Last update
Loading...

নির্ভার এরশাদ

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারি দল আওয়ামী লীগ যখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত, হামলা-মামলার ধকল সামলাতে বিএনপি এখনও কিছুটা তটস্থ, তখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জাতীয় পার্টি। নানা সমীকরণের যোগফলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ভোটের রাজনীতি এবং সরকার গঠনে এখন আরও বড় ফ্যাক্টর। সোজাসাপ্টা বলতে গেলে, বিদ্যমান অবস্থায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে সরকার গঠনে এরশাদই অবতীর্ণ হবেন মূল ক্রীড়নকের ভূমিকায়। বড় দুই দলের যাকে তিনি সমর্থন দেবেন, সেই দলের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম হবে। অর্থাৎ এরশাদের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি ছাড়া আওয়ামী লীগ-বিএনপির কেউ সরকার গঠনে অগ্রসর হতে পারবে না। এমনকি নানা কারণে ভবিষ্যতে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে এমনটি মনে করেন।
এরকম বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে বড় দুটি দলের মধ্যে কমবেশি সংশয় থাকলেও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে সেরকম কোনো শঙ্কা নেই। তাদের মতে, এরশাদ যতদিন আছেন ততদিন তার দল সরকারের অংশীদার থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে নব্বইয়ে সব দল এক হয়েছিল, মাত্র ২৬ বছরের মাথায় সেই এরশাদকেই এখন ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে বড় দলগুলো উন্মুখ। এভাবে ইতিহাসের পাতায় নতুন করে জায়গা নিয়েছে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির বিশেষ কারিশমা ও রাজনৈতিক সাফল্য। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘কারও পছন্দ হোক বা না হোক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টিই এখন প্রধান ফ্যাক্টর। ক্ষমতার রাজনীতিতে এটাই বাস্তবতা। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বড় দুই দল ভালোভাবেই জানে ক্ষমতায় আসতে হলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সমর্থন লাগবে। তাকে ক্ষমতার ভাগ দিতে হবে। আওয়ামী লীগ দুইবার ক্ষমতায় এসেছে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে। এ কারণে জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতার ভাগও দিতে হয়েছে তাদের। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা আপাতত এককভাবেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘কত দিন বেঁচে থাকব জানি না। হয়তো এটাই আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। তাই এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় নেয়াটাই হচ্ছে আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’ সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট আছে। বিএনপির নেতৃত্বে আছে ২০ দলীয় জোট। শুধু জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে কোনো জোট নেই। তাই আমরাও আলাদা একটি জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে শিগগির এ জোটের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটবে।’ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই আমরা প্রার্থী দেব।’ তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে এককভাবে আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে জাতীয় পার্টিই হবে আগামী দিনের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট।’ সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিএনপি এখন কাগুজে বাঘ। তারা বিবৃতিসর্বস্ব একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। কোথাও এই দলের অস্তিত্ব নেই। এখন দেশের মানুষের কাছে একমাত্র আস্থার জায়গা জাতীয় পার্টি।’ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা আমাদের লক্ষ্য স্থির করেছি এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়ে এগোচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আগামী নির্বাচনে কমপক্ষে ১৫১টি আসনে জয়ী হওয়া। সে অনুযায়ী দল গোছানোর কাজ চলছে। প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে।
অনেকেই জাতীয় পার্টির হয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এরই মধ্যে অনেকে দলে যোগ দিয়েছেন। আরও অনেকে যোগদানের অপেক্ষায় আছেন। যারা বিভিন্ন সময় জাতীয় পার্টি ছেড়ে গেছেন, তারাও তাদের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসতে চাচ্ছেন। কারণ সবাই বুঝে গেছেন, একমাত্র জাতীয় পার্টির সামনেই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি নির্ভার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা রাডার ক্রয় সংক্রান্ত মামলায় গত ১৯ এপ্রিল বেকসুর খালাস পেয়েছেন তিনি। শারীরিকভাবেও এখন পুরোপুরি সুস্থ সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। দল গোছানোর কাজে প্রতি সপ্তাহে কোনো না কোনো জেলা সফরে যাচ্ছেন। সর্বশেষ ১০ এপ্রিল নরসিংদী জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলন করে এসেছেন তিনি। মাঝে কিছুদিন নিজের নির্বাচনী এলাকা রংপুরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটান। এরপর ২৩ থেকে ২৭ এপ্রিল টানা পাঁচ দিনের জন্য পশ্চিবঙ্গের দিনহাটায় অবস্থিত নিজের পৈতৃক ভিটা ঘুরে আসেন তিনি। মে’র পুরোটা সময় ব্যস্ত থাকবেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একাধিক জেলায় সফরে যাওয়া ছাড়াও ঢাকায় জেলা নেতাদের নিয়ে বসবেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরবেন মাঠ নেতাদের কাছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা আপাতত এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য, আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেয়া। সে অনুযায়ী প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। পাশাপাশি দল গোছানোর কাজও পুরোদমে এগোচ্ছে।’ জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলেন, ‘একা কতদূর যাওয়া যায়, তা আমরা বোঝার চেষ্টা করছি। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে তখন কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
এ নিয়ে এখনই মন্তব্য করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এ মুহূর্তে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে জাতীয় পার্টি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই বর্তমান বাস্তবতায় এ দলকে কারও উপেক্ষা করা খুবই কঠিন।’ জাতীয় পার্টির একাধিক শীর্ষনেতার মতে, আগামীতে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার ধারণা, আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক দলই সরকার গঠন করুক না কেন, শেষ ট্রাম্প কার্ডটি থাকবে এরশাদের হাতে। তার সমর্থন ছাড়া কোনো দলই সরকার গঠন করতে পারবে না। এরশাদ যে দল বা জোটকে সমর্থন দেবেন, সব নেগেটিভ ও ফ্লোয়েটিং ভোট সেদিকে ছুটবে। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মতে, সেদিক থেকে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। বাংলাদেশে অতীতে ভোটের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, বেশিরভাগ ফ্লোয়েটিং কিংবা নেগেটিভ ভোট চলে যায় রুলিংপার্টির বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় যদি কোনো কারণে বিএনপি জাতীয় পার্টির সমর্থন পেয়ে যায়, তাহলে সরকার গঠনের পথ আরও সুগম হবে। আওয়ামী লীগ পেলেও সরকার গঠন করতে পারবে। আর ক্ষমতায় যেতে হলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতার ভাগ দিতে হবে। যেমন এখন আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় রয়েছেন জাতীয় পার্টির তিন মন্ত্রী। দরকষাকষির শক্তি বেড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে জাপার ভাগে এমপি এবং মন্ত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও এরশাদের রাষ্ট্রপতি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু হবে না। অর্থাৎ আওয়ামী ও বিএনপির মতো তাদের মধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে কোনো টেনশন নেই।
বরং বলা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার আগাম টিকিট এখন তাদের পার্টি চেয়ারম্যানের হাতে। প্রসঙ্গত, দীর্ঘ একুশ বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে হয় জাতীয় পার্টির সঙ্গে মহাজোট করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বৈধতা পায় জাতীয় পার্টির কারণে। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে বিএনপি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০০৮ সাল থেকেই জাতীয় পার্টির পালে হাওয়া বইতে শুরু করে। ওই বছর আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট গঠন এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জাতীয় পার্টিকে। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় ক্ষমতার ভাগাভাগির রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি আরও একধাপ এগিয়ে যায়। এ অবস্থায় আগামীতেও ক্ষমতার প্রাপ্য ভাগ নিয়ে অনেকটাই চাপমুক্ত দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ প্রসঙ্গে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ যুগান্তরকে বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন তিনিই হবেন ক্ষমতার রাজনীতির নিয়ামক শক্তি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে দলই আগামীতে ক্ষমতায় যাক না কেন, জাতীয় পার্টির সমর্থন লাগবে। জাতীয় পার্টির সমর্থন ছাড়া কোনো দলই ভবিষ্যতে সরকার গঠন করতে পারবে না। এ বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট।’

0 comments:

Post a Comment