Last update
Loading...

আন্তঃসংসদীয় সম্মেলন : আত্মপ্রতারণার দলিল

পৃথিবীর যেসব রাষ্ট্রে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা রয়েছে তাদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন ‘আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়ন’। বাস্তবে সংসদীয় ব্যবস্থা জাতিগুলোর অন্তর্মুখী প্রবণতার প্রমাণ। কিন্তু পৃথিবী ক্রমে আন্তর্জাতিকতার পথে ধাবিত হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে পরস্পর নির্ভরশীল সরকারগুলোর মধ্যে অধিকতর সহযোগিতা, মতবিনিময় ও অভিজ্ঞতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৮৮৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ একটি সংসদীয় ব্যবস্থার রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭২ সালে ‘রোম সম্মেলন’ থেকে এর সদস্যপদ গ্রহণ করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঢাকায় ১ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল সংগঠনের ১৩৬তম সম্মেলন। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সন্ধ্যায় এ সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে এ সম্মেলন অনুষ্ঠান সম্মান ও গৌরবের বিষয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সংসদীয় গণতন্ত্রের সাথে বর্তমান সরকারের প্রতারণা এবং সম্মেলনের মূল অংশগ্রহণকারীদের স্ব-বিরোধী অবস্থান সম্মেলনকে অবশেষে প্রতারণার দলিল উপহার দিয়েছে।
সন্দেহ নেই সম্মেলনটি ছিল একটি মহা কর্মকাণ্ড। পৃথিবীর ১৩১টি দেশের জনপ্রতিনিধিরা একত্র হয়ে বর্তমান বিশ্বের নানা সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করেছেন এ সম্মেলনে। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল হতো তাহলে বাংলাদেশের জন্য আরো সহযোগিতা ও সম্মান বয়ে আনতে পারত। কয়েক বছর আগে আইপিইউর সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী নির্বাচিত হন। রাষ্ট্র হিসেবে এটি বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক হলেও ব্যক্তি এবং সরকারের জন্য সম্মানজনক ছিল না। তার কারণ, যে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য। জনাব চৌধুরী ছিলেন বিনা ভোটে নির্বাচিত একজন সদস্য। বর্তমান সরকার কিভাবে গঠিত হয়েছে তা সবারই জানা কথা। প্রথমত, এই সংসদের ১৫৩ জন সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত। অন্য সদস্যরাও নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ। গোটা প্রক্রিয়াটি ছিল ছলচাতুরী ও মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, এ নির্বাচন ছিল প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাবর্জিত। তৃতীয়ত, যেসব নির্বাচনী এলাকায় নামমাত্র ভোট গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে ভোটে অংশগ্রহণকারী লোকদের সংখ্যা পাঁচজনের বেশি ছিল না। চতুর্থত, এ সংসদ ছিল প্রকৃত বিরোধী দলবিহীন। নীতিগতভাবে এবং কার্যত পৃথিবীর কোনো সংসদ বিরোধী দলবিহীন অবস্থায় বৈধ এবং আইনানুগ হতে পারে না। পঞ্চত, সংসদীয় নামে যে সরকারটি গঠিত হলো তা সংসদীয় রীতিনীতিকে হাস্যকর প্রমাণিত করে গৃহপালিত বিরোধী দলকে সরকারে শামিল করল। সংসদ গঠন প্রক্রিয়ায় মৌলিক গলদের পর যে সরকারটি গঠিত হলো তার কার্যক্রম যদি ভালো হতো তাহলে ক্ষমতাসীন দলের ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’ পার পেতে পারত। কিন্তু এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ক. প্রকৃত বিরোধী দলের লোকেরা পরিকল্পিত নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিরোধী দলকে নির্মূল করার জন্য হত্যা, হামলা ও মামলা করা হয়েছে। হাজার হাজার মামলায় মানুষ হয় কারাবন্দী রয়েছে নয়তো মামলা মাথায় নিয়ে অজ্ঞাতবাস করছে। খ. এই সরকার মানুষের সার্বজনীন মৌলিক অধিকারকে হরণ করে কার্যত ‘নিষ্ঠুর রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে। দেশে সভা সমাবেশ করার এমনকি সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে কোনো বিরোধিতাকে সহ্য করছে না।
গ. এই সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে একে ধ্বংস করে দিয়েছে। সংসদকে তামাশায় পরিণত করেছে। আমলাতন্ত্রকে নিকৃষ্ট দলীয় নিগড়ে নিবদ্ধ করেছে। বিচার বিভাগকে বশংবদ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা করছে। প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে হতাশা ও অসহায়ত্বের সুর ভেসে আসছে। ঘ. স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনকে দলীয়করণ করেছে। তৃর্ণমূলপর্যায়ে ছিটেফোঁটা যে বিরোধী অবস্থান রয়েছে, তা দিনের পর দিন বরখাস্তের শিকার হয়েছে। ঙ. এ দেশে এ সময়ে মানবাধিকারের বেকর্ড সর্বনি¤œ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে গুম হচ্ছে মানুষ। উগ্রবাদী আস্তানায় শিশু ও নারী মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বন্দুকযুদ্ধের নামে মৃত্যু ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। জনগণ তাদের জীবন, সম্মান ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই দেশে সংসদীয় সম্মেলন একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। প্রধান বিরোধী দলের এ মন্তব্যকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল সঙ্গতই মনে করছেন। সুতরাং অবস্থানগতভাবে এই সরকারের জন্য এই সম্মেলন আত্মপ্রতারণামূলক। সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য ও কার্যবিবরণীও আত্মপ্রতারণা ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে পরিপূর্ণ। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি চর্চার ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বন্ধন জোরালো করার ক্ষেত্রে আইপিউর ভূমিকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যারা এ সম্মেলনে আতিথেয়তা দিচ্ছেন তারাই নিজ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র বিনষ্ট করছেন। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঘোষণা করা হয়েছে ‘বৈষম্যের প্রতিকার সকলের জন্য মর্যাদা-কল্যাণ নিশ্চিতকরণ’। অথচ সম্মেলন অনুষ্ঠানকারী দেশে বৈষম্যের শিকার রাজনৈতিক দলগুলো ও সিভিল সোসাইটি। সবার জন্য মর্যাদা কল্যাণ নিশ্চিত করার পরিবর্তে উল্টোটিই নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এ দেশের মানুষ আজ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ গৃহীত প্রস্তাব হচ্ছে, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। গৃহীত প্রস্তাবের শিরোনামে বলা হয়েছে, আইপিইউর সদস্য দেশগুলো এক দেশের প্রতি অন্য দেশের প্রতি হুমকি প্রদান বা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় অন্য দেশের বল প্রয়োগ বা হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকার নীতি গ্রহণ করা হবে। রাশিয়ার নেতৃত্বে এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় চীন, ভারত, তুরস্ক, কিউবা ও বাংলাদেশ। আর বিপক্ষে ভোট দেয় জার্মানি, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ড। এ প্রস্তাবের পক্ষে ৪৪ ও বিপক্ষে ১০ ভোট পড়ে। মজার বিষয় হচ্ছে যারা সতত হস্তক্ষেপের জন্য অভিযুক্ত তারাই প্রস্তাব উত্থাপন করে। অপর দিকে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে কম রেকর্ড রয়েছে তারা প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ইউক্রেনের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, যে রাশিয়া অন্য দেশে গিয়ে মানুষ হত্যা করছে, অথচ তারা এখানে এসে অন্য দেশের ওপর হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে সমর্থন করছে। সুইজারল্যান্ড ও আইসল্যান্ডরের তীব্র সমালোচনার জবাবে ভারতের প্রতিনিধি বলেন, ‘একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। কোথায়ও হস্তক্ষেপ করতে হলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন নিয়ে করতে হবে। কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি এক দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরে জঘন্যভাবে হস্তক্ষেপ করেছে’। হস্তক্ষেপের জন্য প্রতিবেশীরা অতিষ্ঠ এমন একটি দেশের এ বক্তব্য ‘ভূতের মুখে রাম নাম’-এর মতোই হাস্যকর বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন। প্রস্তাবে আরো বলা হয়, সংসদের দায়িত্ব হবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, মানবাধিকার রক্ষা করা ও যেকোনো বিতর্কে সংলাপের পথকে উৎসাহিত করা।
দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পথ বের করাও সংসদের দায়িত্ব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকাÑ গণতন্ত্রের ক্ষতিসাধন, মানবাধিকার দলন এবং বিরোধী দলের উপর্যুপরি অনুরোধ সত্যেও সংলাপের তীব্র বিরোধিতা নিশ্চিতভাবেই সম্মেলনের গৃহীত প্রস্তাবের বিপরীত, সুতরাং এটিও একটি আত্মপ্রতারণার উদাহরণ। আরো একটি আপত্তিকর বিষয় হচ্ছে যে, সম্মেলনের গৃহীত প্রস্তাবকে নিজ দলীয় অবস্থান শক্তিশালীকরণের জন্য ব্যবহার করা। যেখানে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য জনগণের আন্দোলনের অধিকার ন্যায়সঙ্গত সেখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় যে ‘বৈধ সরকারকে ধাক্কা দেয়া যাবে না’। সাংবিধানিকভাবে, বিশেষ করে আইনিভাবে বৈধ কোনো সরকারকে দেশের ভেতর কিংবা বাইরে থেকে অন্যায়ভাবে ধাক্কা বা চাপ দেয়া যাবে না। এটি সম্মেলনকে নিজ স্বার্থে পরিচালিত করার চেষ্টা বলে পর্যাবেক্ষক মহলে নিন্দিত হয়েছে। সম্মেলনের শেষ দিন ৫ এপ্রিল আইপিউর সাধারণ অধিবেশনে ৫ দফা ‘ঢাকা ঘোষণা’ গৃহীত হয়। এতে বলা হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈষম্য দূরীকরণে, মানবাধিকার সুরক্ষায়, আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণে বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। সম্মেলনে ঘোষণায় আরো বলা হয়, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থান হিসেবে জাতীয় সংসদকে শক্তিশালী করতে হবে। সব জনগোষ্ঠীর কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। ঘোষণায় রাজস্ব আহরণের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং ুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। বিশ্বব্যাপী সম্পদের বৈষম্য বেড়ে যাওয়ায় আইপিউ খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করে। বৈষম্য কমাতে আইপিউ সদস্য দেশগুলো উদ্যোগ আশা করছে বলে ঘোষণায় বলা হয়।
এসব ঘোষণার প্রয়াস ইতিবাচক। বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এ সম্মেলন ও এর ঘোষণা বিব্রতকর এ জন্য যে, তারা আমাদের উদোম শরীরটা দেখে গেল। বাংলাদেশ সরকার নিজেদের পক্ষে বাহবা নেয়ার জন্য যে উদ্যোগটি নিয়েছে তা আমাদের জন্য সম্মান বয়ে না এনে অসম্মানের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে সম্মেলন চলাকালীন অবস্থায় স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বরখাস্ত আদেশগুলো এসেছে তা হয়তো সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করেছে। এভাবে নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা শুভ করার কোনো কারণ ছিল না। সম্মেলনে প্রকৃত বিরোধী দলের উপস্থিতি না থাকায় সরকারের ইজ্জত বাড়েনি বরং কমেছে। তাই দেখা যায় যে, কিছু সংসদীয় প্রতিনিধিদল প্রকৃত বিরোধীদলীয় নেত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করেছে। মনে রাখতে হবে যে জনসম্পৃক্ততা সব সময়ই এ ধরনের গণতান্ত্রিক উদ্যোগকে পরিপূর্ণতা দেয়। বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য যে, এ সম্মেলন গণতন্ত্রে প্রতিভূ না হয়ে অগণতান্ত্রিক শক্তির প্রদর্শনীতে পরিণত হয়ছে।
লেখক : প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
mal55ju@yahoo.com

0 comments:

Post a Comment