Last update
Loading...

লণ্ডভণ্ড কক্সবাজার

উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় মোরা। এই ঝড় চট্টগ্রামসহ উপকূলের অন্য জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে না পারলেও ধ্বংসের ছাপ রেখে গেছে কক্সবাজারে। মোরার তাণ্ডবে এ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। চার ঘণ্টাব্যাপী তাণ্ডবলীলায় কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩০ হাজারের বেশি কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। উপড়ে গেছে অগণিত গাছ। বিদ্যুতের অধিকাংশ খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় পুরো জেলায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বাস্তার ওপর গাছ উপড়ে পড়ে জেলা শহরের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এদিকে এ জেলায় ৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মোরা। কক্সবাজার ছাড়া উপকূলের আরও কয়েকটি জেলায় এ ঝড় আঘাত হেনেছে। চট্টগ্রামে অন্তত ১০ হাজার কাঁচাবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ে ভোলায় মারা গেছে এক শিশু। আর রাঙ্গামাটিতে মারা গেছে ২ জন। বরগুনার আমতলীতে ২৫টির মতো গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উপকূলসংলগ্ন জেলা প্রশাসনগুলোর দাবি আগাম সতর্কতা এবং আগেই লোকজনকে সরিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়ার কারণে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। মঙ্গলবার ভোর ৬টার দিকে সুপার সাইক্লোন মোরা উপকূল তথা কক্সবাজারে আঘাত হানে। পরে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া নিয়ে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার উপকূল ছুঁয়ে চট্টগ্রাম-হাতিয়া-সন্দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় সাগরে ভাটা ছিল। এ কারণে অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পায় উপকূলের মানুষ। আঘাত হানার সময়টিতে জোয়ার থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো। ঝড়টি ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে স্থল নিন্মচাপে পরিণত হয়েছে। এ কারণে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঢাকা আবহাওয়া অফিস জানায়,
প্রচণ্ড বেগে উপকূল অতিক্রম করার সময় ঝড়টির সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার। মোরা দুর্বল হয়ে পড়ায় বিপদ সংকেত ৩ নম্বরে নামিয়ে আনা হয়েছে। ঝড়টি উপকূল অতিক্রম করার পর দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানোর জন্য ১ হাজার ৪শ’ টন চাল বরাদ্দ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ছাড় দেয়া হয়েছে। নৌবাহিনী মঙ্গলবারই তাৎক্ষণিকভাবে সেন্ট মার্টিন ও কুতুবদিয়া এলাকায় জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু করে। অপরদিকে ঝড়ের কারণে বন্ধ থাকা চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামার কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে। দুপুরের পর পরিস্থিতি উন্নতি হলে আশ্রয় কেন্দ্রসমূহ থেকে লোকজন ঘরে ফিরতে শুরু করে। কক্সবাজার থেকে লোকমান চৌধুরী ও সায়ীদ আলমগীর জানান, ঘূর্ণিঝড় মোরার চার ঘণ্টার তাণ্ডবলীলায় কক্সবাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতায় আতঙ্কিত হয়ে এবং ঘরের চালায় গাছ পড়ে এ জেলায় মারা গেছেন নারীসহ ৫ জন। তারা হলেন : কক্সবাজার পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের ৬নং জেডিঘাট এলাকায় বদিউল আলমের স্ত্রী মরিয়ম বেগম (৫৫), চকরিয়ার বড়ভেওলা এলাকার মৃত নূর আলম সিকদারের স্ত্রী সায়েরা খাতুন (৬৫), একই উপজেলার ডুলাহাজারার পূর্ব জুমখালী এলাকার আবদুল জব্বারের ছেলে রহমত উল্লাহ (৫০), পেকুয়া উপজেলার উপকূলীয় উজানটিয়া ইউনিয়নের নতুন ঘোনা পেকুয়ারচর এলাকার আজিজুর রহমানের ছেলে আবদুল হাকিম সওদাগর (৫৫) ও সদরের ইসলামাবাদ ইউনিয়নের গজালিয়া গ্রামের শাহাজাহানের মেয়ে শাহিনা আকতার (১০)। ঝড়ে কক্সবাজারে শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। তাদের জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ‘মোরা’র আঘাতে কক্সবাজারে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।
অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গেছে। ব্যাপক হারে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় পুরো কক্সবাজারে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বাড়িঘর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্ট মার্টিনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর এখনও উত্তাল রয়েছে। তবে দুপুরের পর জেলার আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এ কারণে কক্সবাজারের ৫৩৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া তিন লক্ষাধিক মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার ভোররাত ৪টা ২০ মিনিট থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর হালকা বাতাস বইতে শুরু করে। এরপর সকাল ৭টা থেকে শুরু হয় ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র তাণ্ডব। টানা চার ঘণ্টা চলে এ তাণ্ডব। প্রচণ্ড বেগে ঝড়ো হাওয়ায় কক্সবাজার সদরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে আঘাত হানতে শুরু করে। চার ঘণ্টার ঝড়ো হাওয়ায় লণ্ডভণ্ড করে ফেলে নান্দনিক সৌন্দর্যের পুরো পর্যটননগরী। কাঁচা, সেমি-পাকা ঘর দোকানপাট দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে। টিনের ঘর চেপ্টা, বেড়ার ঘর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। শক্তিশালী এ ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে বাদ যায়নি পর্যটন শহরের তারকা মানের হোটেল-মোটেলও। বাতাসের তীব্রতায় প্রায় মাল্টিস্টরিড বিল্ডিংয়ের জানালার কাচ ভেঙে পড়েছে। কাচের সবকিছু মুহূর্তেই উড়িয়ে নিয়ে যায় ‘মোরা’। কক্সবাজার পৌরসভার সমিতিপাড়া গ্রামের এক নম্বর সড়কের একটি কাঁচা ঘরে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন আবদুল হক। সোমবার রাত ১০টার দিকে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে সাইক্লোন সেন্টারে চলে গিয়েছিলেন তিনি। ভোর ৬টার দিকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আবার ফিরে আসেন নিজ ঘরে। তখনই শুরু হয় তীব্র ঝড়ো হাওয়া। নারকেল গাছ উপড়ে পড়ে সেই ঘরের ওপর। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে আবদুল হকের পরিবার। প্রতিবেশী আবদুর রাজ্জাক বলেন, যেভাবে শব্দ হয়েছে, গাছ ভেঙে পড়েছে, আমি মনে করেছিলাম তিনজনই মারা গেছে। আমি দৌড়ে এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখি তিনজনই বেঁচে আছে। আবদুল হকের ঘরের পাশাপাশি ১০টি ঘর গাছ পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবদুল হকের পরিবারের মতো, মঙ্গলবারের ঘূর্ণিঝড় মোরা কক্সবাজারে আঘাত হানার পর অনেকেই এমন বিপদ থেকে বেঁচে গেছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভিটেমাটি রক্ষায় যাননি সাইক্লোন সেন্টারে, আর কেউ গিয়েও ফিরে যান বাড়িতে। কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মোরার আঘাতে প্রায় প্রতিটি সড়কের ওপর পড়ে আছে উপড়ানো গাছ আর ডালপালা। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে রাস্তায় পড়ে আছে।
সেন্ট মার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করলেও তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। টেকনাফ সাবরাং ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন জানিয়েছেন, সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ গ্রামে কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষ আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করে। এদিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার কামাল জানিয়েছেন, সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ফদনার ডেইল ও নাজিরারটেক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি। কক্সবাজার সদরের পোকখালী ইউপি চেয়ারম্যান রফিক আহমদ জানান, মোরা অতিক্রমকালীন সাগরে ভাটা থাকায় জলোচ্ছ্বাস হয়নি। জোয়ার থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতো। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র আঘাতে জেলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেই বিবরণ এখনও হাতে আসেনি। তবে টেকনাফ উপজেলার সেন্ট মার্টিন, সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপ, মহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ী ও পেকুয়ার উজানটিয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় গাছপালা উপড়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ২০ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এলাকাবাসী, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্যানুসারে জেলায় ৩০ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এদিকে ঝড়ের সতর্কতা পেয়ে কক্সবাজারের আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কক্সবাজার শহরের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে মঙ্গলবার ৮ শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রাঙ্গামাটি : ঘরের ওপর গাছচাপা পড়ে রাঙ্গামাটি শহরে এক স্কুলছাত্রী ও অপর এক নারী নিহত হয়েছেন। নিহত স্কুলছাত্রীর নাম জাহিদা সুলতানা মাহিমা এবং অপর নারী হাজেরা বেগম। সকালে ঘূর্ণিঝড় শুরু হলে শহরের ভেদভেদী ও আসাম বস্তি এলাকায় বসতঘরের ওপর গাছের ডাল ভেঙে পড়লে গাছচাপা পড়ে ঘটনাস্থলে দু’জনই মারা যান। এ ছাড়া জুনায়েদ নামে এক শিশু আহত হয়েছে। তাকে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাত হানে। তিন ঘণ্টাব্যাপী ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে রাঙ্গামাটি শহরের দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বসতঘর ও রাস্তার ওপর ভেঙে পড়েছে গাছপালা। বৈদ্যুতিক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাঙ্গামাটি শহর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জেলার ১০টি উপজেলায় ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছপালা ও বৈদ্যুতিক লাইনের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
ভোলা, ভোলা দক্ষিণ, চরফ্যাশন ও মনপুরা : মনপুরার বিচ্ছিন্ন কলাতলীর চরে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মায়ের কোল থেকে পড়ে রাসেদ নামে এক বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার রাত ১টায় বিচ্ছিন্ন কলাতলীর চরের আবাসন এলাকা থেকে মনির বাজার কলাতলীর চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নিহত রাসেদ মনপুরা ইউনিয়নের কলাতলী চরের ১নং ওয়ার্ডের জরিফা খাতুন ও সালাউদ্দিনের ছেলে। চরফ্যাশন পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন গ্রমের শতাধিক বৈদ্যুতিক খুঁটি হেলে পড়েছে। এতে প্রাণহানির শঙ্কায় রয়েছেন এলাকাবাসী।
লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও হালকা বাতাস বয়ে যায়। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরী ঘাটে ভোলা-বরিশালগামী ৫ শতাধিক যাত্রী আটকা পড়েছেন। এর মধ্যে নারী ও শিশুকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সোমবার (২৯ মে) বেলা ১১টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত এসব যাত্রী আটকে পড়েন। এছাড়া শতাধিক ট্রাকবোঝাই পণ্যসহ ট্রাক-কার্গো আটকা পড়েছে।
পিরোজপুর : জেলার ইন্দুরকানীতে লক্ষাধিক মানুষ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের অভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সোমবার ইন্দুরকানী বিভিন্ন মহলে ৯/৮ নন্বর বিপদ সংকেতের সংবাদ মাইকিংয়ে শুনে এলাকায় আতঙ্কে দিনরাত কাটায় এলাকাবাসী।
আমতলী ও তালতলী (বরগুনা) : আমতলী ও তালতলী উপকূলীয় অঞ্চলের চর ও নিন্মাঞ্চলসহ ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই এলাকার ২ হাজার পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমতলী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দু’দিন ধরে ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে সাগর ও পায়রা নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৩০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সাগর মোহনা ও পায়রা নদী সংলগ্ন চর ও নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পেয়ে তালতলীর তেঁতুলবাড়িয়ায়র ১ কিলোমিটার ভাঙা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে তেঁতুলবাড়িয়া, নলবুনিয়া, আগাপাড়া ও মোয়াপাড়া গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই গ্রামের ২ হাজার পুকুর ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে।
কলাপাড়া, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ ও রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালি) : আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে উপকূলীয় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার দেড় লাখ মানুষ। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন নদ-নদী উত্তাল রয়েছে। জোয়ারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি বৃদ্ধি পায়। এ সময় জেলেদের মাছ ধরার নৌকা-ট্রুলার নিরাপদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসরত লোকজনের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত হানার পূর্বাভাসের খবরে কুয়াকাটা এবং এর আশপাশের এলাকার মানুষ কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে যায়নি। সোমবার বিকাল থেকে এলাকাগুলোয় ব্যাপক মাইকিং করে ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের বার্তা প্রচার করা হয়। মির্জাগঞ্জ উপজেলায় প্রশাসনের উদ্যোগে খোলা হয় ১৩টি আশ্রয় কেন্দ্র।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে সোমবার বিকাল ৫টা থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। লঞ্চ বন্ধ থাকায় যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে ফেরিতে নদী পারাপার হচ্ছেন।
নোয়াখালী ও কোম্পানীগঞ্জ : নোয়াখালী জেলা শহর থেকে হাতিয়ার মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম সি-ট্রাক দুটি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে হাতিয়ার দুই পারে শত শত যাত্রী আটকা পড়ে আছে। আগত যাত্রীসাধারণ গন্তব্যে পৌঁছতে না পারায় অনেকে চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় অবস্থান করছে। বৈরী আবহাওয়ার ফলে জেলেরা মাছ আহরণ করতে পারছেন না এবং খেটে খাওয়া মানুষ কাজ করতে না পারায় তাদের জীবিকা নির্বাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বরিশাল ও আগৈলঝাড়া : সোমবার দুপুর ২টা থেকে মঙ্গলবার বেলা সোয়া ২টা পর্যন্ত বরিশালের সব রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় বিআইডব্লিউটিএ। এত চরম দুর্ভোগে পরে বরিশাল থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন রুটের সহস্রাধিক লঞ্চ যাত্রী। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে ঢাকা-বরিশাল রুটের শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ি থেকে বন্ধ ছিল লঞ্চ চলাচল। আগৈলঝাড়ায় সারা দিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের পানিতে কৃষকের আমন বীজতলা তলিয়ে গেছে।
বড়লেখা (মৌলভীবাজার) : সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর বাতাস বইতে শুরু করে। সকাল ১০টা থেকে ধমকা হাওয়া বাড়তে থাকায় কর্মজীবীরা বাইরে বের হতে পারেননি। এতে জনজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ।
চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ ফরিদগঞ্জ : মোরার তেমন কোনো প্রভাব চাঁদপুরে পড়েনি। সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মাঝে দুর্বল দমকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এখনও গুমট হয়ে আছে। জেলার ৮ উপজেলার ১১৭টি আশ্রয় কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ৩৮টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ৩৭০ জন লোক সোমবার রাতে আশ্রয় নেন।
ত্রাণ বিতরণ শুরু : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সেন্টমার্টিন ও কুতুবদিয়া এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধ জাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’ ও ‘খাদেম’-এ করে এসব জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে দুর্গত এলাকার পৌঁছেছে। জরুরি খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ৫ টন চাল, ২ টন ডাল, ৩ টন মুড়ি, ৮ টন চিড়া, ২ টন গুড়, ৩ হাজার পিস মোমবাতি, ৩০০ কেজি পলিথিন ব্যাগ, ১০০ প্যাকেট ম্যাচ বক্স ও ২০ টন বিশুদ্ধ খাবার পানি। এছাড়া দুর্গত এলাকায় জরুরি চিকিৎসা সহায়তার জন্য নৌবাহিনীর ২৩ সদস্যের দুটি বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করছে।
১৪শ’ টন চাল ও দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সচিবের দায়িত্বে) গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, উপদ্রুত এলাকার মানুষের জন্য ১ হাজার ৪০০ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ছাড় করা হয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান। গোলাম মোস্তফা বলেন, অনেকে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে চলে গেছেন। অনেকে আবার আছেন। এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার বিস্তারিত পাওয়া যায়নি। বিস্তারিত তথ্যের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক গ্রাম প্লাবিত ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে খবর এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারের বিভিন্ন বাহিনী উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। পবিত্র রমজানে যাতে দুর্গতদের কষ্ট না হয়, সে জন্য আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় খিচুরি, মুড়ি, চিড়া, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গুড়সহ শুকনা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যেক জেলা-উপেজেলায় সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন অধিদফতর এবং বিভাগেও আলাদা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নম্বর: ৯৫৪০৪৫৪, ৯৫৪৫১১৫, ৯৫৪৯১১৬ ও ০১৭১৫১৮০১৯২।
বৃষ্টি ঝরিয়ে দুর্বল মোরাা : ‘তীব্র’ ক্যাটাগরির ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ দুর্বল হয়ে স্থল নিন্মচাপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় কমবেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূল অতিক্রমের পর এটি দুপুর নাগাদ রাঙ্গামাটি অবস্থান করে। আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি) জানিয়েছে, এটি ক্রমে উত্তর দিকে সরে যাবে। চলার পথে এটি ভারতের ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টি ঝরাবে। এ প্রক্রিয়ায় ক্রমে দুর্বল হয়ে বিলীন হয়ে যাবে। বিএমডির কর্মকর্তারা জানান, দ্রুতগতির ঝড় হওয়ায় উপকূলে আঘাত হানার ৮ ঘণ্টার মধ্যে অনেকটাই দুর্বল হয়ে যায়। যে কারণে বিকাল ৫টার দিকেই ঝড়ো পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি ঘটে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই ঢাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়। আবহাওয়া বিভাগ দেশের ৪২ স্টেশনে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে। মঙ্গলবার সকালে জারিকরা এক বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, প্রত্যেক স্টেশনেই কমবেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন বলেন, দুর্বল হওয়ার প্রক্রিয়ায় মোরা প্রচুর বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত কুতুবদিয়ায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৯২ মিলিমিটার। বিএমডি আরও জানায়, মোরার প্রভাবে আরও ২-৩ দিন দেশে কমবেশি বৃষ্টিপাত হবে। ৪ জুনের পর আবার তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তবে আশার আলো হচ্ছে, মৌসুমি বায়ু টেকনাফসহ চট্টগ্রাম উপকূলে চলে এসেছে। এটি ঢাকাসহ সারা দেশে বিস্তৃত হবে। তখন গরম এবং বৃষ্টি উভয়টিই থাকবে। ফলে মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা যাবে। প্রকৃতিগত দিক থেকে ‘মোরা’ ঘূর্ণিঝড়টি ছিল ‘সিভিয়ার’ (তীব্র)। এটি ২০০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে বাংলাদেশের ওপর হামলে পড়ে। উপকূল অতিক্রমকালে এর বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৪৬ কিলোমিটার, যা পতেঙ্গায় রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছে। সমুদ্রের ভেতরের দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ভোর ৪টা নাগাদ ঘণ্টায় ১১৪ কিলোমিটার বেগে বাতাস ছিল। আর সিডরের বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৩ কিলোমিটার। ব্যাপ্তি আর বাতাসের গতিবেগের পার্থক্যের কারণে এবারের ঘূর্ণিঝড়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেছে দেশ। যদিও উভয় ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে ১০ নম্বর ‘মহাবিপদ’ সংকেত দেয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার এ সংকেত তিন নম্বরে নামিয়ে আনা হয়। উল্লেখ্য, ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাত হানবে- এমন সতর্ক সংকেত পেয়ে সোমবার সকাল থেকে উপকূলীয় জেলাগুলোয় ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়। চলে মাইকিং। খুলে দেয়া হয় দুই সহাস্রাধিক আশ্রয় কেন্দ্র। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয় কয়েক লাখ মানুষ।

0 comments:

Post a Comment