Last update
Loading...

আর একতরফা নির্বাচন নয়

আগাম নির্বাচন না হলে আশা করা যায় আগামী বছরের শেষদিকে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নাগরিক মনে এখন একটাই প্রশ্ন- কেমন হবে আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন? নির্বাচনটি কি অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ হবে, নাকি বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যবস্থায় কোনোরকম দায়সারাভাবে অনুষ্ঠিত হবে? দুটি বড় দলের একটি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাহলে যে ওই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, সে বিষয়টি সর্বজনবিদিত। এখন প্রশ্ন হল, একাদশ সংসদ নির্বাচনে বড় দুটি দল অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা? সরকারি দলের অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। প্রধান প্রশ্ন হল, সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা। অন্যভাবে বলা যায়, সরকারি দল প্রধান বিরোধী দলকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে রাজি করাতে পারবে কিনা?
সাম্প্রতিক রাজনীতির লক্ষণ দেখে মনে হয়, একাদশ সংসদ নির্বাচনটি একটি ভালো নির্বাচন হতে পারে। কারণ, অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দলীয় ভোটব্যাংক বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ চেষ্টার অংশ হিসেবে সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামকে গণভবনে দাওয়াত দিয়ে অভূতপূর্ব আপ্যায়ন করা হয়েছে। তাদের দাবি-দাওয়া মেনে এ ইসলামী গোষ্ঠীকে খুশি করে তাদের বিশাল ভোটব্যাংক কব্জা করার একটি প্রয়াস লক্ষ করা গেছে। এ কাজের মধ্য দিয়ে অনুধাবন করা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভোটের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। লক্ষণ দেখে মনে হয়, এখনই স্বীকার না করলেও যথাসময়ে সরকার হয়তো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। সরকার যদি এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে রাজনীতিতে সুবাতাস প্রবাহিত হবে। সেক্ষেত্রে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ না হলেও ‘নির্বাচনকালীন’, ‘অন্তর্বর্তীকালীন’, ‘নির্বাচন সহায়ক’, ‘নির্দলীয় স্বল্পকালীন’ অথবা অন্য যে কোনো নাম দিয়ে একটি দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হতে পারে। আর এমন নির্বাচন করা হলে ওই নির্বাচনে যে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করবে সে বিষয়টি সুনিশ্চিত। তবে দশম সংসদ নির্বাচনের মতো যদি সরকারপ্রধান ও মন্ত্রী-এমপিরা নিজ নিজ পদে থেকে জাতীয় সংসদ না ভেঙে দলীয়করণকৃত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও দুর্বল নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের আয়োজন করেন, তাহলে ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ নাও করতে পারে। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনার জন্য। কোনো জনপ্রিয় দল যদি বুঝতে পারে,
কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে অধিকাংশ ভোটারের সমর্থন পেলেও তারা নির্বাচনে জিততে পারবে না, তাহলে ওই দলের বিবেচনায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করাটাই হবে স্বাভাবিক। সেদিক দিয়ে বিচার করে বলা যায়, বিএনপির দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল না। জেনেশুনে বিষ পান করার বিষয়টি রবীন্দ্র সঙ্গীতে (‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান’) অথবা নাটক সিনেমায় সম্ভব হলেও রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় তা সম্ভব নয়। বিএনপি যদি জেনেশুনে পরাজয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে বিরোধী দল হওয়ার জন্য দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত, তাহলে দলটিকে হয়তো আজীবন বিরোধী দল থাকতে হতো। কারণ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর দলীয় সরকারের অধীনে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিদের ক্ষমতায় ও পদে রেখে সংসদ না ভেঙে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে এ রকম নির্বাচনী ব্যবস্থার বৈধতা দেয়া হতো এবং ভবিষ্যতে ওই একই ধারায় নির্বাচন হতে থাকলে বিএনপিকে অধিক জনপ্রিয়তা নিয়েও একটি আজীবন বিরোধী দল হয়ে থাকতে হতো। বিএনপি রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রদর্শন করে ওই ফাঁদে পা দেয়নি। কাজেই ২০১৮ সালে এসে এ দলের পক্ষে আবারও আগের মতো একই রকম সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। কারণ এ ভুল করলে বিএনপি তাদের সমর্থকদের কাছে একটি আদর্শচ্যুত দল হিসেবে গণ্য হবে এবং ২০১২-২০১৩ সালে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করাকালীন জনগণের যে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার সব দায় বিএনপির ঘাড়ে বর্তাবে। সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা জানেন, গতবারের নড়বড়ে নির্বাচনের ওপর ভর করে তারা যেভাবে এতদিন ক্ষমতায় রয়েছেন তার ফলে তাদের কত অসুবিধা হয়েছে। কী পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। তারা এও জানেন, এর ফলে বহির্বিশ্বের কাছে দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি কতটা মলিন হয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ওই নির্বাচনের পর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরকারকে একটি ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে আসছে। এ অবস্থায় একাদশ সংসদ নির্বাচনেও সরকার যদি আবার বিরোধীদলীয় দাবি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শক্তি প্রয়োগ করে একতরফাভাবে একাদশ সংসদ নির্বাচন করে একই প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করে ক্ষমতায় থাকতে চায়, তাহলে গণতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। সেজন্য সরকারও বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া একতরফা নির্বাচন করতে চাইবে না। বিএনপির দাবি পুরোপুরি মেনে না নিলেও মোটামুটি একটা সমঝোতা করে সরকার হয়তো চাইবে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে রাজি করাতে। বিএনপি জানে, মিষ্টি কথায় এ সরকার তাদের দাবি মানতে রাজি হবে না। এ কারণে সরকারকে চাপ দেয়ার জন্য তারা সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কাজ করে যাচ্ছে। এ কাজে তারা অনেকটা এগিয়েছে। যেসব জেলায় কমিটি গঠন নিয়ে অসুবিধা ছিল, সেসব জেলায় কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে ৫১টি কমিটি করে তাদের কাজে লাগিয়ে দ্রুত সময়ে সারা দেশের সংগঠনকে মাঠে নামার মতো প্রস্তুত করার লক্ষ্যে দলটি কাজ করছে। দলীয় নেতাকর্মীরাও দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর আবার চাঙ্গা হয়ে উঠছেন। দলীয় চেয়ারপারসন ইতিমধ্যে সরকারি দলের সমালোচনায় বক্তব্য-বিবৃতিতে সরব হয়ে উঠেছেন। তিনি আগামী নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়। তবে সে নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে, শেখ হাসিনার অধীনে নয়।’ তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তার কোনোটাই সুষ্ঠু হয়নি। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি।’ সরকারি দলের তীব্র সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ এতই অপকর্ম করেছে যে তারা এখন পালানোর রাস্তা খুঁজছে। কিন্তু এমন সময় সামনে আসছে যে তারা পালাতেও পারবে না।’ সরকারি দলের নেতারা একতরফা নির্বাচন করা কঠিন হবে জানলেও এখনও আগের সুরে কথা বলছেন। মোহাম্মদ নাসিম, ওবায়দুল কাদের প্রমুখ নেতা এখনও বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কী করবে না, এটা তাদের ব্যাপার। বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন সহায়ক সরকারের নিয়ম নেই। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হবে না। কেউ নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা সেটা তাদের ব্যাপার।’ তবে সরকারি দলের নেতারা যত সমালোচনাই করুন না কেন, তারা এখন বুঝতে পেরেছেন একতরফাভাবে একাদশ সংসদ নির্বাচন করা সহজ হবে না। কাজেই শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে এখন থেকেই নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে সংলাপ শুরু করে সরকার রাজনীতিতে সুবাতস আনতে পারত। কিন্তু সরকারের তেমন ইচ্ছা আছে বলে মনে হচ্ছে না। নির্বাচন আরও কাছে এলে হয়তো তারা সেদিকে যাবেন। আর সে পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চলমান বাগযুদ্ধ ও বিবৃতি-পাল্টাবিবৃতি রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে রাখবে। একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে দুই বড় দলের মধ্যে চলমান বাহাসে বিএনপি নেতাকর্মীরা সরকারি দলের নেতাকর্মীদের চেয়ে এগিয়ে আছেন। প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতা করার পর সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা এ সম্পর্কিত টকশো আলোচনায় কিছুটা হলেও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। বিএনপির এ বক্তব্য নাগরিক সমাজে অধিক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। কারণ, বিএনপি নির্বাচন করতে চায়। তবে সে নির্বাচন তারা সরকারি দলের অধীনে করতে চায় না। তারা নির্বাচনী স্বচ্ছতার স্বার্থে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করতে চায়। কাজেই তাদের যুক্তি নাগরিক সমাজের কাছ যৌক্তিক প্রতীয়মান হচ্ছে। অন্যদিকে, সরকারি দল চায় নিজ দলের অধীনে নির্বাচন করতে। কিন্তু ইতিপূর্বে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন বাদ দিলে বাকিগুলোর কোনোটিই ভালো হয়নি। ওই নির্বাচনগুলোতে দৃশ্যমানভাবে ব্যাপক দুর্নীতি-কারচুপি ও সন্ত্রাস-সহিংসতা হলেও নির্বাচন কমিশন এ দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে পারেনি। সে কারণে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি নাগরিক সমাজে যৌক্তিক বিবেচিত হচ্ছে না। নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি যে সংলাপ বা আলোচনার দাবি তুলছে, সে বিষয়টিই নাগরিকদের কাছে সময়োচিত মনে হচ্ছে। কোনো রকম সংলাপ-আলোচনা ছাড়া সরকার যদি একগুঁয়েমি করে একতরফা নির্বাচন দেয়, তাহলে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। দেশকে এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে সরকারকে যে কোনো উপায়ে আগামী সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। এটি সম্ভব না হলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার স্বার্থে আবারও একতরফা নির্বাচন করা হলে নাগরিক সমাজ ভবিষ্যতে সরকারি দলকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করার দায়ে অভিযুক্ত করবে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
akhtermy@gmail.com

0 comments:

Post a Comment