Last update
Loading...
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি।
জেনেভা থেকে গতকাল শুক্রবার দেয়া এক বিবৃতি তিনি বলেন, এ ঘটনা একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারি বাহিনী যাতে সব পরিস্থিতিতে সংযত এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, মিয়ানমার সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইয়াংহি লি বলেন, ‘গত অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যের মংডু ও রুথিডংয়ে সীমান্তরক্ষীদের তিনটি চৌকিতে হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়টি স্মরণ করে আমি বিশেষভাবে শঙ্কিত।’
মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার বলেন, রাখাইন রাজ্যের ঘটনা তদন্তে গঠিত মিয়ানমার সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিশন নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানা অপরাধের অভিযোগ সঠিকভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে স্বীকার করেছে। কমিশন এগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দেখার পরামর্শ দিয়েছে।
তিনি বলেন, রাখাইনের সংখ্যালঘু স্থানীয় জনগোষ্ঠির কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত ৩ আগস্ট ছয়জন ম্রো গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়েছে।
ইয়াংহি লি বলেন, রাজ্যের নিরাপত্তা বিধান করা এবং চরমপন্থীদের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। কিন্তু এ দায়িত্ব সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পক্ষপাত করতে পারে না। নিরাপত্তা বাহিনীর যেকোনো পদক্ষেপ বা অভিযান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা ও মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে।
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও সংক্ষিপ্ত বিচারে মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ারও ইয়াংহি লি’র মতামতকে সমর্থন দিয়েছেন।
এদিকে রয়েটার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে অবস্থান করা ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে ফেরত পাঠানোর একটি পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে আলোচনা করছে ভারত।
এতে বলা হয়, উদ্বাস্তু বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) নিবন্ধন নিয়ে ১৪ হাজার রোহিঙ্গা ভারতে বসবাস করছে। বাকী রোহিঙ্গাদের অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাতে চাইছে ভারত। ভারত উদ্বাস্তু বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ সনদ সই করেনি এবং দেশটির জাতীয় কোনো আইন দ্বারা উদ্বাস্তুরা সুরক্ষিত নয়।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কে এস ধাতওয়ালি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে এ ব্যাপারে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। যথাসময়ে তা আরো পরিষ্কার হবে।’
ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরন রাজ্জু গত বুধবার পার্লামেন্টে বলেছেন, জেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠন করে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশীদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করার জন্য রাজ্য সরকারগুলোকে নিদের্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
১৯৯০ সালের গোড়া থেকে মিয়ানমার সরকারের দমন-পীড়ন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে ভারতেও গিয়েছে। রোহিঙ্গারা মূলত ভারতের জম্মু, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, দিল্লি, হায়দ্রাবাদ ও রাজস্থানে বসবাস করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা নতুন নয়। সেই ১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধের সময় থেকেই দুই দেশের শত্রুতা চরমে। সম্পর্কটা যেন সাপে-নেউলে। তিন বছর ধরে চলা সে যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় মার্কিন সেনাবাহিনী। চালায় ধ্বংসযজ্ঞ। বিধ্বস্ত হয় পুরো দেশ। উল্টেপাল্টে যায় কোরীয়দের জীবনযাত্রা। প্রাণ যায় কয়েক লাখ মানুষের। এরপর থেকে সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি।
উত্তর কোরিয়া একের পর এক পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের রক্তচক্ষুর পরোয়া করেনি। নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ কোনো কিছু দিয়েই নিবৃত্ত করা যায়নি দেশটিকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি উত্তর কোরিয়ার তীব্র ঘৃণার শুরুটা সেই ১৯৫০ সালেই।
যুদ্ধের সময়ের সেই ভয়াবহতা স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার জেনারেল কার্টিস লিমে। ১৯৮৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা কোরিয়া যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। উত্তর কোরিয়ার বেশির ভাগ এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছি।’
১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়ার জনসংখ্যা ছিল ৯৬ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী বলছে, যুদ্ধে দেশটির ১৩ লাখ বেসামরিক নাগরিক এবং সেনাসদস্য আহত হন। আর দক্ষিণ কোরিয়ার ৩০ লাখ বেসামরিক নাগরিক ও আড়াই লাখ সেনাসদস্য আহত হন। সে সময় দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা ছিল দুই কোটির বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ১৯৫১ সালে যুদ্ধবিষয়ক শুনানিতে বলেন, এমন ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। তিনি বলেন, ‘আমি ওই পরিস্থিতি ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না। আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। মনে হয়, আমি সবচেয়ে বেশি মানুষের রক্ত এবং দুর্দশা দেখেছি।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর পর শুরু হওয়া কোরিয়ার ওই যুদ্ধে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সেনাবাহিনীর অনেকেই অনিচ্ছুক ছিলেন। কোরীয় যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে থাকা মার্কিন সেনাবাহিনীর ৩৩ হাজারের বেশি সদস্য নিহত হন। আর উত্তর কোরিয়ার পাশে থাকা চীনা সেনাবাহিনীর ছয় লাখ সদস্য নিহত বা নিখোঁজ হন।
১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়। যুদ্ধ ও সহিংসতার পর চীনা এবং মার্কিন সেনারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যান। তবে উত্তর কোরিয়া থেকে যায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে। শুরু করে বাঁচার লড়াই। যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশটির বড় বড় এলাকা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের কথা প্রচার করে চলেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সাং, তাঁর ছেলে কিম জং ইল এবং নাতি কিম জং উন। বর্তমানে উত্তর কোরিয়া ক্ষমতাসীন কিম জং উন। ফলে মার্কিন মানেই উত্তর কোরিয়ার কাছে শত্রু—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্বরতার প্রচার উত্তর কোরীয় নেতাদের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক চার্লস আর্মস্ট্রং বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান থেকে ৬ লাখ ৩৫ হাজার টন বিস্ফোরক উত্তর কোরিয়ায় ফেলা হয়। আরও ফেলা হয় ৩২ হাজার টন নাপাম। আগুনে বোমায় ব্যবহৃত জমাট বাঁধা থকথকে একধরনের পেট্রল হলো নাপাম।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুশান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক রবার্ট আ কেলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নৃশংস বোমা হামলার কথা উত্তর কোরিয়ায় বারবার প্রচার করা হয়েছে। এই প্রচারকে উত্তর কোরীয় নেতারা কীভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছেন, তাঁর বর্ণনা মেলে রবার্ট আ কেলির কথায়। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ঐতিহাসিক বলে থাকেন কিম ইল সাং দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালানোর পরই যুদ্ধ শুরু হয়। তবে কিম ইল সাং থেকে শুরু করে কিম জং উন সব সময় বলে এসেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করেছে। প্রচারের ধরনটা এমন ছিল যে কেবল কিমের পরিবারই উত্তর কোরীয়দের রক্ষাকবচ।
উত্তর কোরীয়দের মধ্যে মার্কিন বিদ্বেষ শুরু হয় ছোটবেলা থেকেই। কিন্ডারগার্টেনের শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বর্বরতার গল্প শোনে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখে তাঁদের নৃশংসতা। উত্তর কোরিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বার্তা দেওয়া হয় নাটক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে। সিনচন মিউজিয়ামে যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও নৃশংসতার বিভিন্ন নিদর্শন দেখেছে।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিশুরাও যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা ঘৃণা করে, তার প্রমাণ মেলে তাদের আঁকা ছবিতে। পিয়ংইয়ংয়ের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে এক শিশুকে দেখা গেছে মার্কিন ট্যাংক ও যুদ্ধাস্ত্র আঁকতে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র মানেই তাদের কাছে হামলাকারী।
এটা ঠিক যে ১৯৫০ সালের পর থেকে উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। তবে বারবার হামলার হুমকি দিয়েছে। পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে।
তিন বছরের যুদ্ধের পর ১৯৫৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তবে সেটি শান্তিচুক্তি ছিল না। অর্থাৎ উত্তর কোরিয়া কৌশলগতভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এখনো যুদ্ধে জড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেই উত্তর কোরীয়রা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকে। দেশটি বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাবরই বড় ধরনের বরাদ্দ রাখে। ২০০৬ সালে দেশটি প্রথম সফল পরমাণু পরীক্ষা চালায়। তবে এরও আগে ১৯৬৫ সাল থেকেই উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি শুরু হয়। পিয়ংইয়ংয়ের সন্দেহ, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালানো। এই ভয় আর আশঙ্কা থেকেই একের পর এক পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ থেকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান অর্জনসহ বেশ কিছু সুফলও পাচ্ছে দেশটি।
সিএনএন, আল জাজিরা ও নিউজউইক অবলম্বনে শুভা জিনিয়া চৌধুরী
সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সেই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করছেন ইয়েলৎসিন এবং বেলারুশের স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তিনটি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র- রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশের নেতারা সেবছর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করলেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার দুই প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে জানিয়েছেন চুক্তির সময়কার কথা।
১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে যাওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে কমিউনিজমেরও পতন ঘটেছে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনো টিকে আছে। কমিউনিষ্ট পার্টি তখনও ক্ষমতায়, আর পার্টির নেতা তখন মিখাইল গর্বাচভ।
গর্বাচভ তখন এক কঠিন সময় পার করছেন। ১৯৯১ সালের আগস্টে তার বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছে কট্টরপন্থী কমিউনিষ্টরা। তারা গর্বাচভের সংস্কার কর্মসূচি পেরেস্ত্রোইকার বিরোধী ছিল। কিন্তু সেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে গেলেন গর্বাচভ।
কিন্তু এবার দেখা দিল নতুন সমস্যা। ১৫টি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অনেকগুলোতেই স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠলো। ইউক্রেন সহ অনেক ছোট ছোট প্রজাতন্ত্রে স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটও হয়ে গেল।
ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কিভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া যায় তার পথ খুঁজছেন। "একটি স্বাধীন ইউক্রেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। পুরোনো রাষ্ট্রের ধ্বংসাবশেষের নিচে থেকে লাখ লাখ মানুষকে কিভাবে বাঁচানো যায় সেটাই তখন আমার চিন্তা।"
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে বেলারুশে বৈঠকে বসলেন তিনটি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের নেতারা। বৈঠকটি ডেকেছিলেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ। ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক এবং রাশিয়ার নেতা বরিস ইয়েলৎসিন যোগ দিলেন তার সাথে।
ইউক্রেন ততদিনে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছে। কিন্তু বেলারুশ তখনো সেরকম ঘোষণা দেয়নি। শুশকেভিচ দাবি করছেন, তখনো এ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছাননি।
"বেলারুশে শীতকালে তেল এবং গ্যাসের সরবরাহ কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা করাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। আমাদের অর্থনীতি তখন সঙ্কট। আমরা তখন এসব জ্বালানির মূল্য পরিশোধের ক্ষমতা নেই। আমাদের কেউ অর্থ ধার দিতে চাইছে না। সেজন্যে আমরা রাশিয়াকে অনুরোধ করতে যাচ্ছিলাম আমাদের সাহায্য করার জন্য, যাতে আমাদের শীতে জমে যেতে না হয়।"
তবে এই বৈঠক সম্পর্কে লিওনিদ ক্রাভচুকের ভাষ্য অন্যরকম। তার মতে, সেখানে একমাত্র আলোচ্য বিষয় ছিল কিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত করা হবে।
"শুশকেভিচ যখন তেল এবং গ্যাসের কথা বলছিলেন, তখন আমার মাথায় আসছিল না, তিনি কি বলছেন। আমি ভেবেছিলাম, আমরা সেখানে গিয়েছি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলার জন্য। দেশ তখন পরস্পরবিরোধী টানাপোড়েনে ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। সঙ্কটের কারণে মানুষ তখন অতিষ্ঠ। আমরা বেলারুশে গিয়ে বৈঠকে বসেছি দেশ কোনদিকে যাচ্ছে তা নিয়ে আলোচনার জন্য।"
আলোচনার পূর্ব নির্ধারিত বিষয় যাই থাক, তিন নেতাই ভালো করে জানতেন, গর্বাচভকে না জানিয়ে এরকম একটা বৈঠকে বসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
"গর্বাচভের নির্দেশে সোভিয়েত গুপ্ত সংস্থা কেজিবির এজেন্টরা আমাদের গ্রেফতার করতে পারতো। কারণ সোভিয়েত কেজিবি তখনো গর্বাচভের অধীনে। কিন্তু আমাদের বেলারুশের গুপ্তচর সংস্থার প্রধান যোগাযোগ রাখছিলেন বরিস ইয়েলৎসিনের গুপ্তচর সংস্থার সাথে। বৈঠকের ১৫ দিন আগে থেকে প্রতিদিন তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে গেছেন যে আমাদের গ্রেফতার হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, বেলারুশের গুপ্তচর সংস্থার প্রধান পরে যখন অবসর নিয়ে রাশিয়ায় গিয়ে বসবাস শুর করলেন, তখন তিনি অনুতাপ করেছেন, কেন আমাদেরকে ১৯৯১ সালে তিনি গ্রেফতার করেননি।"
১৯৯১ সালের ৭ ডিসেম্বর রাশিয়ার নেতা বরিস ইয়েলৎসিন, ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক এবং বেলারুশের নেতা স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ পূর্ব বেলারুশের এক বিরাট খামারবাড়ীতে গিলে মিলিত হলেন।
"বাড়িটা ছিল খুবই বিলাসবহুল। সোভিয়েত শীর্ষ নেতাদের জন্য এ বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। এ ধরণের বৈঠকের যেটা রীতি, একটি স্টীম বাথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সাধারণত এই স্টীম বাথের পর, প্রচুর মদ পানের আয়োজন রাখা হয়। তবে এবারের বৈঠকে দেখা গেল, মদ পানের পরিবর্তে আমাদের জন্য মাসাজ বা শরীর মালিশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সোভিয়েত রীতি অনুযায়ী এই বৈঠকে প্রচুর খানাপিনা এবং আরাম আয়েশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।"
পরদিন ৮ ডিসেম্বর তিন নেতা তাদের প্রধানমন্ত্রীদের সাথে নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসলেন। স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ জানালেন, বৈঠক শুরুর অল্প পরেই তারা সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির লক্ষ্যে চুক্তির প্রথম লাইনটির ব্যাপারে একমত হলেন :
"আমি আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই লাইনটি মনে রাখবো। এটি ছিল আমাদের চুক্তির শুরুর লাইন। কোনো রকম তর্কবিতর্ক ছাড়াই আমরা এ লাইনটির ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন। লাইনটি ছিল এরকম : ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিষয় হিসেবে ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিকস বা ইউএসএসআর এর কোনো অস্তিত্ব আর নেই। এই লাইনটি শুনে আমিই প্রথম বলেছিলাম, এতে আমি সই করবো।"
এই চুক্তির মধ্য দিয়ে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচভ কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলসিনের হাতে আরো বেশি ক্ষমতা দেয়া হলো। পুরো পরিকল্পনাটির পেছনে ছিলেন ইয়েলৎসিন। যদিও এর মধ্য দিয়ে কার্যত কয়েক শতাব্দীর রুশ সাম্রাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান ঘটলো। এটি ছিল এক বিরাট পদক্ষেপ। পরবর্তীকালে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল, এই তিন নেতা যখন এই চুক্তি করেন, তখন তারা সেটি সুস্থ মাথায় করেছিলেন কিনা। বলছিলেন লিওনিদ ক্রাভচুক।
"এরকম একটা কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে যে আমরা মদ্যপ অবস্থায় এই চুক্তির খসড়া তৈরি করেছিলাম। এটা পুরোপুরি ভুল। এটা ঠিক যে সোভিয়েত রীতিতেই ঐ বৈঠকটির আয়োজন করা হয়েছিল। ওই বাড়ির সর্বত্র প্রচুর মদ পানের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু কেউ তা স্পর্শ করেনি। আমরা এক একটা অনুচ্ছেদের ব্যাপারে একমত হওয়ার পর বড়জোর এক দুই ফোঁটা ব্রান্ডি পান করতাম।"
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় তারা চুক্তির মোট ১৪টি অনুচ্ছেদের ব্যাপারে একমত হলেন। রাত ৩টা নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণা করে তৈরি চুক্তির খসড়া তৈরি হয়ে গেল। এখন পুরো বিশ্বের সামনে ব্যাপারটা ঘোষণা করার পালা। বলছিলেন স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ।
"ইয়েলৎসিন এবং ক্রাভচুক মজা করে আমাকে বললেন, আমরা দু'জন মিলে আপনাকে মনোনীত করেছি গর্বাচভকে বিষয়টি জানানোর জন্য। তখন আমি হেসে বললাম, ইয়েলৎসিন, আমি আর ক্রাভচুক মিলে আপনাকে মনোনীত করছি আপনার প্রিয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে ফোন করার জন্য। আমি মস্কোতে মিখাইল গর্বাচভের অফিসে ফোন করলাম। কিন্তু তারা আমাকে গর্বাচভের সাথে সরাসরি কথা বলতে দিচ্ছিল না। তারা আমার কলটিকে একজনের পর আরেকজনের কাছে দিচ্ছিল। আর আমাকে বারবার ব্যাখ্যা করতে হচ্ছিল, আমি কে, কোত্থেকে ফোন করেছি! আর ইয়েলৎসিন এই ফাঁকে ডায়াল করলেন প্রেসিডেন্ট বুশকে। আর তার পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী আঁন্দ্রে কোজিরেভ আরেকটি ফোন লাইনে প্রেসিডেন্ট বুশের কথা অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক দুজনের কথা শুনছিলেন।"
এর মধ্যে বেলারুশের নেতা শুশকেভিচ টেলিফোনে গর্বাচভের সাথে কথা বলার সুযোগ পেলেন। এবারও তাদের দু'জনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন ইউক্রেনের নেতা ক্রাভচুক;
"দুজনের মধ্যে কঠিন কথাবার্তা হচ্ছিল। গর্বাচভ খুবই রেগে গিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, আপনারা কি করেছেন! পুরো দুনিয়া উলট-পালট করে দিয়েছেন। সবাই তো আতঙ্কের মধ্যে আছে। তবে এই কথাবার্তার সময় শুশকেভিচ ছিলেন শান্ত, ধীর-স্থির।"
সেই টেলিফোন আলাপের কথা এখনো মনে করতে পারেন শুকেভিচ:
"আমি গর্বাচভকে বুঝিয়ে বললাম, কি ধরণের চুক্তিতে আমরা সই করতে চলেছি। গর্বাচভ তখন একটা ভাব নিয়ে বললেন, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কী হবে? তখন আমি বললাম, আসলে বরিস ইয়েলৎসিন এখন প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে কথা বলছেন। এবং প্রেসিডেন্ট বুশের মনে হয় আপত্তি নেই!"
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই তিন নেতা এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চু্ক্তিতে সই করলেন। এই সংবাদ সম্মেলনের পর এবার তাদের বাড়ি ফেরার পালা। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ বাড়ি ফেরার পথে বুঝতে পারলেন, তারা যা করেছেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব :
"গাড়িতে বাড়ি ফেরার সময় আমি রেডিওতে খবর শুনছিলাম দুনিয়ার কোথায় কি ঘটছে। আমি খেয়াল করলাম, খবরে বার বার ইয়েলৎসিন আর ক্রাভচুকের নাম বলা হচ্ছে। আর আমার নাম যখন আসছে, তখন তারা সেটি ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারছে না। চুকচোভিচ, শেশকোভিচ, শাখোভিচ, যার যা খুশি উচ্চারণ করছিল। তখন আমি বুঝলাম, আমরা একটা বিরাট খবর তৈরি করেছি। তবে তখন আমি বেশ ভয়ে ছিলাম। আমাদের আঞ্চলিক পার্লামেন্টের ৮২ শতাংশই সদস্যই হচ্ছে কমিউনিষ্ট। এরা যদি চুক্তিটি অনুমোদন না করে, আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখানেই শেষ।"
তবে শেষ পর্যন্ত তিনটি আঞ্চলিক পার্লামেন্টই এই চুক্তি অনুমোদন করলো। শুধু তাই নয়, অন্য সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোও এতে যোগ দিল। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট গর্বাচভ পদত্যাগ করলেন। বিলুপ্ত হয়ে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন। লিওনিদ ক্রাভচুক স্বাধীন ইউক্রেনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হলেন। তিনি এখনো কিয়েভে থাকেন। স্ট্যানিস্লভ শুশকেভিচ ১৯৯৪ সালে ক্ষমতা ছাড়েন। তিনি এখন বেলারুশে একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, থাকেন রাজধানী মিনস্কে।
তুরস্কে ক্ষমতাসীন এরদোগান সরকার এবং তিনি নিজেও প্রায় প্রতিদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর হচ্ছেন। তার বিভিন্ন পদক্ষেপ বিশ্বে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এবারের একটি সিদ্ধান্ত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্ককে উগ্র সেকুলারিজমের দীর্ঘকালীন ধারা থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বেলায়ও আঙ্কারার একেপি সরকারের পদক্ষেপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, বহুলালোচিত সেই সাবেক মহিলা এমপি মার্ভে কাভাকসি মালয়েশিয়ায় তুর্কি রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়েছেন। তুরস্ক ও মালয়েশিয়া- দুটোই বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দু’টি অগ্রণী দেশ। বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তারা প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। হিজাবশোভিতা কাভাকসি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়ায় মহাদেশের সর্বপশ্চিমের দেশ তুরস্কের প্রতিনিধিত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করবেন।
তুরস্কের বহুলালোচিত পার্লামেন্ট সদস্য মার্ভে কাভাকসি নিকট অতীতে নির্যাতিত ও অপমানিত হয়েছেন এবং শুধু পার্লামেন্টের সদস্যপদই নয়, তুরস্কের নাগরিকত্বও হারিয়েছিলেন। এসব কিছুই হয়েছিল কট্টর সেকুলার শাসনামলে এবং তার অটুট বিশ্বাস ও আদর্শনিষ্ঠার কারণে। সেই আপসহীন নারী মালয়েশিয়ায় স্বদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়ে আরেক রেকর্ড গড়েছেন। মুসলিম অধ্যুষিত তুরস্কে ইসলামের নির্দেশমাফিক হিজাব পরিধানের মাধ্যমে পার্লামেন্টে তিনি মূলত নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর এখন মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রধান কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রে তার নিযুক্তিকে আধুনিক বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে গণ্য করা হচ্ছে।
হিজাব বা মস্তকাবরণ পরিধান করা ইসলামের শিক্ষাগুলোর একটি। এই ধর্মের অনুসারী মহিলারা এর অনুসরণ করাই স্বাভাবিক। কারণ এটা তার অবিচ্ছেদ্য অধিকার। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও তাদের নিজ নিজ ধর্মপালনের অধিকার দেয়া রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। কিন্তু তুরস্কের মতো কোনো কোনো দেশে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এতই বাড়াবাড়ি করা হয়েছে যে, ধর্ম পালন না করার সব সুযোগ দেয়া হলেও ধর্ম পালনে পদে পদে দেয়া হয়েছে নানা রকম বাধা। তুরস্ক একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম রাষ্ট্র হলেও সেখানে পৌনে এক শতাব্দী ধরে উগ্র সেকুলার রাষ্ট্রশক্তি প্রধানত ইসলামকেই টার্গেট করে তাদের অপতৎপরতা চালিয়েছে। কথিত নিরপেক্ষতার আড়ালে ইসলামবিদ্বেষীদের এহেন গোঁড়ামি অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক। এটা নিঃসন্দেহে মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আধুনিক সভ্য জগতে কোনো সরকার এমন পদক্ষেপ নিতে পারে না। যা হোক, তুরস্কে একেপি সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সে দেশের জনগণের অনুসৃত ধর্ম তথা তাদের লালিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ আবার মর্যাদা পাচ্ছে। নারীর হিজাব পরার অধিকার প্রতিষ্ঠা এর একটি নজির।
তুরস্কে ১৯২৪ থেকে একাদিক্রমে গোঁড়া সেকুলার শাসন অব্যাহত ছিল পঞ্চাশের দশকে আদনান মেন্দারেসের কয়েক বছরের শাসনকাল ছাড়া। হিজাব বা মহিলাদের মস্তকাবরণের ওপর রাষ্ট্রীয় খড়গ নেমে আসে প্রথমে ১৯৮০ সালে। তখন সেনাপ্রধান কেনান এভরান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা জবরদখলের পর সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেন। হিজাব সমর্থক দলগুলোর জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, সরকার ততই শঙ্কিত হয়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে কঠোরতর করেছে। এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও হিজাব হলো নিষিদ্ধ। দেশজুড়ে হিজাবের পক্ষে ব্যাপক বিক্ষোভ সত্ত্বেও একগুঁয়ে সরকার তার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
মার্ভে কাভাকসি ধর্মপ্রাণ তো বটেই, সেই সাথে আধুনিক উচ্চশিক্ষার অধিকারী। বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ভার্সিটির ডিগ্রিধারী এই সংগ্রামী নারী ওয়াশিংটনে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ও হোয়ার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ছিলেন। তবে পাশ্চাত্যের চাকচিক্য কিংবা ‘সর্বোন্নত দেশ’-এর আকর্ষণ তাকে ধরে রাখতে পারেনি। কাভাকসি স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তুরস্কে ফিরে এলেন। রাজনীতির মাধ্যমেই দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হবেÑ এমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তিনি পোষণ করতেন। সে মোতাবেক ইসলামি আদর্শে বিশ্বাসী ভার্চু পার্টি থেকে ইস্তাম্বুলের এমপি নির্বাচিত হন এপ্রিল, ১৯৯৯ সালে। এর পরই ২ মে তিনি মাথায় স্কার্ফ দিয়ে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার জন্য গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ভবনে প্রবেশ করেন, কিন্তু সেকুলার ও বামপন্থীরা তার ধর্মীয় অধিকারটুকুও বরদাশত করতে রাজি হননি। স্কার্ফ বা হিজাব পরিহিতা কাভাকসিকে দেখেই ‘ডেমোক্র্যাটিক লেফট পার্টি’র (ডিএলপি) এমপিরা ন্যূনতম ভদ্রতার মাথা খেয়ে ‘বেরিয়ে যাও’ বলে কাভাকসির উদ্দেশে চিৎকার করে ওঠেন। তারা এমনকি তাকে শপথ নিতে পর্যন্ত দেননি। অথচ সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনি জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েই পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত এসেভিট ডিএলপি দলের নেতা হিসেবে চরম সঙ্কীর্ণতা ও গোঁড়ামির প্রমাণ রেখেছিলেন তখন। তিনি দলের অসহিষ্ণু এমপিদের শান্ত করার কোনো চেষ্টা না করে উল্টো ‘বিপ্লবী বক্তৃতা’ ঝাড়তে থাকেন এ ভাষায়Ñ ‘এটা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার জায়গা নয়। এই মহিলাকে লাইনে আনুন।’
‘প্রগতিশীল’রা প্রতিনিয়ত ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাসহ মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রবক্তা রূপে নিজেদের জাহির করেন। অথচ তারাই মার্ভে কাভাকসির গণতান্ত্রিক অবিচ্ছেদ্য অধিকার সে দিন তুর্কি আইনসভায় পদদলিত করেছিলেন। তাদের নেতা ও সরকারপ্রধান এসেভিটের ‘ফতোয়ামাফিক’ বেলাইনে চলে যাওয়ায় কাভাকসিকে শুধু পার্লামেন্ট থেকে নয়, দেশ থেকেও বহিষ্কার করা হলো। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এমন অসভ্যতার দৃষ্টান্ত সমকালীন বিশ্বে বিরল।
মার্ভে কাভাকসি তার পুরনো কর্মস্থল যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং অচিরেই সেখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করেন। মেয়ে ফাতিমার ভাষায়- ‘আম্মা বিরাট ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। পার্লামেন্ট থেকে তাকে ভয়ঙ্করভাবে বাইরে ছুড়ে ফেলার পর মা, বোন আর আমার নতুন জীবন শুরু হলো বিদেশে। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা আগের চেয়ে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম যে, আরো উৎসাহ ও অধ্যবসায়ের সাথে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসরণ করে যাবো। সব সময়ই আমাদের লক্ষ্য ছিল ও আছে- কমিউনিটি ও উম্মাহসহ বিশ্বমানবতার সেবা করা।’
তুরস্কে দশকের পর দশক বজায় ছিল প্রগতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী শাসন। অটোমান সুলতানের সেনা কর্মকর্তা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে ১৯২৩ সালে নতুন তুর্কি রাষ্ট্রের যাত্রার সূচনা। তৎকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কামাল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন। ‘রুগ্ণ’ তুরস্ককে আধুনিকতার পথে ‘শক্তিশালী’ করার লক্ষ্যে কামাল ‘খিলাফত’ উৎখাত করেছিলেন ঠিকই, তবে ‘জমহুরিয়াত’ (গণতন্ত্র) দিয়ে সে শূন্যস্থান পূরণ করেননি। বরং ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত তো বটেই, এর পরও অনেক দিন তুরস্কে গণতন্ত্র ছিল না; ছিল কার্যত একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন। পরে গণতন্ত্র এলেও স্থায়ী হতে পারেনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ শাসন আর বশংবদ বিচার বিভাগ ও বিকৃত আইন পরিষদের মাধ্যমে পরোক্ষ সেনা শাসনের কারণে। ১৯৬০ সালে জেনারেল জামাল গুর্সেল এবং ১৯৮০ সালে জেনারেল কেনান এভরান সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক শাসনের পরও তারা এবং তাদের সমমনা সেকুলাররাই যুগ যুগ ধরে তুরস্ক শাসন করেছেন। অনেক সময় তা করা হয়েছে বেসামরিক পোশাকে এবং গণতন্ত্রের সেøাগান দিয়ে। বিগত শতকের শেষ দিকেও চলছিল এমন একটি শাসনামল। এই প্রেক্ষাপটে মার্ভে কাভাকসির মতো সাহসী নারী বিশ্বমিডিয়ার শিরোনাম হয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে কাভাকসির কন্যা ফাতিমা আবু শানাব লিখেছেন, ‘১৯৯৯ সালের ২ মে; তখন আমার বয়স মাত্র ৯ বছর। একটি ছোট্ট মেয়ে হিসেবে সেদিন দেখেছিÑ আমার মা মার্ভে কাভাকসি বীরের মতো পার্লামেন্টে প্রবেশ করলেন। তুরস্কের নাগরিকদের অনেকের হৃদয়েই ছিল তার স্থান। তাকে নির্যাতিত হতে হলো। তাকে যেন লাথি মেরে পার্লামেন্ট থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। ‘তিনি সেকুলার রাষ্ট্রের প্রতি হুমকি’Ñ এই অভিযোগে তার নাগরিকত্ব পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হলো। আমি সেদিন ভেবেছি, মা এত মহৎ কোনো কাজ করেছেন যে, তিনি সব সময় ওই মুসলিম মহিলাদের প্রতীক হয়ে থাকবেন, যারা মাথায় স্কার্ফ পরিধান করে থাকেন। লাল ও সাদা রঙের রেখা টানা এই নেভি হেডস্কার্ফ শুধু এক টুকরো কাপড় নয়। সেদিন এই টুকরো কাপড় হয়ে উঠেছিল হিজাব নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। একই বিশ্বাসের অনুগামী যে অসংখ্য মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে মাথা ঢাকার বস্ত্রখণ্ডটি। আমার মা নীরবে বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন সে দিন।’
মার্ভে কাভাকসি পার্লামেন্টে অসহিষ্ণু ও মতান্ধ প্রতিপক্ষের চরম অসৌজন্য ও ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। তখন তিনি ছিলেন তুরস্কের প্রখ্যাত রাজনীতিক অধ্যাপক নাজমুদ্দীন এরবাকানের Virtue Party (Welfare Party-এর উত্তরাধিকারী) থেকে সদ্যনির্বাচিত সংসদ সদস্য। এরবাকান দেশের একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে বিভিন্ন সময় সেকুলার সরকারের উগ্রবিদ্বেষের মুখে বিভিন্ন নামে দল গঠন করে ইসলামি আদর্শে সমাজ গঠনের আন্দোলন করেছেন। তিনি সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন ন্যাশনাল স্যালভেশন পার্টি বা মিল্লি সালামি পার্টির নেতা হিসেবে। পরে রেফাহ পার্টি নামেও কাজ করেছেন। এক সময় ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী। ’৯০-এর দশকে জনগণের রায়ে দেশ চালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেও সামরিক বাহিনীর অন্যায় হস্তক্ষেপে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯৭ সালের ১৮ জুন তুরস্কের ইতিহাসের এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ‘উত্তরাধুনিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত। তুর্কি জনগণ তাদের দীর্ঘ দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আর অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সশস্ত্রবাহিনী যেন কলঙ্কিত না হয়, সে জন্য গত বছর ১৫ জুলাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাথে সাথে ব্যর্থ করে দিয়েছে কিছু সেনাকর্মর্তার ক্ষমতা দখলের প্রয়াস।
যা হোক, ১৯৯৭ সালের ব্যতিক্রমী সে অভ্যুত্থানে সেনাকর্মকর্তারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতা নেয়াকে নিরাপদ মনে করেননি, বরং তারা জনসমর্থিত সরকারকে চাপের মুখে তাড়িয়ে দিয়ে পছন্দসই সরকার গঠনে মেতে ওঠেন। এ জন্য তারা ’৯৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গণতান্ত্রিক সরকারকে ভীষণ হুমকির মুখে রেখেছিলেন। মতান্ধ মিডিয়া কাজে লাগিয়ে এবং চরম সেকুলার দলগুলোকে উসকে উর্দিধারীরা এমন অবস্থার সৃষ্টি করেন, বৃদ্ধ এরবাকান পদত্যাগে বাধ্য হলেন। এরপরও ‘ইসলামপন্থী’ রাজনৈতিক মহলকে ভীষণ চাপে থাকতে হয়, যারা সেকুলারদের দৃষ্টিতে ‘রক্ষণশীল’। এমন পরিস্থিতিতেই ’৯৯ সালে মার্ভে কাভাকসি দেশের প্রধান নগর ইস্তাম্বুল থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। তার ক্ষমতাদর্পী প্রতিপক্ষ এটা মেনে নিতে পারেনি। তিন বছর পর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে ‘ভূমিধস বিজয়’ অর্জন করে। তবে বহুকাল ধরে সংসদ, মিডিয়া, বিচারালয়, সশস্ত্রবাহিনী, একাডেমিক অঙ্গন ও সাংস্কৃতিক মহলে হিজাববিরোধী সেকুলার শক্তি এতটাই জেঁকে বসেছিল যে, একেপি সরকার সহজে এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারেনি। তবে দীর্ঘ দিনের বিতর্কের পর ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা। আর হিজাবের অধিকার কায়েমের আন্দোলনের পুরোধা মার্ভে কাভাকসি ২০ বছর পর ফিরে পেলেন তার নাগরিকত্ব। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, তুরস্কের রাষ্ট্রদূতদের এখন আগের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এটা এক দিকে যেমন সমস্যা, তেমনি যোগ্য কূটনীতিকদের সামনে সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একজন তুর্কি ভাষ্যকারের মতে, দু’টি কারণে তুরস্কের কূটনীতিকদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। প্রথমত, তুরস্কের বর্তমান সরকার দেশকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদানের নয়া যুগে প্রবেশ করাতে উন্মুখ। এটা নিশ্চয়ই একটি বিরাট কাজ। দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে একেপির এই সরকার এবং তার নেতা এরদোগানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা তথা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রচারণা ব্যাপক ও জোরালো। এর কার্যকর মোকাবেলা সহজ না হলেও তা করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়াই আঙ্কারার করণীয়।
তুরস্কের বর্তমান সরকারের যারা সাফল্য চান, তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সব বাধাবিপত্তি, বিরোধিতা ও সমালোচনার মোকাবেলা করে জাতীয় স্বার্থ, তুরস্কের আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং বিশ্বসম্প্রদায়ের মাঝে সে দেশের জোরালো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে তুরস্কের প্রতিনিধি হিসেবে কূটনীতিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিক দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়ায় তুর্কি রাষ্ট্রদূত মার্ভে কাভাকসি জাতির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন বলে তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিশ্বাস।
সারাবিশ্বে পুরুষদের শরীরে যে হারে শুক্রাণুর সংখ্যা বা স্পার্ম রেট কমে যাচ্ছে, শুক্রাণু কমে যাবার সেই হার বজায় থাকলে মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন এক চিকিৎসক।
প্রায় দুইশোটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ৪০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে পুরুষদের স্পার্ম কাউন্ট।
উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের পুরুষদের ওপর করা হয়েছিল এসব গবেষণা।
মানব প্রজন্মের সাম্প্রতিক তথ্য নিয়ে অবশ্য কিছু গবেষক সন্দেহও প্রকাশ করেছেন।
তবে তথ্য সংগ্রহের এই গবেষণা দলের প্রধান ড: হ্যাগাই লেভিন জানাচ্ছেন, ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা নিয়ে তিনি 'খুবই উদ্বিগ্ন'।
এই তুলনামূলক গবেষণাটি করা হয় ১৯৭৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। এই সময়কালে করা ১৮৫টি গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা কাজটি করে ড: লেভিনের দল।
ডঃ লেভিন একজন 'এপিডেমিওলজিস্ট'। রোগবিস্তার সংক্রান্ত বিদ্যা ও এর সাথে সম্পর্কিত ওষুধের শাখা, রোগের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ এসব বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ।
বিবিসিকে ডঃ লেভিন জানান, "এভাবে স্পার্ম কাউন্ট কমতে থাকলে একসময় মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে"।
শুক্রাণু কমে যাবার সংখ্যা 'দিনে দিনে বাড়ছে'
"আমরা যদি নিজেদের জীবনযাপনের ধরন, পরিবেশ এবং রাসায়নিক ব্যবহারে পরিবর্তন না আনি, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে তা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন" ।
"একটা সময়ে এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, আর তাতে মানব প্রজাতির বিলুপ্তিও দেখা যেতে পারে" -বিবিসিকে বলেন ড: লেভিন।
যেসব বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার সঙ্গে ছিলেন না তারাও এই গবেষণার মানের প্রশংসা করে বলেন, তাদের কাজ খুবই ভালো, তাদের তথ্যও ঠিক আছে। কিন্তু এখনই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে 'মানব প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে'।
জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির গবেষক ড: লেভিন তাঁর অনুসন্ধানে দেখেছেন, শুক্রাণুর ঘনত্ব কমে এসেছে ৫২.৪ শতাংশ এবং স্পার্ম কাউন্ট কমে এসেছে ৫৯.৩ শতাংশ।
গবেষণায় আরো বলা হচ্ছে, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত পুরুষদের মধ্যে স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণুর হার কমে যাবার এই ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং এটি দিনে দিনে আরো বাড়ছে।
পূ্র্ববর্তী গবেষণা নিয়ে 'দ্বন্দ্ব'
তবে দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার পুরুষদের মধ্যে স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণুর হার কমতে দেখা যায়নি।
তবে গবেষকেরা বলছেন, এসব দেশে যথেষ্ট গবেষণা হয়নি এবং একটা সময়ে এখানেও স্পার্ম কাউন্ট কমে আসতে পারে বলে ধারণা করেছেন ড: লেভিন।
এসব গবেষণার তথ্য নিয়ে বিতর্ক আছে অনেক কারণে।
এর আগে কয়েকটি গবেষণা কাজে বলা হয়েছিল উন্নত অর্থনীতির দেশে স্পার্ম কাউন্ট কমে আসছে। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকের ধারণা এর মধ্যেও 'বিভ্রান্তিমূলক তথ্য' রয়েছে।এছাড়া আরো কিছু গবেষণা করা হয় কমসংখ্যক পুরুষ নিয়ে। আবার ফার্টিলিটি ক্লিনিক থেকে তথ্য নিয়ে যেসব গবেষণা করা হয় সেখানে স্পার্ম কাউন্ট কম আসা স্বাভাবিক, কারণ মানুষ সমস্যা নিয়েই সেখানে যায়।
আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় হলো, স্পার্ম কাউন্ট কমে আসছে এমন ফলাফল দেখতে পেলে তা জার্নালে প্রকাশিত হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। এই কারণে হয়তো স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণু হার কমে আসছে এমন একটা ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এই গবেষকেরা দাবি করছেন এরকম সব ধরনের সমস্যার বিষয়েই তারা চিন্তা করেছেন এবং গবেষণা করে যে তারা যে ফলাফল পেয়েছেন তা সত্য বলে মানছেন অনেকে।
যেমন শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান পেসি বলছেন "এর আগে স্পার্ম কাউন্টের বিষয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে তাতে আমি খুব একটা আশ্বস্ত হয়নি। কিন্তু ড: লেভিন ও তার দল যে গবেষণা করেছেন এবং তারা যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা পূর্ববর্তী অনেক গবেষণা নিয়ে ভ্রান্তি দূর করে দেয়"।
ধুমপান এবং স্থূলতা
তবে অধ্যাপক পেসি বলছেন, নতুন এই গবেষণাটি অনেক ভ্রান্তি দূর করলেও ফলাফলের বিষয়টি নিয়ে সতর্কতার সাথে এগুতে হবে।
"এ বিষয়টা নিয়ে তর্কের অবসান কিন্তু এখনই হচ্ছে না। এ বিষয়ে আরো অনেক কাজ করতে হবে" -বলেন অধ্যাপক পেসি।
কেন স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণু হার কমে যাচ্ছে তার সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি।
তবে কীটনাশক এবং প্লাস্টিকে থাকা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা, ওবেসিটি বা স্থূলতা, ধুমপান, মানসিক চাপ, খাদ্যভ্যাস, এমনকি অতিরিক্ত টিভি দেখা এক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।।
ড: লেভিন বলছেন, কেন শুক্রাণুর হার কমে যাচ্ছে সে বিষয়টি জানা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। একইসাথে এমনটা যেন না ঘটে সেই উপায়ও খুঁজে বের করতে হবে বলে উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা
ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে ওষুধের পুরো কোর্স শেষ করা সবসময় উচিত কীনা তা এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
তারা বলছেন, পুরো কোর্স শেষ না করে মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করলে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না- এর পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি তারা দেখছেন না।
তারা বলছেন, সুস্থ বোধ করলে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যদি থামিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সেভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব কীনা এনিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
কিন্তু পারিবারিক ডাক্তাররা রোগীদের পরামর্শ দিয়েছেন শুধু একটি সমীক্ষার ভিত্তিতে তারা যেন তাদের অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে কোনো পরিবর্তন না আনে।
ইংলন্ডে জিপি বা পারিবারিক ডাক্তারদের সদস্য সংস্থা রয়্যাল কলেজ অফ জেনারেল প্র্যাকটিশনারস্-এর প্রধান প্রফেসর হেলেন স্টোকস্-ল্যামপার্ড বলেছেন রোগের উপসর্গ কমে যাওয়া বা ভাল বোধ করার অর্থ এই নয় যে সংক্রমণ পুরোপুরি কেটে গেছে।
''রোগীদের জন্য যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা খুবই পরিস্কার- সবসময়ই যেটা আমরা বলেছি যে অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স নিতে হবে। এখন এটা বদলাতে গেলে সেটা মানুষকে বিভ্রান্ত করবে।''
তাহলে কী আছে নতুন গবেষণায়?
ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অংশের একদল গবেষক যুক্তি দেখিয়েছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি মানুষের শরীরে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে সেই সমস্যার মোকাবেলা করতে হলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোটা জরুরি।
ব্রাইটন ও সাসেক্স মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যাপক মার্টিন লোয়েলিন ও তার কয়েকজন সহকর্মী তাদের গবেষণার ভিত্তিতে বলছেন প্রয়োজনের বেশি সময় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে।
তারা বলছেন, পুরনো ধারণা ছিল দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করালে সংক্রমণ ভেতরে রয়ে যাবে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি শরীরের প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হবে। তারা বলছেন, এই ধারণা এখন সাবেকি।
তারা বলছেন, এখন যেটা বেশি করে প্রমাণিত সেটা হল তিন থেকে পাঁচদিনের সংক্ষিপ্ত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা বহু ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে।
অধ্যাপক লোয়েলিন বলেছেন, এর ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। যেমন- যক্ষ্মার চিকিৎসায় শুধু এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে দ্রুত ওই অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
ওই গবেষক দল বলছে, বর্তমানে সবাইকে গণভাবে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেয়ার যে প্রথা চালু আছে তা বদলানো উচিত। ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে সংক্রমণের গুরুত্ব বিবেচনা করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা ভিন্নভাবে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে এখন রোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং অল্পদিনের কোর্সে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার দিকেও ডাক্তাররা ঝুঁকছেন।
তারা অবশ্য স্বীকার করেছেন, অল্পদিনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেয়ার সুফল বা কুফল নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন আছে।
ব্রিটেনের পারিবারিক চিকিৎসক মণ্ডলী বলেছেন, তারা কখনই সব রোগীকে এক কাতারে ফেলে অ্যান্টিবায়োটিক দেন না। তারাও ব্যক্তিবিশেষের রোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা পরামর্শ দেন।
এদিকে ব্রিটেনে রয়্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটি বলছে গবেষকদলের নতুন তত্ত্ব অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্কের সুযোগ করে দিল।
'কোর্স শেষ করুন' অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার এই প্রচলিত মন্ত্র বদলে 'ভাল বোধ করলে ওষুধ বন্ধ করে দিন' এই পদ্ধতি চালু করা কতখানি যুক্তিসঙ্গত- তারা বলছেন এর জন্য আরো গবেষণার পথও এর ফলে প্রশস্ত হবে বলে তারা মনে করছেন।
সূত্র : বিবিসি
৭০ বছর বয়সে এসে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি অবশেষে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আরোহণ করতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অন্তত এ কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে আজ যখন একজন নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন অভিযোগে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষিত হলেন। এটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন, নয় কি?
অযোগ্যতা!
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ২৫ পৃষ্ঠার এক সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, নওয়াজ শরীফ প্রধানমন্ত্রীর আসনে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এই রায়ের পর পাকিস্তানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট  দেখা দিয়েছে। এখন সংসদ ভেঙে দেয়া হবে, নাকি আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের পথে দেশ এগিয়ে যাবে তা নিয়ে জনগণের মধ্যে জল্পনা শুরু হয়। তবে সময় মতো এই আশঙ্কার জবাব দেয়ার জন্য মুসলিম লীগ-নওয়াজকে ধন্যবাদ। দলটির নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করবে এবং সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত সময়ে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে সময় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদের একজন শক্তি প্রার্থী হলেন নওয়াজ শরীফের ছোটভাই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। এটা হলে সরকার ও দলের ওপর শরীফ পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত নিশ্চুপ। এই মামলায় প্রত্যক্ষ কোনো হস্তক্ষেপ না করে সুপ্রিম কোর্ট ও অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে দিয়েছে। ফলে আর কোনো সেনা অভ্যুত্থানের গুজব অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায়। তবে, প্রধানমন্ত্রীকে তার পদে অযোগ্য ঘোষণা করা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। পাকিস্তানের ভবিষ্যতের উপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এরই প্রেক্ষাপটে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে তা হলো: এই অযোগ্যতার ঘোষণা পাকিস্তানকে কোথায় নিয়ে যাবে?
রায়ের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কি হবে?
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পাকিস্তানে কোনো দায়িত্বপালনরত প্রধানমন্ত্রীকে এই প্রথমবারের মতো অযোগ্য ঘোষণা করা হয়নি। ২০১২ সালের ১৯শে জুন আদালত অবমাননার অভিযোগ মাথায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানীকে সরে যেতে হয়েছিলো। পাকিস্তানের ছককাটা রাজনীতিতে সিটিং প্রধানমন্ত্রীদের অযোগ্য ঘোষণা করা একটি নতুন প্রবণতা। ১৯৯০’র দশকে (‘গণতন্ত্রের দশক’ ও পরোক্ষ সেনা হস্তক্ষেপের যুগ) দেখা গেছে মোটামুটি প্রতি দুই বছরে একবার করে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া হয়েছে এবং নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। । কিছু মানুষ পর্দার আড়ালে থেকে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের সহজ ও নতুন উপায় হিসেবে প্রধানমন্ত্রীদের অযোগ্য ঘোষণা করার এই ‘নতুন চর্চা’ শুরু করেছে।
পাকিস্তানে অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, এই রায় যতটা না বিচার ব্যবস্থার উচ্চস্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ, তারচেয়ে বেশি একটি ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’। এ রকম সংশয় থাকার পরও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আর কোনো প্রধানমন্ত্রী এমন কি কোনো এলিট রাজনীতিককে নওয়াজ শরীফ ও তার পরিবারের মতো এমন উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক ও বিচারিক পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের সম্মুখিন হতে হয়নি।
নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে এই রায়ের প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী হবে, সে কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। নওয়াজ শরীফই প্রথম অযোগ্য ঘোষিত কোনো প্রধানমন্ত্রী না হলেও এখন কেউ আর এ কথা অস্বীকার করতে পারবেন না যে, ক্ষমতার কেন্দ্রে (কেন্দ্রীয় পাঞ্জাব) যার শেকড় সেই রাজনীতিককেও ক্ষমতা ছেড়ে ঘরে ফিরে যেতে হয়। গিলানিকে যখন ঘরে ফিরে যেতে হয়েছিল তখন তার সিরাইকি (পশ্চিম পাঞ্জাবের ক্ষুদ্র একটি সমপ্রদায়) পরিচিতির কারণে এমন ধারণা হয়েছিল যে, ক্ষুদ্র প্রদেশ বা পাঞ্জাবের তুলনামূলক পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর কাউকেই শুধু অযোগ্য ঘোষণা, পরিবর্তন বা সরসরি বরখাস্ত করা সম্ভব। এমন ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান রায়টি শুধু ঐতিহাসিকই নয়, এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। আর সেই বার্তাটি হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে পাঞ্জাবের আধিপত্য নিয়ে। এটা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পাঞ্জাবের প্রভাবের মধ্যে ফাটল ধরেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানি রাজনীতির গতানুগতিক প্রকৃতিতে যে পরিবর্তন আসছে এই রায়ের মধ্য দিয়ে তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন, এই মামলা ও এ নিয়ে যে পরিমাণ প্রচারণা হয়েছে তাতে নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, পাকিস্তানে যেসব রাজনীতিক নিজেদেরকে ‘সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছুটা ওপরে’ বলে ভাবছেন এবং কোনো জ্ঞাত সম্পদ ও বৈধ আয়ের উৎস ছাড়াই বিলাসবহুল জীবন-যাপন করছেন  তাদের আর আগের রাজনীতির ধারা বজায় রাখা চলবে না। অন্তত সেই নির্লজ্জ চালচলন পরিত্যাগ করতে হবে।
তবে, ১৯৯০ দশকের চেয়ে ২০১৭ সাল অনেক দিক দিয়ে আলাদা হলেও এই দুই যুগের মধ্যে এখনো অনেক কিছুর মিল রয়ে গেছে।
যেমন, এমন রাজনৈতিক সংকট বা অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে যা তাকেও আক্রান্ত করবে সেই আশঙ্কা থাকার পরও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে তার সক্ষমতা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রকাশ করেছে। এরপরও গণতন্ত্রের ভিত্তিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করার ভার এখনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর রয়ে গেছে।
আর তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: শরীফের ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার মানে কি পাকিস্তানে গণতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছে? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। শুক্রবারের রায়ের পর থেকে মিডিয়ায় যে আলোচনা চলছে, যে গণ উৎসব চলছে, আগামী কয়েকদিন ধরে যা চলবে ঠিক একই পরিস্থিতি ১৯৯০’র দশকেও দেখা গিয়েছিলো। তখন বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরীফ দু’জনকেই দু’বার করে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। পাকিস্তানের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক অসিম সাজ্জাদ আখতার বলেন, জনসাধারণের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস ও গণতন্ত্র সুসংহত হচ্ছে বলে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে ১৯৭০’র দশকেও তা দেখা গিয়েছিলো যখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বরখাস্ত এবং পরে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল। আখতার আরো বলেন, এ ধরনের বারবার বরখাস্তের ঘটনা ও গণতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছে বলে অতিমাত্রায় আশাবাদ শুধু একটি সুষ্ঠু ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র বিকাশে পাকিস্তানের অক্ষমতা নিয়ে হতাশাকেই জোরদার করছে। এই হতাশা এবং সত্যিকারের কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের অভাব থেকে বুঝা যায় গত ৭০ বছর ধরে বহু প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এতসব উদাহরণ থাকার পরও পাকিস্তানে জবাবদিহিতা ও যাচাই প্রক্রিয়া কখনোই ‘অভিশপ্ত রাজনীতিকদের’ বাইরে বিস্তার লাভ করতে পারেনি।
আবারো বলছি, এই অযোগ্যতার ঘোষণা যে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে তা হলো: এর ফলে পাকিস্তানের জবাবদিহিতা প্রক্রিয়া টেকসই হবে কি না এবং অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে কিনা। সাংবিধানিকভাবে সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই সেগুলোর কাজের জন্য জবাবদিহি করা যায়। কিন্তু পাকিস্তানের ইতিহাস বলে এই প্রক্রিয়া এযাবৎকাল শুধু সরকারের নির্বাহী বিভাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
একজন প্রধানমন্ত্রীকে অযোগ্য ঘোষণার কারণে গণতন্ত্র নিজেই হুমকির মুখে পড়ছে সে কথা বলা না গেলেও এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আবার দেখিয়ে দিলো যে, পাকিস্তানে জবাবদিহিতা ধারণার প্রয়োগ এখনো অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সীমিত পর্যায়ে।
ফলে, এখানে যে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উঠবে এবং যার উত্তর পেতে হবে তাহলো: এই জবাবদিহিতা প্রক্রিয়া কি পাকিস্তানের অরাজনৈতিক ও অনির্বাচিত ক্ষেত্রগুলোতেও প্রয়োগ করা হবে? এই প্রক্রিয়া আগামীতেও সীমিত ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে তা পাকিস্তানের ক্ষমতার মূলকেন্দ্রগুলোতে তেমন কোনো আঘাত হানা ও সেগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে না। এতে পাকিস্তানের গণতন্ত্র গুণগতভাবে অগণতান্ত্রিক হিসেবেই রয়ে যাবে।
সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর
বৃটিশ সেনা, বিমান ও নৌ বাহিনীতে ভয়াবহ যৌন হয়রানির তথ্য মিলেছে। বলা হয়েছে ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এসব বাহিনীতে কম করে হলেও ৩৬৩টি যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে। তার মধ্যে শুধু গত বছরে মিলিটারি পুলিশ ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ১১৩টির তদন্ত করেছে। ফকল্যান্ডে রাজকীয় বিমান বাহিনীর (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতে এ রকম যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন রেবেকা ক্রুকশ্যাঙ্ক নামের এক নারী। ওই ঘটনার ছবি প্রকাশ হয়েছে। তা বৃটিশ মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। ওই সময় রেবেকা ছিলেন ২১ বছর বয়সী যুবতী। তিনি তখন ফকল্যাল্ডে আরএএফ মাউন্ড অ্যালিস ঘাঁটিতে নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে পুরুষ সহকর্মীদের হাতে তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে দু’পুরুষ সহকর্মী নিজেরা একেবারে নগ্ন অবস্থায় রেবেকাকে জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে নিয়েছেন। একজন সামনের দিকে। অন্যজন পিছন দিকে। তারপর তারা অসংলগ্ন আচরণ করছেন। ছবিতে এমন কিছু অংশ আছে যা সেন্সর করে প্রকাশ করতে হয়েছে। রেবেকা ১৭ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন রয়েল এয়ার ফোর্সে। তারপর সেখানে চার বছর দায়িত্ব পালন করে। এরপর ২০০১ সালে তাকে চার সপ্তাহের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয় ফকল্যান্ডের ওই ঘাঁটিতে। সেখানে প্রায় ২৮ জন পুরুষ সহকর্মীর মধ্যে তিনি একজনই ছিলেন নারী। বর্তমানে তার বয়স ৩৬ বছর। বসবাস উত্তর লন্ডনে। বর্তমানে তিনি একজন লেখিকা ও অভিনেত্রী। রেবেকা বলেছেন, তিনি ওই ঘাঁটিতে যোগ দেয়ার পরই তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ওই পুরুষ সহকর্মীরা। তারা বলেছিলেন, এটাই অন্ধকার সময়ের সূচনা। সেখানে অশালীন আচরণ শুরু করেন তারা। তারই কিছু ছবি তুলে রেখেছিলেন রেবেকা। তিনি বলেন, এর পরে তাকে একজন পুরুষ কর্মকর্তার সঙ্গে নিজের বেডরুমে ব্যক্তিগতভাবে মিটিং করতে হয়েছিল। ওই পুরুষ কর্মকর্তা তাকে এসব বিষয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন। বিনিময়ে তাকে প্রস্তাব করেছিলেন টর্নেডো এফ-৩তে একটি ফ্লাইটে নেয়ার। রেবেকা বলেন, এখন সম্মুখ যুদ্ধে যোগ দিতে সক্ষম নারীরা। কিন্তু যেভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে সেনাবাহিনী যথেষ্ট কাজ করছে না। যেখানে কর্মক্ষেত্রে সমতার শিক্ষা প্রশিক্ষণকালে দেয়া হয়। যৌন হয়রানি, অন্যান্য হয়রানির বিরুদ্ধে শূণ্য সহনশীলতার কথা বলা হয়, সেখানে প্রশিক্ষণের শুরুতে এসব বিষয় নজরে আনা দরকার। রেবেকার ভাষায়, এখন থেকে অনেক আগে ২০০১ সালে আমি যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি তা আমার জীবনের ওপর বিরাট একটি প্রভাব ফেলেছে। আমার কণ্ঠকে থামিয়ে রাখা যাবে না। যদি অন্য কোনো মানুষ আমার কাহিনী পড়েন এবং তারা হোক সেনাবাহিনী বা অন্য যেকোনো কর্মক্ষেত্র সেখানকার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা যদি সাহস করে প্রকাশ করেন, তাহলে আমরা সবাই মিলে এ ধরনের আচরণ পাল্টাতে পারবো। অবিচারের বিরুদ্ধে শূণ্য সহনশীলতা দেখাতে পারবো। রেবেকা দাবি করেন, করপোরালরাও যুবতী প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। গত বছরে মিলিটারি পুলিশ এমন ১১৩ টি অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। বলা হয়, প্রতি সপ্তাহে একজন নারী সদস্য দু’বার যৌন আক্রমণের শিকার হন। তথ্য পাওয়ার অধিকার সংক্রান্ত আইনের অধীনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মোট ৩৬৩ টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৮২ টি মামলা পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে। ৯৯ জন  ইন্সট্রাক্টরকে বরখাস্ত করা হয়েছে।  এখন পর্যন্ত বৃটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এমন হয়রানির শিকার নারীদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছে ২০ লাখ পাউন্ডের বেশি। এ মন্ত্রণালয়ের মতে, মিলিটারি পুলিশ গত বছর ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও হয়রানির কমপক্ষে ১১৩টি অভিযোগ তদন্ত করেছে। তবে অনেক  যৌন নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয় বলে অভিযোগ আছে। বিবিসি প্যানোরমা তদন্তে দেখেছে যে, নির্যাতিতরা যাতে পুলিশের কাছে রিপোর্ট না করেন বা অভিযোগ দাখিল না করেন সে জন্য কর্মকর্তারা তাদেরকে চাপ দিয়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ক্যাডেটদের সুরক্ষা দেয়ার বিষয়টিতে জোর দেয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা মুসলিম আয়মার বাগন যখন তার স্বামীকে জানান যে তার গর্ভাবস্থার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে মিয়ানমারের সৈন্যরা তাকে গণর্ধষণ করে, তখন তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান।
এরপর থেকে চেয়ে-চিন্তে জীবনধারণ করছেন আয়মার।
তিনি মিয়ানমারের বহু রোহিঙ্গা নারীর মধ্যে একজন, যারা রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর মাসের পর মাস চলা 'নির্মূল অভিযানের' সময় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হবার অভিযোগ করেন।
জাতিসংঘের আশঙ্কা, ওই অভিযান এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধের সমান।
বার্তা সংস্থা এএফপি সম্প্রতি মিয়ানমারের সরকারের পরিচালিত একটি সফরে রাখাইন প্রদেশে গিয়ে আয়মার বাগনের সঙ্গে কথা বলে।
তিনি কায়ার গং টং নামে একটি গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামে বার্তা সংস্থার সংবাদদাতা সরকারি লোকজনের অজ্ঞাতসারে একদল রোহিঙ্গা মহিলার সাথে কথা বলেন, যারা সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনা করেন সংবাদদাতার কাছে।
"সন্তান প্রসবের মাত্র কয়েকদিন আগে আমাকে ধর্ষণ করা হয়। আমার তখন নয় মাস চলছিল। তারা জানতো আমি গর্ভবতী, কিন্তু তাতেও দমেনি তারা," ছোট্ট একটি কন্যা শিশুকে কোলে নিয়ে বলছিলেন আয়মার বাগন। তিনি বলছিলেন, "এটা ঘটবার জন্য আমাকে অভিযুক্ত করে আমার স্বামী। একারণে সে অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করে আরেক গ্রামে গিয়ে থাকছে এখন।
আয়মার বাগনের বয়স মাত্র কুড়ি।
দুই সন্তানের মাতা হাসিন্নার বায়গনের বয়েসও কুড়ি। তিনি বলছেন, তাকেও পরিত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে তার স্বামী। কারণ গত ডিসেম্বরে তিনজন সৈন্য তাকে ধর্ষণ করেছিল।
এসব ঘটনা যখন ঘটছিল তখন রাখাইনের গ্রামগুলো ছিল পুরুষশুন্য, রয়ে গিয়েছিল শুধু মহিলা, শিশু আর বয়স্ক মানুষেরা।
সৈন্যদের ধর্ষণ করবার এসব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের সরকার।
এই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
কিন্তু বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৭৪ হাজার রোহিঙ্গাদের অনেকেই জাতিসংঘ তদন্তকারী এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর কাছে যেসব অভিযোগ জানিয়েছে, সেগুলোর সাথে এগুলো মিলে যাচ্ছে।
কায়ার গং টংয়ের রোহিঙ্গারা বলছে, তাদের গ্রামে পনেরোটির মত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে তিনটি ধর্ষণের ব্যাপারে তারা মামলা করেছেন, কিন্তু কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।
বাকিরা ভবিষ্যত হয়রানীর আশঙ্কায় অভিযোগ জানাতে চায়নি।
'কিছু মহিলা সম্মানহানির ভয়ে অভিযোগ জানায়নি', বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রামবাসী।
মানবাধিকারী গোষ্ঠীগুলো বহুদিন দরেই অভিযোগ করে আসছে যে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সীমান্তের জাতিগত সংঘাতগুলোতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশার শেষ নেই। দেশে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেদেশের সেনাবাহিনী। এমনকি জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্মূলের যে অভিযোগ এনেছে সেই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন মিয়ানমারের এখনকার মূল নেত্রী অং সান সুচি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসন পরিকল্পনার কথা বলেছে বাংলাদেশ সরকার। তবে তাতে তাদের ইতিবাচক সাড়া নেই। তারা চান তাদের বিষয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধান। তাদের অনেকেই বলেছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতার পক্ষে তারা। এমন সমঝোতার মাধ্যমে তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন। তাদের একজন দিলরুবা নামের এক শরণার্থী। তিনি বলেছেন, যদি এমনটা না হয় তাহলে আমাদেরকে বোমা দিয়ে মেরে ফেলুন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন পিবিএস নিউজআওয়ার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের দুর্দশা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে এমন প্রায় অর্ধ মিলিয়ন বা ৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে। তাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। ওই দ্বীপটি বসবাসের অনুপযোগী বলেও অনেকের মত রয়েছে। তবে সেখানে গাছ লাগিয়ে বসবাসের উপযোগী করার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার বিষয়ক কর্মী হাফেজ বলেছেন, যদি আমাদেরকে সেখানে পাঠানো হয় তাহলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো। আমরা মূল ভূখন্ডেই নিরাপদে আছি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ মাসে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৭০ হাজার। তবে এখানে তাদের জীবনধারণও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বর্ষা মৌসুমে ও ঘূর্ণিঝড়ে তাদের অনেক বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় নির্জন দ্বীপ ঠেঙ্গারচরে ৬০ হাজার রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করে এ সমস্যা সমাধান করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ পরিকল্পনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পিবিএসের রিপোর্টে বলা হয়েছে ঠেঙ্গারচর মূল ভূখন্ড থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। পলি মাটি জমে সৃষ্টি হয়েছে এ দ্বীপ। সেখানে যাতায়াতও খুব বিপদজনক। স্থানীয় সরকারের একজন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, অতীতে রোহিঙ্গারা মাদক সমস্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা পাচারের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ওই অঞ্চলে যেসব মানুষ বসবাস করেন তাদের মূল জীবিকা হলো মাছ ধরা। মিজানুর রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের এই খারাপ আচরণে প্রভাবিত হবেন স্থানীয়রা। এ জন্য তাদেরকে দেশের জনগণ থেকে আলাদা রাখাটাই যুক্তিযুক্ত। এ বিষয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় একজন বিশেষজ্ঞ হলেন ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেছেন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রধানত একটি বিপদজনক এলাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে আমরা বিশ্বাস করি ঝড়ের মাত্রা অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে। তাই তাদেরকে কংক্রিটে তৈরি ভাল অবকাঠামোতে রাখা উচিত। বিশেষ করে জরুরি অবস্থার কসময়। ওই রিপোর্টে বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পে বর্ণবাদী আমলের মানুষের মতো বসবাস করছেন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সেদেশের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে তাদেরকে। তাদের নেই কোনো নাগরিকত্ব। বিয়ে করতে গেলে তাদেরকে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এমন কি তারা নিজেদের গ্রামের বাইরে যেতে চাইলেও অনুমতি নিতে হয়। গত বছর ৯ই অক্টোবর রোহিঙ্গা জঙ্গিরা হত্যা করে মিয়ানমারের ৯ নিরাপত্তা কর্মীকে। তার প্রতিশোধ নিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। এতে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। তাদের বাড়িঘর, মসজিদ পুড়িয়ে দেয়া হয়। তবে এ অভিযোগকে বাড়িয়ে বলা হয়েছে বলে দাবি মিয়ানমার সরকারের। এর পর যে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন তার মধ্যে দিল নওয়াজ অন্যতম। তাকে সেনাবাহিনী গণধর্ষণ করেছে। তার চোখের সামনে তার স্বামীকে হত্যা করেছে তারা। তিনি বলেন, আমার চোখের সামনে রাস্তার ওপর আমার স্বামীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তারা। তারপর তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। সেনাবাহিনী তারপর নারীদের নিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে চলে যায়। তাদের কয়েকজনকে নিয়ে যায় আলাদা করে। ৫ সেনা সদস্য পর্যায়ক্রমে তাদেরকে ধর্ষণ করে। লোকজনের স্বর্ণালঙ্কার, আংটি, কানের দুল সব নিয়ে যায়। তারা শিশুদের হত্যা করে। এ জন্যই আমরা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। তবে রোহিঙ্গা হাফিজ বলেন, বাংলাদেশ ছোট্ট দেশ। ঘনবসতিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও তারা আমাদেরকে ঠাঁই দিয়েছে। এটা একটি বড় বিষয়। আমাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পাঠানোর চেয়ে মিয়ানমার সরকার যেন আমাদেরকে নাগরিকত্ব দেয় আমরা সেই দাবি করি। ৪৫ বছর বয়সী দিলবারের কণ্ঠে তীব্র হতাশা। তিনি বলেন, আমাদের জীবনের সব কিছু ফেলে, ত্যাগ করে এখানে এসেছি। যদি আমাদের জীবনে কোনো শান্তিই না থাকে তাহলে মরে যাওয়াই ভাল। মিয়ানমারে আমাদের শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। যদি আমাদেরকে এখন ওই চরে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেটাও হবে একরকম হত্যার সামিল। আমাদের পায়ের নিচে তো মাটি নেই।
শক্তিশালী চার আরব প্রতিবেশীর বর্জন শিথিল করার উদ্দেশ্যে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন কাতারের আমির।
সঙ্কট শুরু হবার পর প্রথম দেয়া ভাষণে শেখ তামিম বিন হামাদ আল-সানি বলেন, যেকোনো সমাধানই কাতারের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ হতে হবে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব গত জুনে সন্ত্রাসবাদে সমর্থন দেয়া এবং ইরানের সাথে মৈত্রীর অভিযোগে কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আমিরাত, বাহরাইন এবং মিসর। কিছুদিন পর তারা কাতারের কাছে কিছু দাবিও উত্থাপন করে। সন্ত্রাসবাদে সমর্থন দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে কাতার।
টেলিভিশনে দেয়া বক্তব্যে কাতারের আমির পদশটির বিরুদ্ধে ‘কলুষিত অপবাদের প্রচারণার’ নিন্দা জানান এবং দেশের জনগণের সহ্যশক্তির প্রশংসা করেন। ‘কাতারের জীবনযাত্রা স্বাভাবিকভাবেই চলছে’ বলেন তিনি।
তবে তিনি আরো বলেন ‘সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের দ্বন্দ্ব থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার সময় এসেছে।’
‘আমরা আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী’, যতক্ষণ পর্যন্ত কাতারের ‘সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধা করা হবে’, বলেন কাতারের আমির।
চারটি আরব দেশের অবরোধের কারণে তেলসমৃদ্ধ কাতার দেশটির ২৭ লাখ মানুষের জন্য সমুদ্র এবং আকাশপথে খাদ্য আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে।
আমিরাত থেকে ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার প্রমাণ আছে
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেই যে কাতারের সরকারি সংবাদমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে সাইবার হামলা চালানো হয়েছে সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রমাণ আছে বলে জানিয়েছে দোহা। বৃহস্পতিবার দোহায় এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দলের কর্মকর্তারা বলেন, এপ্রিলের শুরু থেকেই কাতার নিউজ এজেন্সি (কিউএনএ) হ্যাক করার পরিকল্পনা করা হয়।
২৪ মে গভীর রাত থেকে ২৫ মে ভোর পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। পরে কাতারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের আইটি বিশেষজ্ঞরা সাইটের নিয়ন্ত্রণ নেন। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প থেকে একটি ভিডিও উপস্থাপন করা হয়। ভিডিওতে বলা হয়, তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন ভিপিএন সফটওয়্যার ব্যবহার করে এপ্রিলের শুরুর দিকেই হ্যাকাররা কিউএনএর ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ করেছিল এবং ওয়েবসাইটটি স্ক্যান করেছিল।
মে মাসের শেষের দিকে কাতারের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কাতার নিউজ এজেন্ট (কিউএনএ) এবং সরকারি সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়। হ্যাকাররা কিউএনএর ওয়েবসাইটে একটি ভুয়া খবর যুক্ত করে দেয়। ওই খবরে দেখা যায়, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আলে সানি ইরান, হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলকে সমর্থন জানিয়ে মন্তব্য করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মতায় টিকে থাকবেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তবে শুরু থেকেই কাতার দাবি করে আসছে দেশটির আমির কখনই এ ধরনের মন্তব্য করেননি বরং কিউএনএর ওয়েবসাইট হ্যাক হয়েছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক খবরে বলা হয়, নতুন করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে হ্যাকিংয়ের সঙ্গে আমিরাতের সংযোগ রয়েছে। তারা জানতে পেরেছে গত ২৩ মে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের সিনিয়র সদস্যরা হ্যাকিংয়ের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। আর তার পরদিনই কাতার সরকারের সংবাদমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়। তবে আমিরাতি কর্তৃপক্ষ সরাসরি হ্যাক করেছে নাকি চুক্তির ভিত্তিতে কাউকে দিয়ে হ্যাকিং চালিয়েছে তা নিশ্চিত করা হয়নি। ওয়াশিংটন পোস্টে খবরটি প্রকাশের পরপরই তা নাকচ করে দেয় আরব আমিরাত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, খবরটি সত্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োজিত আমিরাতি দূত ইউরুফ আল ওতাইবা ওয়াশিংটন পোস্টের খবরটিকে নাকচ করে দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন : “আর্টিকেলে হ্যাকিং নিয়ে যা যা অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলোর কোনোটিই আমিরাত করেনি....এটাই হলো কাতারের সত্যিকারের আচরণ। তালেবান থেকে শুরু করে হামাস এবং গাদ্দাফি পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন ও সমর্থন দেয়াটা তাদের কাজ। সহিংসতায় উসকানি দেয়া, চরমপন্থাকে উৎসাহিত করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থিতিশীলতা নষ্ট করাটা কাতারের স্বভাব।’
কাতারের সন্ত্রাস দমন আইনে পরিবর্তন
এএফপি জানায়, কাতার বৃহস্পতিবার তাদের দেশের সন্ত্রাস দমন আইনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। দোহা ও তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে চরম সঙ্কটের ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিষয়গুলোর এটি ছিল অন্যতম। কাতারের বিরুদ্ধে চার আরব দেশের অভিযোগ হচ্ছে তারা বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে সহযোগিতা করছে। বৃহস্পতিবার কাতারের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কিউএনএর খবরে বলা হয়, সৌদি জোটের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই আইন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেখ তামিম বিন হামাদ আলে সানির ফরমানে ব্যক্তিবর্গ ও সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা প্রণয়ন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়। এতে সন্ত্রাসী, সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট অপরাধ, সন্ত্রাসী সংস্থা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আর্থিক সহযোগিতার বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আদালতের জারি করা এক সমনের পরিপ্রেক্ষিতে বরগুনার ইউএনও গাজী তারেক সালমনকে বরিশালের চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছিল। যে অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে, সেটি জামিনের অযোগ্য কোন অপরাধ নয়। আর সরকারেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা তিনি, একটি উপজেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তার জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়ে আদালত তাকে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেবেন, সেটা তিনি ভাবতেই পারেন নি।
"আদালতের নির্দেশ শুনে আমি খুবই অবাক হই, হতভম্ব হয়ে যাই। আমি কল্পনা করিনি যে আমার জামিন নামঞ্জুর করা হবে। একটি জামিন-যোগ্য ধারায় মামলাটি করা হয়েছে এবং যথাযথভাবে আদালতের সামনে আমার বক্তব্য উপস্থাপন করেছে আমার আইনজীবী। জামিন নামঞ্জুর করার পর আমাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। আমি খুবই অপমানিত বোধ করি।"
বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।
বরগুনা সদরের ইউএনও-কে হাতকড়া পরিয়ে জেলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হওয়ছেন বাংলাদেশের আরও অনেক মানুষ। যে ধরণের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছিল, সেরকম একটি মামলা যে করা যায়, আর সেই মামলায় একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী কর্মকর্তাকে এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া যায, তা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকেছে।
বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল মারাত্মক। তাদের একটি সংগঠনের তরফ থেকে বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনার নিন্দা করা হয়েছে। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কর্মকর্তারাও এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী।
কিন্তু কেমন করে এরকম একটি ঘটনা ঘটতে পারলো? এটি কি যা বলা হচ্ছে, আসলেই তাই? অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের 'বিকৃত ছবি' প্রকাশের কারণে হৃদয়ে আঘাত পাওয়া কোন মুজিব ভক্তের মামলা? নাকি এর পেছনে আছে অন্য কিছু?
বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে গাজী তারিক সালমন বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন, কিভাবে শিশুদের এক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শেষ পর্যন্ত এরকম একটি হেনস্থার শিকার হয়েছেন তিনি।
১৭ই মার্চ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিবসটি পালিত হয় জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে। সে উপলক্ষে আগৈলঝড়া উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস এইটের বাচ্চারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
"তখনই ঘোষণা দিয়েছিলাম যে যারা প্রতিযোগিতায় প্রথম এবং দ্বিতীয় হবে তাদের ছবি ব্যবহার করেই ২৬শে মার্চের কার্ডটি ডিজাইন করা হবে। এই প্রতিযোগিতার থীম ছিল বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ।"
ঘোষণা অনুযায়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া কার্ডটি ফ্রন্ট কাভারে এবং দ্বিতীয়টি ব্যাক কভারে ব্যবহার করে তার কার্ডটি ছাপান।
"আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবেই এই কার্ডটি ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেই। বাচ্চাদের একটা ছবি ব্যবহার করি বাচ্চাদের উৎসাহ দেয়ার জন্য। আমি কল্পনাও করিনি যে এই কার্ডটি নিয়ে আমাকে এ ধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। এবং আমার বিরুদ্ধে এরকম অমূলক একটি মামলা দায়ের করা হবে।"
গাজী তারিক সালমন জানান, কার্ডে তাদের পরিচিতিও লেখা ছিল তারা কোন ক্লাসে পড়ে। ছিল তারা যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তার নাম। বাচ্চাদের এই ছবি নিয়ে বিভ্রান্তির কোন অবকাশ ছিল না।
পুরস্কার বিজয়ী যে ছবিটি নিয়ে এত বিতর্ক, প্রথম যখন তিনি সেই ছবিটি দেখেন, তাঁর কি মনে হয়েছিল?
"ছবিটি প্রথম দেখে মনে হয়েছিল খুবই দৃষ্টিনন্দন এবং খুবই সুন্দর একটা ছবি। ক্লাস ফাইভের একটি বাচ্চা এটি এঁকেছে, এবং তার বয়স বিবেচনায় খুবই সুন্দর একটি ছবি। এটিকে বিকৃত বলার কোন সুযোগ নেই। এবং এটিকে কেউ যদি বিকৃত বলে, সে নিজেই আসলে বিকৃত মনস্ক।
তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কেন এই মামলা হলো? তাঁর কি মনে হয়?
"আমি আট মাস বরিশালের আগৈলঝড়া উপজেলায় কর্মরত ছিলাম। এসময় আমাকে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। সরকারী বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ যাতে সঠিকভাবে যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় সেজন্যে আমি তৎপর ছিলাম। কঠোর অবস্থানে ছিলাম। আমি সেখানকার আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করি। আমি অবৈধ স্থাপনা করতে দেই নি আমি যতদিন সেখানে ছিলাম। এসব কারণে সেখানকার প্রভাবশালীরা আমার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল। আমার অনুমান, তারা আমাকে হয়রানি করার জন্য বাদীকে দিয়ে এই মামলাটি করিয়েছে।"
এই মামলার কিছুদিন পরে তারিক সালমনকে বরগুনা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়।
যেদিন তিনি বরগুনা সদরে জয়েন করেন, সেদিন বরিশালের কয়েকটি আঞ্চলিক পত্রিকায় তাকে নিয়ে একটি খবর প্রকাশিত হয়।
"জুনের ৪ তারিখে প্রকাশিত সব কটি পত্রিকার রিপোর্টের ভাষা ছিল একই রকম। শিরোণামটি ছিল 'বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতকারী সেই ইউএনও অবশেষে বদলি'। এই খবরের প্রতিবাদ আমি সমস্ত পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু কোন পত্রিকা প্রতিবাদটি ছাপেনি।
আদালত প্রাঙ্গণে যা ঘটেছিল:
বিচারক যখন তার জামিনের আবেদন নাকচ করে দিলেন, কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন গাজী তারিক সালমন। তিনি বুঝতে পারেন নি, এরকম ঘটনা ঘটতে পারে।
"যখন আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তখনই আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তারা আমাকে বলেছিলেন মামলা যেহেতু হয়েছে, মামলাটি আইনগত-ভাবে মোকাবেলা করতে হবে।"
"আমাকে ঠিক গ্রেফতার করা হয়নি। আমার যে জামিনের আবেদন সেটি নামঞ্জুর করা হয়। তারপর আমাকে কোর্টের গরাদখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকে কারাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল। তখন আমি পুলিশকে অনুরোধ করেছিলাম, দয়া করে আমাকে একটু সময় দিন। আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানোর সুযোগ দিন।
গাজী তারিক সালমনের অনুরোধে পুলিশ তাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ দেন। দু ঘণ্টা তিনি ছিলেন আদালতের গরাদখানায়। বেলা দেড়টার দিকে আদালতের বিচারক পিয়ন পাঠিয়ে তাকে ডেকে পাঠান। তাঁর আইনজীবীকেও ডেকে পাঠানো হয়।
"আমি আদালতে যাই। এজলাসে যাই। কিন্তু বিচারক আমার মুখোমুখি হননি। তিনি খাস কামরায় বসে আমার জামিন মঞ্জুর হয়েছে মর্মে একটি আদেশ দেন। আদালতের পেশকার, তিনি আমার জেল পরোয়ানাটি আমার সামনেই ছিঁড়ে ফেলেন। তিনি আমাকে বলেন, আপনার কোন চিন্তা নেই। আপনার জেল পরোয়ানাটি ছিঁড়ে ফেলেছি।"
গত তিন দিন ধরে সারা বাংলাদেশ জুড়ে তাঁকে নিয়ে যে আলোচনা-বির্তকের ঝড়, তারপর এখন তিনি কি করবেন? তিনি কি কোন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছেন?
"এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। এব্যাপারে আমাদের সার্ভিসের এসোসিয়েশন রয়েছে। সবার সঙ্গে পরামর্শ করে আমি পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।"
"আমাকে যে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে, এটি মিডিয়াতে প্রকাশ হওয়ার পর, যে নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে, সমস্ত দেশবাসী আমার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সংবাদকর্মীরা আমার পক্ষে কথা বলেছেন। আমি এজন্য কৃতজ্ঞ। এজন্যে আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।"
সূত্র: বিবিসি
বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরকার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করেছে। সন্ত্রাসী সন্দেহে অনেক মানুষকে আটক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। তবে মাঝে মধ্যেই বিরোধী রাজনীতিক ও স্থানীয় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর উগ্রতা (ভায়োলেন্স) প্রদর্শন করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বার্ষিক সন্ত্রাস বিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিষয়ে এসব কথা বলেছে। ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর ওই রিপোর্ট প্রণয়ন করেছে ব্যুরো অব কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড কাউন্টারিং ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘২০১৬ কান্ট্রি রিপোর্টস অন টেরোরিজম’। এতে বাংলাদেশ অংশে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হামলার দায় স্বীকার করেছে আল কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট (একিইআইএস) ও আইসিস। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের উগ্রবাদী আদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং বাংলাদেশ থেকে তাদের অনুসারী সংগ্রহ করছে। আইসিস ও একিউআইএসের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন অনেক প্রকাশনায়, ভিডিওতে ও ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এ রিপোর্টে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রথমেই এসেছে গুলশানে হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ। এতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ১৮টি সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেছে আইসিস। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১লা জুলাই হলি আর্টিজান বেকারির হামলা। এটি একটি রেস্তরাঁ, যা কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত এবং এখানে বেশির ভাগই বিদেশিরা যাতায়াত করতেন। বাংলাদেশি ৫ হামলাকারী সেখানে বন্দুক, বিস্ফোরক ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে দু’পুলিশ কর্মকর্তা ও ২০ জিম্মিকে হত্যা করে। জিম্মিদের বেশির ভাগই ছিলেন বিদেশি নাগরিক। এরমধ্যে ৯ জন ইতালির। ৭ জন জাপানের। একজন মার্কিন। একজন ভারতীয় ও দু’জন বাংলাদেশি। যেসব মানুষ পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করে নিজেকে মুসলিম প্রমাণ করতে পেরেছেন হামলাকারীরা তাদের ছেড়ে দিয়েছে। এ ছাড়া বাকি যেসব হামলা হয়েছে তার বেশির ভাগই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অথবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর। এক্ষেত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোপানো হয়েছে। ২০১৬ সালে দুটি হামলার দায় স্বীকার করেছে একিউআইএস। এরমধ্যে ৬ই এপ্রিল হত্যা করা হয় বাংলাদেশি একজন অনলাইন কর্মীকে। আর ২৫শে এপ্রিল হত্যা করা হয় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের একজন স্থানীয় কর্মী ও তার বন্ধুকে। দুটি ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা চাপাতি ব্যবহার করেছে। সারা বছর জুড়ে বাংলাদেশে ছোটখাট বেশ কিছু হামলা হয়েছে। তবে এর দায়িত্ব প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ৭ই জুলাই শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজে হামলা। এতে দু’পুলিশ কর্মকর্তাসহ চারজন নিহত হন। আহত হন সাতজন। আইনপ্রয়োগ, সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে ওই রিপোর্টে বলা হয়, ২০১২ ও ২০১৩ সালে সংশোধিত ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন (এটিএ) পুরোপুরিভাবে প্রয়োগ করছে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা। যদিও বাংলাদেশের এই আইন সন্ত্রাসীদের নিয়োগ ও তাদের সফরকে নিষিদ্ধ করা হয়নি, তবু এতে ভাষাগত কিছু বিষয় আছে, যার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশন ২১৭৮ (২০১৪) প্রয়োগ করতে পারে বাংলাদেশ। এটা বিদেশি সন্ত্রাসী যোদ্ধাদের হুমকি সম্বলিত বিষয়। বিদেশি সন্ত্রাসী যোদ্ধাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইনের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান আইনের অধীনে বিদেশি সন্দেহভাজন যোদ্ধাদের অথবা এমন যোদ্ধাদের সহযোগিতা দেয়ার অভিযোগে অনেককে গ্রেপ্তার করেছে বাংলাদেশ। সীমান্ত, স্থলভাগ, জলভাগ ও বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণে সহযোগী করেছে বাংলাদেশ। সীমান্ত, স্থলভাগ, জলভাত ও বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘকেও সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে মনোযোগ দিয়েছে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তায়। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো শিপমেন্ট ২৮শে জুন বাতিল করে জার্মানি। এর মাধ্যমে তারা বৃটেন ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একই দলভুক্ত হয়। ইন্টারপোলের সঙ্গে আইন প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু তাতে নিখুঁত কোনো সন্ত্রাসী ওয়াচলিস্ট দেয়া হয়নি। যাত্রী সংক্রান্ত উন্নতমানের তথ্য ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশে। তাই বাংলাদেশের সীমান্তকে আরো সুরক্ষিত করতে স্ক্রিনিং বিষয়ক অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতামূলক কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নবগঠিত সন্ত্রাসবিরোধী ও বহুজাতিক অপরাধ বিষয়ক ইউনিট (সিটিটিসিইউ) তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে। তারা জাতীয় অনুমোদন পেয়েছে আগস্টে। ১৯-২০ শে ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ আহসানউল্লাহ বাংলা টিমের সন্দেহভাজন দু’জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এর মাধ্যমে বোমা তৈরির কারখানা আবিষ্কার ও তা ধ্বংস করে দেয়ার পথ তৈরি হয়। হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় সন্ত্রাসী হামলার পর বহু ঘেরাও দিতে বহু সংখ্যক সন্দেহভাজন জঙ্গিকে হয়তো ধরেছে না হয় হত্যা করেছে আইনপ্রয়োগকারীরা। এর মধ্যে ২৬শে জুলাই ঢাকার কল্যাণপুরে পুলিশ হত্যা করেছে সন্দেহভাজন ৯ জঙ্গিকে। সেখান থেকে পুলিশ আইসিসের পক্ষে বিভিন্ন জিনিসপত্র, বিস্ফোরক ও অন্যান্য অস্ত্র উদ্ধার করেছে বলে বলা হয়। নারায়ণগঞ্জে ২৭শে আগস্ট ঘেরাও অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে আইসিসের বাংলাদেশ প্রধান তামিম চৌধুরীকে হত্যা করে তারা। ১০ই সেপ্টেম্বর আজিমপুরে ও ৮ই অক্টোবর গাজীপুরে উল্লেখ করার মতো ঘেরাও অভিযান চালায় সিটিটিসিইউ ও র‌্যাব। আইসিসের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন সন্দেহজনক ব্যক্তিদের ধরতে এটা পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতামূলক কর্মসূচিতে অব্যাহতভাবে অংশগ্রহণ করছে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তারা সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এছাড়া আইন মন্ত্রণালয়ের বিচারিক দক্ষতার বিষয়েও প্রশিক্ষণ নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যোগাযোগ রয়েছে ইউএস স্পেশাল অপারেশন্স কমান্ড প্যাসিফিকের (এসওসিপিএসি)। বাংলাদেশি এমন বাহিনীর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ নেভি স্পেশাল ওয়ারফেয়ার অ্যান্ড ডাইভিং স্যালভেজ (এসডব্লিউএডিএস) ইউনিট, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফার্স্ট প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন ও বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আর্থিক অ্যাকশন টাস্কফোর্সের মতো আঞ্চলিক একটি সংস্থা এশিয়া/প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)-এর একটি সদস্য বাংলাদেশ। এগমন্ট গ্রুপ অব ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটস-এরও একটি সদস্য বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার বিরোধী ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টাকে বাস্তবায়ন করতে নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ। এপিজি’র ২০১৬ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এএমএল/সিএফটি মানসম্মত আন্তর্জাতিক মান টেকনিক্যালি বজায় রাখছে বাংলাদেশ। তা সত্ত্বেও দেশে এক্ষেত্রে যেসব প্রবিধান রয়েছে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রয়োজন। ওই রিপোর্টে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের প্রধান উৎস হলো অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গ্রুপ। তারা ক্ষুদ্র মাত্রায় ক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতিতে কাজ করে থাকে। যখনই অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে সন্ত্রাসীদের অর্থায়নের ঝুঁকির মুখে পড়েছে তখনই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে দেশের আইনপ্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। অন্য সব এজেন্সি থেকে তথ্য পাওয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বিএফআইইউকে। এর ফলে তারা উচ্চ মানসম্পন্ন বিশ্লেষণ করে। ভয়াবহ সন্ত্রাস মোকাবিলার বিষয়ে ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সন্ত্রাস মোকাবিলায় তৃণমূল পর্যন্ত পদক্ষেপ নিয়েছে সরকারের সংগঠনগুলো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জন সচেতনতা সৃষ্টিতে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে কাজ করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও এ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে এজন্য যোগাযোগ রাখছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা নিচ্ছে পুলিশ। এতে সন্ত্রাসীদের আত্মসমর্পণের বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে বলা হচ্ছে ইমামদের। এছাড়া পুলিশের রয়েছে কমিউটিনি পুলিশি ব্যবস্থা। আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। চিহ্নিত করা হচ্ছে নিখোঁজ ছাত্রদের। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের উগ্রবাদে ঝোঁকার চেষ্টা খর্ব করা হচ্ছে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে তিন শতাধিক নির্যাতিত নারীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বরগুনা জেলা পুলিশ সুপারের উদ্যোগে গঠিত ‘জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্র’। বরগুনার অতি দরিদ্র পরিবারের অসহায় নারীদের আস্থার প্রতীক এবং আশার আলো এখন ‘জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্র’। একইসাথে তিন শতাধিক নারীর জীবন বদলে দিলেন জেলা পুলিশ সুপার বিজয় বসাক।
বরগুনা শহরের সার্কিট হাউস সংলগ্ন নির্জন মাঠে একাকী একটি মেয়ে। হাতে বিষের বোতল। কয়েকজন খেয়াল করে বুঝলেন হয়তো আত্মহত্যার প্রস্তুতি। খবর চলে যায় জেলা পুলিশের কাছে। কয়েকজন নারী পুলিশের সহযোগিতায় ঘটনাস্থল থেকে বিষের বোতলসহ মেয়েটিকে আনা হয় বরগুনা জেলা পুলিশের ‘জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রে’।
মেয়েটির সাথে কথা বলে জানা গেল, তার বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায়। দাম্পত্য কলহের জের ধরে তার বাবা-মায়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন সংসার করছেন। মেয়েটি মেধাবী শিক্ষার্থী। মাস্টার্সে পড়ছেন তিনি। টিউশনি করে কোনোমতে চলে দুই বোনের পড়াশোনা। কিন্তু এর মধ্যেই এর ওর উত্ত্যক্ত করা। কথা শোনার বিষয়টি তো আছেই। একে তো নারী, তার ওপর পায়ে পায়ে তার নারী হওয়ার যন্ত্রণা। এমন পরিস্থিতিতে বিষপানে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন তরুণীটি। হতাশাগ্রস্ত সেই মেয়েটির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে তার দুঃখ ভুলিয়ে দেয় জেলা পুলিশের জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রের একটি দল। বরগুনার পুলিশ সুপার নিজেও কথা বলেন মেয়েটির সঙ্গে। যেকোনো সমস্যায় মেয়েটির পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। একপর্যায়ে মেয়েটি বুঝতে পারেন তার ভুল। বুঝতে পারেন আত্মহত্যার মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই। বুঝতে পারেন- জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে টিকে থাকার নামই জীবন। আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তিনি। ঠিক এভাবেই মমতার বাঁধনে জড়িয়ে দরিদ্র, বঞ্চিত, অসহায় এবং নির্যাতিত নারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিয়ে অনন্য এক উদাহরণ তৈরি করেছে বরগুনা জেলা পুলিশের জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাত্র আট মাসের ব্যবধানে এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নির্যাতনের শৃঙ্খল ছিঁড়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়েছেন বরগুনার বিভিন্ন গ্রামের তিন শতাধিক দরিদ্র অসহায় নারী।
বরগুনা জেলা পুলিশের একটি সমীক্ষায় দেখা  গেছে, বাংলাদেশের যেকোনো জেলার চেয়ে উপকূলীয় জেলা বরগুনায় নারী নির্যাতনের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। নানা কারণে এ জেলায় নারী নির্যাতন মামলার সংখ্যাও অন্য যেকোনো জেলার চেয়ে অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই দাম্পত্য জীবন এবং পারিবারিক কলহের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে এখানে নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনা ঘটে থাকে। সেসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভেঙে যায় সংসার। মামলা হয় নারী নির্যাতনের। মাসের পর মাস ধরে চলে মামলা। নারী অধিকার নিয়ে প্রায় দু’দশক ধরে বরগুনায় কর্মরত একটি উন্নয়ন সংগঠনের প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা হাসি বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অজ্ঞতা, অসেচতনতা এবং দারিদ্র্যের কারণে ভুক্তভোগী অসহায় নারীরা সঠিকভাবে আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন না। পারেন না নিজেদের নির্যাতন বা ভোগান্তির কথা খুলে বলতেও। ফলে একদিকে বিচারকাজ যেমন প্রলম্বিত হয়, তেমনি ভোগান্তি বাড়ে নারীদের। আর একবার নারীরা যখন তাদের স্বামী বা শ্বশুরকুলের বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নেন, তখন আর ওই স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির স্বজনরা ওই নারীকে সাধারণত মেনে নিতে চান না। ফলে রুদ্ধ হয়ে আসে সমঝোতার পথও। এসব বিবেচনায়, অসহায় দরিদ্র নারীদের পাশে থেকে আইনি পরামর্শের পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে নারী নির্যাতনের হার কমিয়ে আনতে বরগুনা জেলা পুলিশের উদ্যোগে স্থাপন করা হয় জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্র।
জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রের একজন সুবিধাভোগী বরগুনা সদর উপজেলার দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামের দরিদ্র গৃহবধূ মৌসুমী (ছদ্ম নাম) বলেন, নেশাগ্রস্ত স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি ছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী। একসময় মৌসুমীর এক স্বজনের মাধ্যমে অভিযোগ পেয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই ডেকে পাঠায় জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্র। দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে ভুক্তভোগী দম্পতির ঘনিষ্ঠ হয়ে যান জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রের সমন্বয়কারী জেলা পুলিশের নারী উপপরিদর্শক জান্নাতুল ফেরদৌস। পরে জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রের শাসন-বারণ আর পরামর্শের ভিত্তিতে একসময় নিজের ভুল বুঝতে পারেন তার স্বামী। মৌসুমী বলেন, বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক ভালো আছেন তিনি। জানা যায়, বরগুনা জেলা পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের অধীনে এ সহায়তা কেন্দ্রের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন একজন নারী উপপরিদর্শক (এসআই)। রয়েছে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি অভিযোগ গ্রহণ কমিটি। এছাড়া সার্বিক সহযোগিতার জন্যে স্থানীয় সমাজসেবক, উন্নয়নকর্মী, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও নারীনেত্রীসহ ২৫ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবক দলও রয়েছে জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রের সঙ্গে।
বরগুনা জেলা পুলিশের জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রের সমন্বয়কারী এসআই জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘২০১৬ সালের ১২ নভেম্বর থেকে আজ অবধি মাত্র আট মাসের মধ্যে জাগরণী নারী সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে তারা ২১৩টি পারিবারিক নির্যাতন, আটটি যৌতুক, ১৯টি ইভটিজিং, ১৬টি বাল্যবিবাহসহ প্রায় তিন শতাধিক অভিযোগের কার্যকরী সমাধান করেছেন। পাশাপাশি সাতটি অভিযোগকে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করা হয়েছে, নয়টি অভিযোগ লিগ্যাল এইডে পাঠানো হয়েছে এবং এখনও ২১টি অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন।
বরগুনার পুলিশ সুপার বিজয় বসাক জানান, সবার আগে সমাজের অসহায় মানুষের দুঃখ-দুর্দশার মুখোমুখি হতে হয় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকেই। তাই মামলা পরিচালনার সামর্থ্য নেই অথবা মামলায় আগ্রহী নন এমন দরিদ্র, অসহায় ও নির্যাতিত নারীদের ভোগান্তি লাঘবে পুলিশিং সেবার মধ্য দিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে জেলা পুলিশের উদ্যোগে এ সহায়তা কেন্দ্র গঠন করা হয়েছে।
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে গেরিলারা একে-৪৭কে উইকেট বানিয়ে ক্রিকেট খেলছে। এমন ‘সশস্ত্র’ ক্রিকেট খেলার ভিডিও ভাইরাল হয়ে ইন্টারনেটে বেশ আলোড়ন তুলেছে।
পাঁচ মিনিটের এ ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে যে একজন ক্যামেরাম্যানসহ ছয় গেরিলা একে-৪৭কে উইকেট হিসেবে বানিয়ে ক্রিকেট খেলছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ কাশ্মির থেকে এ ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমী গেরিলারা খেলার সময়েও তাদের অস্ত্র ত্যাগ করেননি বরং  তাদের পিঠে ঝুলছে আগ্নেয়াস্ত্র।
এ ছাড়া, খেলার তোড়ে গুলির বেল্টও খুলে রাখেন নি গেরিলারা; বরং ওটি যথারীতি কোমরে বাধা রয়েছে তাদের। ইউটিউবে একদিন আগে দেয়া ভিডিওটি এ পর্যন্ত ৮৭ হাজার বার দেখা হয়েছে।
মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি উপেক্ষা করার মতো নয়। দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধানী (ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং) মিশনকে তদন্ত করতে দেয়া উচিত। এমন মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘে নিয়োজিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি। এ খবর দিয়েছে পিটিআই।
খবরে বলা হয়, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশটির রাখাইন রাজ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ গত মাসে একটি কমিশন গঠন করে। কিন্তু মিয়ানমার ওই কমিশনের সদস্যদের মিয়ানমারে প্রবেশের জন্য ভিসা না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
নিকি হ্যালি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। নিহত হয়েছেন অনেকে। এছাড়া, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘শুধু জাতিগত পরিচয় বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হবে এটা ঠিক নয়। মিয়ানমার সরকারের উচিত এই তথ্য-অনুসন্ধানী মিশনকে কাজ করার অনুমোদন দেয়া।’ তিনি আরো বলেন, ‘জাতিসংঘ মিয়ানমারে যা ঘটছে তা উপেক্ষা করে যেতে পারে না। সরকার যাতে এই ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনকে সমপূর্ণ সহযোগিতা করে সে জন্য আমাদের এক হয়ে কাজ করতে হবে। এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন যদি তদন্ত না করতে পারে, তাহলে নির্যাতিতদের আসল সংখ্যা জানা যাবে না।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর জেনেভা শাখার পরিচালক জন ফিশার বলেন, ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের সদস্যদের ভিসার অনুমোদন না দেয়া মানে হচ্ছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হওয়া মানুষগুলোর মুখে চড় মারা। তিনি বলেন, ‘অং সাং সু চি’র সরকার কি ওইসব ক্ষুদ্র, কলঙ্কজনক দেশগুলোর মতো হতে চায় যারা মানবাধিকার পরিষদের সিদ্ধান্ত  প্রত্যাখ্যান করে? উত্তর কোরিয়া, ইরিত্রিয়া, সিরিয়া ও বুরুন্দি হচ্ছে মানবাধিকার বিরোধী দেশ। এই দেশগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে স্বাধীন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তদন্তে  বাধা দিয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিয়ানমার সরকারও কি তাই করবে?’ জাতিসংঘের ধারণামতে, গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চল থেকে ৯০ হাজার মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। এদের বিপুল অংশ আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী বাংলাদেশে।
স্পেনের সাবেক রাজা হুয়ান কার্লোসের প্রেমিকা ৫০০০। তাদেরকে তিনি শয্যাসঙ্গী করেছেন। এমনকি তিনি প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার ভালোবাসা পাওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন। তার সঙ্গে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এসব কথা ‘হুয়ান কার্লোস: দ্য কিং অব ৫০০০ লাভারস’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন সামরিক ইতিহাসবেত্তা মার্টিনেজ ইংলেস। এ খবর দিয়ে সচিত্র রিপোর্ট প্রকাশ করেছে লন্ডনের অনলাইন ডেইলি মেইল। স্পেনের বর্তমান রাজা ফেলিপ। তার পিতা হুয়ান কার্লোস। মার্টিনেজ ইংলেস তার বইয়ে লিখেছেন, রাজা ফেলিপের মা রাণী সোফিয়ার সঙ্গে বিয়ের পরও তার পিতা হুয়ান কার্লোস কয়েক শ’ নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। ওই বইয়ে হুয়ান কার্লোসকে সেক্স এডিক্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাবেক এই রাজার বয়স এখন ৭৯ বছর। বলাবলি আছে, তিনি যেসব নারীকে বাগে এনেছিলেন তাদের মধ্যে প্রিন্সেস ডায়ানা অন্যতম। এখন থেকে ৫ বছর আগে স্পেনের একজন লেখক লিখেছেন, হুয়ান কার্লোস ১৫০০ নারীর সঙ্গে শয্যা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু নতুন যে বইটির কথা বলা হচ্ছে তার লেখক মার্টিনেজ ইংলেস স্পেনের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত একজন পদস্থ কর্মকর্তা। তিনি হুয়ান কার্লোসের যৌন আসক্তির বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, মাত্র ৬ মাস সময়ের মধ্যে সাবেক রাজা কার্লোসের ছিল ৬২ জন প্রেমিকা। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সময়কে তার প্রেমময় সময় বলা হয়। এ সময়ে বিছানায় তিনি ২১৫৪ জন নারীর সঙ্গ ভোগ করেছেন। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যকার সময়টাকে তার জন্য ‘শীতকালীন সময়’ বলা হয়। এ সময়ে তার বয়স ছিল ৬৭ থেকে ৭৬ বছর। এ সময়ে তার প্রেমিকার সংখ্যা আস্তে আস্তে কমে আসতে থাকে। মার্টিনেজ ইংলেস লিখেছেন, এ সময়ে তিনি ১৯১ জন বিভিন্ন প্রেমিকার সঙ্গে শয্যা গ্রহণ করেছেন। তিনি যখন স্পেনের মিলিটারি একাডেমিতে ছিলেন তখন সাবেক রাকা কার্লোসের সঙ্গে ৩৩২ জন নারীর যৌন সম্পর্ক ছিল। মার্টিনেজ ইংলেস লিখেছেন, হুয়ান কার্লোসের সুপরিচিত প্রেমিকাদের যদি একটি তালিকা করা হয় তাহলে তা হয়ে উঠবে আইসবার্গের মতো বিশাল। উল্লেখ্য, এসব তথ্য প্রকাশ হওয়ায় সাবেক এ রাজার ভাবমূর্তিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ, তিনি লজ্জা পেতে জানেন না। এ নিয়ে অনেক বছর ধরে সমালোচনা আছে। ব্যাংকিং খাতে স্পেনের অর্থনীতিতে যখন ধস নামে তখনই তার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। তিনি নিজেকে একনায়কের মতো উপস্থাপন করতেন। তিনি শিকার করতে ভালোবাসতেন। স্কি খেলতেন। প্রমোদতরী ইয়াটে করে ঘুরতে পছন্দ করতেন এবং নারীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ককে ভালোবাসতেন। তিনি যে নারীভোগী তা স্পেনের মাদ্রিদের রাজ পরিবারের সবার কাছে এক ওপেন সিক্রেট। একবার তিনি সুটকেস গোছাতে থাকেন। স্ত্রী সোফিকে বলেন, তিনি টোলেডোতে শিকারে যাচ্ছেন। তার সঙ্গীরা সবাই পুরুষ। সেখানে সোফিকে নিলে তিনি বিরক্ত বোধ করতে পারেন। কিন্তু রাতের মধ্যভাগে সন্তানদের নিয়ে সেখানে গিয়ে হাজির স্ত্রী সোফি। তিনি রাজা হুয়ান কার্লোসকে সারপ্রাইজ দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখেন তার স্বামী অন্য নারীর সঙ্গে। তিনি হলেন মন্টিয়েল। এসব কিছুর পরেও তার পুরো পরিবার তাকে এ পথ থেকে সরে আসতে উৎসাহিত করে নি। মার্টিনেজ ইংলেস লিখেছেন, কার্লোসের বয়স যখন ১৬ বছর তখন তার জীবনে প্রথম প্রেমিকা আসে। ৬৬ বছর বয়সে শেষ রক্ষিতা আসেন। তিনি হলেন জার্মানিতে জন্ম নেয়া বিচ্ছেদপ্রাপ্ত কোরিনা জু সাইন-উইটজেনস্টেইন। রক্ষিতার প্রসঙ্গ যখন আসতো তখন তিনি কোনো বাছ বিচার করতেন না। মার্টিনেজ ইংলেস বলেছেন, রাজকীয় বিছানায় কার্লোস দু’ধরনের নারীকে নিতেন। তিনি ২৪ ঘণ্টাই সরবরাহ পেতেন অভিনেত্রী, তারকা, সংগীত শিল্পীদের। এর বাইরে ছিলেন বিভিন্ন সুন্দরী। তাদের আবার বেশির ভাগই বিদেশি। এসব কাজে তিনি ব্যবহার করতেন গ্রামের বাড়ি, ব্যক্তিগত এপার্টমেন্ট ও মাদ্রিদের চারপাশের হোটেলগুলো। কার্লোসের যৌন জীবনকে লেখক মার্টিনেজ ইংলেস কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত ১৯৫৪ সালের গ্রীষ্ম থেকে ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এ সময়টাকে প্রাপ্তবয়স্ক সময় বলা হতো। প্রথমেই তিনি শিকার করেন ইতালির সাবেক এক রাজার কন্যা মারিয়া গাব্রিয়েলা ডি সাবোয়া’কে। এর দু’বছর পরে তিনি স্পেনের মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার পদে যোগ দেন। সেখানে তিনি পরিচিত ছিলেন ক্যাডেট হুয়ানিতো নামে। সেখানে তিনি পেয়ে যান ৩৯৪ জন প্রেমিকা। ১৯৫৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্পেশাল মিলিটারি একাডেমিতে। তখন কার্লোস একজন টগবগে যুবক। এ সময়ে তিনি ২৩২ জন নারীকে শয্যাসঙ্গী করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পিরিয়ডে তার শিকার প্রেমিকার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ সময় তার প্রেমিকা ছিল ৪০৩ জন। কিন্তু পরের ৬ বছর তা কমে যেতে থাকে। কমতে কমতে তা দাঁড়ায় ৩৩৬। কেন এমনটা হয়েছে? কারণ, তখন তিনি বিয়ে করেছেন এবং তিন সন্তানের জনক হয়েছেন। এরপরেই তিনি ক্রাউন প্রিন্স হন ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে তার প্রেমিকা ছিলেন ৪৬৮ জন। ১৯৭৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিল তার শেষ সময়। এ সময়ে তাকে ক্ষমতা থেকে নেমে যেতে হয়। এ সময়ে তার শিকার হন ২৯৫৩ জন নারী।
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের সঙ্গে কথা হলে টের পাই স্যার কেমন পড়েন। শুধু যে বই বা রিপোর্ট পড়েন তা নয়, দিনে একাধিক খবরের কাগজ পড়েন। প্রতিদিনই ডেইলি স্টার-এরক্রসওয়ার্ড আর প্রথম আলোর সুডোকু মিলিয়ে ফেলেন, সকালে। কখনো বাসায়, কখনো গাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে। পড়ার এই অভ্যাস তিনি নিজেই তৈরি করেছেন। সেই মধ্য পঞ্চাশে এসএসসি পরীক্ষার পর প্রতিদিনই তিনি সদ্য চালু হওয়া পাবলিক লাইব্রেরিতে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার) সকালে চলে যেতেন, দুপুরে বাসায় খেয়ে এসে আবার লাইব্রেরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত চলত তাঁর বইপড়া। ছোটবেলা থেকে যেকোনো বিষয়ের বই পড়তেন, কোনো বাছবিচার ছিল না। সেই সময়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরে ‘আউট বই’ পড়ার ব্যাপারে অনেক পরিবারে আপত্তি থাকলেও স্যারের বাবা তাঁকে অনেক বই এনে দিতেন। দুনিয়ার আজব কাহিনি দিয়ে স্যারের আউট বই পড়া শুরু। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় পড়ে ফেলেছেন ‘দস্যু মোহন’ সিরিজের এক শ বই। বুয়েটে পড়ার সময় প্রতিদিন ক্লাস থেকে চলে যেতেন ব্রিটিশ কাউন্সিলে, কোনো কোনো দিন ইউএসআইএস লাইব্রেরিতে। নিউমার্কেটে সন্ধ্যায় গিয়ে নলেজ হোমে পড়ে ফেলতেন কোনো না কোনো বই! সব সময় বই পড়ার জগতে থাকার এই অভ্যাস স্যারের এখনো রয়েছে। স্যারের আপ্তবাক্য: ‘পড়ার সময় এখনই। বিষয় নিয়ে ভাবার দরকার নেই। শুধু পড়তে থাকো।’
এ শুধু জামিলুর রেজা স্যারের গল্প নয়। মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিলগেটসের কথা ভাবুন। কেমন করে তিনি জানলেন সফটওয়্যারেরই রয়েছে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ? উত্তর দিচ্ছেন, আমি পড়েছি। কেবল পড়েছি। এবং এখনো পড়ছি। বিল গেটস কেবল পড়েন না। তাঁর ভালো লাগার বইগুলো সম্পর্কে তাঁর পাঠক-অনুসারীকে জানিয়ে দেন। তাঁর নিজের লেখালেখির ব্লগ গেটসনোটের বড় অংশই কিন্তু বই, বই আর বই। পড়ো, পড়ো এবং পড়ো।
তো, কেবল ভবিষ্যৎ জানা, জ্ঞানের আকর কিংবা সম্পদশালী হওয়ার জন্য নয়। নির্মল আনন্দ পাওয়া বা বিনোদিত হওয়ার এমন আশ্চর্য মাধ্যম আর কীই বা আছে?
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ব্যায়াম যেমন শরীর ভালো রাখার জন্য দরকার, তেমনি বই পড়াটা হলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অতি দরকারি। গবেষকেরা বই পড়ার গোটা বিশেক সুফল তুলে ধরেন। এর মধ্যে কয়েকটা তো খুবই দরকারি।
বই পড়ার সময় আমাদের চোখ আর মন যে কেবল কাজ করে, তা নয়; বরং কল্পনাশক্তিরও একটি চর্চা হয়। মস্তিষ্ক থাকে সচল। ফলে বই পড়া হয়ে পড়ে মানসিক উদ্দীপনার একটি নিয়ামক। গবেষণা বলছে, মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা বড় উপায় হচ্ছে বইয়ের মধ্যে ডুবে যাওয়া। ঔপন্যাসিক আদ্রে জিদ যেমন বলতেন, বই দিয়ে নিজের একটা জগৎ গড়ে তুললে দরকারমতো সেখানে ডুব দেওয়া যায়। জ্ঞান কিংবা শব্দভান্ডারের বৃদ্ধি, নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জানা, এসব সুফলের কথা তো আমরা সবাই জানি। তবে বই পড়লে সবচেয়ে বেশি বাড়ে বিশ্লেষণী শক্তি। বেড়ে যায় সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। বেড়ে যায় স্বপ্ন দেখার শক্তিও।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে অন্যতম আলোচিত উদ্যোক্তা টেসলা ও স্পেসএক্স কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্কের কথাই ধরা যাক। এলনের বয়স যখন নয়, তখন তিনি এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (বিশ্বকোষ) সম্পূর্ণ পড়ে ফেলেছিলেন। সে সময় তিনি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি পড়তেন দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টা!!! কাজে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো এত্ত এত্ত স্বপ্ন আর সেটি পূরণের শক্তি কোথা থেকে আসে? তিনি নিজে বলেন, আমি পড়ি। যখনই সুযোগ পায় তখনই পড়ি।
যত পড়া হয় তত লেখার দক্ষতা বাড়ে, নিজেকে মেলে ধরার ক্ষমতা বিকশিত হয়। বই পড়তে হয় মনোযোগ দিয়ে, কখনো কখনো কল্পনাকে ছেড়ে দিলে ফোকাস হওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা তৈরি হয় নিজের মধ্যে।
এই যে পড়ার এক জাদুকরি সুফল, সেটি কেমন করে পাওয়া যাবে? সহজ উত্তর: পড়ো, পড়ো, পড়ো।
অনেকেই বলেন, পড়ার সময় পাই না। কাজের মধ্যে ডুবে থাকি, তাই পড়তে পারি না।
আসলে এটি একটি অজুহাত। ১৬-১৮ ঘণ্টা কাজের জগতে ডুবে থাকেন এমন মানুষেরা কিন্তু পড়তে থাকেন ফাঁক পেলে। কারণ পড়াটা হয়ে পড়েছে তাঁদের প্রাত্যহিকতার অংশ।
আপনি যদি ভালো পড়ুয়া হতে চান, তাহলে ‘পড়া’কে আপনার জীবনের অংশ করে ফেলতে হবে। ঢাকাবাসীর একটা বড় অংশ কেটে যায় রাস্তায়, যানজটে। সেই সময়টা বই পড়ায় দিয়ে দিন (বুক, ফেসবুক নয়!)। এখন অনেক বই আপনি পড়তে পারবেন আপনার স্মার্টফোনে। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ল্যাসিক এখন পাবলিক ডোমেইনে এবং এগুলোর ই-বুক পাওয়া যায় বিনা মূল্যে। ইন্টারনেট থেকে সহজে সেগুলো সংগ্রহ করা যায়। বাসায় যখন থাকবেন, তখনো কিছু কিছু পড়তে হবে। প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস জিইয়ে রাখার একটা ভালো বুদ্ধি হলো প্রতিদিন কমপক্ষে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকা পড়া।
সব সময় একটা বই হাতের কাছেই রাখতে পারেন। বিল গেটসের মতো অনেকেই একসঙ্গে দু-তিনটি বই পড়তে পারেন। অনেকেই একটার পর একটা পড়েন। নতুন করে বইয়ের প্রেমে পড়তে চাইলে অবশ্য সমান্তরালে কয়েকটা বই পড়া ভালো।
বই পড়াটাকে আপনি আপনার অভ্যাসে পরিণত করার আরেকটা উপায় হলো পড়া বই নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা। একসময় এ দেশে অনেক পাঠচক্র সচল ছিল। এখন সেটি নেই বললেই চলে। বন্ধুদের সঙ্গে কিংবা পারিবারিক আড্ডায় নতুন পড়া বই নিয়ে আলাপ করতে পারেন। যে বই পড়ছেন সেটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখাও যেতে পারে। আপনার দেখাদেখি অনেকেই আপনার সঙ্গে এই আলোচনায় যুক্ত হয়ে যাবেন।
চেষ্টা করলেই বই পড়াকে আপনি আপনার প্রাত্যহিকতার একটি অংশ করে ফেলতে পারবেন। বিভিন্ন গবেষণা বলে, বই পড়ার অভ্যাস করতে সারাক্ষণ একটা বই সঙ্গে রাখতে পারেন। প্রথম দিকে দিনে দুইটা সময় বের করে রাখেন। ১০ মিনিট হলেও ওই সময় কেবল পড়ুন। সময় নিয়ে একটা তালিকা করে ফেলতে হবে যে বইগুলো আপনি পড়তে চান। এই তালিকা কখনো ফুরাবে না। কারণ, নতুন নতুন বই এই তালিকায় যুক্ত করবেন আপনি। ছোট সন্তানদের বই পড়ে শোনান। একদম নিয়মিত। সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিন ওদের গল্প পড়ে শোনাবেন। ওদের মধ্যে যেমন পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে, তেমনি আপনি হয়ে উঠবেন একজন ভালো পড়ুয়া। হালকা মেজাজের, কৌতুক কিংবা মজার বইও পড়ুন। সম্ভব হলে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আজ কী পড়লেন, তার একটা সারাংশ লিখে ফেলুন নোটখাতায় কিংবা ফেসবুকের পাতায়।
বিশ্বাস করুন, ঠিক ঠিক তিন মাস যদি এ নিয়ম মেনে চলেন, তাহলেই আপনি হয়ে যাবেন একজন সর্বভুক পড়ুয়া। আপনার বই পড়ার জগৎ আনন্দময় হোক।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব আজ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সমর্থকদের হামলার শিকার হয়েছেন। আজ (বৃহস্পতিবার) তিনি নেপালি কবি ভানুভক্তের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শিলিগুড়ির কাছে পানিঘাটায় গেলে সেখানে নিগ্রহ ও হামলার মুখে পড়েন।
গৌতম বাবুর অভিযোগ, পানিঘাটায় ঢুকতেই মোর্চা সমর্থকরা কুকরি নিয়ে হামলা চালায় এবং তার গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখায়। বিক্ষোভকারীরা ইটবৃষ্টি শুরু করলে কোনোক্রমে তিনি ব্যাঙডুবির সেনা ছাউনিতে আশ্রয় নেন। পর্যটনমন্ত্রী এলাকা ছাড়ার পর পুলিশের একটি গাড়িতেও বিক্ষোভকারীরা ভাঙচুর চালায়।
মোর্চা সমর্থকদের প্রবল বাধার মুখে পড়ে শেষপর্যন্ত সরকারিভাবে পালিত হওয়া কবি ভানুভক্তের জন্মজয়ন্তী পালন অনুষ্ঠানস্থল পর্যন্ত যেতে পারেননি গৌতম দেব। মন্ত্রীর যাত্রা পথে পাথরের বড়ো বড়ো বোল্ডার ফেলে পানিঘাটার রাস্তা অবরুদ্ধ করে রাখে মোর্চা কর্মী-সমর্থকরা। এ সময় প্রায় ৬০টি গাড়ির কনভয়ে ব্যাপক পুলিশ বাহিনী থাকা সত্ত্বেও অবরোধ সরিয়ে এগোতে পারেননি মন্ত্রী। অবশেষে পানিঘাটা বাজার থেকে দু’কিলোমিটার আগে ৫ নম্বর মোড়ে রাস্তার উপর চেয়ার পেতে কবির ছবিতে ফুলের মালা দিয়ে মন্ত্রী সরকারি অনুষ্ঠান পালন করেন।
এদিকে, মোর্চা সমর্থকরা তিস্তা বাজারে সিকিমগামী ১০টি গাড়িতে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া কালিম্পঙে তামাং বোর্ডের চেয়ারম্যানের বাড়িতে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। দার্জিলিঙের ধত্রেয় বনবাংলো ও কালিম্পঙের তিস্তা বন বাংলোতে দুর্বৃত্তরা আগুন ধরিয়ে দেয়।
গতকাল বুধবার রাতে সুকনা গ্রাম পঞ্চায়েত সংলগ্ন ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর দুর্বৃত্তরা পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরফলে কার্যালয়ের বেশকিছু আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ওই ঘটনার সঙ্গে তারা জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন মোর্চা নেতা সুরেন প্রধান। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার পক্ষ থেকে দার্জিলিংয়ে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে সেখানে একমাসেরও বেশি সময় ধরে গণ আন্দোলন ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
গতকালই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দার্জিলিংয়ে খুব শিগগিরি শান্তি আসবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এদিন রাত থেকেই সেখানে সহিংসতা শুরু হয়েছে।