Last update
Loading...

বঙ্গবন্ধুর মহাপ্রয়াণ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা by সুভাষ সিংহ রায়

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ হয় ৭ আগস্ট, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ২৯ আগস্ট। বাঙালি জাতিসত্তার এই দুই মহান পুরুষের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নানা দিক দিয়ে মিল আছে। তিনজনেরই মহাপ্রয়াণ আগস্ট মাসে। বঙ্গবন্ধুর সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এখনো বেঁচে আছেন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো।


মাঝেমধ্যে আমাদের মনের ভেতরে এই ভাবনা কাজ করতেই পারে যে বঙ্গবন্ধু তো আজও বেঁচে থাকতে পারতেন। কবিগুরু লিখেছেন, 'নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। হৃদয় তোমায় পায় জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে'। এই তিন মহান ব্যক্তি আমাদের সত্যি সত্যি হৃদয়ে রয়েছেন গোপনে। বঙ্গবন্ধুকে দেশি-বিদেশি ঘাতক চক্র বাঁচতে দেয়নি। কবিগুরুর ভাষায় বলা যায়, 'নয়ন সমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়াছো যে ঠাঁই।' যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন শেখ মুজিব অমর, অব্যয়, অক্ষয় হয়ে থাকবেন। কিন্তু আর যদি বঙ্গবন্ধু ২০টা বছরও বাঁচতে পারতেন, তাহলে বাংলাদেশ আজ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকত।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের বিখ্যাত পত্রিকা 'ধূমকেতু'র কথা আমরা জেনে থাকব। ধূমকেতু প্রকাশ করে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কবি লিখেছিলেন : "মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে 'জয় প্রলঙ্কর' বলে 'ধূমকেতুকে' রথ করে আমার আজ নতুনপথে যাত্রা শুরু হল। আমার কর্ণধার আমি। আমার পথ দেখাবে আমার সত্য। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি-নমস্কার করছি আমার সত্যকে।" আমরা সত্যকে মিথ্যার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ২১ বছর লেগেছে সত্য প্রকাশের পরিবেশ তৈরি করতে। শেখ হাসিনার দেশে আসায় কত রকম বাধার সৃষ্টি করা হয়েছিল। এমনকি জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি করা হয়েছিল 'শেখ হাসিনার আগমন প্রতিরোধ কমিটি'। যেকোনো পাঠক ১৯৮১ সালের মে মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের দৈনিক পত্রিকার পাতা উল্টালেই এ কথার সত্যতা পাবেন। এমনকি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সড়কের বাড়িটি নিয়ে কত রকম মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে ৩২ নম্বরের বাড়িতে মিলাদ পর্যন্ত পড়তে দেওয়া হয়নি। যাঁরা দেননি, তাঁরাই এখন কত রকম বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের কথা বলে যাচ্ছেন। তাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ দেশে গবেষণার সবিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। পৃথিবীর একমাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যার নাম-নিশানা মুছে ফেলার জন্য সব রকম অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। বিবিসি টেলিভিশিনের দূরপ্রাচ্য সংবাদদাতা ব্রায়ান ব্যারনকে ১৯৭৫ সালের আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে কয়েক দিন তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর সংবাদ বিবরণীতে উল্লেখ করেছিলেন, 'শেখ মুজিব সরকারিভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ও জনসাধারণের হদয়ে উচ্চতম আসনে প্রতিষ্ঠিত-পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হবেন। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। এটা যখন ঘটবে, তখন নিঃসন্দেহে তাঁর বুলেট-বিক্ষত বাসগৃহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারকচিহ্ন এবং তাঁর কবরস্থান পুণ্যতীর্থে পরিণত হবে।' (দি লিসনার, লন্ডন, ২৮ আগস্ট, ১৯৭৫)।
কবি আল মাহমুদ যেমন করে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করেছেন সেটা খুবই যথার্থ। তাঁর 'নিশিডাক কবিতা'র অংশবিশেষ এখানে উৎকলন করা যেতে পারে- "সে যখন বলল, 'ভাইসব'। অমনি অরণ্যের এলোমেলো গাছেরাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল।" অথচ এই মাটিতে অর্বাচীনরা শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ডাক নিয়ে বির্তক করেই যাচ্ছে। কেননা টিক্কা খানের সঙ্গে বসে থেকে (১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ব্রিগেডিয়ার সালিকও শুনতে পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। শুনতে পায়নি এ দেশের কিছু জ্ঞানপাপী। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী যাঁরা এরই মধ্যে পাঠ করেছেন, তাঁরা শেখ মুজিবকে নতুনভাবে চিনতে পেরেছেন। এই মানুষটি দেখিয়ে গেছেন রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ সাধন তাদেরই করতে হয়।
বঙ্গবন্ধু শুধু এই জাতিকে দিয়েই গেছেন। যেমনভাবে দিয়ে গেছেন ভারতের মহাত্মা গান্ধী। জীবনে এক মুহূর্তের জন্য কারো সঙ্গেই আপস করেননি। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যথার্থই লিখেছেন, 'শেখ মুজিব একটি মহাকাব্যের নায়ক ছিলেন। এই মহাকাব্য জাতীয়তাবাদের। আরো নির্দিষ্টার্থে এ হচ্ছে পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অভ্যুত্থান ও পরিণতিতে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার।' এমনকি পঞ্চাশ দশকেই বাঙালির ভবিষ্যৎ পথরেখার কথা বলেছেন অবলীলাক্রমে। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট গণপরিষদে দেওয়া তাঁর ভাষণেও তা লক্ষ করি। তিনি বলেছিলেন, Sir you will see that they want to place the word 'East pakistan' instead of East Bengal'. ...The word 'Bengal' has a history, has a tradition of its own.
স্বাধীনতার এত বছর পরও বিদ্যুতের কারণে আমাদের সব উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হয় না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বিদ্যুৎ নিয়ে ভেবেছেন ষাটের দশকে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন এভাবে- 'সর্বাধিক পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনের প্রত্যেকটি উৎসের সদ্ব্যবহার করা হবে। পূর্ব পাকিস্তানকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ন্যূনপক্ষে ২৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।... রূপপুর আণবিক শক্তি প্রকল্প ও জামালগঞ্জ কয়লাখনি প্রকল্প অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা হবে।' বঙ্গবন্ধু চার দশকের বেশি সময় আগে জাতির জন্য যে করণীয় ঠিক করেছিলেন আজকের দিনে তা অনেকে ভাবতে পারেন না। এ জন্যই তো তিনি জাতির পিতা। ১৯৭১ সালে 'বঙ্গবন্ধু ও রক্তাক্ত বাংলা' শীর্ষক এক নিবন্ধে পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা লেখক নিরঞ্জন মজুমদার লিখেছেন, 'দেশে দেশে নেতা অনেকেই জন্মান। কেউ ইতিহাসের একটি পঙ্ক্তি, কেউ একটি পাতা, কেউ বা একটি অধ্যায়। কেউ আবার সমগ্র ইতিহাস। শেখ মুজিব এই সমগ্র ইতিহাস।' বাংলাদেশে বহু মত থাকবে, বহু নেতা থাকবেন- এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বির্তক থাকবে- এটা কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ আশা করেন না। একমাত্র অর্বাচীনরাই শেখ মুজিবকে অস্বীকার করতে পারে। আজ থেকে ৬০ বছর আগে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধের কিছুটা অংশ উপস্থাপন করা হয়তো প্রাসঙ্গিক হবে। "বাঙ্গালিকে, বাঙ্গালির ছেলেমেয়েকে ছোটবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও : এই পবিত্র বাংলাদেশ বাঙ্গালির-আমাদের।/দিয়া 'প্রহারেণ ধনঞ্জয়' তাড়াবো আমরা, করি না ভয় যত পরদেশী দস্যু ডাকাত 'রামা'দের 'গামা'দের।/বাঙ্গলা বাঙ্গালির হোক! বাংলার জয় হোক! বাঙ্গালির জয় হোক।" আমরা যত বেশি বঙ্গবন্ধু পাঠ করব, তত বেশি দেশপ্রেমিকতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে থাকব। শেখ মুজিবের জীবন-সংগ্রামের প্রতি মুহূর্তে বিদ্রোহী কবির এই প্রত্যয় প্রতিক্ষণে প্রাণিত করেছে। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অমর, অব্যয়, অক্ষয়। আবার বলা যায়, 'নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছো নয়নে নয়নে। হৃদয় তোমায় পায় জানিতে, হৃদয়ে রয়েছো গোপনে। '
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
suvassingho@gmail.com

0 comments:

Post a Comment