Last update
Loading...

হাতিরঝিলে প্রেম by রোকনুজ্জামান পিয়াস

প্রেম সাদা-কালো জীবনকে রাঙিয়ে দেয়। আবার বিবর্ণ-রংহীনও করে তোলে জীবন। রাজধানীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হাতিরঝিলে নানা বয়সীর, নানা শ্রেণি-পেশার, নানা জাতের প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনমেলা বসে প্রতিদিন। আবার কারো প্রেমের শুরুটা এখান থেকে। কারো প্রেমের সমাপ্তিও এখানে। আবার কারো প্রেম পরিণত হয়েছে এখানে। কোনো প্রেমের সমাধিও হয়েছে এখানেই। ঘটন-অঘটনের এতসব হিসাব-নিকাশের মধ্যেই হাতিরঝিলে ছুটে আসেন প্রেমিক-প্রেমিকারা। অসংখ্য প্রেমিক যুগলের ভিড়ে দু’জন দু’জনে একান্তে সময় কাটানোর এমন দৃশ্য রাজধানীতে বিরল। মুক্ত আকাশ, হিমেল বাতাস- এই পরিবেশে প্রেম যেন হয়ে ওঠে আরো মোহনীয়। হাতিরঝিলের লেকের দু’ধারে প্রতিদিনই অসংখ্য প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনমেলা হয়, বসে ভালোবাসার হাট। তবে এখানে প্রেমের বিড়ম্বনাও কম নয়। অসংলগ্ন প্রেম করতে গিয়ে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখিও হতে হয় অনেককে।
প্যারিসের সিন নদীর ওপর ‘পু দে আ’ ব্রিজ। এ ব্রিজের দু’পাশের রেলিংয়ে হাজার হাজার তালা ঝুলানো। সেই তালা ঝুলিয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকারা। তাদের বিশ্বাস এ ব্রিজের রেলিংয়ে তালা আটকে দিয়ে চাবিটি নদীতে ছুড়ে ফেললেই ভাঙবে না তাদের প্রেম। তাই প্রেমকে আমৃত্যু টিকিয়ে রাখতে অদ্ভুত এক বিশ্বাস থেকে সেখানকার প্রেমিক-প্রেমিকারা এ কাণ্ড করে। ভালোবাসার মানুষকে ধরে রাখতে প্যারিসের ‘পু দে আ’ ব্রিজের দু’পাশের রেলিংয়ের মতো কিছুদিন হাতিরঝিলের লেকের ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ব্রিজের রেলিংয়েও তালা ঝুলিয়েছিলো কোনো কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের নজরদারিতে এই রেওয়াজ বন্ধ হয়েছে। ‘পু দে আ’ ব্রিজের রেলিংয়ে তালা ঝুলানোর এই সুযোগ হারিয়েছে হাতিরঝিলে আসা প্রেমিক-প্রেমিকারা। তবে রয়েছে উন্মুক্ত আকাশ। যে আকাশ প্রেমিক হৃদয়কে বিস্তৃতি দেয়। রয়েছে নির্মল বাতাস। এ হাতিরঝিলেই ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে অজস্র স্বপ্নের জাল বুনে চলে প্রেমিক-প্রেমিকারা।
সূত্র মতে, রাজধানী ঢাকার ওপর দিয়ে এক সময় ১৩টি খাল-নদী বহমান ছিল। এরই একটি নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে বেগুনবাড়ী খাল আর হাতিরঝিল। বিস্তীর্ণ এই ঝিলে ছিল বিভিন্ন ধরনের পশু-পাখির অভয়ারণ্য। এ সবকে কেন্দ্র করে সে সময় এর আশপাশে গড়ে ওঠে শ্বাশত বাংলার বিভিন্ন পেশাজীবী সমপ্রদায়ের বসতি। মগবাজার, মধুবাগ, উলন, দাসপাড়া, রামপুরা, মেরুল বাড্ডা, বেগুনবাড়ী ইত্যাদি নামে এসব সম্প্রদায়ের লোকজনের ছাপ রয়েছে। এখানে বাস করতো মাউত, ঢুলী, ধোপা, মালি, মগ, জেলেসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর লোকজন, যারা নগর ও নগরবাসীর বিভিন্ন সেবামূলক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। প্রায় প্রতিবছর বন্যা হতো এবং বন্যার পানিতে নগরীর ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে-মুছে যেতো। রামপুরা-হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী-ধানমন্ডি খাল (বর্তমানে লেক) আর কল্যাণপুর-ইব্রাহিমপুর খাল হয়ে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তীর্ণ জলাভূমির মাধ্যমে তুরাগ ও বালু নদীর মধ্যে সংযোগ ছিল। সে সময় এই পথ দিয়ে পালতোলা নৌকা চলতো। পর্তুগীজরা এই নদীপথে ঢাকায় এসে তেজতুরি বাজার ও তেজগাঁও এলাকায় তাদের বসতি গড়েছিল। ঢাকার রাজাধীরাজ ভাওয়াল রাজাও এই পথে ঢাকায় আসা-যাওয়া করতেন। তার হাতির পাল স্নান করতে বা পানি খেতে এই জলাভূমিতে বিচরণ করতো। কালের বিবর্তনে একসময় এই জলাভূমিই পরিচিতি পায় হাতিরঝিল নামে।
এরপর এই হাতিরঝিল নিয়ে ঘটে গেছে কত কি! একটা সময় এলাকাটি পরিণত হয় দুর্বৃত্ত আর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে। ময়লার ভাগাড়ে দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে এলাকা। দিনের বেলাতেও মানুষ হাতিরঝিল এলাকা দিয়ে যেতে ভয় পেতো। এলাকা পার হওয়ার সময় নাকে রুমাল চেপে দুর্গন্ধ থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা করতো। কিন্তু এ চিত্র পাল্টে যায় ২০১৩ সালে। এ বছরের ২রা জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন হাতিরঝিল প্রকল্প। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, হাতিরঝিল শুধু দেশের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। নতুন বছরের শুরুতে ঢাকাবাসীকে তিনি এই প্রকল্প উপহার দিয়েছিলেন।
এ প্রকল্প উদ্বোধনে নগরবাসীর মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অত্যন্ত পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা এবং দৃষ্টিনন্দন ব্রিজগুলো নান্দনিকতা আরো বাড়িয়ে তোলে। সন্ধ্যার পর রঙিন বাতির ঝলকানি আগন্তুকদের অভিভূত করে। ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম আকর্ষণ এই হাতিরঝিল। উন্নত বিশ্বের আদলে গড়ে তোলা এ ঝিল দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসেন সৌন্দর্য্যপ্রেমীরা। এখানে প্রতিদিন হাজারও মানুষ প্রাতঃভ্রমণ করেন। ইট-পাথরের নগরজীবনের ক্লান্তি দূর করতে কিংবা নির্মল বায়ুতে শ্বাস নিতে বিকালে নামে জনতার ঢল। কখনো কখনো গভীর রাত অবধি থাকে জনতার আনাগোনা। তারা উপভোগ করেন নয়নাভিরাম দৃশ্য। তবে সবচেয়ে বেশি টানে প্রেমিকযুগলদের। মাথার ওপরের সূর্যটা পশ্চিমে যতই হেলতে থাকে প্রেমিক-প্রেমিকাদের ভিড়ও বাড়তে থাকে ততই। সূর্য তার আলো নিভিয়ে দিলে কৃত্রিম আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠে পুরো হাতিরঝিল। নানা রঙের পানির ফোয়ারা নজর কাড়ে সকলের।  নাল-নীল বাতির নিচে বসে, লেকের দৃষ্টিনন্দন ব্রিজের রেলিং ধরে, ব্রিজের দু’মাথায় ঝকঝকে গোলচত্বর বা সবুজ ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে প্রেমিকজুটি। কখনো হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভাবের আদান-প্রদান করে। কখনো প্রেমিকার কোলে মাথা রাখে প্রেমিক। আবার কখনো প্রেমিকের ঘাড়ে পড়ে প্রেমিকার নিঃশ্বাস। কারো কারো মধ্যে চলে মিষ্টি-মধুর খুনসুটি। কোন কোন যুগলদের মধ্যকার মতদ্বৈধতায় সৃষ্টি হয় তুমুল ঝগড়া। যা উৎসুক মানুষ ও অন্য প্রেমিকজুটির কৌতূহলের কারণও হয়ে ওঠে। কোনো কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা মান-অভিমানে আশেপাশের মানুষ থেকে নিজেদের কান্না লুকানোরও চেষ্টা করেন। আবার হাতিরঝিলে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্টে অর্ডার দিয়ে হাত হাত স্পর্শ করে খাবারের অপেক্ষায় সময় কাটে কারো কারো। এরই মাঝে চলতে থাকে প্রেমালাপ। ভবিষ্যৎ সাজানোর গল্প।
সরজমিন হাতিরঝিলে বেশ কয়েকজন প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। মঙ্গলবার দুপুর ১২ টার দিকে দেখা হয় হাতিরঝিলের রামপুরা ব্রিজ প্রান্তে দুই কিশোরের সঙ্গে। এদের একজন রাশেদ, অপরজন জয়। রাজধানীর একটি বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র তারা। কারোর অপেক্ষায় ছিলো তারা। তাদের কথাবার্তায় এমনটাই মনে হলো। জয় জানালো তার বন্ধু রাশেদ একই ক্লাসের অন্য একটি বিদ্যালয়ের একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে। তার আজ এখানে আসার কথা। সেজন্যই তারা দু’জন ক্লাসে না গিয়ে এখানে এসেছে। কিন্তু এখন জানতে পেরেছে মেয়েটি স্কুলে গেছে। কথায় কথায় জানা গেলো, রাশেদ এবং মেয়েটির পরিবার এক সময় একই বাড়িতে ভাড়া থাকতো। তখন থেকেই তাদের মধ্যে চেনাজানা। কিন্তু বছরখানেক আগে মেয়েটির পরিবার অন্য এলাকায় বাসা নিয়েছে। এখন তাদের যোগাযোগের সুযোগ নেই। তাই মাঝে-মধ্যে স্কুল পালিয়ে তারা হাতিরঝিলে প্রেম করতে আসে। একটু এগুতেই লেকের পাশে বসানো বেঞ্চে বসে খাতায় কিছু লিখে একটি মেয়ে তার সঙ্গী ছেলেটিকে বুঝাচ্ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে জানা গেলো- তারা দু’জনেই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। একই ক্লাসে পড়ার সুবাদে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পড়াশোনার বিষয়াদি শেয়ার করতে ক্লাসের পর তারা মাঝে-মধ্যে এই লেকের ধারে বসেন। এখন উভয়েই ৮ম সেমিস্টারে রয়েছেন। তবে বন্ধুত্ব ছাড়িয়ে এখন দু’জন ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছেন। তবে তার আগে লেখাপড়া শেষ করে ভালো চাকরি পেতে চান। যেহেতু দু’জন দু’জায়গায় থাকেন আর তাদের বিশ্ববিদ্যালয়টিও কাছেই, তাই তারা এখানেই বেশি সময় কাটান। প্রচণ্ড রৌদ্রের মধ্যে লেকের ধারে এক ছাতার নিচেই সবুজ ঘাসের ওপর বসে খোশ-গল্প করছিলেন পিংকী ও জিয়াদ। এরমধ্যে পিংকী স্কুলে ও জিয়াদ কলেজে পড়ে। উভয়েই মা-বাবার সঙ্গে থাকেন। মাঝে-মধ্যে তারা পরিবারের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় দেখা করেন। তবে বেশি আসেন এই হাতিরঝিলেই। বসার সুবিধার কারণেই তারা এই জায়গাটিকে পছন্দ করেন।       
বগুড়ার মান্নান ও রংপুরের বৃষ্টি। তারা দু’জনেই নিজ নিজ এলাকায় পড়াশোনা করেন। ঢাকায় একটি কাজে এসে উঠেছেন নিজ নিজ আত্মীয়র বাসায়। তবে এর বাইরে তাদের আরেকটি কাজ ছিলো পরস্পরের সঙ্গে দেখা করা। মঙ্গলবার রাতেই তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার কথা। তাই দুপুর-বিকালটা একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য এসেছেন হাতিরঝিলে। এক বন্ধুর মাধ্যমে তাদের দু’জনের পরিচয় থেকে প্রেম। সন্ধ্যার পর হাতিরঝিলে এসেছেন তানিয়া ও মোবাশ্বের। তানিয়া এখনো পড়ালেখা করছেন। আর মোবাশ্বের একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করেন। খুব শিগগিরই তারা বিয়ে করবেন বলে জানান। মোবাশ্বের অফিস শেষ করে বাসায় ফেরার পথে প্রায়ই তানিয়ার সঙ্গে কিছুটা সময় হাতিরঝিলে কাটিয়ে যান। এ লেকে বেশি প্রেম করতে যারা আসেন তাদের বেশির ভাগই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। রয়েছেন চাকরিজীবী। এছাড়া চোখে পড়ে অসম প্রেমিকযুগলকেও। চোখে পড়ে দিনমজুর, গার্মেন্টকর্মী থেকে শুরু করে গৃহকর্মীরাও। এমনই এক গৃহকর্মী আকলিমা। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে পরিচয় হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শওকতের। এরপর একজন অপরজনকে ভালোবেসে ফেলেন। শওকতের রড-সিমেন্টের দোকান আছে বলে জানান। তিনি আকলিমাকে বিয়েও করতে চান। শনিবার আকলিমা কাজ ছেড়ে নিজ জেলায় বাপের বাড়িতে চলে যাবে। গৃহকর্তার কাছ থেকে বিকাল পর্যন্ত ছুটি নিয়েছেন আকলিমা। একজন আরেকজনের জন্য উপহার সামগ্রীও নিয়ে এসেছেন। শিগগিরই বিয়ে করবেন তারা এমনটাই জানালেন এই যুগল। তাদের প্রথম দেখা এই হাতিরঝিলেই।        
তবে ২০১৪ সালের ৩রা জুন ভোরে প্রেমিক যুগলের লেকে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা এখন মানুষ মনে করে। এদিন দুই কিশোর প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের প্রেম আত্মাহুতি দিতে আসে। উভয়ের পরিবার তাদের এই প্রেম মেনে না নেয়ায় তারা হাতিরঝিলের লেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে কিশোর প্রেমিক এহসানুল হক তন্ময় (১৬) মারা গেলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় মেয়েটি।

0 comments:

Post a Comment