Last update
Loading...

যুদ্ধাপরাধের বিচার নুরেমবার্গ থেকে ঢাকা by শাহরিয়ার কবির

কেউ কোন অপরাধ করলে তার বিচার হতে হবেজ্জ সমাজের এই নিয়ম সভ্যতার বোধের অন্তর্গত। হত্যা, নির্যাতন, সম্পদ লুণ্ঠন বা সম্পদহানি প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজে অপরাধ হিসেবে গণ্য।
এ সব অপরাধের বিচার ও শাস্তির বিধান ভারত, চীন, মেসোপটেমিয়া, গ্রীস ও মিসরের প্রাচীন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে।
যুদ্ধের সময় বিবদমান উভয় পক্ষকে কিছু নিয়ম বা রীতি মান্য করার বিধান মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম গৃহীত হয়েছে প্রাচীন ভারতবর্ষে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়। এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল পাঁচ হাজার বছরের আগে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ‘মহাভারত’-এ এই যুদ্ধের কারণ, বিবরণ, যুদ্ধের অস্ত্র, কলাকৌশল, কূটনীতি প্রভৃতির পাশাপাশি যুদ্ধের আইনের উল্লেখ রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিবদমান পা-ব ও কৌরবরা কতগুলো নিয়ম বা আইন মান্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষই এসব আইন ভঙ্গ করে যুদ্ধাপরাধ করেছিল। সেই সময় যুদ্ধাপরাধের জন্য জাগতিক শাস্তির বিধান ছিল না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আইন লঙ্ঘনকারীরা যুদ্ধাপরাধের জন্য ঐশ্বরিক শাস্তি ভোগ করেছিলেন, যে শাস্তি থেকে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরও রেহাই পাননি। তাঁর অপরাধ ছিল প্রতিপক্ষকে অর্ধসত্য বলে প্রতারণার।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর চীন, মেসোপটেমিয়া, মিসর ও গ্রীসে যুদ্ধের নিয়ম বা আইনের উল্লেখ সামরিক ইতিহাসে পাওয়া যাবে। আইন ও বিচারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছিল প্রাচীন গ্রীসে। এথেন্সের ক্ষমতাবান শাসক ও সমরনায়ক এ্যালিবিয়াদিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০-৪০৪)-এর বিচার হয়েছিল সিসিলির বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনাকালে যুদ্ধের আইন ভঙ্গের জন্য। এথেন্সের আদালতে তার অনুপস্থিতিতে বিচার হয় এবং তাঁকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হয়। পরে সিসিলি জয় করে ফিরে আসার পর এথেন্সবাসী তাকে বীর হিসেবে বরণ করে এবং আদালত শাস্তি প্রত্যাহার করে নেয়।
বিশ শতকের আগে যুদ্ধকালে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন প্রভৃতি অপরাধের জন্য বিচারের কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছি ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে। ঐতিহাসিক বাসিয়োনির মতে যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রথম বিচারের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে ইতালি থেকে। ১২৬৮ সালে নেপলস-এর কনরাডিন ভন হোহেনস্টেফানের বিচার হয়েছিল যুদ্ধের আইন ভঙ্গের জন্য এবং তাকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়েছিল। এর এগারো বছর পর ১২৭৯ সালে ইংল্যান্ডে ‘ওয়েস্টমিন্স্টার আইন’ (স্ট্যাটিউট অব ওয়েস্টমিন্স্টার) পাস হয়, যেখানে আইন ভঙ্গের জন্য সেনাবাহিনীর বিচারের ক্ষমতা রাজাকে দেয়া হয়েছে। এই আইনের অধীনে ১৩০৫ সালে স্কটল্যান্ডের স্যার উইলিয়াম ওয়ালেসের (১২৭২-১৩০৫) বিচার হয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের। এ ছাড়াও ওয়ালেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যুদ্ধের সময় বয়স ও নারীপুরুষ নির্বিশেষে গণহত্যার জন্য। ইংল্যান্ডের আদালত তাঁকে মৃত্যুদ- প্রদান করলেও স্কটল্যান্ডে স্যার উইলিয়াম ওয়ালেস স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ও জাতীয় বীর হিসেবে আজও সম্মানিত।
ইতালিতে হোহেনস্টেফান এবং ইংল্যান্ডে উইলিয়াম ওয়ালেসের বিচার হয়েছিল সেই সব দেশের রাজার আইনে, যা ছিল নির্দিষ্ট দেশের জন্য প্রযোজ্য। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত স্থাপনের প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে অস্ট্রিয়া ১৪৭৪ সালে স্যার পিটার ভন হাগেনবাখের (১৪২০-১৪৭৪) বিচারের ক্ষেত্রে। বার্গান্ডির ডিউক চার্লস (যিনি ‘চার্লস দি টেরিবল’ নামে বেশি পরিচিত) ব্রেইসাখের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন হাগেনবাখকে। অস্ট্রিয়া তখন রোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। ব্রেইসাখের শাসক হিসেবে হাগেনবাখ হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকাময় রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। হাগেনবাখের দখল থেকে ব্রেইসাখকে মুক্ত করে অস্ট্রিয়া ও তার মিত্ররা। হাগেনবাখকে বিচারের নির্দেশ দেন রোম সম্রাট। এই বিচারের জন্য রোমান সাম্্রাজ্যের ২৮টি দেশ থেকে বাছাই করা ২৮ জন বিচারকের সমন্বয়ে একটি বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছিল। এই আদালতে হাগেনবাখের বিচার হয়েছিল ঈশ্বর ও প্রকৃতির আইন লঙ্ঘনের জন্য। তার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, অবৈধ কর আদায়, সম্পত্তি দখল ইত্যাদি অভিযোগ আনা হয়েছিল। হাগেনবাখ অবশ্য আদালতে বলেছেন, তিনি সবই করেছেন তার নিয়োগদাতা বার্গান্ডির ডিউকের নির্দেশে। এই বিচারকার্য শুরুর এক বছর আগে ডিউক চার্লস মারা গিয়েছিলেন। আদালত হাগেনবাখের যুক্তি খারিজ করে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে। রায়ে তার নাইট উপাধি বাতিল করে তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। ৯ মে ১৪৭৪ তারিখে শিরñেদের মাধ্যমে হাগেনবাখের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। হাগেনবাখের এই বিচারের মাধ্যমে যুদ্ধআইনে ‘অধিনায়কের দায়বদ্ধতা’র (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে এ ধরনের বিচারের সূত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একই সঙ্গে এই বিচার ‘আন্তর্জাতিক আদালত’-এর ধারণাও প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিশ শতকের আগে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত মামলা হচ্ছে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হেনরি রীযের বিচার। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় (১৮৬১-১৮৬৫) হেনরি একটি কারাগারের দায়িত্বে ছিলেন। এই গৃহযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩,৫৯,৫২৮। কারাগারে আটক যুদ্ধবন্দী মৃত্যুর সংখ্যা ২৪,৮৬৬। ক্যাপ্টেন হেনরির বিরুদ্ধে ১৩টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার ভেতর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও আঘাত অন্যতম। ক্যাপ্টেন হেনরির বিচার হয়েছিল সামরিক আদালতে, যার প্রধান বিচারক ছিলেন মেজর জেনারেল লিউ ওয়ালেস (‘বেনহুর’ উপন্যাসের রচয়িতা)। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধাপরাধের বিচার। বিচারে ক্যাপ্টেন হেনরিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়।
যুদ্ধের ব্যাপক নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকা গত শতাব্দীতে আমরা প্রথম প্রত্যক্ষ করি প্রথম মহাযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮)। চার বছরের এই মহাযুদ্ধ মানব জাতির বিবেককে প্রচ-ভাবে আলোড়িত করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জার্মানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই।
ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ চলাকালে পৃথকভাবে দাবি করেছে- যারা স্থলে ও সমুদ্রে যুদ্ধ ও মানবতার আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। ১৯১৮ সালে ৫ অক্টোবর ফরাসী সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল- আন্তর্জাতিক আইন ও মানব সভ্যতার মূলনীতি অগ্রাহ্য করে যারা যুদ্ধ করেছে তারা শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী লুই বারথু ১৯১৭ সালের ৩ নবেম্বর বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে এবং এটা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।
১৯১৮ সালের ১১ নবেম্বর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ডের লর্ড হাই চ্যান্সেলর ভাইকাউন্ট বিরকেনহেড দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল ১ম বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের ঘটনা সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রণয়ন করা। এরপর ভার্সাইতে মিত্রশক্তির সঙ্গে জার্মানির বৈঠকে ঐতিহাসিক ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯১৯ সালের ২৮ জুন। এই চুক্তি সম্পর্কে জার্মানি পরে বলেছে তাদের এতে স্বাক্ষর প্রদানে বাধ্য করা হয়েছিল।
ভার্সাই চুক্তির ৪৪০টি অনুচ্ছেদের ভেতর জার্মানির প্রতি শাস্তিমূলক বহু ধারা রয়েছে। এই চুক্তির সপ্তম পর্বে ২২৭, ২২৮ ও ২২৯ অনুচ্ছেদে জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম হোহেনযোলেনসহ তদন্তে অভিযুক্ত সকল জার্মান যুদ্ধাপরাধীকে সামরিক আদালতে বিচারের কথা বলা হয়েছে।
ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী মিত্রশক্তি প্রথমে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯ হাজার ব্যক্তির তালিকা তৈরি করেছিল। এই তালিকা বলা বাহুল্য জার্মানির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। জার্মান প্রতিনিধিরা বলেছেন এত বেশি ব্যক্তির বিচারের যেমন সমস্যা রয়েছে- এই বিচার শুরু হলে জার্মানিতে গৃহযুদ্ধ বাধতে পারে। মিত্রশক্তি এই যুক্তি মেনে নিয়ে যাচাই বাছাই করে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮৯৫ জন এবং শেষে চূড়ান্তভাবে ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর একটি তালিকা জার্মানিকে প্রদান করে।
জার্মানির কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম যুদ্ধে পরাজয়ের পর নেদারল্যান্ডে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নেদারল্যান্ডস নিরপেক্ষ ছিল। এ ছাড়া কাইজার উইলিয়াম আত্মীয়তার সূত্রে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় ইউরোপের অধিকাংশ রাজ পরিবার একটি অপরটির সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ ছিল।
মিত্রশক্তি আশা করেছিল কাইজারের বিচার সম্ভব না হলেও ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার জার্মানি করবে। কিন্তু সমস্যা ছিল বিচারের আইন ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে এবং জার্মান সরকারের সদিচ্ছার। জার্মানির আইন এবং ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকার আইন এক নয়। এ ছাড়া বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে জার্মান ভাষায়, মিত্রশক্তির সাক্ষীদের জন্য যা ছিল অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর। বিচারে জার্মান সরকারের আগ্রহ ও আন্তরিকতার অভাব লক্ষ্য করে কিছু ব্রিটিশ সাক্ষী শেষ পর্যন্ত লাইপযিগের আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
জার্মান সুপ্রীমকোর্ট শেষ পর্যন্ত মাত্র ২২ জন যুদ্ধবন্দীর বিচার করেছিল যাদের ভেতর সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছর কারাদ-। যার এই শাস্তি হয়েছে তার অপরাধ ছিল সে মিত্রশক্তির একটি সমুদ্রগামী হাসপাতাল জাহাজ টর্পেডোর আঘাতে ডুবিয়ে দিয়েছিল- যে জাহাজে দুই শতাধিক আহত ও অসুস্থ সৈন্য এবং সাধারণ রোগী ছিল। ঠা-া মাথায় দুই শতাধিক নিরস্ত্র, আহত ও অসুস্থ মানুষকে হত্যার জন্য ওবেরলেফট্যানেন্ট সি প্যাটজিগকে মাত্র তিন বছরের কারাদ- প্রদান করে ‘লাইপজিগ ট্রায়াল’ ন্যায়বিচারের ইতিহাসে কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
মানব জাতির ইতিহাসে নৃশংসতম গণহত্যা, নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সময়। জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি বাহিনী, ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট বাহিনী এবং প্রাচ্যে জেনারেল তোজোর রাজকীয় জাপানী বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের কথা বিশ্ববাসী কখনও ভুলবে না। হিটলারের নাৎসি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী গেস্টাপো ও অন্যান্য বাহিনী যেভাবে ইহুদি, কমিউনিস্ট ও অজার্মানদের হত্যা করেছে সভ্যতার ইতিহাসে তার কোনও নজির নেই। যুদ্ধের ইতিহাসবিদরা নাৎসিদের এই নৃশংসতাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘হলোকস্ট’ বা ‘শোয়াহ্’ নামে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর মিত্রশক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা প্রদান করে। ১৯৪৩ সালে ৩০ অক্টোবর ঐতিহাসিক ‘মস্কো ঘোষণা’ স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, অক্ষশক্তির যে সব রাজনৈতিক নেতা ও সমর অধিনায়কদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ পাওয়া যাবে তাদের গ্রেফতার করে বিচার করা হবে। মস্কো ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৫ সালের ৪-১১ ফেব্রুয়ারি ইয়াল্টা কনফারেন্সে মিলিত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এবং সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্টালিন। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় বিজয়ের পর মিত্রশক্তি সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবে। শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে তিন দেশের পররাষ্ট্র সচিবরা সম্মিলিতভাবে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ইয়াল্টা সম্মেলনে চার্চিল বলেছিলেন, যুদ্ধজয়ের পর দেরি না করে পরাজিত সব নাৎসি নেতাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলতে হবে। স্টালিন বলেছিলেন আমাদের দেশে আমরা কাউকে বিচার না করে শাস্তি দিই না। বিরক্ত চার্চিল বলেছিলেন, আমরা বিচার করেই তাদের ফাঁসিতে ঝোলাব।
ইয়াল্টা সম্মেলনের পর মিত্রশক্তি যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। তাদের সামনে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা- প্রয়োজনীয় আইন এবং আন্তরিকতার অভাব ঘটলে কিভাবে যুদ্ধাপরাধীরা বিচার ও শাস্তি থেকে অব্যাহতি লাভ করে। ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট মিত্রশক্তি ‘লন্ডন চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল’-এ। ট্রাইব্যুনালের নীতি ও কার্যবিধি এই চুক্তির ভেতর অনুমোদন করা হয়। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জাস্টিস এইচ জ্যাকসন, ফ্রান্সের অস্থায়ী সরকারের পক্ষে রবার্ট ফ্যালকো, যুক্তরাজ্য ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকারের পক্ষে জোউইট সি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের পক্ষে আই নিকিশেঙ্কো ও এ ট্রাইনিন।
এই চুক্তি অনুযায়ী মিত্রশক্তির চারটি দেশ ট্রাইব্যুনালের জন্য নিজ নিজ দেশের আইনজীবী ও বিচারক নিয়োগ চূড়ান্ত করে। যুক্তরাষ্ট্র ‘আন্তর্জাতিক সামরিক আদালত’ (আইএমটি)-এর প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি রবার্ট এইচ জ্যাকসনকে নিয়োগ করে।
২০ নবেম্বর ১৯৪৫ তারিখে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম আরম্ভ হয়। এর আগে ১৮-১৯ অক্টোবর মিশ্রশক্তির আইনজীবীরা ‘আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে’ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২৪ জন শীর্ষস্থানীয় নাৎসি নেতা ও সমরনায়ক এবং ৭টি সংগঠনকে সুপরিকল্পিতভাবে লাখ লাখ মানুষ হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে ৬৫ পৃষ্ঠার অভিযোগনামা পেশ করেন। বিচার শুরু হওয়ার আগে নাৎসি পার্টির প্রধান হিটলার এবং তার দুই শীর্ষ সহযোগী হিমলার ও গোয়েবলস আত্মহত্যা করার জন্য বিচার থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। অভিযুক্তদের তালিকায় ১ নম্বর আসামি ছিলেন ডেপুটি ফুয়েরার মার্টিন বোরমান। গ্রেফতারের আগেই তিনি আত্মগোপন করেছিলেন।
১৯টি তদন্ত দল অভিযুক্ত নাৎসি নেতাদের দুষ্কর্ম সম্পর্কে তদন্ত করেছেন। নাৎসি সরকারের দলিল, চিঠিপত্র, আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র সংগ্রহ করা ছাড়াও তারা অনেক বন্দী নির্যাতন শিবির পরিদর্শন এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের জবানবন্দী নথিবদ্ধ করেছিলেন।
ব্যক্তির বিচারের পাশাপাশি নুরেমবার্গে ৭টি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কর্মকা- সম্পর্কে তদন্ত ও বিচার হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে- ১) নাৎসি পার্টির নেতৃত্ব, ২) রাইখ সরকারের মন্ত্রিসভা, ৩) এসএস, ৪) গেস্টাপো ৫) এসডি, ৬) এসএ এবং ৭) জার্মান হাই কমান্ড। বিচারে ৪টি সংগঠন দোষী প্রমাণিত হয়েছে এবং রায়ে এদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য ৭টি নীতি বা ধারা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ৬ নং ধারায় বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইনে যে সব অপরাধ শাস্তিযোগ্য বলে নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- ক) শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, খ) যুদ্ধাপরাধ ও গ) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এরপর এই তিনটি অপরাধের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এর আগে এত নির্দিষ্টভাবে এই সব অপরাধ আইনশাস্ত্রে বিধিবদ্ধ হয়নি। নুরেমবার্গ নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানও অব্যাহতি পাবেন না। এই নীতিমালার ভিত্তিতেই প্রস্তুত করা হয়েছিল অভিযোগনামা।
প্রত্যেক দেশের বিচার ব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পশ্চিমে প্রধানত দুই ধরনের বিচার পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রশক্তিদের ভেতর আমেরিকা ও বৃটেন অনুসরণ করে ‘দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি’ (অফাবৎংধৎরধষ ঝুংঃবস)। অন্যদিকে ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুসরণ করে ‘অনুসন্ধানমূলক পদ্ধতি’ (ওহয়ঁরংরঃরাব ঝুংঃবস)। আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থার উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের দেশে আদালতে বিচারক থাকেন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। সাধারণত দুই পক্ষের সওয়াল-জবাব শুনে তারই ভিত্তিতে তিনি রায় দেন। অন্যদিকে ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশের আদালত প্রধানত বিচারককেন্দ্রিক। বিচারক নিজেও বাদী ও বিবাদীকে প্রশ্ন করতে পারেন, দুই পক্ষের আইনজীবীদেরও জেরা করতে পারেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রায় দেন।
লন্ডনে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি প্রণয়নের সময় এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর কিছু পরিমার্জনসহ ‘দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি’ গ্রহণ করা হয়। এরপর প্রশ্ন উঠেছিল নতুন নীতিমালার ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা (জবঃৎড়ংঢ়বপঃরাব বভভবপঃ) সম্পর্কে। কোন অপরাধের বিচারের সময় বাদী পক্ষের আইনজীবীকে আদালতে বলতে হয় সেই অপরাধ আইনের কোন কোন ধারায় দ-যোগ্য। অপরাধ যখন সংঘটিত হয় তখন যে আইন বলবৎ ছিল সেই আইনে অপরাধীর বিচার হয়। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি ও আইন প্রণয়নের সময় মিত্রশক্তির আইনপ্রণয়নকারীদের এ বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়েছেজ্জ তারা নতুন কোন আইন তৈরি করতে যাচ্ছেন না যা আইনশাস্ত্রে ইতিপূবে বর্ণিত হয়নি। নুরেমবার্গে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ ও ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধে’র বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রথমবারের মতো সূত্রবদ্ধ করা হলেও হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, বাধ্যতামূলক শ্রম, যৌনদাসত্ব, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি প্রভৃতি বহু আগে থেকেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। জাস্টিস জ্যাকসন লন্ডন বৈঠকের শুরুতেই মিত্রশক্তির সহযোগীদের বলেছিলেন, আমরা এমন সব কর্মকা-ের বিচার করতে যাচ্ছি যা আদিকাল থেকে অপরাধ হিসেবে পরিগণিত এবং প্রতিটি সভ্য দেশে যার বিচার করা হয়।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি ও কার্যবিধি প্রণয়নের সময় মিত্রপক্ষের আইনজীবীরা সম্ভাব্য সকল চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। জাস্টিস জ্যাকসন তার উদ্বোধনী ও সমাপনী ভাষণে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য সমালোচনা ও বিরুদ্ধ যুক্তি অত্যন্ত মেধা ও দক্ষতার সঙ্গে খ-ন করেছেন। একটি সমালোচনা নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এটি ছিল ‘বিজয়ীর বিচার’ (ঠরপঃড়ৎ’ং ঔঁংঃরপব)।
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের উদ্বোধনী ভাষণে জাস্টিস জ্যাকসন এ বিষয়ে বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আদালত গঠন সহ আইনজীবী ও বিচারক সবই নিয়োগ করতে হয়েছে যুদ্ধে বিজয়ী মিত্রশক্তিকে পরাজিত অক্ষশক্তির অপরাধের বিচারের জন্য। অভিযুক্তদের বিশ্বব্যাপী আগ্রাসনের কারণে সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ কেউ নেই বললেই চলে, যারা এই বিচারে আগ্রহী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হয় পরাজিতদের বিচার করতে হবে বিজয়ীদের, নয় তো পরাজিতদের অপরাধের বিচারের ভার তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়টির অকার্যকারিতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম থেকে।
অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের আপিলের সুযোগ নেই, এমনকি বিচারকদের সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপনেরও কোন সুযোগ কার্যবিধিতে রাখা হয়নি। এ বিষয়ে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক এ এল গুডহার্ট লিখেছেন, ‘তত্ত্বগতভাবে এই যুক্তি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে তা যে কোন দেশের বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী। এই যুক্তি মানতে হলে কোন দেশ গুপ্তচরদের বিচার করতে পারবে না। কারণ যে দেশের আদালতে সেই গুপ্তচরের বিচার হবে সেখানকার বিচারক তার শত্রুদেশের। এ ক্ষেত্রে কেউ নিরপেক্ষতার কথা বলতে পারে না। বন্দি গুপ্তচর বিচারকদের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করতে পারে কিন্তু কোন অবস্থায় তাদের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে না। (ক্রমশ.)

0 comments:

Post a Comment