Last update
Loading...

‘শিশুটি মরে গেছে, হায় আমার বাংলাদেশ!’ by ফারুক ওয়াসিফ

‘শিশুটি মরে গেছে’ বলে শিল্পী আজম খান চিৎকার করে উঠেছিলেন ‘হায় আমার বাংলাদেশ’ বলে। আমরা এখন কাকে ডাকব? লাগাতার শিশুহত্যার লানতের মুখে সমাধান নেই, হা–হুতাশ আছে। চিৎকার নেই, পরিসংখ্যান আছে। গত চার বছরে ১ হাজার ৮৫ জন শিশু হত্যার শিকার, আর এ বছরের প্রথম দুই মাসেই ৪৯ জন! এ যোগফল কেবল থানায় আসা ঘটনার। মধ্যবিত্তের নিচের ও ওপরের অনেক ঘটনাই পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়। তাহলেও এ নিষ্পাপ জীবনগুলো এভাবে সংখ্যা হয়ে যেতে পারে না। প্রতিটি মুখ, প্রতিটি নাম একেকটা করে ভােলাবাসার সিন্দুক, একেকটা স্মৃতির ঝলক। মাহমুদুল হকের একটি ছোট গল্পের নাম ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’! প্রতিদিন প্রায় একটি করে শিশুহত্যা হচ্ছে দেশে!
এখনই ভাবার দরকার আছে, সমাজের গভীর গভীরতর অসুখের কারণটা কী? রাজধানীর বনশ্রীতে দুটি শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় বাবা-মাসহ কেউ সন্দেহের বাইরে নন। ডিসেম্বর মাসে নীলফামারীর এক মা দুই শিশুকন্যাকে হত্যা করে নিজেকেও শেষ করেছেন। ভোরবেলা স্বামী বাইরে থেকে এসে দেখেন, দুটি শিশুকন্যা মেঝেয় নিথর শুয়ে আর মা ঝুলছে কড়িকাঠ থেকে। তার কিছুদিন পরই কুষ্টিয়ায় এক যুবক প্রতিবেশী কলেজছাত্রকে হত্যা করে নিজের প্রাণও নিয়েছেন। অপরকে শিকার করে এঁরা নিজেদেরও রেহাই দিতে পারেননি। তাহলে বিচার হবে কার? ১ ফেব্রুয়ারি সকালে রমনার বেইলি রোডের একটি বাসার চারতলা থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতককে ফেলে দেয় শিশুটির মা গৃহকর্মী বিউটি। ২৪ দিন লড়াই করে সে-ও চলে গেছে জীবনের পরপারে।
সমাজ সমতলে কিছু একটা ঘটছে যা জীবনবিরোধী, যা সুস্থ নয়। যখন মা বা বাবা কিংবা নিকটাত্মীয়রা শিশুসন্তানকে হত্যা করে তার ব্যাখ্যা সরল চিন্তা দিয়ে হওয়ার নয়। প্রতিকার বের করা তো আরও পরের কথা। ঘটনাগুলোর ধরন বলে, এগুলো গড়পড়তা অপরাধমূলক হত্যা নয়। অনেক সময় ঘাতক ও নিহত উভয়ই জীবন দিয়ে কোনো না কোনো দুঃসহ যন্ত্রণার ইতি টানছেন। হিংসা, অসহায়ত্ব, হঠাৎ জেগে ওঠা রাগ এবং স্বার্থ থেকে হত্যা হচ্ছে। এগুলো একধরনের সামাজিক হত্যাকাণ্ড, যার কার্যকারণ ও প্রকাশ হয়তো বিচিত্র। কিন্তু এগুলোর মধ্যে আমাদের সময়ের গনগনে সামাজিক সহিংসতার আঁচ পাওয়া যায়।
কখন দুর্দশায় থাকা দুজন মানুষের মধ্যে পরস্পরকে হত্যার ইচ্ছা জেগে ওঠে, তা নিয়ে কাজ করেছিলেন আলজেরীয় বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক ফ্রান্জ ফ্যানো। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে দার্শনিক ও মনস্তত্ত্ববিদ। সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানসিক গন্ডগোলের সম্পর্ক দেখানোয় তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি ছিলেন আলজেরিয়ার একটি হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রধান। আলজেরিয়ায় তখন চলছে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক দুঃশাসন। তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসা ব্যক্তিদের ওপর গবেষণা থেকে তিনি একটি বই লেখেন, ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক (১৯৫২)। তাঁর বিখ্যাত রেচেড অব দ্য আর্থ বইতেও (১৯৬১ সালে প্রকাশিত বইটির বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়) প্রসঙ্গটা এসেছে। সেটা হলো দীর্ঘদিন চাপ, অবদমন, অসম্মান ও নির্যাতনের পরিবেশে থাকলে কোনো সমাজে পারস্পরিক হিংসা বেড়ে যায় বলে তিনি দেখিয়েছেন।
তারই একটা উদাহরণ: শ্রমিক হয়তো ১৬ ঘণ্টার হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ঘরে এসে কেবল শুয়েছে, অমনি বেড়ার অপর পাশ থেকে একটি শিশু এমন কান্না শুরু করল আর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া লোকটা ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। অথবা কর্মস্থলে গালি খেয়ে, রাস্তায় ছিনতাই হয়ে এক যুবক পাড়ার দোকানে বাকিতে চাল কিনতে গেলে দোকানদারের অপমানকর কথা শুনল। কিংবা রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন দেশে ভয়ের আবহে রাস্তার যানজটে কিংবা নিঃসঙ্গতা কিংবা মাস্তানের নির্যাতনে বিপর্যস্ত কোনো লোকের কথা ভাবুন। কিংবা ভাবুন আর্থসামাজিক কারণে হতাশ এক প্রজন্মের কথা—বেকারত্ব, হতাশা ও নিঃসঙ্গতায় মাদকই যাদের ‘দুদণ্ড শান্তি’। রাজনীতি, অর্থনীতি, ক্ষমতার চাপে যখন কোনো সমাজে দমবন্ধ অবস্থা তৈরি হয়, তখন ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দেয়। আরও সরাসরি বললে, যখন অবস্থা আর সহ্য হচ্ছে না কিন্তু তাকে বদলানোর পথও পাওয়া যাচ্ছে না, তখন মানুষের ক্ষোভ-প্রতিবাদ ক্ষমতার দেয়ালে বাধা পেয়ে নিজেদের দিকেই ফিরে আসে।
ফ্যানো দেখিয়েছেন, যখন মনে হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনে আলজেরিয়া তুলনামূলক শান্ত, তখন জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক অপরাধপ্রবণতা দেখা দিচ্ছে। আবার যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কমে যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ। সমাজ মনস্ততত্ত্বের ভাষায় একে বলা যায় ট্রান্সফারড অ্যাগ্রেশন বা স্থানান্তরিত ক্রোধ। এটা এমন এক মানসিক দশা, যখন আপনি সমস্যার মূল কারণে হাত দিতে না পেরে বা তা খুঁজে না পেয়ে চারপাশের ওপর আক্রোশ বোধ করবেন। সাধারণত বিড়ালদের মধ্যে এমনটা দেখা যায়। হয়তো বাড়িতে অন্য কোনো বিড়াল আসায় সে ক্ষুব্ধ, কিন্তু দেখা গেল বাড়ির বিড়ালটা রেগেমেগে আঁচড়ে দিচ্ছে খোদ তার মালিককেই। মানুষের মধ্যেও এমন লক্ষণ দেখা যায়। সেগুলো এ রকম: বিনা কারণে বা ছোট কারণে রেগে যাওয়া, বন্ধুকে শত্রু ভাবা, ব্যক্তিত্ব ভেঙে পড়া, মনের মধ্যে ঘৃণা পুষে রাখা ইত্যাদি।
আমাদের প্রতিষ্ঠান ভেঙে যাচ্ছে, পারস্পরিক আস্থা তথা সামাজিক পুঁজি নিম্নমুখী, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কে নীরব ধস চলছে। তা ছাড়া কোনো সমাজের অনেক মানুষ যদি রাজনৈতিক অথবা অন্যান্য বাস্তব কারণে দীর্ঘদিন অবদমিত অবস্থায় থাকে, তখন সেই সমাজে বিচ্ছিন্নতা চলে আসে। সেটা হতে পারে মানুষে মানুষে ও মানুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এ অবস্থায় সেই সমাজ হয়ে ওঠে ক্ষোভ ও হিংসার মাইনফিল্ড। তখন কোথায় কার মধ্যে ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটবে এবং কে তার শিকার হবে, তা আগাম বলার কোনো উপায় থাকে না। এ ধরনের সামাজিক হিংসার পরিস্থিতিকে দারোগার চোখ দিয়ে দেখে বোঝা যাবে না। একে বুঝতে হলে গভীর দরদি সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনীতিমনস্ক মন চাই।
বাংলাদেশ একটা রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্র দুখানেই। পাশাপাশি যে ধরনের বাছবিচারহীন ‘উন্নয়ন’ চলছে, যেভাবে একদিকে লোভ অন্যদিকে বৈষম্য বাড়ছে, যেভাবে জনগণের স্বাধীন জীবন ও চিন্তার অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, যেভাবে পরিবার-বন্ধুত্বে ফাটল জাগছে, এসবের নিশ্চয়ই খারাপ প্রতিক্রিয়া আছে। উন্নতি নামক মরীচিকার পেছনে ছুটছি সবাই। উন্নতির বাসনায় শিশুদের ওপর বাড়ানো হচ্ছে পড়ালেখার চাপ। অথচ মেলামেশা ও আনন্দ-বিনোদনের সুস্থ সুযোগ কত কম। প্রায়ই ঢাকার পথেঘাটে একা একা কথা বলা, অদৃশ্য কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে থাকা মানুষ দেখি। বেশভূষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তই হবেন তাঁরা। এগুলো সমাজ-মনস্তত্ত্বে অস্থিরতার প্রকাশ নয়? দেশে মনের অসুখে ভুগতে থাকা লোকের সংখ্যাও ধাঁইধাঁই করে বাড়ছে।
মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মায়া ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গ মাকড়সার মতো যার যার জালে আমরা একা বসে থাকি। ঢাকা তো এখন ব্যয়বহুল এক খোলা ছাদের কারাগার। এ অবস্থায় মানুষে মানুষে সম্পর্কের বয়ন ফেঁসে যায়, কেউ সেই সামাজিক জালের ফোকর দিয়ে পড়েও যায়। তাদেরই কেউ কেউ খুনি, ধর্ষক, নির্যাতক কিংবা পেশাদার অপরাধী হয়ে ওঠে। এদের সংখ্যা যত কমই হোক, একেকটি সামাজিক হত্যাকাণ্ড গোটা সমাজকেই চমকে দেয়। টনক যদি কারও থেকে থাকে, তাহলে এসবের প্রতিক্রিয়ায় তার জাগরণ ঘটা উচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আবেগ উথলানো সেই গানটা মনে আছে? সেই যে,
‘...যে নারীর মধু প্রেমেতে আমার রক্ত দোলে
যে শিশুর মায়া হাসিতে আমার বিশ্ব ভোলে
যে গৃহ কপোত সুখ স্বর্গের দুয়ার খোলে
সে শান্তির শিবির বাঁচাতে শপথ করি।’
সমাজে শান্তির শিবির বাঁচাতে আমাদের এখন খতিয়ে দেখা দরকার, যেভাবে সব চলছে সেভাবে চলতে পারে কি না!
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

0 comments:

Post a Comment