Last update
Loading...

ঢাকায় অভিযান নাটক, অভিযুক্তরা সিলেটে

বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে ধর্ষিত দুই তরুণীর করা মামলার অভিযুক্তরা সিলেটে পালিয়ে যাওয়ার পর ঢাকায় দিনভর অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। মামলা দায়েরের পর দু’দিন অভিযুক্তরা নিজেদের বাসায় ছিল- এমন তথ্য পরিবারের পক্ষ থেকে দেয়া হলেও পুলিশ তাদের খুঁজে পায়নি। আসামিরা সিলেটে পালিয়ে যাওয়ার পর মঙ্গলবার সকাল থেকে তাদের ধরতে ‘তৎপরতা’ দেখায় পুলিশ। এদিন মামলাটি ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশনে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে ধর্ষিত দুই তরুণীকে হয়রানি, মামলা নিতে গড়িমসি এবং আসামিদের গ্রেফতার না করে তাদের সঙ্গে আপসের অভিযোগ ওঠার পর পাঁচ দিনের ছুটিতে গেছেন বনানী থানার ওসি বিএম ফরমান আলী। এছাড়া প্রধান অভিযুক্ত আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী পিয়াসা নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, প্রধান অভিযুক্ত সাফাতের গ্রামের বাড়ি সিলেটে। সাফাত আরেক ধর্ষক নাঈম আশরাফ এবং ধর্ষণের সহায়তাকারী সাদনান সাকিফকে নিয়ে সিলেটে যায়। সঙ্গে সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষীও ছিল। সোমবার তারা সিলেটের রিজেন্ট পার্ক রিসোর্টে রুম বুকিংয়ের জন্য যায়। সঙ্গে কোনো লাগেজ ছিল না। বুকিংয়ের সময় আইডি কার্ড চাইলে তারা তা দিতে রাজি না হওয়ায় রুম দেয়া হয়নি। এ নিয়ে সাফাত বাকবিতণ্ডাও করেন। রিজেন্ট পার্ক রিসোর্টের ইনচার্জ হেলাল আহমেদ, ম্যানেজার বখতিয়ার ও রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোবারক যুগান্তরকে এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন।
মোবারক যুগান্তরকে বলেন, বুকিং না দেয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে রিসোর্ট ত্যাগ করেন। সাফাতের চেহারা চেনা মনে হলেও তখন নিশ্চিত হতে পারিনি তারা বনানীর ঘটনায় অভিযুক্ত। পরে মনে পড়ে তাদের ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের ডিসি জেদান আল মুসা যুগান্তরকে বলেন, আমরা লোকজনের মুখে শুনেছি বনানীতে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তরা সিলেটে অবস্থান করছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। মামলাটি মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশনে স্থানান্তর করা হয় বলে জানিয়েছেন বিভাগের ডিসি ফরিদা ইয়াসমিন। ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে মামলাটি স্থানান্তর করা হয় বলে তিনি জানান। এরই মধ্যে একটি দল ঘটনাটির ছায়া তদন্ত করছে। তারা ধর্ষিত দুই তরুণীর জবানবন্দি নিয়েছেন। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন থেকে দেয়া মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়েছেন। ভুক্তভোগী দুই তরুণীর অভিযোগ, ২৮ মার্চ বন্ধু সাদমান সাকিফের প্ররোচনায় জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে বনানীর দি রেইনট্রি হোটেলে তারা ধর্ষণের শিকার হন। আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ নামে দু’জন তাদের সারারাত দুটি কক্ষে অস্ত্রের মুখে আটক রেখে ধর্ষণ করে। সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছে ধর্ষকরা। এখন ওই ভিডিও প্রকাশসহ তাদের খুন-গুমের হুমকি দিচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে হেয় করতে নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে ধর্ষকরা। আসামিরা পালিয়ে যাওয়ার পর অভিযান: মামলা দায়েরের দু’দিন পর্যন্ত প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদ তাদের গুলশানের বাসায় অবস্থান করেছিল। তার বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিম যুগান্তরকে বলেছেন, সোমবার সকালেও সাফাতের সঙ্গে বাসায় তার কথা হয়েছে। তারপর থেকে তিনি ছেলের আর কোনো খোঁজ জানেন না। অথচ মামলার পর থেকে বনানী থানার ওসি বিএম ফরমান আলী এবং পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মতিন বলে আসছেন, আসামি গ্রেফতারে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আসামি ধরতে বনানী থানা পুলিশের কোনো আগ্রহই ছিল না। সব আসামি নিজেদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারে যোগাযোগ রাখছিল। সোমবার তারা নিরাপদে ঢাকা থেকে পালিয়ে সিলেট চলে যায়। পালিয়ে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গুলশান-২ এর ৬২ নম্বর রোডের ‘আপন ঘর’ নামের ডুপ্লেক্স বাড়িতে অভিযান চালায় বনানী থানা পুলিশ। দেড় ঘণ্টা ধরে এই অভিযান চলে।
বাড়িতে সাফাতের পাসপোর্টও পাওয়া যায়নি। পুলিশের গুলশান জোনের এডিসি আবদুল আহাদ সাংবাদিকদের বলেন, ধর্ষণ মামলার আসামিদের ধরতে তাদের বাসাসহ সিলেটে অভিযান চালানো হচ্ছে। শিগগিরই আসামিরা ধরা পড়বে। এদিকে মঙ্গলবার পুলিশের অভিযানের পর বাসা থেকে বের হওয়ার সময় প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের বাবা দিলদার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, আমি আগে বুঝিনি যে, বিষয়টি নিয়ে এত চাপ সৃষ্টি হবে, এতদূর গড়াবে। বুঝলে আমি নিজেই আমার ছেলেকে পুলিশে দিতাম। বিতর্কের মুখে ওসির পাঁচ দিনের ছুটি: বনানী থানার বিতর্কিত ওসি বিএম ফরমান আলী মঙ্গলবার থেকে পাঁচ দিনের ছুটিতে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষিত দুই তরুণীকে নানাভাবে তিনি হয়রানি করেছেন। প্রথম দিন থানায় অভিযোগ দিতে গেলে তিনি তাদের থানা থেকে বের করে দেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপের মুখে অভিযোগ নেন। তখনও ওসি দুই তরুণীকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ৬ মে মামলা দায়েরের পর ধর্ষিত দুই তরুণীকে কোনো কিছু না জানিয়ে তিনি থানায় আটকে রাখেন। পরে তরুণীরা ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারে যোগাযোগ করলে রাত ১০টার পর তাদের ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়। ধর্ষিত তরুণীরা আরও অভিযোগ করেন, ওসি ফরমান আলী তাদের সহযোগিতা না করে অকথ্য ভাষায় গালিও দিয়েছেন। বারবার তিনি আসামিদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর চাপে পড়েন ওসি। তাই তিনি ছুটিতে গিয়েছেন বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ওসি ফরমান আলী নানা ইস্যুতে বিতর্কিত। এর আগে মতিঝিলে স্বর্ণ কেলেঙ্কারি এবং বনানীতে ঘুষ কেলেঙ্কারিতে বিতর্কিত হন তিনি। বনানীতে ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় থানার দু’জন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হলেও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। এ বিষয়ে পুলিশের গুলশান জোনের এডিসি আবদুল আহাদ বলেন, পারিবারিক কারণে বনানী থানার ওসি ছুটিতে গেছেন। গুলশানের ডিসি অফিস সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পাঁচ দিনের ছুটি চান ওসি ফরমান আলী। তিন দিন নৈমিত্তিক এবং দুই দিন অনুমিত ছুটি পেয়েছেন তিনি।
নিরাপত্তা চেয়ে পিয়াসার জিডি: ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী পিয়াসা নিরাপত্তা চেয়ে রাজধানীর ভাটারা থানায় জিডি করেছেন। তার অভিযোগ, সাফাতের বাবা দিলদার আহমেদ তাকে জড়িয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। এমনকি ধর্ষণের ঘটনা সাজানো দাবি করে বলছেন, এর পেছনে তার (পিয়াসা) হাত রয়েছে। এর আগে সাফাতের বাবা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও পিয়াসা দাবি করেন। এ বিষয়ে দিলদার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এর পেছনে পিয়াসার হাত রয়েছে। পিয়াসা তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছেন তা ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেন।

0 comments:

Post a Comment