Last update
Loading...

ইসির রোডম্যাপের খসড়া চূড়ান্ত

আগামী বছরের ৩০ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে যে কোনো দিন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আর ২০১৮ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণা করার পরিকল্পনা করে নির্বাচনের রোডম্যাপের খসড়া চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। এছাড়া নির্বাচনী আইন সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইসির সংলাপ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে রাখা হয়েছে রোডম্যাপে। এতে আরও স্থান পেয়েছে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (ডিভিএম)/ ইলেকট্রুনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের উপযোগী করা এবং ভোট গ্রহণের আগে এ বিষয়ে প্রচার চালাতে নানা কর্মসূচি। আজ রোববার কমিশনের চতুর্থ সভায় ‘নির্বাচনী রোডম্যাপ’র খসড়াটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া ডিভিএম বা ইভিএমের ব্যাপারে কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে নানা সন্দেহ পোষণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ছাড়া এ বিষয়ে কমিশনের কার্যক্রম বিতর্ক সৃষ্টি করবে। ইভিএমের অতীত রেকর্ড ভালো নয়। রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে ড. শামসুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন ইভিএম চালু করলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন তা বাতিল করেছিল। যদিও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ই-ভোটিং’ চালুর প্রস্তাব দেয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিং চালুর পরিকল্পনা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। সর্বশেষ শনিবার এক অনুষ্ঠানে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইভিএম বা ডিভিএম চালু করার পর বিতর্কের কারণে তা আবার বন্ধ করেছে। বাংলাদেশেও ইভিএমে ভোট গ্রহণের পর তা আবার বাতিল করা হয়েছে। এখন আবার ইভিএম বা ডিভিএম চালুর উদ্যোগ কেন নেয়া হয়েছে তা সহজেই বোঝা যায়। তিনি বলেন, সবাই জানেন, সরকারের পক্ষ থেকে ইলেকট্রুনিক ভোটিং পদ্ধতি চালুর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের মনোবাসনা পূর্ণ করা ইসির মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিলে নির্বাচন কমিশন নিজেকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে পারবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্টদের মতামত নিলে ভালো হয়। নির্বাচনে ইভিএম ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ইভিএম বিতর্কিত হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া ইভিএমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সঠিক হবে না। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দল ও সরকারের সম্মতি ছাড়া আগামী নির্বাচনে ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করবে না ইসি। তিনি জানান, মধ্য জুলাইয়ে রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার পর রাজনৈতিক দল,
সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসছে কমিশন। ইসি সূত্র জানায়, বিগত সংসদ নির্বাচনের আলোকেই এবারের রোডম্যাপের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এতে চমক হিসেবে থাকছে নির্বাচনে ভোটারদের সুবিধার্থে কমিশনের নিজস্ব উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার স্লিপ পৌঁছে দেয়ার প্রস্তাব। বিগত নির্বাচনগুলোতে এ কাজ প্রার্থীরা করলেও এবারই প্রথম কমিশন নিজ উদ্যোগে এটি করতে চায়। এক্ষেত্রে প্রতিটি ভোটার স্লিপের ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ টাকা। এছাড়া রোডম্যাপের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাতটি আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ তৈরি করা হবে। আগস্টের মধ্যে প্রস্তাবিত আইন ও বিধির খসড়া প্রণয়ন এবং এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সংলাপের জন্য আলোচ্যসূচি তৈরি ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। সেপ্টম্বর-অক্টোবরে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী বছরের জানুয়ারিতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও খসড়া প্রকাশ, আপত্তি-নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। এতে ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনশ’ নির্বাচনী এলাকার ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রকাশ ও ছবি ছাড়া সিডি প্রস্তুত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জুনে মাঠপর্যায়ে যাচাইয়ের পর ভোটার তালিকা মুদ্রণ এবং আগস্টে প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ভোটার তালিকা ও সিডি প্রস্তুত এবং মাঠপর্যায়ে পাঠানো হবে। নির্বাচনী রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার আগেই রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ করেছিল কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন।
যদিও নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ওই কমিশন আর সংলাপের আয়োজন করেনি। এর আগে ড. শামসুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন নির্বাচনী আইনে বিস্তর সংস্কার, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠিয়েছিল। ওইসব ইস্যুতে সংলাপ করেছিল ওই কমিশন। বর্তমান কেএম নুরুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার প্রায় ৩ মাসে নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরি এবং ইভিএম বা ডিভিএম চালু করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকল্প ধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচন করতে হলে কমিশনকে রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জন করতে হবে। নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রণয়ন ও ভোট গ্রহণে ইভিএম ব্যবহার একটি সেনসেটিভ বিষয়। এমন বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারত ইসি। এতে সুন্দর নির্বাচন আয়োজনে অনেক সাজেশন্স পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, নির্বাচনের অন্যতম স্টেকহেল্ডার রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরির বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা বা মতামত নেয়া হলে তা আরও সমৃদ্ধ ও বাস্তবভিত্তিক হতো।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়নি। নির্বাচনী রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার আগে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারত। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) অনুমোদনের জন্য কমিশন সভায় তোলা হবে। কমিশন চাইলে ওই সভায় এটি অনুমোদন করতে পারে। অথবা আরও দু-একটি বৈঠকে এটির ওপর পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করতে পারে। পুরো বিষয়টি কমিশনের ওপর নির্ভর করছে। রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার আগে রাজনৈতিক দলের মতামত নেয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নির্বাচনী রোডম্যাপে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের বিষয় রাখা হয়েছে। এটি অনুমোদনের পর এ বছরই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করা হবে। ইভিএমে ফেরার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে ইভিএম প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিশনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

0 comments:

Post a Comment