Last update
Loading...

ঢালাও সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হচ্ছে না, ভ্যাট হারও কমছে

দেশীয় শিল্পের জন্য সুখবর। আমদানি পণ্য সম্পূরক শুল্ক বিলুপ্তের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আইএমএফের চাপে বিতর্কিত নতুন ভ্যাট আইনে সম্পূরক শুল্ক বিলুপ্তের বিধান করা হয় বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর চক্রান্তে। মাত্র ১৭০টি আমদানি পণ্য ছাড়া ১১৯২ পণ্য থেকে সম্পূরক শুল্ক বিলুপ্তের বিধান রেখেই আগামী অর্থবছরের বাজেটের হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত করে এনবিআর। কিন্তু স্থানীয় শিল্পের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী সমাজ এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, বিতর্কিত নতুন ভ্যাট আইনের এই বিশেষ বিধান দেশীয় শিল্পের ওপর কুঠারাঘাত করবে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেনি এনবিআর। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আগের অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে। ঢালাওভাবে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হচ্ছে না। খবর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রের। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতার মুখে নতুন আইনে ভ্যাট হারেরও পরিবর্তন আসছে। এ নিয়ে অনমনীয় অবস্থানে ছিলেন এনবিআরের নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু সামনে জাতীয় নির্বাচন। মূল্যস্ফীতি বাড়লে, দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে জনমনে বিরূপ প্রভাব পড়বে- এমন আশংকায়ই সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
যদিও এতে দাতা সংস্থা আইএমএফের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হবে এবং প্রত্যাশিত ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়ে ঝুঁকির সৃষ্টি হবে এমন আশংকাও রয়েছে। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রীসহ দলের মহাসচিব থেকে শুরু করে একাধিক পর্যায় থেকে ভ্যাট আইন সংশোধনের পরামর্শ দেয়া হয়। নির্বাচনের আগে অহেতুক সমালোচনা-বিতর্ক এড়াতে স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনার কথা বলেন তারা। এরপরই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তবে সবকিছুই চূড়ান্ত হবে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য বাজেট বৈঠকে- এমন দাবি করে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকটি হবে মূলত অর্থমন্ত্রী এবং এনবিআরের সঙ্গে। তবে একাধিক সিনিয়র মন্ত্রী বৈঠকে অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বৈঠকেই আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার ও কর প্রস্তাবের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এনবিআরে লিখিত নির্দেশ এসেছে ‘২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজস্ব কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। দেশে যথেষ্ট পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে বা চাহিদার বড় অংশ স্থানীয় বাজার থেকে সরবরাহ হচ্ছে- এমন একই জাতীয় পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করা যাবে না। চলতি অর্থবছরের বাজেটে যেসব পণ্যে আমদানি পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা সমন্বয়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একজন সদস্য জানান, শেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি পেয়ে আবার নতুন করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। এছাড়া ভ্যাট হারেও বড় পরিবর্তন আসছে। তিনি জানান, ভ্যাট হার এবং সম্পূরক শুল্ক নিয়ে আগামী বাজেটে বড় ধরনের চমক থাকছে। ভ্যাট হার এবং সম্পূরক শুল্কের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে ভ্যাট আইন সংশোধন করতে হবে। এতে রাজস্ব আদায়ের হিসাব-নিকাশ আবার নতুন করে করতে হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, আইএমএফের অনড় অবস্থানের কারণেই নতুন ভ্যাট আইনে সম্পূরক শুল্ক বিলুপ্তের ধারা সংযোজন করা হয়েছে।
জানতে চাইলে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, আগামী বাজেটে সম্পূরক শুল্ক পুরো প্রত্যাহার হচ্ছে না এ কথা সত্য। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাহার হতে পারে। ভ্যাট হার নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ভ্যাট হার ১৫ শতাংশই থাকছে। নতুন কোনো পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে তা আমার জানা নেই। তবে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাজেট বৈঠককালে এসব বিতর্কিত বিষয় নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি মনে করেন। এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখছেন। তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ভ্যাট আইন নিয়ে বিতর্কের অবসান হবে। সরকার যদি শিল্প ও কর্মসংস্থান চায় তবে সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখতে হবে। না হলে দেশীয় শিল্প মরে যাবে। যত বেশি সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে দেশি শিল্প তত বেশি সহায়তা পাবে। তিনি বলেন, শুনেছি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি পাঠানোর পর দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় এনবিআর সম্পূরক শুল্কের তালিকা পুনর্বিন্যাস করছে। যদি তাই হয়, তবে এ সরকার যে ব্যবসাবান্ধব তা আরেকবার প্রমাণিত হবে। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, আমদানি পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তা সার্বিক অর্থনীতির জন্য হতো বুমেরাং। তার দাবি, এনবিআরেরই অতি উৎসাহী কিছু কর্মকর্তা সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের বিধান নতুন ভ্যাট আইনে সম্পৃক্ত করেছিলেন। কাস্টমস ও ভ্যাট উইংয়ের অধিকাংশ কমিশনার এ বিষয়ে আপত্তি জানালেও তাদের মতামত অগ্রাহ্য করা হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে এনবিআর চিঠি পাঠিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে দেশি শিল্পের সুরক্ষায় রাজস্ব কাঠামো নির্ধারণে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর। এরপর এনবিআর থেকে বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ে পৃথক দুটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে স্থানীয় উৎপাদিত যেসব পণ্য স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম তার হালনাগাদ তালিকা এবং গত ও চলতি অর্থবছরে প্রায় দুই হাজার পণ্যের ওপর আমদানি পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর ফলে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য কী প্রভাব পড়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই উদ্বেগজনক এ বিষয়টি বারবার সরকারের গোচরে এনেছে। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইনের দোহাই দিয়ে এনবিআর জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। আইএমএফ শর্তযুক্ত এক বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তার মুলা ঝুলিয়ে সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করছে- এমন অভিযোগ করে ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন,
আত্মঘাতী এ সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে ব্যাপক আকারে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আমদানি পণ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) আরোপ করার প্রস্তাব করা হলেও এখন পর্যন্ত তা বিবেচনায় না নেয়ায় ক্ষুব্ধ ও আশংকিত ব্যবসায়ী নেতারা। বর্তমানে আমদানি পর্যায়ে ১ হাজার ৩৬২টি পণ্য ও সেবার ওপর বিভিন্ন হারে সম্পূরক শুল্ক বা এসডি আরোপ আছে। আর স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত সিগারেট, বিড়ি, শ্যাম্পু, টাইলসসহ ২৫-৩০টি পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক দিতে হয়। নতুন ভ্যাট আইনে সর্বোচ্চ মাত্র ১৭০টি পণ্য ও তিনটি সেবার ওপর আমদানি ও স্থানীয় উভয় পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যের সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার সুযোগ থাকছে। বিতর্কিত এ আইনে ২৪১ ট্যারিফ লাইনগুলো ছাড়াও এসডি অপসারণ করার কথা বলা হয়েছে। যার ফলে আমদানি পণ্যের কাছে মার খাবে দেশে উৎপাদিত পণ্য। এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সার্বিক অর্থনীতিতে। বাজেট বৈঠকেও অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার বা কমাতে হচ্ছে। এতে দেশি শিল্প কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়বে। স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইএমএফের নীলনকশায় আমদানি পণ্যের শুল্ক বাধা অপসারণ করলে এদেশ শিল্প খাতে বহির্বিশ্বের শক্তিশালী বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া বাণিজ্যের অবাধ ক্ষেত্র হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের বাজার বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করতে এই নীতি চালু হলে দেশীয় শিল্পের বিকাশ রুদ্ধ হবে, ভেঙে পড়বে জাতীয় উৎপাদন কাঠামো। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) দুর্বল দেশগুলোকে আমদানি শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার করতে বলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- এসব দেশের বাজার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পণ্যে সয়লাব করা ও স্থানীয় উৎপাদন কাঠামো ভেঙে ফেলে নিরঙ্কুশ অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা সৃষ্টি করা। ডব্লিউটিওর এ নীতি বাস্তবায়নে মূল দায়িত্ব পালন করছে ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফ।

0 comments:

Post a Comment