Last update
Loading...

নির্বাচনের সুবাতাস!

দেশে নির্বাচনী সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছে। বলা যায়, গত ২০ মে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দলটির একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী কার্যক্রম। আর ১০ মে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিএনপির নির্বাচনী কার্যক্রম। গত বছর ১ অক্টোবর সিলেটে হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল এবং একইসঙ্গে সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়। নিবন্ধিত অন্যসব রাজনৈতিক দল একক বা জোটবদ্ধভাবে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম শিগগির শুরু করবে বলে আশা করা যায়। অনেকটা একদলীয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়া গণতন্ত্র একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সুস্থ্ হয়ে উঠুক- এটাই জনগণের প্রত্যাশা। তা কীভাবে সম্ভব হতে পারে সেটি আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। ২০ মে আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, এ বর্ধিত সভা দলটির আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ। সভায় দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। সভায় নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং পুরনোদের সদস্যপদ নবায়নের ওপর জোর দেয়া হয়।
শেখ হাসিনা নিজে তার সদস্যপদ নবায়ন করেন। সভায় দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র উন্মোচন করা হয়। জেলা নেতাদের প্রত্যেককে দলের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রের কপিসহ বই, সিডি ও প্রচারপত্র দেয়া হয়। তাছাড়া সরকারের নেয়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের একটি সারসংক্ষেপ সরবরাহ করা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’-এ রাজনীতি, সাংবিধানিক সংস্কার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। আর্থ-সামাজিক বিষয়ে প্রস্তাবাবলীতে তেমন নতুনত্ব না থাকলেও তার সাংবিধানিক সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো সমাজের বিভিন্ন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন, সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং ন্যায়পাল পদ সৃষ্টির ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারপারসন যেমন শর্তহীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তেমনি তিনি সংবিধানের পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা সংসদ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল, সংসদ বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান, সংবিধানের কিছু বিষয় সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ এবং সংবিধানের কিছু ধারা-উপধারা সংশোধনের অযোগ্য করার বিধান এবং উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত করার বিধান পর্যালোচনা ও পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার আনার কথা বলেছেন। এদিকে শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং মাঠে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির প্রাথমিক কাজ ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে মর্মে পত্রপত্রিকায় খবর এসেছে। ১৯ মে যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের চার নেতাকে ডেকে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রাথমিক কাজ শুরু করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
২০০৮ ও ২০১৪ সালের ধারাবাহিকতায় এবং দলের ঘোষণাপত্রকে ভিত্তি ধরে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, জ্বালানি খাত, ব্লু ইকোনমি, যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও তাদের মেধা ব্যবহারের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হচ্ছে ইশতেহার। অন্যদিকে ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’-এর আলোকেই ইশতেহারের কাজ শুরু করেছে বিএনপি। প্রতিহিংসা নয়, ইতিবাচক রাজনীতির স্লোগানে সরকার, জাতীয় সংসদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতিসহ বেশ কয়েকটি খাতে অধিক গুরুত্ব দেয়া হবে দলটির ইশতেহারে। রাজনৈতিক দলগুলোর এসব কার্যক্রম আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজনৈতিক দলগুলো ঘোষিত ভিশন, ঘোষণাপত্র, ইশতেহার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কতটা সহায়ক হবে? এখানে যে বিষয়টি প্রথমে এসে যায় সেটি হল, ১৯৯১-২০০৮ সময়কালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি এবং ক্ষমতাসীন কোনো দলের কোনো জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার নজির নেই। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দু’জন সামরিক শাসক সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে ১৫ বছর দেশ শাসন করেছেন। তারা বেসামরিক পোশাকে রাজনৈতিক দল গঠন করে যে তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, সেসব নির্বাচনে জয়লাভের জন্য মাঠ প্রশাসনসহ পুরো প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করেন। জনগণ সহজেই বুঝতে পারে, সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে পরিচালিত হচ্ছে নির্বাচন। ফলে এসব নির্বাচনের ফল ছিল পূর্বনির্ধারিত।
নির্বাচনের ফল আগে থেকেই ছকে বাঁধা থাকায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যায় ২০১৪ সালের অনেকটা একদলীয় দশম সংসদ নির্বাচন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সরকার গঠনের কিছুদিন পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার পদ্ধতি বাতিল করে। সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে সরকারকে দাবি মানাতে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোট এবং জোটের বাইরে ৯টি সমমনা দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত ৩০০ আসনের ১৫৩টিতে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী কয়েকটি দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সদস্যপদ লাভ করেন। প্রতিদ্বন্দ্বি^তাহীন দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যদিও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের মতে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় নেই, গণতন্ত্র কবরে চলে গেছে। বর্তমানে দেশে যে নির্বাচনী সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক একাদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার শুভ পরিণতি ঘটুক। এজন্য যে অনুকূল পরিবেশের প্রয়োজন হবে তা সৃষ্টির দায়ভার সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং বিরোধী দলের। তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই মূল দায়ভার বহন করতে হবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের প্রথম কাজ হবে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে স্পেস দেয়া। এজন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা তুলে নিতে হবে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অযথা হয়রানি বন্ধ করতে হবে,
বিরোধী দলের অফিসে অযথা তল্লাশি অভিযান চালানো যাবে না এবং বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার দিতে হবে। সরকারকে আর যে কাজটি করতে হবে তা হল, আগামী সংসদ নির্বাচনে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ না করে নির্বাচন পরিচালনায় কমিশনকে সংবিধান নির্দেশিত পূর্ণ সহায়তা প্রদান। জনগণের যেন বিশ্বাস জন্মে, সরকার নয়, নির্বাচন পরিচালনা করছে নির্বাচন কমিশন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে তার কিছুটা ধারণা পত্রপত্রিকা থেকে পাওয়া যায়। রোডম্যাপে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশোধন, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন এবং একাদশ জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান। এসব বিষয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিশনের আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হবে রোডম্যাপে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে অথবা ২০১৯ সালের জানুয়ারির শুরুতে একাদশ সংসদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সব ধরনের হিংসাত্মক কার্যক্রম পরিহার করে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।
বিরোধী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে তারা ক্ষমতাসীন দলের তুলনায় উন্নত বিকল্প। বর্তমান কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল জনগণের আস্থা অর্জন করা। এতে তারা ইতিমধ্যে কিছুটা সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এখন তাদের পরবর্তী এজেন্ডা হবে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আনার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। এজন্য কমিশনের কাজ হবে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। এ কাজটি হবে কমিশনের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। কারণ বিশ্বে সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নজির না থাকলেও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে শাসক দল আওয়ামী লীগ সংসদ বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিধান করেছে। ফলে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় জাতীয় সংসদের মোট আসনের কমবেশি ৯০ ভাগ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা (তাদের মধ্যে অনেকে মন্ত্রীও হয়েছেন) ক্ষমতায় থাকবেন। তাছাড়া কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন নিরপেক্ষভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়ায় এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত/মনোনীত প্রার্থীরা নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেন। তারা দলীয় নীতিনির্ধারকদের ইঙ্গিতে সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে যে পিছপা হবেন না, তা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়। এসব বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে কমিশনকে সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির এজেন্ডায় জয়ী হতে হবে। তাহলেই বিএনপিসহ সব নিবন্ধিত দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। রোডম্যাপে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এটি হবে একটি ভালো উদ্যোগ। কমিশনকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচন মঞ্চে কুশীলব হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের এড়িয়ে নয়, বরং তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই নির্বাচন পরিচালনার ব্যাপারে কমিশনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দল ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্যসব দলের পূর্ণ সহযোগিতা কমিশনের সবচেয়ে বেশি দরকার। দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিভক্তি থাকলেও তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। কমিশনকে আলোচনায় বসতে হবে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও।
আগামী সংসদ নির্বাচনে কমিশনের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবে নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রশাসনে নব্বইয়ের দশকের প্রথম ভাগ থেকে শুরু হওয়া দলীয়করণ বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানেন, যে সরকার ক্ষমতায় আসবে সে সরকারই তাদের রক্ষা করাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে। তাই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি দিলেও শেষমেশ তা কার্যকর করতে পারবে না। সঙ্গত কারণে প্রশাসনের যারা বেনিফিশিয়ারি, তারা নিজেদের স্বার্থেই সরকারের পরিবর্তন চাইবেন না। তাই কমিশনের কাজ হবে মাঠ প্রশাসনকে দলনিরপেক্ষ থাকতে উদ্বুদ্ধ করা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করে মাঠ প্রশাসন যে সুনাম অর্জন করেছিল তা তাদের স্মরণ করে দিতে হবে। তাদের সে হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে অনুপ্রেরণা দিতে হবে। এটা করতে পারলে কমিশনের পক্ষে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠান করা সহজ হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পথে কোনো দলবাজ কর্মকর্তা বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার যে প্রতিশ্রুতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার দিয়েছেন, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে যা বলতে চাই তা হল, দেশে নির্বাচনের যে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার শুভ সমাপ্তি হোক। দেশের দুর্বল গণতন্ত্র সুস্থ ও সবল হোক। বাংলাদেশ বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাতারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলুক।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

0 comments:

Post a Comment