Last update
Loading...

দেবব্রত বিশ্বাস- নট আউট ১০১ by গোলাম মুরশিদ

দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মবার্ষিকীর ১০০ বছর পূর্তি হয়েছে গত বছরের ২২ আগস্ট। নানা আয়োজনে স্মরণ করা হচ্ছে রবীন্দ্রসংগীতের এই প্রবাদতুল্য শিল্পীকে। তিনি মারা যান ৩২ বছর আগে, কিন্তু শ্রোতাদের কাছে এখনো জ্যান্ত। এখনো রবীন্দ্রসংগীতের সবচেয়ে বেশি রেকর্ড বিক্রি হয় দেবব্রত বিশ্বাসেরই।


তাঁকে নিয়েই বিশেষ রচনা

প্রায় সব গায়কেরই মৃত্যু হয় তাঁদের জীবদ্দশাতে। কারণ, গায়কের জীবন কেবল তাঁর বেঁচে থাকার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে তাঁর কণ্ঠ এবং গায়কির ওপর। আর নির্ভর করে যুগের হুজুগ—জন-রুচির ওপর। বয়স বাড়লে বেশির ভাগ গায়কের গলা পড়ে যায়। অমন যে হেমন্ত, তাঁর গলাও মাধুর্য হারিয়েছিল। শেষ দিকে নেপথ্যে গাইবার জন্য তাঁকে ডাকা হতো না। তাই আক্ষেপ করে সলিল চৌধুরীকে বলেছিলেন, ‘বুড়ো কোনো সাধুসন্তের গানও কি মেলে না!’ গলা ছাড়া গাওয়ার ভঙ্গিটাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায়। তখন সে হারিয়ে ফেলে তার আগেকার আকর্ষণ। কজন গায়ক আছেন, যাঁরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাইবার স্টাইলেও পরিবর্তন আনতে পারেন? সুতরাং, শিল্পীর অকাল মৃত্যু প্রায় অবধারিত। আর, মৃত্যুর পরে গায়কেরা একেবারেই মরে যান। শ্রোতারা একেবারে নির্দয়—তাঁদের প্রিয় শিল্পীদের বেশি দিন মনে রাখেন না। তাই তাঁদের জন্মদিন, মৃত্যুদিন পালিত হয় না। শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান তো দূরের কথা।
এর একটা অতি-ব্যতিক্রম দেখলাম এবার দেবব্রত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে। মনে হলো, এখনো রীতিমতো জ্যান্ত তিনি। অথচ মরে গেছেন ৩২ বছর আগে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গ্রামোফোন কোম্পানির কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে লিখেছিলেন যে, রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড বিক্রি হয় দেবব্রত বিশ্বাসেরই সবচেয়ে বেশি। আমার কাছে অতিসাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও নেই। তবু যদ্দুর জানি, রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড বিক্রির দিক দিয়ে দেবব্রত বিশ্বাস এখনো সবার থেকে এগিয়ে।
তাঁর ১০০ বছর পূর্তি হলো গত বছরের ২২ আগস্ট। সেই উপলক্ষে বছর খানেক আগে থেকেই তাঁর ভক্তরা তাঁকে স্মরণ করতে আরম্ভ করেছিলেন নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এসবের মধ্যে কেবল দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়ে আলোচনা এবং নাচ-গানের আয়োজন করাই প্রধান বিষয় ছিল না। উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা দেবব্রত বিশ্বাস সম্পর্কে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করবেন, প্রকাশ করবেন একটি স্মরণগ্রন্থ, আর শিল্পীর গাওয়া যেসব গান হারিয়ে যেতে বসেছে, সেগুলোকে নতুন করে প্রকাশ করবেন। তথ্যচিত্রের জন্য ছবি, চলচ্চিত্র, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি জোটানো সহজ কাজ ছিল না। এমনকি স্মরণগ্রন্থের জন্য লেখা জোটানো শক্ত কাজ। শিল্পীর গাওয়া ছড়িয়ে থাকা গানগুলো সংগ্রহ করাও সহজ নয়। আপাতদৃষ্টিতে এই কঠিন কাজই সহজ করে তুলেছিলেন বরুণকান্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, নীলাদ্রি চাকী, তুষার তালুকদার প্রমুখ। বরুণকান্তি চট্টোপাধ্যায়ের ওপর দায়িত্ব ছিল আমার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার। তিনি গত ছয় মাস যেভাবে অসংখ্য ই-মেইল আর ফোন-কলের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করেন, তা থেকে অন্যরাও কী করেছিলেন, তা অনুমান করতে পারি। তাঁদের শ্রম বিফলে যায়নি।
দেখে অবাক হলাম, ২১ আগস্ট বাংলা আকাদেমি এবং ২২ আগস্ট অত বড় রবীন্দ্রসদনের অনুষ্ঠানে দর্শকের কোনো অভাব হয়নি। তাঁরা এসেছিলেন ৩২ বছর আগে যে মানুষটি মারা গেছেন, তাঁর প্রতি ভালোবাসার টানে। আসলে দেবব্রত বিশ্বাস কেবল গায়ক ছিলেন না; তিনি রাজনীতি করেছেন, গণসংগীত গেয়েছেন, গণসংগীতকে জনপ্রিয় করেছেন, অভিনয় করেছেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁকে ভালোবাসতেন সমাজের নানা তলার লোকেরা, বিশেষ করে সাধারণ লোকেরা। মৃত্যুর তিন দশক পরে আজও তাই তিনি বেঁচে আছেন তাঁর ভক্তদের হূদয়ে।
শতবর্ষ-পূর্তি উপলক্ষে উদ্যোক্তারা প্রকাশ করেছেন তাঁর জীবনী-সম্পর্কিত একটি তথ্যচিত্র—নাম উন্মুক্ত ব্রাত্যজন। এই নামকরণের একটা ইতিহাস আছে। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে দেবব্রত বিশ্বাস একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেছিলেন। তার নাম ছিল ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত। তাতে তাঁর জীবনের অনেক কথা ছিল বটে, কিন্তু বেশির ভাগটাই ছিল তাঁর গায়কি এবং তাই নিয়ে বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডের যে-বিরোধ হয়, তার বিস্মৃত বিবরণ। তাঁর গাওয়া কোনো কোনো গান মিউজিক বোর্ড আটকে দিয়েছিল তাঁর গাইবার ভঙ্গি আর গানের ফাঁকে ফাঁকে যে ইন্টারলিয়ুড মিউজিক থাকে, তার জন্য। রবীন্দ্রসংগীতের এই শ্রেষ্ঠ শিল্পী তার প্রতিবাদে রেকর্ড করা ছেড়ে দেন আর নিজেকে আখ্যায়িত করেন ব্রাত্যজন বলে। অভিমান করে মৃত্যুর আগে তিনি আট-নয় বছর রেকর্ডে কোনো রবীন্দ্রসংগীত করেননি। গান যাঁর ছিল পাখির মতন সহজাত, সেই গান-পাগল মানুষটাকে গাইতে না-দেওয়ায় কী যে মর্মান্তিক বেদনায় বিধ্বস্ত হয়েছিলেন, তার শোকগাথা এই আত্মজীবনী। তথ্যচিত্রের নামকরণে সেই আত্মজীবনীর নামেরই প্রতিধ্বনি—তবে রুদ্ধ নয়, উন্মুক্ত ব্রাত্যজন।
এই তথ্যচিত্রে আছে দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়সহ বহুজনের বক্তব্য এবং তাঁদের চলচ্চিত্র। এক ঘণ্টা ১০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে দেবব্রত বিশ্বাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। তাতে জীবনের নানা পরিবেশে তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর অভিনয়ের দৃশ্যও আছে। এ তথ্যচিত্র থেকে সবচেয়ে বেশি জানা যায় তাঁর সংগীতজীবন সম্পর্কে—কিছু বা অন্যদের কথা থেকে, কিন্তু বেশির ভাগটাই তাঁর নিজের কণ্ঠে। বহু বিরল খণ্ডচিত্র আছে এ তথ্যচিত্রে। ছবির মান বেশির ভাগ জায়গাতেই খুব উন্নত। তবে এক কথাতে তথ্যচিত্রটি ওভারলোডেড। অতিরিক্ত খণ্ড খণ্ড দৃশ্যের সমাবেশ। কোনো কোনোটা বলতে গেলে ক্ষণস্থায়ী। ফলে মূল বিষয়বস্তুটি প্রায়ই দানাবেঁধে ওঠে না। ধারাবাহিকতা-বর্জিত বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত বলে মনে হয়। কোনো কোনো জায়গায় ডাবল ভয়েস-ওভারও কথাগুলো শুনে বুঝতে পারার অন্তরায়। তা সত্ত্বেও, দেবব্রত বিশ্বাসের ভক্তদের কাছ এই তথ্যচিত্রটি অমূল্য সম্পদ বলে বিবেচিত হবে।
উদ্যোক্তারা আরও প্রকাশ করেছেন, দুটি সিডিতে দূর হতে এসো কাছে নামক তাঁর ২৯টি গানের লাইভ রেকর্ডিং। গানগুলোর মধ্যে বারোটি পূজা আর প্রেমের এবং বাকি ১৭টি গ্রীষ্ম ও বর্ষার গান। এই গানগুলো শোনানোর জন্য জাহানারা (ইমাম) আপাকে দেবব্রত বিশ্বাসের ছোট্ট ঘরটিতে নিয়ে গিয়েছিলাম ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে। সেদিন জর্জদা অসুস্থ ছিলেন। তাই নিজের মুখে না-গেয়ে এই গানগুলো তিনি বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন। ‘অসীম ধন তো আছে তোমার তাহে সাধ না মেটে’র পর যখন ‘এরে ভিখারি সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে’ গানটি শুরু হলো, তখন অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে শুরু করেছিল জাহানারা আপার চোখ থেকে। সিডিতে সেই গানগুলো শুনতে গিয়ে ১৯৭৩ সালের দৃশ্যটি আবার মনে পড়ল। গানগুলো দেবব্রত বিশ্বাসের ঘরে বসেই রেকর্ড করা—বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে কেবল হারমোনিয়াম। কিন্তু সেই হালকা যন্ত্রসংগীতের সঙ্গে চমৎকার রেকর্ডিং মিলে সিডি দুটো বারবার শোনার মতো।
এবার আসা যাক ২২ আগস্টের অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই দেবব্রত বিশ্বাস শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ—আমি ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন এবং তথ্যচিত্র এবং গানের সিডির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এর মধ্যে স্মারকগ্রন্থটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন ভারতের লোকসভার সাবেক স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। গ্রন্থটি নিয়ে তিনি মনোজ্ঞ আলোচনা করেন।
বইয়ের তো কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই! তবু সাড়ে চার শ পৃষ্ঠার মোটা বই প্রতিদিন প্রকাশিত হয় না। সেদিক দিয়ে বইটি বেশ মোটা এবং খানিকটা অসাধারণ। কিন্তু যা সত্যি অসাধারণ, তা হলো: এতে লিখেছেন ৮০ জনেরও বেশি লেখক। তাঁদের মধ্যে আছেন মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল গাঙ্গুলি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষকুমার ঘোষ, দেবেশ রায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, পবিত্র সরকার, বুদ্ধদেব গুহ, শাঁওলি মিত্র, অমিতাভ চৌধুরী প্রমুখ—যাঁরা সুপরিচিত। দেবব্রত বিশ্বাসের নিজের লেখা এবং সাক্ষাৎকারও আছে। তাঁরা কী লিখেছেন, তার থেকেও তাঁরা যে লিখেছেন, সেটাও কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, এতজন লেখককে একত্র করা এবং তাঁদের কাছ থেকে লেখা আদায় করা খুব সহজ কাজ নয়। তদুপরি, লেখাগুলো পড়তে গিয়ে বুঝতে পারলাম, দায়সারা লেখা নয়, অনেক লেখাই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ এবং ব্যক্তিগত ভালোবাসায় ভরা।
দেবব্রত বিশ্বাসের জীবন ও ব্যক্তিত্বের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখকেরা। বরিশালে তাঁর জন্ম থেকে আরম্ভ করে কিশোরগঞ্জে বাল্য ও কিশোরজীবন এবং কলকাতায় যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব কাটানোর কথা জানা যায় কোনো কোনো লেখা থেকে। জানা যায় তাঁর শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কে। ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলনে (আইপিটিএ) তাঁর যোগদান এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথাও জানা যায়।
এমনকি, নাটক ও চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় এবং চলচ্চিত্রে নেপথ্যে গাওয়ার কথা নিয়ে আলোচনা আছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে তাঁর সংগীতজীবন, গায়কি, রবীন্দ্রসংগীত বিস্তারে তাঁর অসামান্য অবদান এবং শিল্পীর স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই ও বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে তাঁর বিরোধের কথা।
গ্রন্থের প্রথম চারটি রচনা তাঁর নিজের লেখা এবং/অথবা তাঁর সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে লেখা। এই লেখাগুলোর মূল বক্তব্য হলো: রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর গান গাইবার ক্ষেত্রে শিল্পীকে স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলেছেন এবং স্বীকার করেছেন যে, গান এমন একটা শিল্প যাকে রূপ দিতে গেলে শিল্পীকে স্বাধীনতা দিতেই হবে। স্বরলিপি কেবল সুরের কাঠামো, সেই সুরকে জীবন দান করেন শিল্পী—তাঁর কণ্ঠের নানা কারুকার্য, আবৃত্তি ও এক্সপ্রেশন দিয়ে এবং গানের অর্থ ও ভাবটিকে প্রকাশ করে। নিজেকে প্রকাশ না-করে কোনো শিল্পীর পক্ষেই এটা করা সম্ভব নয়। তাই রবীন্দ্রনাথের গান শুনলে তার মধ্যে সেই গানের গায়ককেও কম-বেশি শোনা যাবে। তা ছাড়া, স্বরলিপির জাল ফেলে গানকে যতই শক্ত করে বেঁধে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গানের গায়কি ধীরে ধীরে বদলে যাবেই। এমনকি, বদলে যাবে যন্ত্রসংগীত এবং পরিবেশনপদ্ধতি। কিন্তু বিশ্বভারতীয় মিউজিক বোর্ড এই সত্যকে অস্বীকার করে গাইবার পদ্ধতি এবং ইন্টারলিয়ুড মিউজিক, এমনকি, কী কী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে—তার অযৌক্তিক ফতোয়া জারি করেছিল। দেবব্রত বিশ্বাস এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি দিয়েই তিনি নিজের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করেছিলেন। তাঁর এবং অন্য কারও কারও লেখা পড়লে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, রবীন্দ্ররক্ষীরা যে-অচলায়তন গড়ে তুলেছিলেন, তা দিয়ে তাঁরা গায়কদের অতটা বাঁধতে পারেননি, যতটা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে। অচলায়তনের আড়ালে রবীন্দ্রনাথের স্পিরিটই মরে গেছে।
গ্রন্থ এবং তথ্যচিত্র ও সিডির মোড়ক উন্মোচন শেষে শুরু হয় অনুষ্ঠানের অধিকতর আকর্ষণীয় দিক—নাচ আর গান। একেবারে শুরুতে ছিল মঞ্চে অনুপস্থিত দেবব্রত বিশ্বাসের তুলনাহীন কণ্ঠে গান— ‘আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো’ আর ‘নৃত্যের তালে তালে’। গেরুয়া রঙের লুঙ্গি আর ফতুয়া-পরা আকর্ষণীয় ব্যক্তিকে দেখা গেল না। কিন্তু মনে হলো তিনি আছেন। অনেকের কণ্ঠে শুনেছি ‘আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো’ গানটি, কিন্তু এমন করে কাউকে এই গানে ‘নমো হে নমো’ কথাটি বলতে শুনিনি। অন্যরা গেয়েছেন স্বরলিপি অনুসরণ করে, কিন্তু দেবব্রত বিশ্বাস আসন-তলে প্রণত হয়ে যেন নিজেকে বিলীন করে করুণ মিনতি জানাচ্ছিলেন তিনটি শব্দ দিয়ে—‘নমো, নমো, নমো’।
তাঁর গানের পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয় চারটি নাচের মাধ্যমে। এগুলো পরিবেশন করে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী চাকীর প্রতিষ্ঠিত ডান্সার্স গিল্ড। তারা যে-গানগুলোর সঙ্গে নাচ পরিবেশন করে, সেগুলো হলো ‘আকাশ ভরা সূর্যতারা’, ‘প্রথম আদি তব’, ‘বিশ্ববীণা রবে বিশ্বজন মোহিছে’ এবং ‘এত দিন যে বসেছিলেম’। প্রথম তিনটি নাচের কোরিওগ্রাফ ও সামগ্রিক পরিকল্পনা করেন স্বয়ং মঞ্জুশ্রী; আর ‘এত দিন যে বসেছিলেম’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিকল্পনা ও কোরিওগ্রাফ রচনা করেন ঐশিকা চক্রবর্তী। কত্থক, ভরতনাট্যম অথবা মণিপুরি—কোনো ধরনের নাচের সঙ্গে ডান্সার্স গিল্ডের নাচের মিল নেই। এমনকি, রবীন্দ্রনাথ নিজে যে নাচের স্টাইল প্রবর্তন করেছিলেন, তার সঙ্গেও নয়।
রবীন্দ্রসংগীত যেমন কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়, ডান্সার্স গিল্ডের নাচও তেমনি রবীন্দ্রসংগীত আর নাচের মুদ্রার সমন্বয়। দেহের ভঙ্গিমা দিয়ে গানের কথাটাকে মূর্ত করে তোলাই এ নাচের বৈশিষ্ট্য। মনে পড়ছে, ঐশিকা চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘এত দিন যে বসেছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুনে’ গানটার যেখানটায় আছে ‘অবাক আমি তরুণ গলার গান শুনে’ সেখানকার কম্পোজিশনে ‘অবাক’ হওয়াটা যেন সমস্ত মঞ্চজুড়ে মূর্তিমান হয়ে উঠেছিল। এমনটা এর আগে আর কখনো দেখিনি। ডান্সার্স গিল্ডকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
নাচের পরে ছিল গান। অনেকের গান।
পিন-পতন নীরবতার মধ্যে শ্রোতাদর্শকেরা সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপভোগ করে। সেটা অমন বিস্ময়ের কারণ নয়। কিন্তু একান্ত বিস্মিত হলাম, দেবব্রত বিশ্বাসের প্রতি শ্রোতাদর্শক, সংগঠক, লেখক এবং শিল্পীদের আন্তরিক ভালোবাসা দেখে। মৃত্যুর ৩২ বছর পরেও তাঁর প্রতি ভালোবাসা অক্ষুণ্ন আছে। এই দেবব্রত বিশ্বাসই ১৯৭৩ সালে আমাকে বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর আনন্দবাজার-এর শেষ পাতায় হয়তো দু-তিন লাইনের একটি খবর ছাপা হবে ‘দেবব্রত বিশ্বাস আর নেই।’ কিন্তু হাজার হাজার লোককে কাঁদিয়ে চলে যাওয়ার পরের দিন—১৯ আগস্ট ১৯৮০ সালে আনন্দবাজার-এ তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আবেগাপ্লুত ভাষায় সম্পাদকীয় লিখেছিলেন সন্তোষ ঘোষ। এখনো আনন্দবাজার কেন, প্রতিটি পত্রিকার কাছে নমস্য দেবব্রত বিশ্বাস। কোনো একটি গোষ্ঠী নয়, সমাজের সর্বস্তরেই আজও তাঁকে স্মরণ করে অসংখ্য মানুষ।
অহংকারহীন চিরকুমার দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী একজন মানুষ। দেখলে মনে হতো না, এত বড় একজন শিল্পীর সঙ্গে কথা বলছি। সবার সঙ্গে অমায়িক। থাকতেন রাসবিহার অ্যাভেনিউর ছোট্ট একটি বাড়িতে। নিজের ছোট্ট ঘরটিতে হারমোনিয়াম আর পান খাওয়ার উপকরণই থাকত না, থাকত তাঁর যথাসর্বস্ব। ভক্তদের চিঠিপত্রের গাদা গাদা ফাইল, কাপড়চোপড়, ধুলো-ঢাকা বইপত্তর; হাঁপানির স্প্রে, একটা ইজি চেয়ার ইত্যাদি রাজ্যের জিনিসপত্র— বোধ হয় পঞ্চাশ বছর আগে কিশোরগঞ্জ থেকে আনা জিনিসও খুঁজলে পাওয়া যেত। পঞ্চাশের দশকে চীন থেকে নিয়ে আসা বাদ্যযন্ত্র তো ছিলই।
তিনি ছিলেন গণমুখী মানুষ। বামপন্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। অভিজাতদের ঘরে-বন্দী রবীন্দ্রসংগীতকে তিনি টেনে নিচে নামিয়ে এনেছিলেন সাধারণ মানুষের স্তরে। আজ যে রবীন্দ্রসংগীত বাঙালিদের ঘরে ঘরে গাওয়া হয়, বৃদ্ধরা যার মধ্যে তত্ত্ব খোঁজেন, তরুণ-তরুণীরা যা দিয়ে প্রেম নিবেদন করেন, কিশোর-কিশোরীরা যা দিয়ে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে—সেসব গান পঙ্কজ মল্লিক, কানন দেবী, সায়গল, হেমন্ত, দেবব্রত বিশ্বাসের আগে ছিল শহরের শিক্ষিত ব্রাহ্মদের বৈঠকখানার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কে গাইত আকাশ-ভরা সূর্যতারা, তুমি রবে নীরবে, গায়ে আমার পুলক লাগে, যেতে যেতে একলা পথে, কেন চেয়ে আছ গো মা-এর মতো গান? মৃত পুস্তকের ধূলিধূসর পাতা থেকে দেবব্রত তাদের উদ্ধার করেছিলেন, কেবল তা-ই নয়, তাদের জনপ্রিয় করেছিলেন। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন এসব গানকে। মিহিকণ্ঠে কৃত্রিম উচ্চারণে ভদ্রলোকের বৈঠকখানায় যেসব গান গাওয়া হতো, তাদের অনেকগুলোকে তিনি গণসংগীতে পরিণত করেছিলেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস ভারতীয় গণনাট্যসংঘতে তাঁর এ রকম গান শুনে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, এসব গানকে যে এভাবে পরিবেশন করা যায়, তিনি ভাবতেই পারেননি। বস্তুত, দেবব্রত বিশ্বাস নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে, পরিবেশন-ভঙ্গিতে অভিনবত্ব এনে রবীন্দ্রনাথের বহু গানকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসংগীত যত দিন বেঁচে থাকবে, তিনিও তত দিন বেঁচে থাকবেন।
ghulammurshid@aol.com

0 comments:

Post a Comment