Last update
Loading...

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক চৌধুরী আর নেই

বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের বহু ঘটনার সাক্ষী সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক আহমেদ চৌধুরী ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। বুধবার ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি বার্ধক্যজনিত জটিলতার পাশাপাশি হার্ট ও কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। ফারুক চৌধুরী সফল কূটনীতিক, লেখক ও সৃজনশীল প্রতিভার মানুষ ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে কূটনীতিক, রাজনীতিক, শিক্ষাবিদসহ সর্বস্তরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্ষীয়ান এ কূটনীতিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। মরহুমের প্রথম জানাজা সেগুনবাগিচায় অবস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাদ আসর ধানমণ্ডি ৭ নম্বর রোডের বায়তুল আমান জামে মসজিদে জানাজা শেষে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। ফারুক চৌধুরী স্ত্রী জীনাত চৌধুরী, ছেলে আদনান, মেয়ে ফাইয়াজসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরীসহ একাধিক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। বিকালে বাদ আসর ধানমণ্ডির বায়তুল আমান মসজিদে দ্বিতীয় জানাজায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক ইলাহী চৌধুরী, বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, শনিবার বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে ফারুক চৌধুরীর কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। ফারুক চৌধুরী ১৯৩৪ সালের ৪ জনুয়ারি সিলেটে করিমগঞ্জে বা শ্রীহট্টে জন্মগ্রহণ করেন। করিমগঞ্জ তখন সিলেটের অন্তর্ভুক্ত হলেও এখন তা ভারতের আসাম রাজ্যের অধীন। তার বাবা গিয়াসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছিলেন সরকারি চাকুরে, মা রফিকুন্নেছা খাতুন চৌধুরী। ম্যাজিস্ট্রেট বাবার প্রথম সন্তান ফারুক চৌধুরী। তার আরও তিন ভাই ও দুই বোন রয়েছেন- ইনাম আহমেদ চৌধুরী (সাবেক সচিব ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত), প্রয়াত মাসুম আহমেদ চৌধুরী (রাষ্ট্রদূত), ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী (রাষ্ট্রদূত, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও অধ্যাপক),
বোন নাসিম হাই (স্বামী শহীদ কর্নেল সৈয়দ আবদুল হাই), ছোট বোন নীনা আহমেদ (স্বামী ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা)। ফারুক চৌধুরী ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে চাকরিজীবন শেষ করেন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে। ফারুক চৌধুরী ভারত ও পাকিস্তানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি ছিলেন। ওআইসি ও সার্ক প্রথম সম্মেলনের সমন্বয় ছাড়াও তিনি জাতিসংঘ এবং অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়া তিনি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের উপদেষ্টা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি, ও ডিবিএইচের (ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঝানু এ কূটনীতিকের প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ বইয়ের জন্য তিনি ২০১৫ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। আত্মজীবনীমূলক এ গ্রন্থ ছাড়াও তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে, দেশ দেশান্তর, প্রিয় ফারজানা, নানাক্ষণ নানাকথা, স্বদেশ স্বকাল স্বজন, সময়ের আবর্তে, বঙ্গবন্ধু স্মরণে ইত্যাদি। ফারুক চৌধুরীর কাছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিশেষভাবে স্মরণীয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে লন্ডন হয়ে দেশে ফেরার সময় দিল্লি থেকে ফারুক চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে এগিয়ে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিফ অব প্রটোকল নিয়োগ করেছিলেন। তার কূটনৈতিক অবদান ও সাহিত্যকর্মের জন্য দেশবাসীর কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ফারুক চৌধুরীর মৃত্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের সভাপতি নাজমুল ইসলাম মকবুল ও সাধারণ সম্পাদক লিমন মিয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা ও বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তি শোক প্রকাশ করেছেন। শোকে স্তব্ধ গোলাপগঞ্জ : গোলাপগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি জানান,
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে তার নিজ এলাকা সিলেটের গোলাপগঞ্জ। বুধবার ভোরে তার মৃত্যুর সংবাদ তাৎক্ষণিক বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারের পরপরই গোটা উপজেলায় নেমে আসে শোকের ছায়া। এ সংবাদে অনেকেই শোকে কাতর হয়ে পড়েন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ফারুক আহমদ চৌধুরী প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ চৌধুরীর আপন ভাই। ফারুক আহমদ চৌধুরীর বাড়িতে কেউ না থাকলেও বুধবার তার বাড়িতে এলাকার বিভিন্ন লোকজন ছুটে গেছেন খোঁজখবর নিতে। অত্যন্ত মিষ্টভাষী এ লোককে হারিয়ে অনেকেই এখন ভেঙে পড়েছেন মানসিকভাবে। জানা যায়, বুধবার ভোরে মারা যান সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক আহমদ চৌধুরী। এ মৃত্যুর খবর প্রচার হলে গোটা উপজেলায় নেমে আসে শোকের ছায়া। তার নিজ এলাকা বারকোট গ্রামের লোকজন শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েন। এলাকার লোকজন জানান, ফারুক আহমদ চৌধুরী বড়মাপের লোক হলেও তার কথাবার্তা ও আচার-আচরণ ছিল একেবারে সাধারণ। এলাকার লোকজনদের তিনি খুবই ভালো বাসতেন। তাদের ভালোবাসার টানে তিনি নিজের হাজারো কর্মব্যস্ততা রেখে মাঝেমধ্যে ছুটে আসতেন তার নিজ এলাকা উপর বারকোট গ্রামে। এলাকার লোকজন তাকে চিনতো মিষ্টভাষী হিসেবে। এলাকার অসহায় গরিব লোকদের ব্যাপারে তিনি খোঁজখবর রাখতেন সব সময়। কেউ কোনো কাজকর্ম নিয়ে তার কাছে গেলে কখনও কেউ খালি হাতে ফেরেননি। এদিকে সদ্যপ্রয়াত ফারুক আহমদ চৌধুরীর অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে গোলাপগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটি। সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ জেলওয়ার হোসেন স্বপন, সিনিয়র সহ-সভাপতি হারিছ আলী ও অনলাইন প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাহিদ উদ্দিন এক শোকবার্তায় মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমাবেনা জ্ঞাপন করেন।

0 comments:

Post a Comment