Last update
Loading...

মেয়রদের বরখাস্ত প্রসঙ্গে

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় এখন গণতন্ত্র বলে যে কিছু নেই এর ভূরি ভূরি প্রমাণ দেশে সংঘটিত নানা ঘটনার থেকে প্রতিদিনই পাওয়া যায়। গণতন্ত্রের নিকেশ কতভাবে ও কত ক্ষেত্রে করা যায় এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের থেকে বেশি কেরামতি অন্য কোনো দেশে দেখা যায় কিনা সন্দেহ। পুলিশ, র‌্যাব এবং আওয়ামী লীগ ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত যুবলীগ, ছাত্রলীগ ইত্যাদির গুণ্ডারা প্রতিনিয়ত জনগণের ওপর হামলা করছে। তারা সরকারবিরোধী সভা-সমিতি-মিছিল তো করতেই দিচ্ছে না, উপরন্তু কোনো সময়ে কেউ সেটা করলে তাদের ওপর মারমুখো হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এসব সংবাদ যাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত না হয় তার জন্য সরকারের লোকেরা সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। এসব কারণে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, নিউজের থেকে নন-নিউজের গুরুত্বই বেশি। বিরোধী দলের কোনো কাজ ও তৎপরতা, কোনো বক্তৃতা-বিবৃতির থেকে খবরের নামে বাজে খবরের ভিড়ই সংবাদপত্রে বেশি। এটা অন্যতম প্রধান কারণ, যেজন্য বাংলাদেশে নিউজ সেকশনই দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর দুর্বলতম অংশ। এসব জানা কথা, তবু গুরুত্বের কারণে এ বিষয়ের উল্লেখ বারবার করা ছাড়া উপায় নেই। নির্বাচন হল গণতন্ত্রের একটা অপরিহার্য দিক। শুধু নির্বাচন নয়, সঠিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এদিক দিয়ে গৌরব করার মতো কিছু বাংলাদেশের নেই। বরং কারচুপি, জালিয়াতি, পুলিশি নির্যাতন এবং সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনের চরম পক্ষপাতিত্ব নির্বাচনকে যে জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে এটা হল নির্বাচন উচ্ছেদের শামিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সরকার নির্বাচন কমিশন ও পুলিশের সাহায্যে যেভাবে নির্বাচন করেছে তাতে ভোট ছাড়াই ১৫৩টি আসন লাভ করে তারা ‘বিজয়’ অর্জন করেছিল! বলাই বাহুল্য, তাদের এই বিজয় ছিল গণতন্ত্রের চরম পরাজয়। গণতন্ত্র হত্যা করেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার ব্যবস্থা করেছিল এবং তারা তাদের সেই কর্মসূচি অনুযায়ী ফিরেও এসেছিল। সেই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে তারা এখনও ক্ষমতায় আছে।
কিন্তু শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনই নয়, দেশে প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য অন্য অনেক স্তরে নির্বাচন করতে হয়। সিটি কর্পোরেশন থেকে নিয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচন পর্যন্ত এসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বাহ্যত এ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হলেও যেভাবে এসব ক্ষেত্রে সরকার নির্বাচন পরিচালনা করে এবং বিভিন্ন সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করে তার মধ্যে লেশমাত্র গণতন্ত্র থাকে না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হলে নতুন নির্বাচন দেয়ার সময় হয়। কিন্তু এই নির্বাচনে জয়ের কোনো সম্ভাবনা না দেখে তারা দীর্ঘদিন নির্বাচন স্থগিত রাখে। অবশেষে কোনো গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ না করে তারা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে ভাগ করে সেখানে নির্বাচন ছাড়াই দু’জন প্রশাসক নিযুক্ত করে, যারা তাদেরই লোক। এভাবে দুই সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিযুক্ত করে নির্বাচিত মেয়রকে বিদায় করা হয়। অনেক পরে মাত্র কিছুদিন আগে নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপার পূর্ব পরিকল্পিত কারচুপির মাধ্যমে নিশ্চিত করে তারা নতুন নির্বাচন দেয় এবং তাতে তাদের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। ঢাকা সিটির ক্ষেত্রে এ কাজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হলেও অন্য সিটি কর্পোরেশন, পৌর কর্পোরেশন ইত্যাদি নির্বাচন তাদের বাধ্য হয়ে করতে হয়েছিল। সেই নির্বাচনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, অন্তত গুরুত্বপূর্ণ সিটি কর্পোরেশন ও পৌর কর্পোরেশনগুলোতে, আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পরাজয় এবং বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের জয় হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র-প্রেম এমনই গভীর যে, তারা এভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়ারে বসে কাজ করতে না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদেরকে বরখাস্ত করেছিল। এ কাজ স্থানীয় মন্ত্রণালয়কে দিয়ে করানো হয়। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অনুসৃত নীতি হল সব রকম কারচুপি ও নির্যাতনের মাধ্যমে বিরোধী প্রার্থীকে পরাজিত করা। কিন্তু নিজেদের দলীয় প্রার্থী যদি জয়লাভ না করে, তাহলে বিরোধীদলীয় জয়ী প্রার্থী যাতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ না করতে পারে সেজন্য তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও মিথ্যা মামলা দিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক তাদেরকে বরখাস্ত করা। সিটি কর্পোরেশন মেয়র, পৌর কর্পোরেশন মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইত্যাদির স্থানে সরকারি আমলাদের দিয়ে এগুলো পরিচালনা করা। এভাবেই ‘গণতান্ত্রিক’ আওয়ামী লীগ সরকার খুলনা, গাজীপুর, সিলেট, রাজশাহী, হবিগঞ্জ থেকে নিয়ে সর্বত্র প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করে এসেছে। সিটি কর্পোরেশন আইন ২০০৯-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী তারা এ কাজ করেছে। আসলে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও যেভাবে তারা নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল তাতে ভবিষ্যতে নিজেদের নির্বাচন জয়ের ব্যাপারে তাদের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এ কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার উদ্দেশ্য সামনে রেখেই তারা এই চরম অগণতান্ত্রিক আইনটি প্রণয়ন করেছিল। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা হয়েছে সে ধরনের অভিযোগ আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও ভূরি ভূরি আছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের অথবা তাদেরকে বরখাস্ত করা হয় না। এ প্রসঙ্গে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। রাজশাহীর মেয়রকে চারটি মামলা দেখিয়ে বরখাস্ত করা হয়। ওই একই মামলায় কাউন্সিলরাও আসামি ছিলেন, কিন্তু তাদের কাউকেই বরখাস্ত করা হয়নি! (প্রথম আলো, ০৮.০৪.২০১৭)। কারণ এই কাউন্সিলরদের মধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগের লোকেরা আছে!! স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গত সাড়ে তিন বছরে ৩৮১ জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। এর মধ্যে আছেন ৪ জন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, ৩৬ জন পৌর মেয়র, ৫৬ জন কাউন্সিলর, ৫২ জন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ৭৪ জন মেম্বার। তাদের অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী (দৈনিক ইত্তেফাক, ০৬.০৪.২০১৭)।
এসব ঘটনা ঘটতে থাকার সময় সব থেকে চমকপ্রদ বক্তব্য প্রদান করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। তিনি এক সমাবেশে বক্তৃতায় বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপরোক্ত সব সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু জানতেন না! তার এই বক্তব্য যে একেবারে অসত্য এটা বোঝার মতো বুদ্ধি সবারই আছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী যেভাবে তার সরকার পরিচালনা করেন এবং তার মন্ত্রী-এমপিরা যেভাবে তার কথায় ওঠাবসা করেন তাতে এ ধরনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ে কেউ তার নির্দেশ, সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া কাজ করেন এটা অসম্ভব। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে দায়মুক্ত করে তার খেদমত করার উদ্দেশ্যেই যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী একথা বলেছেন এতে সন্দেহ নেই। তাদের নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের দৌড় তো সবারই জানা। কিন্তু এ বিষয়ে অন্য কথাও আছে। ধরা যাক মন্ত্রী যা বলছেন তা ঠিক, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী মেয়রদের বরখাস্ত বিষয়ে কিছু জানতেন না। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা কী দাঁড়াল? এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যদি তার জানা না থাকে তাহলে তিনি দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছেন কীভাবে? এটা কি কোনো যোগ্যতার পরিচায়ক? কাজেই সরকারের মন্ত্রী তাদের প্রধানমন্ত্রীকে দায়মুক্ত করার তোষামোদি চেষ্টায় যেভাবে তার অজ্ঞতার কথা বলেছেন তাতে তার ‘ভাবমূর্তি’ ও যোগ্যতার অবস্থা কী দাঁড়াল? এর দ্বারা তিনি প্রধানমন্ত্রীর কী উপকার করলেন? কিন্তু এসব কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এর ফলে উপরোক্ত মন্ত্রী বা তার মতো মন্ত্রী, এমপি বা অন্য সরকারি লোকেরা দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যেভাবে কথা বলেন সেটা বন্ধ হবে। মোটেই তা নয়। কারণ সবরকম সমালোচনা, মিথ্যা ও ব্যর্থতা হজম করার শক্তির কোনো কমতি এদের নেই।
০৮.০৪.২০১৭
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

0 comments:

Post a Comment