Last update
Loading...

লাশকাটা ঘর by কায়েস আহমেদ

মানুষটা কালীনাথ বড় চুপচাপ। তবে কাজের লোক। ছোট-বড় যে কোন কাজ বড় মনোযোগের সঙ্গে করে। বড় কাজ করার সুযোগ অবশ্য তার জীবনে আসেনি কখনো। 'চিন্তাহরণ মেডিকেল স্টোর'-এ ওষুধ বেচে আর মিকশ্চার তৈরী


করেই তার তিরিশ বছর কেটে গেলো, ২৫ বছর বয়সে ঢুকেছিলো এখানে, এখন চুল দাড়ি পেকেছে, চামড়া কুঁচকেছে, গাল মুখ ভেঙেছে, কপাল চওড়া করে টাক পড়েছে, মানুষটার স্বভাব বদলায়নি। আগে ধুতির ওপর হাতে-কাচা হাফশার্ট পরতো, ৬৪'র দাঙ্গার পর ধুতি ছেড়েছে, এখন তার নিত্যদিনের পোশাক শার্ট পাজামা।
হাফ শার্ট পরা মানুষ বড় একটা দেখা যায় না আজকাল। কালীনাথ আজো হাফ শার্ট পরে। এর দ্বারা অবশ্য তার বৈশিষ্ট্য সচেতনতা বোঝানো হচ্ছে না। অনেক কিছুর মতোই এটা তার স্রেফ অভ্যাস।
চিন্তাহরণ মেডিকেল স্টোরে তার চাকরী করাটাও যেন অভ্যাস। রোজ সকালে টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে এসে দোকানে ঢোকে।
রাস্তা ঘাটে কতো ধরনের রগড় হয়। না হোক, হাঁটতে হাঁটতে মানুষ এদিক ওদিক তাকায়ও তো। কালীনাথের ওসব নেই। বাড়ী থেকে মাথা হেঁট করে এই যে বেরুলো আর মাথা তোলবার নামটি নেই। একেবারে সোজা এসে দোকানে। যেনো দম দেওয়া পুতুল। মেকাররা যেমন তৈরী করে দিয়েছে ঠিক তেমনটি। খদ্দের এসে হয়তো বললো : 'লারগ্যাকটিল সিরাপ' আছে? যদি থাকে কোন কথা না বলে আলমারী থেকে ফাইলটি বার করে এনে কাউন্টারের ওপর রাখে। যদি না থাকে, বলবে : 'নাই'।
'নাই' শব্দটি শুধুই একটি ধ্বনি, চোখে মুখে কালীনাথের কোন অভিব্যক্তি ফোটে না। খদ্দের যদি বলে : 'কোথায় পাবো বলতে পারেন?'
কালীনাথ এবার আর মুখে বলবে না, মাথাটি খুব সংক্ষিপ্ত নাড়িয়ে জানিয়ে দেবে সে জানে না।
হয়তো কালীনাথ হার্ডবোর্ডের পার্টিশন দেওয়া খুপরীটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিকশ্চার বানাচ্ছে। দোকানের মালিক ললিতবাবু কোন ব্যাপারে হয়তো ডাকলেন। কালীনাথ কোন জবাব না দিয়ে খুপরী থেকে বেরিয়ে এসে ললিতবাবুর মুখের দিকে তাকাবে। ললিতবাবু কোন কথা জিজ্ঞেস করলে অতি সংক্ষিপ্ত জবাব অথবা মস্তকের হ্যাঁ বা না বাচক মুদ্রা দেখিয়ে আবার খুপরীর ভেতর ঢুকে গিয়ে আপন কাজে মগ্ন হয়ে যায়।
মিকশ্চার বানানোর কাজটা তার অবশ্য সারাদিন করতে হয় না। বিকেলবেলা ৫টা থেকে ৭টা এই দু'ঘণ্টার জন্যে ডাঃ আব্দুল হান্নান এসে বসেন। (তার জন্যে একপাশে আর একটা খুপরী আছে।) তখন কালীনাথকে ইনজেকশন ফোঁড়া, মিকশ্চার বানানো_এইসব টুকটাক কম্পাউন্ডারীর কাজটুকু করতে হয়।
এই সময়টা ললিতবাবু নিজেই খদ্দের সামলান। তবে মিকশ্চার টিকশ্চার আজকালকার ডাক্তাররা দেয় না বড় একটা। ইনজেকশন আর পেটেন্ট ওষুধই চালায়।
ইনজেকশন ফোঁড়ার জন্যে রুগী প্রতি দু'টাকা। এই টাকাটা কালীনাথের উপরি আয়। কাছাকাছি সিরিয়াস রুগী হলে অবশ্য বাড়ীতে গিয়ে ফুঁড়ে আসতে হয়। কাজটা কালীনাথের মোটেই পছন্দ নয়, তবু বাধ্য হয়ে যেতে হয় অনেক সময়। স্বামীর এই অপছন্দের ব্যাপারটা গিরিবালার কাছে নিতান্তই অপরাধের। গিরিবালা বলে : বজ্জাতি।
'হাবাইত্তা মিনসা কি কম! মিটমিটা শয়তান। কারুর সুখ চায় না। খালি নিজেরটা বোঝে। ক্যান, কি এমুন জমিদার খান অইছ যে মানষের বারিত্ গিয়া ইন্জিশন দিলে মান যাইবো? আহা মান অলারে, গোয়ার নাই চাম রাধাকিষ্ট নাম। হুঁঃ।'
চ্যবনপ্রাস খেতে খেতে নিশিকান্ত বলে : 'মানুষটারে একটু শান্তিতে থাকতে দিবো না, রাইত দিন'...বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারে না, তার মুখের চামড়া দলামোচা কাগজের মতো কুঁচকে যায়, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসে, গলার রগ ফুলে ফেটে যেতে চায়। বিছানার ওপর বসে বসে প্রবল ঝড়ের ঝাপটায় টালমাটাল নিশিকান্ত নুয়ে নুয়ে পড়ে।
হৈমবতী স্বামীর পিঠে এক হাত বুকে এক হাত রেখে বুলোতে থাকে। পেটের ভেতর সাত মাসের সন্তান পিতার কাশির শব্দে কেঁপে কেঁপে ওঠে।
'কতো কই বালো দেইখ্যা এ্যালাপাথি ওষুধ খাও, ডাক্তার দ্যাহাও, তা না কি ছাতার এক চব্বনপাস পাইছে'_রাগে দুঃখে মমতায় তার কথা ভিজে চপচপে হয়ে জড়িয়ে যায়।
নিশিকান্ত'র কি হয় কে জানে, তার কাশির ঝড় থেমে আসে, বিছানার ওপর হাতের ভর দিয়ে একদিকে ঘাড়-মাথা হেলিয়ে সে মুখ হাঁ করে শ্বাস নেয়, তার তোবড়ানো বুকটি বেগে ওঠা নামা করে, আর সেখান থেকে একটানা ঘড় ঘড়ানি নিয়ে হোঁ...হোঁ...শব্দ বেরিয়ে আসতে থাকে নিশিকান্তর মুখ দিয়ে।
হৈমবতী ধীরে ধীরে স্বামীকে শুইয়ে দিয়ে বাতাস করতে থাকে। বাতাস করতে করতে সারিসারি ঘুমিয়ে থাকা ছেলেমেয়েদের দিকে এক পলক তাকিয়ে দুর্জ্ঞেয় কারণে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বামীর দিকে মনোযোগী হয় আবার।
এই সময় হৈমবতী সাইকেলের শব্দ পায়। মনোতোষ মাস্টার প্রাইভেট পড়িয়ে ফিরলো। পারেও লোকটা। সকাল বেলা বাজার-হাট করে দিয়ে এক ঝাঁক ছেলে পড়িয়ে স্নান খাওয়া-দাওয়া ক'রে স্কুলে ছোটে, দুপুরে একবার খেতে আসে, তারপর এইরাত দশটা সাড়ে দশটায় ফিরলো। এর মধ্যে আবার রাজনীতিও করে।
ঘরে বাইরে লোকজনকে মহা উৎসাহে তার রাজনীতি বোঝায়, কতো কি যে বলে, ও ছাইভস্ম বোঝেও না হৈমবতী শুনতেও চায় না।
নিশিকান্ত পার্টি-ফার্টির ধার কাছেও নেই, কিন্তু রাজনীতির আলোচনায় বড় উৎসাহী। চাকরী করে সাধনা ঔষধালয়ের এক ব্রাঞ্চে। প্রত্যেকদিন দোকানে বসে খবরের কাগজটি তার পড়া চাই। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে বলে : 'হঃ, হ্যারা করবো রাজনীতি। নেতা আছিলো দেশবন্ধু, নেতা আছিলো নেতাজী সুভাষ বোস, গান্ধী। খালি চিককুর পারলেই যদি নেতা হওন যাইতো'...কাশির ধমকে মাঝ পথেই থামতে হয় তাকে।
একটু দম নিয়ে নিশিকান্ত স্ত্রীকে বোঝায় : 'বুঝলানি, ওই মন্তোষ মাস্টারের সমাজতন্ত্র, ওই সব অইলো গিয়া বুলি, এক হালারে বালো মনে করো তুমি? সব খালি বোচকা মারনের ফন্দি।'
হৈমবতী দেশবন্ধু, নেতাজী, গান্ধী কাউকেই চেনে না, রাজনীতির অতো ঘোরপ্যাঁচও বোঝে না, কিন্তু সে মনোতোষ মাস্টারকে চেনে, হাসি খুশি মানুষটা, মনে কুনো কালি নাই, ঠ্যাকা বেঠ্যাকায় দুই দশ টাকা পাওন যায়।
_'মন্তোষ মাস্টারের কথাগুলো তো খারাপ না।'
_'আহ্, খারাপ তোমারে কইতাছে কে, কিন্তু করনের লোকটা দেহাও।'
_'হ, তোমার লগে অহন আজাইরা প্যাচাল পারি। আমার আর খাইয়া কাম নাই।' হৈমবতী ঘাড় টান করে সংসার সামলাতে উঠে যায়।
মনোতোষ মাস্টারের স্কুলের বেতন এবং ছেলে পড়িয়ে মাসিক আয় হাজার দুয়েক টাকার মতো। সংসারে মানুষ বলতে স্বামী-স্ত্রী আর ছোট দুটো ছেলে-মেয়ে। গ্রামের বাড়ীতে বাপ আছে, ডাক্তারী করে, জায়গা জমি দেখা শোনা করে, মামলা মকদ্দমা সামলায়। সম্প্রতি বোনটি বিধবা হয়েছে, তাকে কিছু কিছু সাহায্য করতে হয় এই যা।
হৈমবতী মনোতোষের স্ত্রী জয়াকে বলে, 'তোমার চিন্তা কি, তোমার ছোট পরিবার সুখী পরিবার, আমাগো অইলো গিয়া হুয়োরের পাল।' হাসতে হাসতেই বলে হৈমবতী। কিন্তু জয়ার মুখ কিঞ্চিৎ গম্ভীর হয়ে যায় : 'হ, মানুষ বাইর থেইক্যা ওইটাই দ্যাখে।'
হৈমবতী এতোটুকু হয়ে যায় : 'আমি কিন্তু কিছু ভাইব্যা কই নাই, মনে কষ্ট নিও না।' জয়ার মুখ-ভার তবু কাটে না। হৈমবতী সে দিকে তাকিয়ে বলে : 'না, কাম পইরা রইছে, উঠি।'
মনে মনে হৈমবতী জ্বলে : 'মাগীর গাও ভরা হিংসা। বিধবা ননদরে মাসে ছয় মাসে ৫০/১০০টা টাকা দিতে অয়, তাতেই বুক ফাটে, স্বামী তো এদিকে শুনি ধইন্যা না শ্যামপুরে জমি রাখছে তিন কাঠা।'
রাতের বেলা শুয়ে শুয়ে নিশিকান্ত বলে : 'বুঝলা শিবুর মা, এইসব ওইলো তোমার গিয়া বিজনেস, বুঝছো, মহাজনরা যেমুন চাইল ডাইল মজুত কইরা বাজারে দাম বারায়, সুযোগ বুইজ্যা চরা দামে মাল বেচে, এ-ও হেমুন; জাগা জমিনের দাম বারতাছে, অহন সস্তায় কিন্যা থুইলো, দুই তিন বছর থাউক না পইরা, আরবের পয়সা আইতাছে মানুষের আতে, দুই চার বছর পর ওই জমি মন্তোষ ৮ গুণ দামে বেচবো_বুজলা অহন, সমাজতন্ত্র কারে কয়? হুঁঃ'
জয়া গিরিবালাকে বলে : 'কি কমু মাসীমা, কি যে পায় রাজনীতির মইদ্যে, আমার বালো লাগে না, পোলাপান বয়সে করছে করছে, অহন কি? থাকি হ্যাকেগো দ্যাশে, হ্যাগো মাথা গরম, কুনসুম কি অয় কওন যায়? আমরা অইলাম গিয়া ইন্দু মানুষ, আমাগো অতো মাথা ব্যথা ক্যান? হ্যাগো দ্যাশ হ্যারা যেম্নে মনে লয় চালাউকগা, তোমার অতো রাজনীতির আউস ক্যান?'
কুয়োতলা থেকে সর্বানী জবাব দেয় : 'পুরুষ মান্ষের কতো রকমের আউস থাকে, তাই ধরলে কি আর চলে?'
সর্বানীর স্বামী বাসুদেব ফরাসগঞ্জের কোন আড়তে চাকরী করে। মদ গাঁজা খায়, জুয়া খেলে, বেপাড়ায় যায়, সর্বানীর মুখে 'পুরুষ মান্ষের কতো রকমের আউস থাকে' কথাটায় জয়ার কোথা যেনো ঘা খেলো।_কোথায় বাসুদেব, একটা অশিক্ষিত, মাতাল, যার সংসারে, দু'বেলা ঠিক মতো হাঁড়ি চড়ে না, যে বৌ পেটায়, তার সঙ্গে যেনো সর্বানী মনোতোষকে একই পাল্লায় তুলে দিচ্ছে। জয়ার ভেতরটা রি-রি করে।
'হ, আউস তো অনেক রকমের, কেউ মদ গাঞ্জা খায়, জুয়া খেলে, বাজে পারায় যায়, হেইটাও আউস, আর কেউ রাজনীতি করে হেইটাও আউস; কি কন মাসীমা, দুইটা কি এক অইলো?'
'কী!'_সর্বানী সটান দাঁড়িয়ে পড়ে, তার আঁটসাঁট শরীরটা ফণা তোলা সাপের মতো দুলতে থাকে : 'আমার স্বামী মদ গাঞ্জা খায় নিজে কামাই কইরা খায়, জুয়া খেলে নিজের পয়সায় খেলে তাতে কার কি'_হাত নেড়ে দু'চোখে আগুন নিয়ে সর্বানী চিৎকার করে বাতাস কাটতে থাকে : 'আমার স্বামী বাজে পারায় যায়? ক্যান কারুর আত দইরা কুনদিন টান দিছে, না কাউরে নিয়া'...
_'চুপ করো।' গিরিবালা ধমক দিয়ে সর্বানীকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে চায়। একটানা কথা বলে হাঁফ ধরে গিয়েছিলো, ছোট্ট করে শ্বাস টেনে সর্বানী আবার শুরু করে : 'না চুপ করুম ক্যান, বিচার করেন, কি খারাপ কথাটা কইছি আমি, হেয় আমার স্বামীর কথা কইবো? আমার স্বামী নি তারে নিয়ে কুনদিন'...
_'আহ চুপ করো না, তোমার স্বামীর নাম নিয়া তো কয় নাই।'
_'ওইসব আমরা বুঝি'...
জয়া তেতো কথার খোঁচা যেমন দিতে পারে, ঝগড়া ততোটা গুছিয়ে করতে পারে না। তার জড়িয়ে জড়িয়ে যাওয়া কথা সর্বানীর চড়া গলায় আওয়াজের নীচে চাপা পড়ে যেতে থাকে। এর মধ্যেই সে খুব একটা জুৎসই কথা বলে সর্বানীকে কাবু করতে পারে অবশ্য, কিন্তু সামনে গিরিবালা, তাছাড়া বলে পরে সর্বানীকেই সামলাতে পারবে বলেও ভরসা পায় না।
ব্যাপারটা আর কিছু নয়, গিরিবালার বড় ছেলে সুকুমার, যে ইদানীং মাস্তান হয়ে উঠেছে, সেদিন রাত্রে, বাসুদেব তখনো ফেরেনি, জয়া নিজের চোখে দেখেছে, সর্বানীকে সাপ্টে ধরে চুমু খাচ্ছে।
হৈমবতী শুয়ে ছিলো, তার শরীরটা ততো ভালো নয়, বিকেল শেষ হয়ে আসছে তবু তার উঠতে ভালো লাগছিলো না, আর এমন সময় হঠাৎ এই ঝগড়া; সে কোন কথা বললো না, তক্তপোষের ওপর শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে না দেখার ভান করে ঝগড়া দেখতে লাগলো। কী যে ভালো লাগছে তার, মাগীর বড় দেমাক, বোঝ্ অহন কেমুন লাগে। হেই দিনকা হাউস তামাসা কইরা একখানা কথা কইছিলাম, ওমা তাইতে মাগীর কি গোস্সা।
বাড়ীটা একতলা। সরু সরু নীচু দরজা, ফোকরের মতো জানালা, ঘরের ভেতর ঢুকলে প্রথমেই মনে হবে ঠেলা দিয়ে দেওয়ালগুলোকে সরিয়ে দিই; এর ভেতরই তক্তপোষ, বাঙ্-প্যাটরা, সস্তা দামের আলমারী, আলনা, ছেঁড়া লেপের তুলো ভরা চটের বস্তা, চালের টিন, গমের টিন, হাজারো গণ্ডা জিনিসপত্র স্যাঁতসেঁতে ঘরকে আরো অন্ধকার করে রাখে।
রাস্তার দিকে পিঠ করে দাঁড়ানো দুটি কামরার একটিতে থাকে কালীনাথ অপরটিতে নিশিকান্ত। কালীনাথের ঘরের গায়েই লাগানো সদর দরজা, সদর দরজার মাথাটি কালীনাথের ঘরের ছাদের সঙ্গে মিলে কার্নিশের শেষ সীমানা পর্যন্ত এসেছে : একদিকে বাড়ীর পাঁচিলের কাঁধে ভর অপর দিকে ঘরের কার্নিশে, ফলে সদর দরজা দিয়ে ঢুকলেই মনে হয় একটা সুড়ঙ্গ, সুড়ঙ্গটি পেরুলেই এক খামচা উঠোন, উঠোন এবং পাঁচিলের গা ঘেঁষে তুলসী মঞ্চ, একটি গন্ধরাজ ফুলের গাছ, কয়েকটা সন্ধ্যামালতী, গোটা তিনেক কলাবতী, তার লাগোয়া ঘরটি মনোতোষ সরকারের। ওধারে, কল, কুয়োতলা এবং পায়খানার দিকে টিনের চালের ঘরটিতে থাকে বাসুদেব। বেড়ার দেওয়াল আর দিনের চালের রান্নাঘরগুলো যার যার ঘরের সামনে বা পাশে।
এই বাড়ীতেই দীপালীর জন্ম, কিন্তু আজকাল তার দম বন্ধ হয়ে আসে। আগে তবু যা হোক সারাদিনটা স্কুলে তার বেশ কাটতো। আজ এক বছর তা-ও বন্ধ হয়েছে। এই ক'দিনে ফুলে-ফেঁপে কী বড়ই না হয়ে গেছে সে। নিজেরই লজ্জা লাগে, মা তবু তাকে শাড়ী পরতে দেবে না।
গিরিবালা যতোই চেষ্টা করুক, দীপালীর ভেতরে যে আর একটি দীপালী আছে গিরিবালার সাধ্য কি তাকে সেলাই করা কাপড়ে বেঁধে রাখে, সময় নেই অসময় নেই দীপালী ঠেসে স্বপ্ন দেখে! কিন্তু এই স্বল্প পরিসর ঘর থেকে, এই বাড়ীর চৌহদ্দি থেকে তার স্বপ্নকে কতোদূর আর নিয়ে যেতে পারে কালীনাথের মেয়ে?
কালীনাথের ছেলে থালাটাকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়ে চাপা গলায় গর্জন করে ওঠে : 'এই দিয়া খাওন যায়?' হারিকেনের আলোয় তার ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা কোঁকড়ানো চুলভরা মাথার বিশাল ছায়া মেঝের ওপর ভল্লুকের মতো নড়ে।
_'ই হি রে নবাব পুত্তুর, খাওন যায় না! লজ্জা করে না কথা কইতে? একখান ফুটা পয়সার মুরাদ নাই, আবার বর বর কথা_' এই দিয়া খাওন যায়?_মুখ বিকৃত করে মাথা দুলিয়ে গিরিবালা ভারী কুৎসিত একখানা ভঙ্গি করে। 'খাইতে তরে কয় কে? যা না যে বন্দুগো লগে রাইত দিন আড্ডা দিয়া বেরাস হ্যাগো কাছে যা গিয়া রাইত দুফুরে অহন আইছস মুখ নারতে! এত বড় জুয়ান গাববুর একখান, একটু যদি চিন্তা করে, একটু যদি ভাবে!'
থালাটা একটানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে বেরিয়ে গেলে ঠিক ঠাক মানানসই কাজটা হয় এখন। কিন্তু সুকুমার ওঠে না। ধারালো চোখমুখ, টানটান ঘাড় নিয়ে ম্যাচ-ম্যাচ করে ভাত মাখতে থাকে মাথা নিচু করে। দেখলে মনে হয় সে ভাত মাখছে না আটা ছানছে।
'বোইনটা বর অইতাছে তার বিয়া দিতে ওইবো, ছোট ছোট ভাইবোন গুলার মানুষ করতে অইবো, এতোবড় পোলা হেই চিন্তা নাই।'...
সুকুমার মুখ তোলে, তার চোখ মুখ থমথমে : 'করুমটা কি? চাকরী আমার লেইগ্যা বহায়া থুইছে সব। ক্যান, বাবা'...
গিরিবালা কথাটা চিলের মতো ছোঁ মেরে ধরে : 'ওই মেচিবিলাই তরে চাকরী দিবো? কথা কইতে জানে মান্ষের লগে? ভগোবান অর মুখ দিছে? হ্যায় আছে সব কয়টিরে চিতায় তুইল্যা দিয়া পিণ্ডি দেওনের অপেক্ষায়। হ্যায় তরে দিবো চাকরী ঠিক কইর‌্যা।'
গিরিবালার তোপের মুখ কালীনাথের দিকে ঘুরে যায় : 'হারা জনম আমারে জ্বালাইয়া কয়লা করছে। হ্যায় কি একটা মানুষ? পুরুষ মানুষ এমুন অয়? বাপ দাদার ভিটাখান রক্ষা করতে পারলো না, একদিন গিয়া খারাইলো না পর্যন্ত! অখন মোসলমানেরা ভোগ করতাছে!'
সরু তক্তপোষ এখন চিতা, তার ওপর কালীনাথের শব। গিরিবালা এবং সুকুমার ভারী চমৎকারভাবে চিতা জ্বালাতে থাকে। মুখের দিক থেকে আগুন আস্তে আস্তে বুক পেট পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে এক সময় সমস্ত চিতা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। কালীনাথকে আর আলাদা ক'রে চেনা যায় না। গোটা কালীনাথই এখন অগি্নময় চিতা। ছোট্ট ঘরের ভেতর সেই প্রচণ্ড আগুনের উত্তাপ হা হা ক'রে ফিরতে থাকে। ঊর্ধ্বমুখী রক্তাভ অগি্নশিখা কড়ি বরগাতে গিয়ে ছোবল মারে। ধোঁয়ায় ঘর ভরে যায়। মেঝের ওপর সার সার ঘুমন্ত ভাই-বোনের পাশে-পড়ে-থাকা দীপালীর চোখে সেই ধোঁয়া এসে লাগে। দীপালীর চোখ জ্বালা করে। দু'চোখ বেয়ে জল বিরিয়ে আসতে থাকে তার।
'দ্যাহ কুত্তার বাচ্চারা রাইত দুফুরে'...নিশিকান্ত গিরিবালা সুকুমারকে বিড়বিড় করে গালাগালি করে একা একা। কিন্তু গালাগালিটা খুব জুৎসই করে করতে পারে না। মগজের সঙ্গে বাঁধা সুতোগুলোয় টান পড়ে। কপালের দু'পাশের রগ টনটন করে। চোখ মুখ কামড়ে নিশিকান্ত কাশি ঠেকায়।
হৈমবতীর ঘুম বড়ো বেশী, একবার যদি বিছানায় পিঠ দিলো তো গেলো। কিছুক্ষণ আগেও কোমরের কশি ঢিলে করে সে তার সাত মাসের গাভীন পেট মেলে চোখ বুঁজে চিৎ হয়ে পড়ে স্বামীর আদর নিচ্ছিলো; আর অহন দ্যাহ কেমুন নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছে। 'মাইয়া মানুষটার খালি আছে খাওন, ঘুমান আর'... বাকী অনুপ্রাসটি কাশির জন্যে উচ্চারণ করতে পারে না নিশিকান্ত, তাতে তার রাগ আর একটু বাড়ে।
রাগ মনোতোষেরও বাড়ে। তার পা থেকে আগুনের একটি হলকা মাথার ভেতর গিয়ে ধাক্কা মারে। সেই আগুনের উত্তাপে মনোতোষের চোখ-মুখ ঝলসে যায়। জয়া গোঁজ হয়ে বসে আছে। টেবিলের ওপর খাতাটাকে আছড়ে ফেলে দিয়ে মুহূর্ত কয়েক কিছুই বলতে পারে না মনোতোষ, শুধু নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ শোনে।
_'তোমারে নিয়া আর পারা গেলো না।'
তার ক্রোধের তুলনায় বাক্যটি বড় বেমানান, কিন্তু মনোতোষের গলার আওয়াজে টের পাওয়া যায় কী অসীম চেষ্টায় সে নিজেকে সামলাচ্ছে। মনোতোষ দম নেয়। 'তোমার মনটা হইল এতটুক, বুঝলা?'
মনোতোষ জয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে ডান হাতের পাঁচটি আঙুলকে একত্রিত ক'রে মনের আয়তনটা দেখায়। জয়া চোখ তুলতে গিয়েও তোলে না। তুললে দেখতে পেতো রাগটা মনোতোষের হঠাৎ করে নয়। বহুদিন ধরে একটু একটু করে জমতে জমতে ক্রোধ যখন গরল হয়ে যায় কেবলমাত্র তখনই রাগের সময় মুখের চেহারা মানুষের এমন হয়ে থাকে।
_'বাবায় আইতে চায় না ক্যান জানো? শুধু তোমার কারণে। তুমি'...
জয়া ফোঁস করে উঠে : 'ক্যান, আমি তারে কী কইছি?'
'কইতে হয় নাকি, মানুষের ব্যবহারেই বোঝন যায়।'
_'তখন মনে আছিলো না? ভাল ব্যবহারের মানুষ আনলেই পারতা।'
_'তখন কি আর এত বুঝছি। তখন তো তুমি রং ঢং দিয়া ভুলাইয়াছিলা।'
বিষের জ্বালায় জয়া ছটফট করে : 'কী, আমি রং ঢং দিয়া ভুলাইয়াছিলাম তোমারে? তুমি এইকথা কইলা?'
রাগের মাথায় কথাটা বড়ো খারাপ বলে ফেলেছে মনোতোষ। কিন্তু তখন যা হবার হয়ে গেছে। জয়া দেওয়ালে মাথা ঠুকতে থাকে।
মনোতোষ উঠে গিয়ে জয়াকে ধরে : 'আহ্, কি পাগলামী কর।' গলার স্বরকে মনোতোষ প্রাণপণ বদলে ফেলতে চায়।
_'না', তুমি আমারে ধরবা না, ছার, তোমারে আমি চিনছি, আর মিঠা কথা কইতে ওইবো না।'
চোখে জল এসে যায়। গালের জ্বলুনি মগজ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু কোন কথা বলে না, দু'হাতে গাল ঢেকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মাথায় চুল ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে, আঁচল লুটোচ্ছে, একদিকের স্তনচক্রের আভাস বাসুদেবকে আরো ক্ষিপ্ত করে : 'আমি বুঝি না, না? রাইত দিন ঠাকুর পো ঠাকুর পো! ক্যান, অতো মাখামাখি ক্যান'...টলমল পায়ে বাসুদেব এগোয়, আত্মরক্ষার জন্যে সর্বানী সামনে ঝোঁকে। বাসুদেব প্রহার করে না, আঁচল ধরে টান দেয় : 'আঁ?' এই 'আঁ' ধ্বনি দিয়ে সে বাক্যটিকে সম্পূর্ণ করে। নিরুত্তর সর্বানী প্রতি মুহূর্তে চপেটাঘাতের আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে ওঠে। বাসুদেব ক্ষিপ্রহাতে সর্বানীর বস্ত্র হরণ করে।
মধ্যম পুত্রটির ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো, ঘুম চোখে হারিকেনের আলোয় বাসুদেবের কংসমূর্তি, চাপা গর্জন এবং উলঙ্গ মাতৃ-দর্শনে ছিটিয়ে পড়ে থাকে সে।
'তরে খুন কইরা ফালামু'_বাসুদেব ন্যাংটো সর্বানীকে হ্যাঁচকা টানে কাছে নিয়ে আসে। অতঃপর ঘাড়ে রদ্দা মারলে সর্বানী তার শরীরে বাসুদেবের প্রত্যাশিত ভঙ্গিটি এনে ফেলে। বাসুদেব মেঝের ওপর সর্বানীকে কুকুরের মতো রমণ করতে থাকে।
কালীনাথ আস্তে আস্তে তক্তপোষ থেকে নামে। পা টিপে টিপে দরজার কাছে যায়। নিশিকান্ত প্রবল বেগে শ্বাস টানছে। কালীনাথ নিঃশব্দে দরজার খিল খোলে। বাইরে এসে চারপাশে তাকায়, নিথর বাড়ীটায় শুধু নিশিকান্তর শ্বাস টানার শব্দ। কালীনাথ সুড়ঙ্গের মুখে এসে দাঁড়ায়। তার বিভ্রম আসে, মনে হয় আর একটু এগোলেই কঠিন কয়লার বিশাল চাঙটায় ঘা খেয়ে তার নাক মুখ থেঁতলে যাবে। কালীনাথ হাত বাড়ায়, তার হাত অন্ধকার শূন্যতায় কোথাও ঠাঁই পায় না। দু'পা এগিয়ে সে আবার থমকায়, মনে হয় এই অন্ধকারের ভেতর কালো লোমশ একটা জন্তু গুঁড়ি মেরে বসে বসে কপিস চোখে দেখছে তাকে। কালীনাথ হৃৎপিণ্ডের শব্দ শোনে। শব্দটি তার নিজের না জন্তুটির? কালীনাথের আবার বিভ্রম আসে। হঠাৎ তার পায়ের ওপর দিয়ে কিচকিচ ক'রে ছুঁচো দৌড়োয় সামনের দিকে। কালীনাথ চমকে লাফিয়ে ওঠে। আর সঙ্গে সঙ্গে নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দটিকে স্পষ্ট চিনতে পারে এবার।
এই শব্দ তার মস্তিষ্কে কী কাজ করে কে জানে, কালীনাথ অন্ধকারে ভেতর দু'হাত মেলে হাঁতড়ে হাঁতড়ে সদর দরজাটা খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে যেতে থাকে।
মনে হয় সুড়ঙ্গ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে, একবার মনে হয় ঐ তো সামনে খিল আঁটা বিশাল সদর দরজাটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটা মোহ্নমে আচ্ছন্ন করে ফেলতে থাকে তাকে। কালীনাথ দরজার কাছে যাবার জন্যে অস্থির হয়। আর তখন ছাদের কার্নিশে প্যাঁচাটা ডেকে ওঠে।
'রাইত দুপুরে আর ডং করণ লাগবো না বুরা বয়সে।' কালীনাথ একটি হাতের স্পর্শ পায় পিঠে : 'চল'। হাতটি তাকে ঘুরিয়ে দেয়। সদর দরজা এখন কালীনাথের পেছন দিকে।
অন্ধকারে অদৃশ্য গিরিবালা তাকে পেছন থেকে ঠেলে : 'মরতে চাইলে একাই মরণ লাগবো, বুছছো, অখন আর সহমরণ নাই।'
কালীনাথের পা শিথিল হয়ে আসে। প্যাঁচার ডাকটা তার মাথার ভেতরে ঢুকে গিয়ে বোঁ বোঁ করে ঘোরে।
গিরিবালাকে আর ধাক্কা দিতে হয় না, কালীনাথ নিজেই হাঁটতে থাকে মাথা ঝুঁকিয়ে। এতোক্ষণে কালীনাথ সঠিক কালীনাথে ফিরে আসে। কেননা এই ভঙ্গিটি তার একান্ত নিজস্ব।

0 comments:

Post a Comment