Last update
Loading...

সোয়া দুইশ’ বছর পর স্বীকৃতি পেলো কওমি সনদ: কমিটির চেয়ারম্যান আল্লামা শফি by নূর মোহাম্মদ



প্রায় সোয়া দুইশ’ বছর পর স্বীকৃতি পেলো কওমি মাদরাসা। বৃহস্পতিবার কওমি মাদরাসা দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রি ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রির সমান মর্যাদা পাবে। এতে বলা হয়, দাওরায়ে হাদিস বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণকারী দেশের কওমি  বোর্ডগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সনদ বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সারা দেশের কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা একই প্রশ্নপত্রে নেয়া হবে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মতো পরীক্ষার উত্তরপত্রও একসঙ্গে মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশ করা হবে। কওমি মাদরাসা দাওরায়ে হাদিসের সনদের মান বাস্তবায়ন কমিটি এই কাজ পরিচালনা করবে। এদিকে প্রায় সোয়া দুইশ’ বছর পর কওমি মাদরাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতির ঘোষণায় দেশের আলেম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। তারা এই প্রজ্ঞাপনের দ্রুত বাস্তবায়ন চান।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই সমমান দেয়ার লক্ষ্যে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি (পদাধিকার বলে) ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। কমিটিতে সরকারের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এ কমিটি সনদবিষয়ক যাবতীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলে বিবেচিত হবে। কমিটির নিবন্ধিত মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের সনদ মাস্টার্সের সমমান বলে বিবেচিত হবে। এ কমিটির অধীনে ও তত্ত্বাবধানে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা হবে। কমিটি সিলেবাস প্রণয়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, অভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল ও সনদ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক বা একাধিক উপ-কমিটি গঠন করতে পারবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়গুলো অবহিত করবে কমিটি। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এ কমিটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে। এর আগে ১১ই এপ্রিল রাতে গণভবনে কওমি মাদরাসার আলেম-ওলামাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এই স্বীকৃতির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারও আগে ২৮শে মার্চ কওমিপন্থি শীর্ষ আলেম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে কওমি মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় ও দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিসমূহকে ভিত্তি ধরে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবি এর সমমান দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
১৭ সদস্যের এই কমিটির চেয়ারম্যান হলেন দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া (বেফাক) সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফী। কো-চেয়ারম্যান বেদাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা আশরাফ আলী। এছাড়া কমিটিতে বেফাক থেকে ৫ জন, গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গার বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার ২জন। ইত্তেহাদুল মাদারিসিল কওমিয়া চট্টগ্রামের ২ জন। সিলেটের আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম থেকে ২ জন, তানজিমুল মাদারিসিল কওমিয়া উত্তরবঙ্গের ২জন, জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ থেকে ২ জন। এসব বোর্ডের সভাপতি ও মহাসচিবরা সদস্য হিসেবে পদাধিকার বলে থাকবেন। তবে বোর্ড চাইলে তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদেরও দিতে পারবে। এছাড়া চেয়ারম্যান সর্বোচ্চ ১৫ জন সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবেন। তবে এ সংখ্যা ১৫ জনের বেশি হবে না।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, দাওরায়ে হাদিসের ডিগ্রির মান বাস্তবায়নে নিয়োজিত কমিটি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকবেন না। এই কমিটির তিনটি কার্যপরিধি ঠিক করে দেয়া হয়েছে। এই কমিটি যেসব মাদরাসাকে নিবন্ধন দেবে কেবল তারাই দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির সমমান পাবে। বর্তমানে সারা দেশে দাওরায় হাদিসের অন্তত ৬টি শিক্ষা বোর্ড আছে। ওই বোর্ডগুলো আলাদাভাবে পরীক্ষা নিয়ে দাওরায় হাদিস ডিগ্রির সনদ দিয়ে থাকে।
এর আগে ২০১২ সালের ১৫ই এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে কওমি সনদের স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগ নেয় সরকার। কওমি মাদরাসা শিক্ষা আইন-২০১৩ অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকেও ওঠে। তখন স্বীকৃতির বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলাম। এরপর তা মন্ত্রিসভা থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তার আগে ২০০৬ সালের ২৯শে আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অনুমতি নিয়ে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যার নম্বর শাখা-১৬/বিবিধ-১১(৯)/২০০৩(অংশ)-৮৮৭। এতে বলা হয় কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে এমএ (ইসলামিক স্টাডিজ/সাহিত্য) সমমান হিসেবে ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তার বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি তৎকালীন সরকার।  
কওমি মাদরাসা শিক্ষাসনদ স্বীকৃতি বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ বলেন, বেফাকের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা একটি পক্ষের কারণে এতো দিন এটার স্বীকৃতি বা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। সরকার এর স্বীকৃতি দিয়েছে, এখন দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিক আহমেদ বলেন, ১৪’শ বছর আগের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। যা বর্তমান সময়ের থেকে আলাদা। এজন্য কওমি মাদরাসার কারিকুলামের আধুনিকায়নও দরকার। দাওরায়ে হাদিস সনদের যে মান সে মান অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। যাতে তারা যে কোনো জায়গায় নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষার্থীরা যেমন যোগ্যতা অর্জন করবে তারা যদি সে রকম করতে পারে তাহলে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব।
কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল বলেন, সনদের স্বীকৃতি আমাদের দীর্ঘদিনের একটা দাবি ছিল। দাবি আদায়ে অনেক কর্মসূচি ও আন্দোলন করেছি। দেশের ওলামা কেরামদের প্রত্যাশা ছিল। খতিব ওবায়দুল হক সাহেব দাবি পূরণে অনেক চেষ্টা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমাদের দাবি পূরণের পদ সুগম হয়েছে।
ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অব দাওরায়ের পরিচালক ও বিশিষ্ট আলেম মো. শরীফ মোহাম্মদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ ভারত, পাকিস্তানে কওমি শিক্ষার স্বীকৃতি আছে। বাংলাদেশে এটা এত দিন ছিল না। গত বিএনপি সরকারের ক্ষমতার শেষদিকে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর একটি গেজেটও প্রকাশ করে ছিলেন। কিন্তু পুরোপুরি আনুষ্ঠানিকতা তিনি শেষ করেন নি। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সনদের স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়। সব পক্ষের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলেমদের বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে দূরত্ব কমেছে। তিনি আরো বলেন, সনদের স্বীকৃতি ঘোষণার সঙ্গে আলেমদের জন্য একটা অপেক্ষাও কাজ করছে। মূল বিষয়টি বাস্তবায়নে কত দিন দেরি হয় তা নিয়ে পর্যবেক্ষণও কাজ করছে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমা শিক্ষা ও কালচারের আগ্রাসন থেকে মুসলিমদের রক্ষায় ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই সর্বপ্রথম কওমি মাদরাসা। সে ধারাবাহিকতায় ১৯০১ সালে বাংলাদেশের প্রথম কওমি মাদরাসা দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদরাসা আছে। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। তবে বর্তমানে কওমি মাদরাসার সংখ্যা ১৮ হাজারের মতো এবং ২০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করে। তবে সনদের স্বীকৃতি না থাকায় কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পায়নি।

0 comments:

Post a Comment