Last update
Loading...
ডনাল্ড ট্রাম্পের মুখে শোভন কথাবার্তা এতটা বেমানান লাগে যে, তার সবচেয়ে কট্টর সমর্থকটিও বোধ হয় বিস্মিত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রথম বর্ষপূর্তি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমার মনে পড়লো এক ওয়েস্টার্ন মুভির কথা, যেটি আমি বারবার দেখেছি ছোটবেলায়। ক্লিন্ট ইস্টউড অভিনীত ছবিটির নাম ‘দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি’। ডনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলের ৩৬৫ দিনকে আমি এই তিন কাতারে ফেলে পর্যালোচনা করবো।
দ্য গুড
ডনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকেই আমেরিকার অর্থনীতি যেন ফুলেফেঁপে উঠেছে। এই এক বছরে নতুন ২১ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে। অপরদিকে বেকারত্ব ৪.১%।
যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার বর্তমানে ৬.৮ শতাংশ। ৪৫ বছর আগে যখন কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের পরিসংখ্যান রাখার চর্চা শুরু হয়, তার পর থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বেকারত্বের হার এত কম কখনই ছিল না। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমেরিকার ইতিহাসে কৃষ্ণাঙ্গদের বেকারত্বের হার ৭ শতাংশের নিচে এর আগে কখনই নামেনি।
পাশাপাশি, ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। অবৈধ অভিবাসন কমেছে। ধারাবাহিক ৩ শতাংশ জাতীয় প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। তারপরও, শিগগিরই অনুষ্ঠেয় মধ্যকালীন (মিড-টার্ম) নির্বাচনে ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দল কংগ্রেসের একটি অথবা উভয় কক্ষ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
অর্থনীতি এত ভালো করা সত্ত্বেও কেন ভরাডুবির আশঙ্কা?
দ্য ব্যাড
ওয়াশিংটনের পেনসিলভ্যানিয়া অ্যাভিনিউর এক প্রান্তে হোয়াইট হাউস। অপরপ্রান্তে ক্যাপিটল হিল বা কংগ্রেস। উভয় প্রান্তের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রিপাবলিকান দল। এই নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী যে, ১৯২৯ সালের পর এই পর্যায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটির কখনোই ছিল না। সেই হিসেবে যে কেউ ধরে নেবে যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে প্রণীত স্বাস্থ্যসেবা বিল ওবামা কেয়ার বাতিল, আয়কর হ্রাস ও ওবামা আমলের রেগুলেশন প্রত্যাহার করার যে ইচ্ছে রিপাবলিকান দলের, তা পূরণ করা সহজ হবে। কিন্তু তা ভুল।
আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শক্ত নিয়ন্ত্রণের অভাবে বিভিন্ন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে রিপাবলিকান দলের বিভিন্ন অংশ প্রকাশ্যেই একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এই কারণেই ওবামা কেয়ার বাতিলে রিপাবলিকানরা ব্যর্থ হয়েছে। রিপাবলিকান দল আয়কর কর্তনের বিল পাস করাতে পেরেছে বটে। কিন্তু এর ফলে ডেমোক্রেটরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলটিকে ধনীদের হাতের পুতুল হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। অনেকেরই বিশ্বাস, ট্রাম্প যদি আরো দৃঢ়তার সঙ্গে এই বিল নিয়ে দরকষাকষিতে সম্পৃক্ত থাকতেন, তাহলে আরো  ভালো একটি আইন হয়তো পাস করানো যেত।
কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ২৪টি আসনে জিততে হবে ডেমোক্রেটদের। ইতিমধ্যে, ৩৮ জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা নভেম্বরের নির্বাচনের আগেই অবসর নিয়ে নিয়েছেন। রিপাবলিকানরা যদি একবার প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসন করার সম্ভাবনা বাস্তব হয়ে উঠবে।
দ্য আগলি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিজেকে পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যমের ‘ফেক নিউজে’র শিকার বলে উপস্থাপন করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি নিজেই নিজের প্রধান শত্রু। বাস্তব ও কল্পিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জবাব দিতে তিনি সার্বক্ষণিকভাবে টুইটার ব্যবহার করেন। এটি তার পদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তার আচরণ নিয়ে বিশ্বনেতারা রাগান্বিত না হলেও, হতবিহ্বল তো বটেই। ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে কথাবার্তা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একেই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কিন্তু এটি আসলে স্বাভাবিক অবস্থা নয়।
বর্ণবাদের অভিযোগ ট্রাম্পকে তাড়া করে ফিরছে। হাইতি ও আফ্রিকার গরিব দেশগুলো সম্পর্কে তিনি গত সপ্তাহে যে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, তাতে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও হতাশ হয়েছেন। বর্ণবাদ-বিরোধী কৃষ্ণাঙ্গ কিংবদন্তি নেতা ড. মার্টিন লুথার কিং-এর সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ্যেই দেশের প্রেসিডেন্ট বর্ণবাদী কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করছে। ট্রাম্প বুঝতে পারুন, আর না-ই পারুন, আমেরিকার জন্য এসব নিদারুণ অস্বস্তিকর।
ট্রাম্প সমর্থকদের যুক্তি, তার সোজাসাপ্টা কথা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার তাকে তার সমর্থকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু, বাস্তব কথা হলো, ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন ৩০ কোটি আমেরিকানের প্রতিনিধিত্ব করতে। এদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ, বাদামি, সমকামী, মুসলিম ও হিজড়ারাও আছেন।
দেশের সব গোষ্ঠীকে বাদ রেখে, শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত পুরুষদের সন্তুষ্ট করে দেশ চালানোর আশা করা কারও উচিত নয়। আমাদের বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। ডনাল্ড ট্রাম্প কি তা বোঝেন?
দ্য ফিউচার
পরবর্তী ৩৬৫ দিন পুরোটাই প্রেসিডেন্টের হাতে। তার হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ এখনো চলে যায়নি। যদি আমেরিকান অর্থনীতি শক্তিশালী থাকে। বিদেশে সংঘাত কমে আসে। তাহলে ২০২০ সালে পুনর্নির্বাচনের পথে তিনি সংহত অবস্থানে থাকবেন। কিন্তু যদি ‘ব্যাড’ ও ‘আগলি’ জিনিসগুলোই টিকে যায়, তাহলে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবেন। ২০২০ সালে ডেমোক্রেট দল থেকে তো বটেই, রিপাবলিকান দল থেকেও তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য লোকের অভাব হবে না।
(রব ক্রিস্টি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বিশেষ সহকারী ছিলেন। তার এই লেখাটি বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন: মাহমুদ ফেরদৌস।)
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের এক বছর পূর্তিতে কঠিন এক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে রয়েছে তার গৃহীত বিভিন্ন বিতর্কিত পদক্ষেপ। অন্যদিকে এখন সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি নতুন বাজেট নিয়ে সিনেটররা একমত হতে না পারায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম মাটিস বলেছেন, এ অবস্থায় তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ড শতকরা ৫০ ভাগই বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া কিছু রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়বে।
এ অবস্থায় করণীয় কি তা নিয়ে জোর তৎপরতা চলছে। এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট এবং হোয়াইট হাউজ রয়েছে রিপাবলিকান দলের নিয়ন্ত্রণে। এটাই এমন কোনো সরকারের জন্য প্রথম। তবে এ জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ডেমোক্রেটদের দায়ী করেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ। মধ্যরাতের সামান্য আগে হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি সারাহ স্যান্ডার্স বলেছেন, শুক্রবার রাতে তারা (ডেমোক্রেট) জাতীয় নিরাপত্তা, সেনা পরিবার, বিপন্ন শিশু এবং সব মার্কিনিকে আমাদের সেবা দেয়ার সক্ষমতার ঊর্ধ্বে রেখেছেন রাজনীতিকে। আমরা অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে কোনো সমঝোতা করবো না। অন্যদিকে তাদের অযৌক্তিক দাবির জন্য আমাদের বৈধ নাগরিকদের জিম্মি করেছে ডেমোক্রেটরা। পরাজিতদের বাধা সৃষ্টির এমনই আচরণ। এ আচরণ কোনো রাজনীতিকের হতে পারে না। আগামী ১৬ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের বাজেট বাড়ানো নিয়ে বিলটি সিনেটে  অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। বিলটি স্থানীয় সময় শুক্রবার মধ্যরাতে সিনেটে ভোটে দেয়া হয়। পাস হতে প্রয়োজন ৬০টি ভোট। কিন্তু পক্ষে বা বিপক্ষে কত ভোট পড়েছে তাৎক্ষণিকভাবে তা জানাতে পারে নি অনলাইন সিএনএন। তবে তারা বলছে, বিলটিকে আটকে দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সিনেটর ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১৬ মিনিটে সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককনেল ভোটের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। কিন্তু সিএনএন যা বলছে, তাতে বিলটি পাস হয় নি। ফলে সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা মিচ ম্যাককনেল ও সিনেট সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার সমস্যা উত্তরণের পথ খুঁজতে সিনেট চেম্বারে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানকার সূত্র উল্লেখ করে সিএনএন বলছে, আলোচনা চলছে। কিন্তু সেখানে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে।  বিলটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ বৃহস্পতিবার রাতে ২৩০-১৯৭ ভোটে পাস করে। ওদিকে মধ্যরাতের পর সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও চালু থাকবে অত্যাবশ্যকীয় সেবাখাতগুলো। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, পোস্ট, বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোর মেডিকেল সেবা, দুর্যোগ সহায়তা, কারাগার, আয়কর ও বিদ্যুত উৎপাদন খাত। বন্ধ হয়ে যাবে জাতীয় পার্ক ও স্মৃতিস্তম্ভগুলো। এর আগে এমন পরিস্থিতিতে ব্যাপক জনক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। তবে ভোটের কয়েক ঘন্টা আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক টুইটে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি ডেমোক্রেট সিনেট নেতা চাক শুমারকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে সঙ্কট উত্তরণের পথ খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তারা অভিন্ন সমাধানে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর এক ঘন্টা পরে চাক শুমার সাংবাদিকদের বলেছেন, কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে অনেক বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে। এর আগে একই পরিণতি হয়েছিল ২০১৩ সালে এবং তা স্থায়ী হয়েছিল ১৬ দিন। এবার বিলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে রিপাবলিকান ও  ডেমক্রেট সিনেটরদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এ কারণে বিলটি ভোটে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেটরদের নেতা মিচ ম্যাককনেল।
প্রথমটা কি হয়েছে? দ্বিতীয়টা কি হয়েছে? কোন স্টাইলে নির্বাচন হয়েছে? নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে ইঙ্গিত করে শামীম ওসমানের এমন বক্তব্যে তোলপাড় চলছে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে। অন্যদিকে বিএনপি বললো ‘থলের বিড়াল’ বের হতে শুরু করেছে। ১৬ই জানুয়ারি হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘাতের পরদিন বুধবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যের এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান এ মন্তব্য করেন। এরপর থেকেই তার এ মন্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যের ৮ মিনিটের মাথায় তিনি বলেন, গত এক বছর নির্বাচন পরিহার করার পরও কিভাবে নির্বাচন করেছি, কেমনে করেছি। প্রথমটা কি হয়েছে? দ্বিতীয়টা কি হয়েছে? শামীম ওসমান জোর দিয়ে বলেন- কোন স্টাইলে নির্বাচন হয়েছে। আমার সমস্যা হচ্ছে আমি সংগঠনটা খুব সিনসিয়ারলি করি বিধায় এই কথাগুলো বলতে পারি না।
কোথায় কি হয়েছে- এখনও মুখ খোলার সময় হয়নি। এক পর্যায় পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। তারপর বলবো কিভাবে কাকে পাস করানো হয়েছে। সে বিষয়ে আমি আসতে চাই না। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই। যে একটা বছর নির্বাচন করেছি, যা কিছু করার দরকার করেছি। ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য করিনি। আমার নেত্রী নির্দেশ দিয়েছেন নেত্রীর নির্দেশের জন্যই আমি আমার কাজ করেছি। এবং আমি আমার কাজ হান্ড্রেড পার্সেন্ট সততার সঙ্গে দলের প্রতি আনুগত্য রেখেই কাজ করেছি। আমি কোন ধন্যবাদ পাইনি। আমি তার (আইভী) ধন্যবাদ চাইও না। বিকজ আমি যা করেছি দলের জন্য এবং নৌকা মার্কার পক্ষে করেছি।
শামীম ওসমানের এই বক্তব্য রাইফেলস ক্লাবের বাইরে ছড়িয়ে পড়লে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, শামীম ওসমানের এ ধরনের বক্তব্য দেয়া ঠিক হয়নি? তার এই বক্তব্য সরাসরি দলের বিরুদ্ধে গেল। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনগুলোকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে সারাদেশে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন আলোচিত। বিভিন্ন টেলিভিশন টক শো’তেও নাসিক নির্বাচনকে একটি উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন শামীম ওসমান। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। দলের একজন এমপি হয়ে তিনি এ ধরনের কথা বা বক্তব্য দিতে পারেন না।
জেলা যুবলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদির বলেন, শামীম ওসমানের বক্তব্যটি অবশ্যই দলের বিরুদ্ধে গেছে। দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তার এই বক্তব্যকে অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে এবং একটি টিম করে বক্তব্যের রেকর্ডটি শোনার জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবলীগের পক্ষ থেকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। শামীম ওসমানের এমন বক্তব্যে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, মিথ্যা বলা শামীম ওসমানের একটি পুরনো চরিত্র। যখনই কোনো ঘটনা ঘটে সে বলে আমি সব জানি। কে করেছে, কারা করেছে। সময় হলে বলবো। ত্বকী মার্ডারের সময়ও সে একই কথা বলেছিল। মোটকথা নারায়ণগঞ্জে যখন কোনো ঘটনা ঘটে তখনই শামীম ওসমান মিথ্যার জোরে তার পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে। সে এত বেশি মিথ্যা কথা বলে যে, মুহূর্তেই বক্তব্য পরিবর্তন করতে পারে। বাংলাদেশের কোথাও মিথ্যা কথার প্রতিযোগিতা হলে শামীম ওসমান সেই প্রতিযোগিতায় প্রথম হবে।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, উনি যদি এ ধরনের কথা বলে থাকেন, উনি দায়-দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারবো না।
মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ আনোয়ার হোসেন দলের অধীনে হওয়া নির্বাচন নিয়ে একজন সংসদ সদস্যের এমন বক্তব্য নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে বিএনপি প্রশ্ন তুলতে পারে। তারা বলতে পারে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। দলের কর্মী হয়ে শামীম তা বলতে পারে না। এটা তো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বান্দ্বিক বক্তব্য হলো।
তিনি বলেন, প্রথম নির্বাচনটা আইভী দলের বাইরে গিয়ে করেছে। সেই নির্বাচনে আমরা সুন্দর সিটির জন্য আইভীর পক্ষে কাজ করেছি। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সে লাখো ভোটের ব্যবধানে শামীম ওসমানকে পরাজিত করে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও বারবার এই নির্বাচনকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের সুষ্ঠু রাজনীতির স্বার্থে জনগণ গত নির্বাচনে আইভীকে পুনরায় নির্বাচিত করেছে জানিয়ে আনোয়ার হোসেন বলেন, শামীমের কথা স্ববিরোধী। শামীম ওসমানের কথা আর বিএনপির কথা এক হয়ে গেলে এই দায় শামীম ওসমান নিজে নেবে। এখন প্রধানমন্ত্রী কি করেন আমরা সেই অপেক্ষায় আছি।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মানবজমিনকে জানান, এই ধরনের বক্তব্য তো দুঃখজনক, অনাকাঙ্ক্ষিত। যেহেতু কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ বিষয়টি টেককেয়ার করছে, দেখা যাক কি হয়।
এদিকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ শামীম ওসমানের বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যের মাধ্যমে ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন।
শামীম ওসমানকে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক দাবি করে তিনি বলেন, তার বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে এই সরকার মিথ্যাবাদী সরকার এবং দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
শামীম ওসমানের বক্তব্যের পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন দেয়ার বিএনপির দাবি আরো বেশি জোরালো হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল বলেন, কথায় আছে ‘বোয়ালের ডিম বোয়ালে ভাঙে’। শামীম ওসমান তার বক্তব্যে তা-ই করেছে। শামীম ওসমানের মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ যে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করতেছে। জাতীয় নির্বাচনে তারা যেটা করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচনে মানুষ যে ভোট দিতে পারেনি, তারা যে মানুষের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নিয়ে গেছে- এটা দিনের আলোর মতো প্রকাশ পেয়ে গেছে শামীম ওসমানের এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।
সাল ২০১৫। তুরস্কের সমুদ্র তীরে ভেসে আসা সিরিয়ান শিশু আয়লান কুর্দির মর্মান্তিক মৃত্যু স্তব্ধ করেছিল সারা বিশ্বকে। বিশ্ববাসীর কাছে মানবতার প্রশ্ন রেখে গিয়েছিল তিন বছরের এই শিশুর মৃত্যু। ইউরোপের শরণার্থী সঙ্কটের প্রতিভূ হয়ে উঠেছিল সমুদ্র তীরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আয়লানের নিথর দেহ।
আয়লানের মৃত্যু নাড়া দিয়েছিল বৃটিশ দম্পতি লেন ও ক্যারেনকও। লেন অ্যাব্রামস একজন ধর্ম যাজক।
পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। তার স্ত্রী ক্যারেন অ্যাব্রামস একজন লাইব্রেবিয়ান। আয়লানের মৃত্যুতে তারা এতোটাই মর্মাহত হন যে, তারা চেয়েছিলেন এইসব শরণার্থীদের পাশে দাঁড়াতে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে ইউরোপে পাড়ি জমানোর আশায় লাখ লাখ শরণার্থী বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় নামেন। যাত্রাপথে অনেকের সলীল সমাধি হয়। বাকিরা কোনমতে পৌঁছাতে সক্ষম হয় ইউরোপে। কিন্তু পৌঁছালেও তাদের দুর্দশার শেষ হয়নি। মাথাগোঁজার ঠাই ছিল না অনেকের। শরণার্থীদের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেন লেন ও ক্যারেন। সিদ্ধান্ত নেন অন্তত দু’-একজনকে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দেবেন। এই আতিথেয়তা শরণার্থীদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে ছোট্ট পদক্ষেপ বলে মনে করেন এই দম্পতি।
তারা প্রথমে আফগানিস্তানের এক মুসলিম যুবককে সাহায্য করতে এগিয়ে যান। ওই যুবক যখন বৃটেনের সারেতে পৌঁছায়, তখন একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া তার কাছে আর কিছুই ছিল না। মুসলিম ওই যুবককে নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দেন লেন ও ক্যারেন। তার জন্য হালাল খাবারের ব্যবস্থা করেন। তার নামাজ পড়ার সুবিধার্থে কেবলা নির্ণায়ক একটি অ্যাপও ডাউনলোড করেন।
আফগানিস্তানে বেড়ে ওঠার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোকে নিয়ে ওই যুবক অনেক ভ্রান্ত ধারণাও পোষণ করতেন। কিন্তু তিনি বলেন যে, লেন এবং তার স্ত্রীর উদারতা আঠারো বছরের সকল মিথ্যা ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে।
লেন আরও বলেন, এই ধরনের পরিবেশ থেকে যখন মানুষ আপনার বাড়িতে আসবে, তখন তাদের দৃষ্টিতে আপনি নিজের সমস্ত জিনিস দেখতে পাবেন। এসব আপনাকে নতুন করে জীবনের মূল্য বুঝাতে সাহায্য করবে। আর এসব শরনার্থীর বাড়িতে আশ্রয় দিতে পারা আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
তাদের এই প্রথম পদক্ষেপটি ফলপ্রসূ হওয়ার পরে তারা এখন তাদের দ্বিতীয় অতিথিকে আতিথেয়তা করছেন। মালাওয়ি থেকে আসা ৩৬ বছরের গ্রেস। সদাহাস্য গ্রেস সহজেই এই পরিবারটির সঙ্গে মিশে যান। লেন ও ক্যারেনের প্রতিও তার অসম্ভব ভালোবাসা রয়েছে বলেও জানান এই দম্পতি।
গ্রেসের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে ক্যারেন বলেন, দুর্বিষহ মুহূর্তেও গ্রেস এতোটা আশাবাদী এবং তার বিশ্বাস এতোটা জোরালো যে, সে অন্যদের উপর তার এই চারিত্রিক গুণের প্রভাব রাখতে পারে।
গ্রেস বলেন, আমার উপকারে আজ পর্যন্ত সকলে যা কিছু করেছেন, এই দম্পতির আতিথেয়তা তার মধ্যে সেরা। যখন আমি একা ছিলাম, সবসময় অস্থিরতা কাজ করতো। কিন্তু এখন আমার বসবাসের জায়গা আছে। আমি এখন মুক্ত। লেন এবং ক্যারেন দম্পতির সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে গ্রেস তিন মাস গৃহহীন ছিলেন। তিনি পার্কে, শপিং মলে এমনকি বাসেও ঘুমাতেন। তিনি বলেন, আমার প্রচুর বন্ধু ছিল। কিন্তু যখন আমি ঘরছাড়া হলাম, তখন তাদের আসল রূপ দেখতে পেলাম। তাদের আচরণে আমি খুবই ব্যথিত হয়েছিলাম। যে মুহূর্তে আপনি ঘর ছাড়া হবেন, আর আপনার বন্ধুরা মোবাইল বন্ধ করে রাখবে কিংবা বলবে যে তারা ব্যস্ত আছে, এটা আপনাকে সরাসরি না বলে ইঙ্গিতে বুঝানো হচ্ছে যে আপনি আর কল দিবেন না। মাঝেমধ্যে আপনাকে আসতে দেখে তারা তাদের জিনিসপত্র লুকোতে থাকবে। তারা চিন্তা করে, তাদের কাছে টাকা নেই, তারা মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করবে। কিন্তু আমি লেন এবং ক্যারেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে উপলব্ধি করেছিলাম তারা খুবই হৃদয়বান।
লেন জানান, আমাদের দুই সন্তান এখন আলাদা থাকে। কাজেই এতো বড় বাড়িতে শুধু আমরা দু’জন থাকি। গ্রেস আমাদের সঙ্গে থাকাতে বরং ভালোই হয়েছে। আমাকে প্রায়ই কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়। তখন ক্যারেন অন্তত একজন সঙ্গী পান। 
লেন পেশাগত কাজে বাইরে থাকলে ক্যারেন ও গ্রেসের সময়টা ভালোই কাটে। তারা মাঝে-মধ্যে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বনে হাঁটাহাঁটি করেন। লন্ডনের গ্লোব থিয়েটারেও বেড়িয়ে এসেছেন একসঙ্গে।
গ্রেস আরও বলেন, যে পরিবারটি আমাকে সাহায্য করেছে, তাদেরকে আমাকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে। কেউ কোনো অর্থ ছাড়া তাদের বাড়িতে থাকতে দিবে এটা বিশ্বাস করাটা কঠিন। কেননা এখানে খুব কম মানুষই আছে যারা তাদের বাড়ির দরজা আপনার জন্য খুলে দিবে। 
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট, গার্ডিয়ান
রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন পর্নো তারকা অলিভিয়া লু। মাত্র ২৩ বছর বয়সী এই তারকা রিহ্যাবে মারা যান। তার এজেন্সি শুক্রবার রাতে এ খবর নিশ্চিত করেছে। অলিভিয়া ভোলটায়ার নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। এ নিয়ে মাত্র তিন মাসের মধ্যে মারা গেলেন ৫ জন পর্নো তারকা। অলিভিয়ার এজেন্সি থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওষুধ গরমিল করে খেয়েছিলেন তিনি।
এ ছাড়া পান করেছিলেন এলকোহল। তার সঙ্গে অন্যান্য জিনিসের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। সম্প্রতি এই জগতের আরো যেসব তারকা মারা গিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ইউরি লুভ (৩১), অগাস্ট এমিস (২৩), শাইলা স্টালিজ (৩৫), অলিভিয়া নোভা (২০) উল্লেখযোগ্য।  এর মধ্যে নিজের এপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় অলিভিয়া নোভাকে। তার বিশেষ অঙ্গে সম্প্রতি ভয়াবহ এক সংক্রমণ দেখা দেয়। তারপরই এ অবস্থা হয় তার। ওদিকে ডিসেম্বরে রগরগে একটি দৃশ্যে অভিনয় করতে অস্বীকৃতি জানানোর পরে সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন অগাস্ট ইমিস। এরপরই তিনি আত্মহত্যা করেন। ওদিকে শুক্রবারে মারা যাওয়া সম্পর্কে অলিভিয়া লু’র এজেন্সি এলএ ডিরেক্ট মডেলস এক বিবৃতিতে বলেছে, আমরা জানতে পেরেছি যে, অলিভিয়া লু মারা গেছেন। তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। একজন মুখপাত্র বলেছেন, মাদকে আসক্তির সঙ্গে লড়াই করছিলেন অলিভিয়া লু।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে বেপরোয়া অর্ধশত কিশোর গ্যাং। যারা জড়িয়ে পড়েছে দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। সেবন করছে ইয়াবা, ফেন্সিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্য। আধিপত্য বিস্তারে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্রও।
এদের ছত্রছায়ায় রয়েছে নগর ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ গডফাদাররা, যা একের পর এক বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে স্কুল ছাত্রলীগের অপরপক্ষের ছুরিকাঘাতে কলেজিয়েট স্কুলের মেধাবী ছাত্র আদনান ইসফার (১৫) হত্যার পর।
আদনান ইসফার হত্যায় জড়িত আরমান, সাব্বির, মুনতাসির, মহিম ও আবু সাঈদও চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কর্মী।
যারা গ্রেপ্তারের পর পুলিশকে স্কুল ছাত্রলীগের নামে প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং এর তথ্য দেন বলে জানান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মোস্তাইন হোসাইন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট স্কুল, কাজেম আলী স্কুল এন্ড কলেজ, বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজেরা তজু উচ্চ বিদ্যালয়, নাসিরাবাদ সরকারি হাই স্কুলসহ সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন স্কুলে ‘স্কুল ছাত্রলীগের’ নামে এসব কিশোর গ্যাং গড়ে উঠে।
যারা নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, মেডিকেল হোস্টেল, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি, খুলশি, ফয়েস লেক, ডেবারপার, চান্দগাঁও শমসের পাড়া, ফরিদের পাড়া, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বেশ কয়েকটি এলাকায় মাদক বেচাকেনাসহ মোটরসাইকেল ও সাইকেল ছিনতাই, গান-বাজনা, খেলার মাঠ, ডান্স ও ডিজে পার্টি, ক্লাবের আড্ডাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ন্ত্রণে মরিয়া।
শুধু তাই নয়, এসব কিশোর গ্যাং চক্র মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের বেশির ভাগ ঘটনায় জড়িত। নিজ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক সময় তারা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালায়। এরকম নগরীর ১৬ থানা এলাকায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাং চক্রের তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, রাজধানীর উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ট্রাস্ট স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবীর খুন হয় ২০১৭ সালের ৬ই জানুয়ারি। এর ঠিক এক বছর ১০ দিন পর গত ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শহরের জামালখানে কিশোর গ্যাং স্টারে হাতে খুন হয় কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসফার। সেও নবম শ্রেণিতে পড়ে।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আবু সাঈদ ছাড়া ৪ জন নগরীর চান্দগাঁও থানার হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আর এ হত্যাকাণ্ডে ছুরিকাঘাতের মূল হোতা মঈন উদ্দিন হাজেরা তজু উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। পুলিশ এখনো তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। 
পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মোস্তাইন হোসাইন আরো জানান, গত এক দশকে চট্টগ্রাম শহরের জামালখান এলাকায়ও একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান ঘটে। সামপ্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব গ্রুপের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠে।
তিনি জানান, আদনান ইসফারকে ছুরিকাঘাতে হত্যার পর গ্রেপ্তারকৃত আরমান, সাব্বির, মুনতাসির, মহিম ও আবু সাঈদ নগরীর চকবাজার থানা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আবদুর রউফের চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাড়িতে আশ্রয় নেয়। আদনান হত্যায় খুনি কিশোরদের হাতে পিস্তল তুলে দেন আবদুর রউফ।
আদনান ইসফারও জামালখান এলাকার ছাত্রলীগ নেতা সাব্বিরের অনুসারি স্কুল ছাত্রলীগ নেতা। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আগে থেকেই এই দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে বিরোধ ছিল। সেই সূত্র ধরে সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ মাঠে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে আদনান ইসফারকে খুনের পরিকল্পনা করে মঈন উদ্দিন। এভাবে রাজনীতিক ছত্রছায়ায় নগরীর সবকটি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ লেগে থাকলেও আদনান ইসফার হচ্ছে প্রথম বলি। 
নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক সমর্থন, বিপুল অর্থপ্রাপ্তি, এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপের উত্থান। এরমধ্যে কাজেম আলী স্কুল মার্কেটের মামার দোকানে জিলহস গ্রুপ, জামালখান আংকেলের দোকান ও দেবপাহাড়ে রনি, সাফায়েত ও ফাহিম গ্রুপ, জামালখানে সাব্বিরের আরো একটি গ্রুপ, মেজ্জান হাইলে আইয়্যু রেস্তরাঁর কাছে খালার দোকানভিত্তিক আলাদা কিশোর গ্যাং গ্রুপ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
তাদের বিচরণ আন্দরকিল্লা মোড় থেকে রহমতগঞ্জ হয়ে গণি বেকারি সীমানাও ছাড়িয়ে গেছে। তারা সামান্য কথা কাটাকাটিতে একজন অন্যজনকে চিৎকার করে মোবাইলে ফোন দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সদলবলে হাজির হয়। এরপর চলে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর এমনকি দোকানপাট ভাঙচুর। কোনো এক জায়গায় বসা নিয়ে কথিত বড়ভাইদের সঙ্গে ছোটভাইদের কথা কাটাকাটি থেকেও ঘটে যায় বড় ধরনের সংঘর্ষ। তারা ফুটপাথে রাতে বিকট শব্দে আতশবাজি ফাটিয়ে জন্মদিন উদযাপন করে।
প্রায় তিন বছর আগে জামাল খান সড়কের র‌্যাংগস বিক্রয় ও প্রদর্শনী কেন্দ্রের পাশে শফিউল্লাহ নামের এক ব্যবসায়ীর ফটোকপির দোকান ছিল। এক কিশোর সেখানে একটি ফটোকপি করতে যায়। ফটোকপি করাকে কেন্দ্র করে শফিউল্লাহর সঙ্গে ওই কিশোরের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। কিন্তু ১০ মিনিটের মধ্যে একদল কিশোর এসে শফিউল্লাহর ওপর হামলা চালায়। তার ফটোকপির মেশিন ও দোকানের কাচ ভেঙে দেয়া হয়। শফিউল্লাহকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফুটপাথে ফেলে রাখা হয়। জ্ঞান ফেরার পর তাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়।
ওই ঘটনার পর শফিউল্লাহ আর দোকান খুলতে পারেনি। দোকান ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনায় মামলা না করার জন্যও তাকে শাসিয়ে দেয়া হয়। ফলে মামলাও করেনি। কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি পোষাতে না পেরে তিনি ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত চাকরি শুরু করেন।
গত একদশকেরও কম সময়ে অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত নগরীর জামাল খান সড়কে অনেক বহুতল ভবন গড়ে ওঠে। এসব ভবনে ফ্ল্যাট কেনেন সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা। অনেকে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। এসব ব্যক্তি নিজেদের সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। ফলে ১৪ বছর থেকে শুরু করে ১৮/২০ বছরের এসব ছেলে হয়ে ওঠে বেপরোয়া।
চট্টগ্রাম মহানগরীর অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, কিশোর অপরাধ বন্ধ করতে পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন দরকার। এখন তো সামাজিক অনুশাসন বলতে কিছুই নেই। এ অবস্থায় পারিবারিক অনুশাসন বাড়াতে হবে। সামাজিক অনুশাসন যেটা চলে গেছে, তা পুনরুদ্ধার করতে হবে। কিশোর অপরাধীদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক সহযোগিতা থাকলে তা অবশ্যই বন্ধ অথবা প্রত্যাহার করতে হবে। যেসব বড় ভাই তাদের ইন্ধন দেয়, তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে অপরাধীদের নামের তালিকা ইতোমধ্যে তৈরির কাজ শুরু করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। নগরীর ১৬টি থানার ওসিদের এ তালিকা তৈরি করে এক সপ্তাহের মধ্যে পুলিশ কমিশনার বরাবরে পাঠানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তালিকায় কোন থানায় কতজন কিশোর অপরাধী রয়েছে, তারা কখন কোথায় অবস্থান করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ অ্যাকশনে যাবে।
আনকাট, বিটিআর ও বিডব্লিউআর—এই তিন ধরনের কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, সেটি পাটশিল্পের ওপর কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। পাটকল মালিকদের অনুরোধে গত বৃহস্পতিবার পাটবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাটকল মালিকদের অভিযোগ ছিল, বিদেশে কাঁচা পাট নির্বিচারে রপ্তানির কারণে পাটের অভাবে অনেক সময় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। এটি পাট খাতের বহুবিধ সমস্যার একটি। আবার পাটচাষি বা উৎপাদকদের অভিযোগ, বিদেশে রপ্তানি বন্ধ হলে দেশীয় পাটকল মালিকেরা যে দাম তাঁদের দেন, তাতে তাঁদের উৎপাদন খরচই ওঠে না। বেশ কয়েক বছর আগে ভারত কাঁচা পাট আমদানির ওপর বিধিনিষেধ জারি করলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে জানানো হয়েছিল। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
পাটকল মালিকদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে যাতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। চাষিরা দেশে পণ্যের ভালো দাম পেলে বিদেশে কেন রপ্তানি করতে যাবেন? বেসরকারি পাটকল মালিকেরা যখন কারখানা চালু রাখতে পাট রপ্তানি বন্ধের তদবির করছেন, তখন রাষ্ট্রমালিকানাধীন পাটকলগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। বর্তমান সরকারের আমলে চালু অধিকাংশ সরকারি পাটকল ফের বন্ধ হয়ে গেছে এবং শ্রমিক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতনও পাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত। বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে কোনো কারখানা চলতে পারে না। যে দেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কার করতে পারেন, যে দেশকে বহির্বিশ্ব সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে চেনে, সেই দেশে ফের পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা কঠিন নয়। বাইরের দুনিয়ায় যখন পরিবেশসম্মত পণ্য হিসেবে পাটের ব্যবহার বেড়েছে, তখন বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? পাটের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। পাটের উৎপাদক, পাটকল মালিক, শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ সমুন্নত রেখে পাট খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারপন্থী ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মীর অন্যায় কার্যকলাপের কারণে অচলাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগে ছাত্রলীগের সাত নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন শুরু করেছেন, ন্যায্যতার সঙ্গে তার সুরাহা করা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি সে পর্যন্ত গড়ানোর আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজধানীর বড় সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বলপ্রয়োগ, ছাত্রীদের গালাগাল ও উত্ত্যক্ত করা এবং সর্বোপরি আন্দোলনের সমন্বয়কারীকে প্রহার করা অন্যায় হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অন্যায়ের শিকার শিক্ষার্থীদের কথা আমলে না নিয়ে উল্টো তাঁদের প্রহৃত সমন্বয়কারীকেই থানায় সোপর্দ করেছিল, থানায় তাঁকে ২৮ ঘণ্টা আটকে রেখে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দৃশ্যত ছাত্রলীগের পেশিশক্তি ও পুলিশি পদক্ষেপের ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের পথে গিয়েছে, কিন্তু তার ফলে আন্দোলন দমিত হয়নি, বরং শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করেছিলেন।
শেষ পর্যন্ত প্রক্টর ও খোদ উপাচার্যকে আশ্বাস দিতে হয়েছে যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, কিন্তু তাতে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। আবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড তদন্তের জন্যও একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপরন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ও প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেছেন। এ জন্য তাঁরা আগামীকাল রোববার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপলব্ধি করা উচিত যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রশমন করতে হলে তাঁদের দাবির প্রতি সুবিবেচনার প্রকাশ ঘটে, এমন পদক্ষেপ অবশ্য নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করে সমস্যার সমাধান হবে না। আমরা আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য নষ্ট হয়, এমন কোনো আচরণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা করবেন না, তাঁরাও যথাযথ সংযম, সুবিবেচনা ও যুক্তি-বুদ্ধির পরিচয় দেবেন। আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি থেকে শুরু হয়নি, এটা তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। সুতরাং তাঁদের কথা আন্তরিকভাবে আমলে নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁদের সঙ্গে সৎ, আন্তরিক ও ন্যায্য আচরণ করলে তাঁরা অবশ্যই তা মেনে নেবেন।
গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই) ৬৫টি নিম্ন আয়ের দেশে শিক্ষা বিস্তারের এক ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এর যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের উন্নয়নবিশারদদের ভাষায় ‘শূন্যস্থান পূরণ’ পর্ব, যার অর্থ হলো, শূন্য তহবিল পূরণ করতে দাতাদেশগুলোকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এই উদ্যোগের জন্য বছরে যে মাত্র ১০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, সবার জন্য শিক্ষা অ্যাজেন্ডার প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর অঙ্গীকার কতটা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কখনোই এ ব্যাপারে অতটা মাথা ঘামায়নি। রোগ বা মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা গেলে তারা কখনো কখনো এইডস, ম্যালেরিয়া ও ইবোলার মতো রোগের পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। মানুষের জীবন রক্ষার্থে এবং রোগটিকে তাদের দেশে আসতে বাধা দিতে তারা সেটা করেছে। কিন্তু শিক্ষার প্রসঙ্গে দেখা যায়, পশ্চিমের অনেক দেশ বিদ্যালয় নির্মাণের চেয়ে দেয়াল ও নির্যাতন শিবির নির্মাণে বেশি আগ্রহী। সারা পৃথিবীতে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারে জিপিই দারুণ কাজ করছে। দাতাদেশগুলো অনেক আগেই সবার জন্য শিক্ষার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তাদের উচিত হলো, জিপিইর মতো বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিকে সাহায্য করার জন্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। কিন্তু উদার দাতারা কালেভদ্রে সেটা করে থাকে। এই বাস্তবতার জন্ম সাম্রাজ্যিক যুগে। যখন আফ্রিকা ও এশিয়ার সিংহভাগ ইউরোপীয় শাসনের অধীনে ছিল, তখন সেই ঔপনিবেশিক শাসকেরা মৌলিক শিক্ষায় খুব সামান্যই বিনিয়োগ করতেন। ১৯৫০-এর দশকের শেষ ভাগে জাতিসংঘের তথ্যানুসারে ইউরোপের আফ্রিকান ও এশীয় উপনিবেশগুলোতে সাক্ষরতার হার ছিল খুবই কম। ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের সাক্ষরতার হার ছিল ১৫-২০ শতাংশ। নেদারল্যান্ডসের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় ইন্দোনেশিয়ার সাক্ষরতার হারও ছিল একই রকম। ফরাসি উপনিবেশ পশ্চিম আফ্রিকায় ১৯৫০-এর দশকে সাক্ষরতার হার ছিল ১ থেকে ৫ শতাংশ।
স্বাধীনতার পর আফ্রিকান ও এশীয় দেশগুলো মৌলিক শিক্ষা ও সাক্ষরতার বিস্তারে ব্যাপক পদক্ষেপ নেয়। তা সত্ত্বেও এই সুযোগে ক্ষতিপূরণ না করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিস্তারে যৎসামান্য টাকা দিয়েছে। যদিও তারা সবার জন্য শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৪-এর বাস্তবায়নে গভীর অঙ্গীকার করেছে, যার মাধ্যমে সবার জন্য প্রাক্প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে শিক্ষায় অনুদান প্রকৃত অর্থে কমেছে। সর্বসাম্প্রতিক তথ্যানুসারে আফ্রিকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় দাতাদের অনুদানের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার। এর একটু তুলনা করলে দেখা যাবে, পেন্টাগনের দৈনিক বাজেট ২০০ কোটি ডলার। আফ্রিকায় স্কুলগামী শিশুদের সংখ্যা ৪২ কোটি, অর্থাৎ শিশুপ্রতি বছরওয়ারি মোট অনুদানের পরিমাণ তিন ডলার। ব্যাপারটা এমন নয় যে পশ্চিমা সরকারগুলো জানে না কত টাকা দরকার। একাধিক সাম্প্রতিক বড় হিসাবে জানা যায়, এসডিজির চতুর্থ অভীষ্ট বাস্তবায়নে কী পরিমাণে বাহ্যিক অর্থায়ন দরকার। ইউনেসকোর সমীক্ষায় দেখা যায়, এতে বছরে ৩৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার লাগবে। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের নেতৃত্বাধীন ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন ফাইন্যান্সিং এডুকেশন অপরচুনিটিও বলেছে, এই খাতে প্রতিবছর প্রায় এই পরিমাণ টাকা লাগবে। আর সে কারণেই অনুদান জরুরি। আফ্রিকায় একজন ছাত্রের শিক্ষা বাবদ বছরে অন্তত ৩০০ ডলার প্রয়োজন (খেয়াল করুন, ধনী দেশগুলো প্রতিবছর মাথাপিছু কয়েক হাজার ডলার ব্যয় করে)। আফ্রিকার স্কুলগামী ছাত্রের সংখ্যা তার জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সে কারণে তার মাথাপিছু ১০০ ডলার প্রয়োজন। তারপরও এটা আফ্রিকার একটি দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ১০ শতাংশ। এই শূন্যতা পূরণ করতে পারে বাহ্যিক অর্থায়ন। তবে সেটা হচ্ছে না। সাবসাহারা আফ্রিকায় স্কুলগামী প্রতিটি শিশুর পেছনে বার্ষিক যে ব্যয় হয়, তা চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। ফলে অধিকাংশ শিশু মাধ্যমিক স্কুল শেষ করার পর্যায়ে যেতে পারে না। তারা অনেক আগেভাগে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। কারণ একদিকে সরকারি স্কুলে তাদের জায়গা হয় না, অন্যদিকে বেসরকারি স্কুলের টিউশন ফি অনেক বেশি। বিশেষ করে, মেয়েরা দ্রুত ঝরে পড়ে, যদিও অভিভাবকেরা জানেন, সব শিশুর মানসম্পন্ন শিক্ষার চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা আছে। ফলে যেটা হয় তা হলো, দ্রুত ঝরে পড়ার কারণে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীরা যে দক্ষতা অর্জন করে থাকে, সেটা তারা অর্জন করতে পারে না। অনেকেই তখন জীবিকার জন্য মরিয়া হয়ে ইউরোপে পাড়ি জমায়। ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যেতে গিয়ে অনেকেই ডুবে মরে। অনেকেই আবার সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়ে আফ্রিকায় ফেরত যায়। এবার জিপিইর শূন্যস্থান পূরণের পর্বে আসি, যেটা ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে সেনেগালে হতে পারে। এদের অন্তত বছরে এক হাজার কোটি ডলার পাওয়া উচিত, যেটা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর চার দিনের সামরিক ব্যয়ের সমান। আফ্রিকায় সর্বজনীন মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে এটি জরুরি। কিন্তু জিপিই সারা পৃথিবীর জন্য বছরে ১০০ কোটি ডলার ভিক্ষা চাইছে। পশ্চিমা নেতারা প্রকৃত অর্থে শিক্ষার সংকট সমাধান না করে একের পর এক বক্তৃতা দেন এবং এক বৈঠক থেকে আরেক বৈঠকে যান। তাঁরা সবার জন্য শিক্ষার নীতির প্রতি ভালোবাসার কথা বলে বেড়ান। আফ্রিকাজুড়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক সমাজের নেতারা যা পারেন, তা করে যাচ্ছেন। ঘানা সম্প্রতি সবার জন্য উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ঘোষণা দিয়ে মহাদেশটির গতি ঠিক করে দিয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যপূরণে টাকার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সে জন্য নতুন অংশীদার, বেসরকারি কোম্পানি ও উচ্চস্তরের ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত। মূলধারার দাতারা অনেক সময় নষ্ট করেছেন, যেটা এখন তাঁদের পূরণ করতে হবে। শিক্ষার চাহিদা কখনো কমবে না। কিন্তু যাঁরা শিশুদের চাহিদার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, ইতিহাস তাঁদের কঠিন বিচার করবে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।
জেফরি ডি স্যাক্স: যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়নের অধ্যাপক।
উচ্চৈঃস্বরে গান বাজানোর প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ওয়ারীতে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার নাম নাজিমুল হক (৬৫)। তিনি অবসর প্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে গোপিবাগ প্রথম লেনের বিপরীতে অবস্থিত লা ক্রিসেন্দ্রা অ্যাপার্টমেন্টে এ ঘটনা ঘটে। একই অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দা ও সেক্রেটারি আলতাফ হোসেন এবং তার পরিবারের লোকজন বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করে বলে নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
নিহতের ছেলে নাসিমুল হকের বন্ধু আরিফ জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ১২টার পরে ৯ তলা ভবনের ওই অ্যাপার্টমেন্টের সেক্রেটারি এফ-৫ ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আলতাফ হোসেনের এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। এ সময় সেখানে উচ্চস্বরে গানবাজনা হচ্ছিল। এতে ঘুমাতে পারছিলেন না একই অ্যাপার্টমেন্টের ৯ম তলার সি-৮ নং ফ্ল্যাটের বাসিন্দা অসুস্থ নাজিমুল হক (৬৫)। ইতিপূর্বে হার্টের সমস্যার কারণে তার বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছিলেন। পরে ঘুমাতে না পেরে নাজিমুল হক নিজেই গিয়ে কেয়ারটেকারকে বিষয়টি জানান। পরে অ্যাপার্টমেন্টের সেক্রেটারি আলতাফ হোসেনকে বিষয়টি জানালে তিনি নিজেই আসেন। এ সময় উচ্চস্বরে গান বাজানোর প্রতিবাদ জানান তিনি। এতে উভয়ে বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরে বিষয়টি সেখানেই মিটে যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আলতাফ হোসেন তার স্ত্রীসহ পরিবারের ৪ জন  পুরুষ ও ৩ জন নারী সদস্য নিয়ে নিচে নেমে অ্যাপার্টমেন্টের কেয়ারটেকারকে দিয়ে নাজিমুল হকের পরিবারের সদস্যদের ডাকেন। এর প্রেক্ষিতে নাজিমুল হক, তার ছেলে ব্যাংক কর্মকর্তা নাসিমুল হক, কলেজ শিক্ষক মেয়ে নিশি, নাসিমুল হকের স্ত্রী মাস্টারমাইন্ড স্কুলের শিক্ষক নিচে নেমে আসেন। নামার সঙ্গে সঙ্গে রাতের ঘটনা নিয়ে তারা আবারো বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে নাসিমুল হককে আলতাফ হোসেনের লোকজন মারধর শুরু করে। এ সময় তার পিতা নাজিমুল হক এগিয়ে এসে ছেলেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরে আলতাফ ও তার পরিবারের পুরুষ-নারী সদস্যরা নাজিমুল হককে মারপিট করতে থাকেন। এ সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা তাকে রক্ষায় এগিয়ে এলে   হামলাকারীরা তাদের ওপরও চড়াও হয়। নাসিমুলের বন্ধু আরিফ জানান, তাদের পুরুষ সদস্যরা নারীদের ওপরও হামলা চালায়। এদিকে তাদের হামলায় অসুস্থ নাজিমুল হক নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এ সময় তার ছেলে ও পরিবারের সদস্যরা নিজেদের গাড়িতে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য মিটফোর্ডের সলিমুল্লাহ মেডেকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে ওয়ারী থানার এসআই হারুন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে ওই অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। এ সময় উচ্চস্বরে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটি হয়। পরে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আলতাফ হোসেন নিহতের পরিবারকে ডেকে আনে। এরপর উভয় পরিবারের লোকজনের মধ্যে হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে নাজিমুল হক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে তার মৃত্যু হয়। তিনি আরো বলেন, নাজিমুল হক আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তাই হাতাহতির কারণে তার মৃত্যু হতে পারে। তবে তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করেন এসআই হারুন।
চার-পাঁচ দিন ধরে ঘুমের সমস্যা হচ্ছিল অনিক আহমেদের (ছদ্মনাম)। সারা দিন অফিস করে তাড়াতাড়ি শোয়ার তোড়জোড় করলেও ঘুম শুধু দূর থেকে হাতছানি দিত। আসলে তাঁর অফিসে নানা রকম সমস্যা চলছিল, সেই চাপের প্রভাব পড়ল ঘুমে। এক সহকর্মীর পরামর্শে তিনি ঘুমের ওষুধ খাওয়া শুরু করলেন। এক বছর পর দেখা গেল যে শুধু ঘুমের ওষুধ নয়, গাঁজা-ইয়াবা খাওয়াও শুরু হয়ে যায়…ঘুম না আসা তাঁকে আসক্তির পথে নিয়ে যায়। আমরা নিজেদের স্বার্থে ঘুম না আসার নানা কারণ দাঁড় করিয়ে নিই। ঘুম না আসার জন্য নিজেরাই কোনো না কোনোভাবে দায়ী। এই শহুরে জীবনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে চারপাশের বিভিন্ন চাপে এতই ব্যতিব্যস্ত থাকি, নিজেকে নিয়ে কেউ ভাবি না। সারা দিনের কাজ শেষে রাতে নির্ভার ‍ঘুম আসছে না, অমনি নাগালের মধ্যে থাকা একটা ঘুমের বড়ি টুক করে খেয়ে নিই আমরা অনেকে। মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত, বিষণ্ন, কোনো কারণে দুশ্চিন্তা বা শারীরিক কোনো সমস্যা, বিশেষ করে হরমোনজনিত রোগের ক্ষেত্রে সাধারণত ঘুমের সমস্যা হয়ে থাকে। শরীর ও মনের মধ্যে থাকা চাপা চাপগুলো সরিয়ে ফেলতে না পেরে দিনের পর দিন ঘুমের ওষুধের দ্বারস্থ হন অনেকে। অজান্তে কখন এই অভ্যাস আসক্তিতে রূপ নেয় বোঝাই যায় না। অনেকে ভাবেন, ঘুমের ওষুধই তো খেয়েছি, নেশা তো করিনি। এই ভুল ধারণা ডেকে আনে বিপত্তি। ঘুমের সমস্যা, ঘুমের ওষুধ নগরজীবনের সঙ্গে লেপটে আছে। সকালে ফুরফুরে মেজাজে উঠতে দরকার একটা আরামের ঘুম। সে জন্য ছোট্ট একটি লাল, নীল বা সাদা রঙের ওষুধের দিকে ঝুঁকে পড়ি আমরা। এভাবেই শরীর একসময় ঘুমের ওষুধে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ওষুধ না খেলে ঘুম আসতে চায় না। অযথা ঘুম নিয়ে ভয়ে ভীত হয়ে খেয়ে ফেলেন ঘুমের ওষুধ। নিয়ম থাকা সত্ত্বেও অনেক ওষুধ বিক্রেতাই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ঘুমের ওষুধ বিক্রি করেন, যা আমাদের দেশে বেশ সহজলভ্য।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও দরকার মনে করি না, নিজেরাই অন্যের মুখে শুনে বা দোকানে গিয়ে ওষুধ কিনে আনি। সবচেয়ে শঙ্কিত হওয়ার কথা হলো এই যে, গত কয়েক বছরে গাঁজা, ইয়াবার পাশাপাশি ঘুমের ওষুধ খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ঘুমের ওষুধ অজান্তেই জন্ম দিয়েছে নেশাতুর মানুষের। গত ডিসেম্বরে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন-নবম ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন সাইকিয়াট্রি ২০১৭-অ্যাডিকশন সাইকিয়াট্রি সেমিনারে একটি গবেষণাপত্র তুলে ধরেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাইকোথেরাপি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহিত কামাল। তাঁর সঙ্গে সহকারী হিসেবে ছিলেন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা রহমান। ২০১৩ সালের মে থেকে ২০১৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও নিরাময় কেন্দ্রে যাঁরা মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে যান, এমন ৩০৬ জনের মধ্যে চালানো হয়েছিল এই গবেষণা। গবেষণা থেকে বেরিয়ে আসে, নগরজীবনের মানুষের ঘুমের ওষুধের প্রতি আসক্তি বেশি। সেই হার ৭৮ দশমিক ১ শতাংশ। আর গ্রামীণ মানুষের মধ্যে এই হার ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। আরও একটি আশঙ্কার বিষয় হলো, তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন এমন তরুণদের মধ্যে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ, এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ, এমনকি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এই আসক্তিতে জড়িয়ে পড়েছে। কর্মজীবী ও কর্মহীন মানুষের মধ্যেও ঘুমের ওষুধে আসক্ত হওয়ার হার নেহাত কম নয়। ঢাকা, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকায় এই প্রবণতা বেশি, তেমনটাই উঠে আসে এই গবেষণায়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মজীবী ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্যবসায়ী ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ, বেকার ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ আসক্ত ঘুমের ওষুধে। অনিক আহমেদের ঘুম না আসার কারণ ছিল কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ। এর বাইরেও অনেক কারণ আছে। যেমন এই গবেষণায় দেখা যায়, ঘুমের ওষুধের প্রতি আসক্তির কারণ হতাশা, সম্পর্ক নিয়ে সমস্যা, রাগ বা আক্রমণাত্মক আচরণ, খারাপ সঙ্গ, পারিবারিক কোন্দল, অনৈতিক সম্পর্ক, সম্পর্ক ভাঙা বা বিবাহবিচ্ছেদ এবং ওষুধের প্রতি নির্ভরতা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব কারণে ঘুমের ওষুধ সেবনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ৫০ শতাংশ অবিবাহিত, ৪৫ শতাংশ বিবাহিত এবং বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এমন ৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে ঘুমের ওষুধের প্রতি আসক্তি দেখা গেছে। গবেষণার ফলাফল দেখলে ঘুমের ওষুধকে আর হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না। লেখক-কবি-সাহিত্যিকেরা তাঁদের লেখায় যতই শৈল্পিকভাবে নির্ঘুম রাতকে ফুটিয়ে তুলুন না কেন, নিত্যদিনকার জীবনে নির্ঘুম রাত অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। নির্ঘুম রাত ঘুমের ওষুধের দিকে আকর্ষণ করে। জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা গেলে ঘুমের ওষুধের প্রতি নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। যাঁদের ঘুমের সমস্যা গুরুতর হয়নি, তাঁদের জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি। যেমন রাতে নির্দিষ্ট একটি সময়ে ঘুমানো, সন্ধ্যার পর চা বা কফি পান না করা, শুতে যাওয়ার আগে উত্তেজক কিছু না দেখা, টিভি বা মুঠোফোনে চোখ না রাখা, ভোরে ওঠার অভ্যাস, ইয়োগা ও মেডিটেশন করা, হাঁটা বা কোনো শারীরিক ব্যায়াম-সাধারণভাবে এগুলো মানলে ঘুম আসবে। সম্পর্ক বা পারিবারিক সমস্যা বা কোনো বিষয়ে চাপ, হতাশা থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে ঘুমের ওষুধ খাওয়া চরম বোকামি। তাতে কোনো সমস্যার সমাধান তো হবেই না, উল্টো সমস্যা গেড়ে বসবে। নিজের ও চারপাশ থেকে ভালোর রস আস্বাদন করুন, দেখবেন জীবনটা অত খারাপ মনে হচ্ছে না। ছেঁড়া কাঁথা গায়ে দিয়েও জীবনকে সুন্দর মনে হবে। তবু না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। খেয়াল-খুশি ও ইচ্ছামতো ঘুমের ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
আট ঘণ্টার ঘুমের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে সাফল্যের সূত্র। শান্তির ঘুম মনে শান্তি আনে।
তৌহিদা শিরোপা: সাংবাদিক।
প্রথম আলো : ২০১৭ সালজুড়ে নেপালে আঞ্চলিক, প্রাদেশিক ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন গোলযোগ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হলো। সব নির্বাচনেই আপনাদের দল নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল) জয়ী হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে সব সম্পন্ন করার চাবিকাঠি কী ছিল?
মাধব কুমার নেপাল : নেপালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব ভালো। আমরা সবাই সামাজিক সম্পর্ক রেখে চলি। গণতন্ত্রের কিছু মূল্যবোধ ও নীতি মেনে চলি। সময়ে সময়ে যে সমস্যা আসে, কমবেশি তার সবই দেখভাল করা হয়। আমাদের রাষ্ট্র নিয়ে আমরা গর্বিত এবং প্রাচ্যের সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ।
প্রথম আলো : সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ, প্রাসাদ হত্যাকাণ্ড এবং দীর্ঘ অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও এই শান্তি ও সহযোগিতা কীভাবে অর্জিত হলো?
মাধব কুমার নেপাল : আমাদের শরিক সিপিএন (মাওবাদী) সশস্ত্র পথ নিয়েছিল। একাই জয়ী হওয়ার জন্যই তারা যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পরিস্থিতি তাদের পক্ষে ছিল না। একই পরিস্থিতির কারণে তাদের বলপূর্বক নির্মূল করাও ছিল অসম্ভব। পরিস্থিতির চাপেই দুই চরমপন্থার মধ্যে ভারসাম্য আনতে হয়েছিল। কোনো পক্ষই একে অন্যকে মুছে ফেলতে পারছিল না। মাওবাদীদের একদলীয় শাসন কায়েমের লক্ষ্য সঠিক না হলেও গণক্ষমতার জন্য তাদের সংগ্রাম সঠিক ছিল। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের জন্য তারা জীবন উৎসর্গ করতে তৈরি ছিল। পূর্ণ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার যাত্রায় আমরা একই তরণির যাত্রী ছিলাম। গণতন্ত্রের স্বার্থেই বাস্তবতা উপলব্ধি করে তারা তাদের পথ ও চিন্তা বদলেছিল। আমরা দেখিয়েছিলাম, অতীতে অনেক রক্ত ঝরেছে, আর রক্তপাতের দরকার নেই। বিভিন্ন মেরুতে দাঁড়িয়ে যারা লড়াই করেছিল, গণতন্ত্রের সত্যিকার শক্তি যারা, তাদের মধ্যে সমঝোতা জরুরি। ভুল সংশোধন এবং সত্যকে রক্ষা করেই আমরা এত দূর এসেছি।
প্রথম আলো : গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় নেপালে দুই কর্তৃপক্ষ ছিল: বিদ্যমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন। দুই কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ে কোনো সমস্যা হয়নি?
মাধব কুমার নেপাল : কিছু সমস্যা হয়েছে, কিন্তু তা শুধরে নেওয়া হয়েছে। সরকার কিছু অপচেষ্টা করলেও যথাসময়ে তা এড়ানো গেছে। আমাদের নির্বাচন কমিশন সত্যিকারভাবেই স্বাধীন। আমরা কিছু পদ্ধতি, নীতি, দৃষ্টান্ত ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, যার কারণে ১৯৯০ সালের পর থেকে নেপালের নির্বাচন কমিশন মোটামুটি কর্মক্ষম এবং সঠিক পথেই থেকেছে।
প্রথম আলো : নির্বাচনকালীন সরকারে আপনাদের শরিক দল মাওবাদীরাসহ আরও কয়েকটি দল ছিল। ক্ষমতাসীন নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধ হয়নি তাদের?
মাধব কুমার নেপাল : নির্বাচনের সময় আসলে সরকারের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। নির্বাচন কমিশন যে তহবিল ও কর্মী চেয়েছে, সরকার তা সরবরাহ করেছে। ইসিও সরকারি লোকজনকে আচরণবিধি মেনে চলতে বাধ্য করেছে। অনিয়ম হলে শাস্তি দিয়েছে।
প্রথম আলো : আপনি মাওবাদী বিদ্রোহের সামরিক সমাধানের বিপক্ষে ছিলেন। এখন সেই মাওবাদীদের সঙ্গে বাম জোট গঠনের পর এক পার্টি গড়তেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কোন পরিস্থিতি আপনাদের এক করল?
মাধব কুমার নেপাল : আমরা আমাদের ৩০ বছর ধরে চিনি এবং একসঙ্গে কাজও করেছি। মাঝপথে মাওবাদীরা পথ বদলে সশস্ত্র পথে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। তাদের জন্য সেটা ছিল কঠিন সময়। সরকারও তাদের প্রতি খুব কঠোর ছিল। তারপর নতুন পরিস্থিতির উদয় হলো, রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটল। রাজনৈতিক দল ও রাজতন্ত্র মুখোমুখি হয়ে গেল। সে সময় আমরা কাছাকাছি আসি। আমরা তখন থেকে টানা যোগাযোগে আছি। তাদের বুঝিয়েছি, শান্তিপূর্ণভাবে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এ জন্য কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। আমি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তারা আমার সরকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিল, আমাকে সরাতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি টিকে গেছি এবং তারাও পরে নীতি বদলেছে।
প্রথম আলো : বাম জোট সরকারে কীভাবে ক্ষমতা ভাগাভাগি হবে?
মাধব কুমার নেপাল : ঐক্যবদ্ধভাবেই আমরা বেশি লাভবান হব, এটাই অতীতের শিক্ষা। নেপালে আপনি দুটি রাজনৈতিক প্রবণতা দেখবেন। একটি হলো বাম, অন্যটি ডান। লিবারেল বনাম র‍্যাডিকাল। কখনো র‍্যাডিকালরা টিকেছে, কখনো মধ্য বামরা জিতেছে। জনগণ শেষ পর্যন্ত মধ্যপন্থী বামদেরই সমর্থন করেছে। মাওবাদীরাও সেটা বুঝেছে। এভাবে দুই দলই বুঝতে পারল, ঐক্যের মাধ্যমেই আমরা এগোতে পারব। তা ছাড়া নেপালে কমিউনিস্ট আন্দোলন খুবই জনপ্রিয়।
প্রথম আলো : কেন?
মাধব কুমার নেপাল : গত কয়েক দশকে কমিউনিস্ট পার্টি নেপালের রাজনৈতিক বাঁকবদলের প্রতিটি ঘটনার মূল ভূমিকায় ছিল। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রশ্নে এবং বাইরের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি অটল ছিল। মানুষ মনে করে, কমিউনিস্ট পার্টি জনগণের অধিকারের পক্ষে থাকে। কমিউনিস্ট পার্টি তথাকথিত গণতান্ত্রিক দলগুলোর চেয়েও গণতান্ত্রিক। জনগণ দেখেছে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নত করার সবচেয়ে সোচ্চার পক্ষ কমিউনিস্টরা। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পক্ষ আমরা। অন্যদিকে কংগ্রেসের আমলে তারা দেখেছে সর্বাত্মক দুর্নীতি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জন।
প্রথম আলো : দেখতে পাচ্ছি, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হতে দেরি হচ্ছে। ক্ষমতা হস্তান্তর-প্রক্রিয়া কি অচলাবস্থায় পড়েছে?
মাধব কুমার নেপাল : নেপালি কংগ্রেস নির্বাচনে পরাজিত হয়ে খুব আহত ও হতাশ। তারা নিজেদের সব সময়ই ক্ষমতাসীন দেখতে চায়। কিন্তু জনগণ তার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। বর্তমান দুনিয়ায় নির্বাচনের ফল অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এক মাসের মধ্যেই বাম জোটের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে কে পি অলিই হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
প্রথম আলো : আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আপনার সরকারের নীতি কী হবে?
মাধব কুমার নেপাল : ১৯৯৪-৯৫ সালে সংখ্যালঘিষ্ঠ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলাম আমি। আমিই তখন ভারতের সঙ্গে ১৯৫০ সালের চুক্তি সংস্কারের কথা বলি। এই চুক্তি বৈষম্যমূলক। কারণ, একদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করেছেন, অন্যদিকের স্বাক্ষর নেপালে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূতের? দুজন কি সমান? দ্বিতীয়ত, এই চুক্তির কারণে সব সময়ই আমরা কী করতে পারব কী পারব না, তা ভারতকে জিজ্ঞাসা করতে হতো। তিন কোটি জনসংখ্যার নেপাল দেড় শ কোটি জনসংখ্যার ভারতকে কীভাবে সমান সুযোগ দিতে পারবে? তৃতীয়ত, এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ৭০ বছর আগে। এর মধ্যে দুনিয়ায় অনেক কিছু ঘটে গেছে। এটা শীতলযুদ্ধের যুগ নয়, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সময় নয়। দক্ষিণ এশিয়ায়ও অনেক ঘটনা ঘটেছে। তাই এই চুক্তিতে নেপালি জনগণের নতুন আকাঙ্ক্ষাকে জায়গা দিতে হবে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই দেশকে সব সময় স্বাধীন রেখে গেছেন, তার জন্য লড়াই করে গেছেন। আপনি যদি আপনার ঐতিহ্য নিয়ে গৌরব করতে পারেন, তাহলে কেন আমরা আমাদের ইতিহাস নিয়ে গৌরব করতে পারব না? আমাদের কী অপরাধ? বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ চাই। আমরা বলি, আমাদের হুকুম দিয়ো না। আন্তর্জাতিক চুক্তির সময় দেখি, আমাদের ওপর অন্যায্য চাপ থাকে। আমরা তা পছন্দ করি না। মুক্তবাণিজ্য ও বিশ্বায়নের এই যুগে কেন আমরা ক্ষতিকর শর্ত মেনে নেব? আমাদের তো পথ খোলা আছে। এটা তো ঔপনিবেশিক যুগ নয়। নেপাল আর ভারতকে আলোচনা করে বের করতে হবে, কোথায় কোথায় অভিন্ন স্বার্থ আছে। নেপাল স্বাধীন দেশ, একে শ্রদ্ধা করতে হবে।
প্রথম আলো : আপনারা কি আপনাদের এই অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন?
মাধব কুমার নেপাল : আমরা যদি দুর্নীতিমুক্ত ও ঐক্যবদ্ধ না থাকি এবং জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নতি করতে না পারি, তাহলে আমাদের মাথা নত করতে হবে। আমাদের বিচক্ষণতা দেখাতে হবে। নিজের ঘর ঠিক রাখতে পারলে সব সামলানো সম্ভব। আমার অভিজ্ঞতা বলে, যেসব বিষয় অনেক বছর ধরে ঝুলে আছে, তা মাত্র একটি বৈঠকেই মীমাংসা করা যায়। শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আমি সমস্যা দেখি না। সমস্যা হলো আমলাতান্ত্রিক চিন্তাভাবনায়। নেতারা যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার খপ্পরে পড়েন, তখনই সমস্যা হয়। সংকীর্ণ দৃষ্টির ওপরে উঠতে পারলে কিছুই সমস্যা নয়। নেপাল কারও বিরুদ্ধে কারও কার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতে চায় না। আমরা সবার নাজুক জায়গা মেনে চলি। অন্যদেরও আমাদের স্পর্শকাতরতা আমলে নিতে হবে। নেপালের ভূমি কারও বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। নেপাল সবার সঙ্গে সমদূরত্ব ও সমবন্ধুত্ব রাখবে।
প্রথম আলো : নেপাল আর বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখেন? বিশেষ করে, যোগাযোগ ও পানিবিদ্যুতের বেলায়?
মাধব কুমার নেপাল : যাদের একই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, একই রকম অনুভূতি যাদের, তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হয়। তাই নেপাল ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আমরা আমাদের বাজার বহুমুখী করতে পারি। নেপালে বাংলাদেশের বাজার আছে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একটি বিকল্প নিয়ে বসে থাকা উচিত নয়। এটাই বাজারের নিয়ম। বাংলাদেশের বিদ্যুতের খুব দরকার। নেপালেরও এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা। আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম, নেপালে আসুন, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করুন, বিদ্যুৎ বানান, নিজ দেশে নিয়ে যান। এ জন্য নেপালের সঙ্গে চুক্তি করুন। ভারতের সঙ্গেও চুক্তি করুন। নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী ভারতের ১৬ কিলোমিটার করিডর দিয়ে ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপনের চুক্তি করুন। নেপালে কৃষির আধুনিকায়ন ও বাণিজ্যিকায়নে, অবকাঠামো খাতে, সিমেন্টশিল্পে, পর্যটনের বিস্তারে বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশিরা নেপালে যৌথ বিনিয়োগে আসতে পারে। বাংলাদেশ ভারতকে রাজি করিয়ে নেপালের সঙ্গে রেল, সড়ক, বিদ্যুৎ কানেকটিভিটি স্থাপন করতে পারে। ভারত বিশাল দেশ, আমাদের মতো দেশের জন্য তার হৃদয় বড় করা উচিত।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
মাধব কুমার নেপাল : আপনাকেও ধন্যবাদ।
এই উদ্ধৃতিটি কার, দেখা যাক, আমরা তা বুঝতে পারি কি না: ‘আমেরিকান ইউনিয়ন নিজেকে নরডিক-জার্মান রাষ্ট্র মনে করে, এই রাষ্ট্রটি কোনোভাবেই বহু জাতির সমাবেশ নয়, তার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল নেই। অভিবাসনের কোটা দেখে তা বোঝা যায়...স্ক্যান্ডিনেভিয়ান...এরপর ইংরেজ ও শেষমেশ জার্মানদের সবচেয়ে বেশি জায়গা দেওয়া হয়েছে।’ ১৯২৮ সালে অ্যাডলফ হিটলার মার্কিন অভিবাসন আইনের প্রশংসায় এ কথা লিখেছিলেন। নিশ্চিতভাবে হিটলারের প্রসঙ্গ টানার ব্যাপারটা হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস থেকে যত নোংরা কথাই বের হোক না কেন, বিশেষ করে হাইতি, এল সালভাদর ও আফ্রিকার দেশগুলোকে ‘নোংরা জায়গা’ বলে তিনি যতই উপহাস করুন না কেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনোভাবেই হিটলারের জার্মানির সমতুল্য নয়। ট্রাম্প একজন স্বভাবসুলভ কর্তৃত্বপরায়ণ একনায়ক। তিনি সেই পুরোনো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিনিধি। কিন্তু মার্কিন গণতন্ত্রকে তিনি যদি ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে চান, তাহলে তাঁকে আরও অনেক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলতে হবে। এমনকি অভিবাসন নীতির প্রসঙ্গেও ট্রাম্প প্রশাসনের গণদেশান্তর ও নাৎসিদের গণহারে হত্যার মধ্যে পার্থক্য আছে, সে তাঁর নীতি যতই নিষ্ঠুর ও বোধহীন হোক না কেন। তা সত্ত্বেও এটা ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন অজ্ঞ ও বর্ণবাদী মানুষ নির্বাচিত হয়েছেন। আরও খারাপ ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য আমাদের ইতিহাসের সেই পর্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন হিটলার মার্কিন অভিবাসন দ্বারা অনুপ্রাণিত হতেন। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, হিটলার ১৯২৪ সালের মার্কিন অভিবাসন আইনের প্রশংসা করেছেন, যেটা জনসন-রিড অ্যাক্ট নামে পরিচিত।
এই আইন ‘জাতীয় কোটার’ মাধ্যমে প্রকাশ্যে অভিবাসনের পথে জাতিগত বাধা তৈরি করেছিল। এই আইনে সরাসরি আরব ও এশীয়দের মার্কিন মুলুকে অভিবাসন বাতিল করা হয়েছিল। হিটলার খেয়াল করেছিলেন, এই আইনে ইহুদিসহ দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপীয়দের চেয়ে ‘নরডিক-জার্মান’ নাগরিকদের অভিবাসনের প্রতি পক্ষপাত করা হয়েছিল। এই সীমাবদ্ধ আইনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের আগে জার্মানির ইহুদিদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ট্রাম্প যখন বললেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হাইতি থেকে অভিবাসী গ্রহণ না করে নরওয়ের মতো দেশ থেকে অভিবাসী নেওয়া, তখন থেকে ১৯২৪ সালের আইনটি গণমাধ্যমে আলোচিত হতে শুরু করে; যদিও নরওয়ের মানুষেরা অভিবাসন চান না। শুধু এটাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী অভিবাসন নীতির আরও অনেক নজির আছে। উনিশ শতকের শেষ ভাগে তথাকথিত হলুদভীতির যুগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাধারে বেশ কয়েকটি এশীয়বিরোধী আইন প্রণয়ন করেছিল। ১৮৮২ সালে এক আইন করে সরাসরি চীনাদের মার্কিন দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর অনেক আগে ১৭৯০ সালে মার্কিন কংগ্রেস ‘যেকোনো মুক্ত ও শ্বেতাঙ্গ ভিনদেশিকে’ নাগরিকত্ব গ্রহণের সুযোগ দিয়ে বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। শুধু হিটলারই যে একমাত্র ডানপন্থী হিসেবে মার্কিন ইতিহাসের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন, তা নয়। তাঁর যখন উত্থান হলো, তত দিনে ইউরোপের সব কট্টর ডানপন্থী যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী অভিবাসন নীতির ব্যাপারে অবগত। ইউরোপের অন্যতম গর্হিত সেমিটীয়বিরোধী থিওডোর ফ্রিতস কয়েক দশক পরে ১৮৯৩ সালে হ্যান্ডবুক অব দ্য জিউশ কোয়েশ্চেন শীর্ষক বইয়ে এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। হিটলার নিজের ইশতেহার মাইন ক্যাম্ফে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশংসা করেছেন: ‘এটি এমন এক দেশ’ যারা বর্ণগতভাবে স্বাস্থ্যকর হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। আর নাৎসিরা ১৯৩০-এর দশকে যখন ক্ষমতায় এল, তখন তাদের আইনজীবীরা সতর্কতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির দীর্ঘ ইতিহাস খতিয়ে দেখতে শুরু করেন, যাতে অশ্বেতাঙ্গদের জন্য দরজা বন্ধ করে দেওয়া যায়।
আজ পেছন ফিরে তাকালে দেখি, ১৯৬৫ সালের মার্কিন অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বর্ণবাদী অতীত থেকে নিজেদের ফিরিয়ে আনতে শুরু করে। আর ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায়, এই রাষ্ট্র এখনো পুরোপুরি অতীতকে জয় করতে পারেনি। সম্প্রতি অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্প যে অশ্লীল মন্তব্য করেছেন, তা সব মার্কিন নাগরিককে এটাই মনে করিয়ে দেবে যে হিটলার ও তাঁর নাৎসি বাহিনী  একসময় মার্কিন অভিবাসন নীতির বড় ভক্ত ছিলেন। ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের এক বছর হয়ে গেল। যাঁরা ভাবছেন ট্রাম্পের আমলে মার্কিন গণতন্ত্রের বড় ক্ষতি হয়নি, তাঁর অভিবাসন নীতি দেখে তাঁদের বোঝা উচিত, এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই। মার্কিন গণতন্ত্র টিকবে কি টিকবে না, তা দিয়ে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বিচার করা যাবে না। সর্বোপরি শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের কাছে মার্কিন গণতন্ত্র সব সময় ভালোই ছিল। এমনকি ১৯৭০-এর দশকে বা ১৯ শতকের শেষ ভাগে ও ১৯২০-এর দশকে বর্ণবাদী অভিবাসন আইন যখন পাস হলো, তখনো যুক্তরাষ্ট্র ভালোই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিকভাবে প্রণীত বর্ণবাদী আইন অত্যন্ত নোংরা। সাধারণ মানুষ ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ও বিষাক্ত অভিবাসন নীতির ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। যে মার্কিনরা দেশকে ভালোবাসেন, তাঁদের ১৯২৮ সালে হিটলারের উল্লিখিত মন্তব্য শুনে দুঃখিত হওয়া উচিত। তাঁদের প্রেসিডেন্ট যে নরডিক মানুষদের আবারও অভিবাসী কোটার সামনের সারিতে রাখতে চাইছেন, তাতে তাঁদের হতাশ হওয়া উচিত।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।
জেমস কিউ হুইটম্যান: ইয়েল ল স্কুলের তুলনামূলক ও বিদেশি আইন বিভাগের অধ্যাপক।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসফারকে দিনেদুপুরে রাজপথে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যে স্কুলে আদনান পড়ত, সেই স্কুলে আমিও পড়েছি। যে রাস্তায় আদনান হাঁটত, সেসব রাস্তা দিয়ে আমিও হেঁটেছি। আর যে মোড়ে আদনান খুন হয়েছে, সেই মোড় থেকে আমি বেঁচে ফিরেছি। তবে তখনো আমি দেখেছি, আমাদের স্কুলের কিছু ছেলের হাতে হকিস্টিক, শার্টের পেছনে কোমরে রড। এটা কেবল সরকারি স্কুল বলে কলেজিয়েটেই দেখেছি তা-ই নয়, রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজেও আমি চায়ের দোকানে ছেলেদের শোডাউনের পরে চাপাতি লুকাতে দেখেছি আর শার্ট তুলে চাপাতির কোপের দাগ দেখাতে দেখেছি। এই বিবর্ণ আক্রমণাত্মক কৈশোর নিয়ে আমি বড় হয়েছি এবং রাজনীতিমুক্ত কোনো কৈশোর আমি চিনি না। কাজেই যখন আমার জ্যেষ্ঠরা আমাকে মারামারি আর কোন্দলের বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা শোনান, সেটিকে আমার রূপকথা বলেই মনে হয়।
আমার বেড়ে ওঠবার সময়ে রাজনীতি মানেই ছিল ছাত্ররাজনীতি আর ছাত্ররাজনীতি মানেই ছিল হকিস্টিক, রড আর চাপাতির ছড়াছড়ি। সুশীল ছাত্র হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ছিল মাথা এতখানি নিচু করে রাখা, যাতে চাপাতি আর রডওয়ালারা আমাদের দেখতে না পায়, আমরা যাতে পিছলে বের হয়ে যেতে পারি। আমি পিছলে বের হয়ে যেতে পেরেছিলাম। আদনান পারেনি। আরও অনেকে পারবে না। চাপাতি, হকিস্টিক আর রডের ব্যবহারের পরিধি বাড়ছে, চাপাতি হকিস্টিক আর রডের উপযোগ আরও বাড়ছে এবং সে জন্য চাপাতি, হকিস্টিক আর রড ব্যবহারের জন্য আরও বেশি বেশি করে ছেলেদের দলে টানা লাগছে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যাল, কলেজ পেরিয়ে এখন স্কুলের আঙিনায় আরও বেশি করে হাত ডুবোতে হচ্ছে আমাদের রাজনীতিবিদদের। শিশুদের ব্যবহার করতে হচ্ছে আর শিশুরা নিজেদের কোন্দলে ব্যবহার করতে পারছে মারণাস্ত্র। সেসব মারণাস্ত্রের আক্রমণে কয়েকজন মারা পড়ছে। পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হচ্ছে। বুদ্ধিজীবীরা বক্তৃতা দিচ্ছেন সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে। আমাদের সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে শিশুরা শিশুদের হত্যা করছে? শিক্ষকেরা কী শেখাচ্ছেন? অভিভাবকেরা করছেন কী? ঠিক এভাবে প্রতিটি সমস্যার মতন সমাজের চুনোপুঁটিদের ওপর দায় তুলে দিয়ে রাজনৈতিক কাঠামোর বিশাল সমস্যাটি এড়িয়ে যাচ্ছি আমরা প্রতিদিন। আমরা বুঝতে চাইছি না যে কেন আমাদের রাজনীতিবিদদের শিশুদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এত বিশাল একটি পেটোয়া বাহিনী আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কেন পুষতে হচ্ছে? দল বড় রাখা, দলের প্রভাব অটুট রাখার জন্য। সেই বিষয়ে যাওয়ার আগে আরেকটি গল্প বলে নিই।
আমি আমেরিকার যে স্টেটে থাকি, সেখানে তখন নির্বাচন হচ্ছে। আমি রিপাবলিকান পার্টির কিছু রাজনীতিবিদের নির্বাচনী প্রচারণার কাজ করছি। আমার প্রধান কাজ হলো ভিক্ষা চেয়ে চিঠি লেখা। নানান সাহিত্য, ভঙ্গিমা করে আমি সাধারণ মানুষের কাছে ভিক্ষা চাই। কেননা, তারা যদি ভিক্ষা না দেয়, তাহলে আমরা প্রচারণা করতে পারব না আর প্রচারণা না করতে পারলে আমরা নির্বাচনে জিততে পারব না। আমার মনে পড়ে যে প্রতিবার ট্রাম্প একটি করে পাগলামি করলে কেমন করে আমরা সবাই মিলে কপাল চাপড়াতাম, কারণ এবার আমরা আর ভিক্ষা তুলতে পারব না। যারা এত দিন আমাদের সাহায্য করছিল, তারা আর সাহায্য করবে না। ফলে নির্বাচনের আগেই নির্বাচন হেরে যাব আমরা। ঠিক সেই উত্তপ্ত দিনগুলোয় আমার মনে হয়েছিল যে এমন কোনো ভিক্ষার চিঠি আমি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কাছ থেকে পাইনি। শুধু যে আমি পাইনি তা নয়, আমার পরিচিত কাউকেও আমি কোনো দিন পেতে শুনিনি। যদি সাধারণ সমর্থকদের থেকে তারা গণতান্ত্রিকভাবে চাঁদা না তুলে থাকে, তাহলে প্রতিবছর যে হাজার কোটি টাকা খরচ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দেখায়, সেই পয়সা তারা কোথা থেকে পায়? একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে জানা গেল যে চাঁদা আপসে তোলার রাস্তায় না গিয়ে বরং আরও বেশি নিশ্চিত একটি উপায় বেছে নেয় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো। ভয় দেখিয়ে চাঁদা তুলে নেওয়া, যেটিকে কথ্য ভাষায় আমরা চাঁদাবাজিও বলি। এই চাঁদাবাজির ব্যাপারটি আমাদের রাজনীতিতে এমনভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে যে স্বেচ্ছায় চাঁদা তোলার বুদ্ধিও এখন বুঝি কারও মাথায় আসে না। আর এই চাঁদাবাজি করে দল টিকিয়ে রাখতে গেলে প্রয়োজন হয় ভয়ভীতি দেখাতে পারে এমন কিছু লোকজন।
ভয়ভীতি দেখাতে গেলে প্রয়োজন হয় চাপাতি, হকিস্টিক আর রড। সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হয় তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের থেকে রেহাই পাওয়ার মতন নিরাপত্তা। কাজেই সেটির সংস্থান করে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এই ছাত্রদের রাজনৈতিক সহিংসতার ট্রেনিং দিতে হচ্ছে এবং তাদের মিলিশিয়ার মতন করে রাস্তায় নামিয়ে দিতে হচ্ছে। আর এই চাঁদাবাজির বাইরে দলগুলোর অর্থসংস্থানের দ্বিতীয় উপায়টি হলো মনোনয়ন বাণিজ্য। উচ্চ দামে মনোনয়নপত্র বিক্রি করা হবে, এমন ধনী ব্যবসায়ীদের যাঁরা অতীতে দলে অনুদান দিয়েছেন মোটা অঙ্কের, তাঁরা ভবিষ্যতে আরও মোটা অঙ্কের অনুদান দেবেন। আর রাজনীতিকে ভালোমানের বিনিয়োগ করে ব্যবসায়ীরাও রাজনীতিতে আসতে থাকেন দলে দলে এবং রাজনীতিতে এসেই তাঁদের সম্পদ ফুলেফেঁপে ওঠে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে দুই দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের দিকে তাকালে আমরা সেই চিত্রই দেখতে পাব। সংসদের অবস্থাও ঠিক একই। সুজনের তথ্যমতে, বর্তমান সংসদের ৫০ শতাংশই ব্যবসায়ী এবং ৩৫০ জন সাংসদের মধ্যে ২২৬ জনই কোটিপতি। বাকি সাংসদদের মধ্যে অনেকেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং গডফাদার। তাদের নেতৃত্বেই এলাকাগুলোতেই সৃষ্টি হয় আঞ্চলিক ছাত্রনেতা, যাদের টিকে থাকার উদ্দেশ্যই হলো দলকে, নেতাকে চাঁদা তুলে দেওয়া, তাদের আধিপত্য বজায়ে রাখা। এবং নেতার ছত্রচ্ছায়ায় নিজের আর্থিক এবং সামাজিক প্রভাব বজায় রাখার জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্কুলছাত্রদের। তা ছাড়া বিরোধী দল তো বটেই, নিজের দলের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঠেকিয়ে রাখতেও যার যার নিজস্ব মাস্তান বাহিনীর প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ আমাদের রাজনীতি এখন হয়ে উঠেছে অপরাধী, ব্যবসায়ী, ব্যবসায়ীদের আখড়া, রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য পদসৈনিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নওল কিশোরদের। চট্টগ্রামের সংবাদপত্র দৈনিক পূর্বকোণের প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের প্রভাবশালী জাতীয় রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় ঘুরে বেড়ায় আরেক পাতিনেতা এবং তার দায়ভারেই স্কুলছাত্রদের রাজনীতির চাপাতিবাহক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আর যত দিন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাঁদাবাজি আর মনোনয়ন-বাণিজ্য তথা আধিপত্যনির্ভর থাকবে, তত দিন এমন নিয়োগ চলতেই থাকবে। কখনো আদনানের মতন কেউ মারা পড়বে বলে সেটি খবরের কাগজে আসবে, না হয় আমার বন্ধুদের মতন পিঠে চাপাতির কোপ নিয়ে বেঁচে থাকবে হাজারো কিশোর—যাদের গল্প আমরা কেউ জানব না। কাজেই যদি আমরা আমাদের সংসদে বা রাজনীতিতে কেবল একটি শ্রেণির বা পেশার মানুষের আধিপত্য নিয়ে অথবা অপরাপর নিম্নশ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে চিন্তিত হতে না পারি, তাহলে কমপক্ষে আমদের শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের জন্য কথা বলতে হবে। নতুন প্রজন্মের রাজনীতি যদি গণমুখী হতে চায়, তাহলে তার গণতহবিলমুখী হতে হবে। জনতার কাছে হাত পাততে হবে আর সেই হাত পেতে পাওয়া পয়সার মান রাখার চেষ্টা করতে হবে নিরন্তর। তাহলেই আর ছেঁকে ছেঁকে কোটিপতিদের দলে টানতে হবে না অথবা দলীয় আধিপত্য আর নেতাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ছোট ছেলেদের জীবন বলি দিতে হবে না। সে রকম একটি পরিবর্তন যদি আমরা শুরু করতে না পারি, তাহলে আদনানদের মৃত্যুগুলো ঘুরে ঘুরে আমাদের পৃথিবীতে হানা দেবেই।
অনুপম দেবাশীষ রায়: গবেষণা সহযোগী, কেটো ইনস্টিটিউট, ওয়াশিংটন ডিসি।
সংবিধানের ৫৯ ধারার (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ এই আইনের আলোকে আমরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দিকে তাকালে কী দেখতে পাই। দেখতে পাই, সেখানে পৌনে দুই মাস ধরে মেয়র পদটি শূন্য থাকলেও নির্বাচনের সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। নির্বাচন কমিশন ২৬ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে বলে যে তফসিল ঘোষণা করেছিল, উচ্চ আদালত তিন মাসের জন্য তার কার্যকারিতা স্থগিত করে দিয়েছেন। তাহলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কে চালাবেন-প্যানেল মেয়র। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, প্যানেল মেয়র দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি বেশি দিন চলতে পারে না। তাহলে কি অনির্বাচিত প্রশাসক বসানো হবে? প্রশাসক কত দিন থাকবেন? অতীতের নজির খুবই খারাপ। ছয় মাসের জন্য প্রশাসক নিয়োগের বিধান থাকলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক থেকেছেন বছরের পর বছর। জেলা পরিষদেও একই ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা উত্তরের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। তারা যথাসময়ে মেয়রের পদটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে। কিন্তু কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন রংপুরের নির্বাচনের পর আপন কৃতিত্বে এতটাই বিভোর ছিল যে, ঢাকা উত্তরের তফসিল ঘোষণার পূর্বশর্তটুকুও মানেনি। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ৯ জানুয়ারি তফসিল ঘোষণার আগে এই নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ভোটার তালিকা, নতুন ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ, নতুন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের মেয়াদ-সম্পর্কিত জটিলতাসহ ছয়টি বিষয় বিবেচনা করার কথা বলেছিলেন লিখিত আকারে। কিন্তু সেসব বৈঠকে এ বিষয়গুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
অবশ্য দুর্মুখেরা বলেন, ইসি ইচ্ছাকৃতভাবেই এই কাজ করেছে; যাতে নির্বাচনটি ভন্ডুল হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। আমরা পাঁচজন বিজ্ঞ কমিশনার দ্বারা পরিচালিত নির্বাচন কমিশনের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস হারাতে চাই না। হাইকোর্ট তিন মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিত করেছেন। আশা করতে পারি, তিন মাসের মধ্যে আইনি জটিলতা কাটিয়ে উঠে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হবে। কিন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের যে ঐতিহ্য, তাতে খুব একটা ভরসা পাই না। এর আগেও নানা বাহানায় নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখার নানা কসরত চলেছে। আমাদের গণতন্ত্র সামনে এগোনোর পথ দেখায় না। পেছনে যাওয়ার সুড়ঙ্গ তৈরি করে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে নির্বাচন নিয়ে এত বিতর্ক, এত মারামারি, হানাহানির ঘটনা ঘটেনি। আদালতের আদেশের পর ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘নির্বাচন করা ইসির দায়িত্ব। স্থানীয় সরকার থেকে এসব নির্বাচন করার জন্য অনুরোধ পেয়েছে ইসি। সেভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো বাধা নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তফসিল ঘোষণা করা হয়।’ তাহলে বাধা এল কেন? সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও (গ) কোন আদালত, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হইয়াছে এইরূপ কোন নির্বাচনের বিষয়ে, নির্বাচন কমিশনকে যুক্তিসংগত নোটিশ ও শুনানির সুযোগ প্রদান না করিয়া, অন্তর্বর্তী বা অন্য কোনরূপে কোন আদেশ বা নির্দেশ প্রদান করিবেন না।’ সরকারের বা সরকারি দলের নেতাদের মনে যা-ই থাকুক না কেন, এখানে মূল ভিলেন নির্বাচন কমিশনই। এখন তাকে ভিলেনের পোশাক বদলে নায়কের চরিত্র পেতে হলে নির্বাচনটি করে দেখাতে হবে। কিন্তু শুরু থেকে তাদের আচরণে গা ছাড়া ভাব লক্ষ করা গেছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়ার পরও তারা এ বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি। নির্বাচন কমিশন কি আইন জানত না? তাদের আইনজীবী প্যানেলে কি এমন কেউ ছিলেন না যে আগে থাকতে সজাগ করে দিতে পারতেন? আদালতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে যে আইনজীবী ছিলেন, তিনি বলতে পারেননি আদালতের নোটিশ নির্বাচন কমিশনে পৌঁছেছে কি না? ‘এ রকম আইনজীবী ও নির্বাচন কমিশন লইয়া আমরা কী করিব?’ ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধনী) বিল, ২০১১ পাসের মাধ্যমে ঢাকা শহর দ্বিখণ্ডিত হলেও বিভক্ত সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয় ২০১৫ সালের এপ্রিলে। পাঁচ বছর অন্তর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে একজন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রায় নয় বছর মেয়র পদে ছিলেন সাদেক হোসেন। মোহাম্মদ হানিফ ছিলেন সাড়ে সাত বছর। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে না যে গণতান্ত্রিক সরকারগুলো মেয়াদ শেষে নির্বাচন দিতে সব সময় উদ্‌গ্রীব থাকেন। তারা তখনই নির্বাচন দেন, যখন নিজেদের জয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হন। ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা সিটি করপোরেশনে রূপ নেয় ১৯৭৮ সালে। কিন্তু মেয়র পদে প্রথম ভোট হয় ১৯৯৪ সালে, খালেদা জিয়ার আমলে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে হারিয়ে জয়ী হন। নিয়ম অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে নতুন নির্বাচন দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে সেই নির্বাচন আর হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের মার্চে দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেয়নি। ফলে বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান। এরপর ২০০৭ সালের মার্চে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে মেয়র নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েও সফল হয়নি আওয়ামী লীগের বিরোধিতার কারণে। এমনকি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেলেও ঢাকা সিটি করপোরেশনে নির্বাচন দিতে সাহস পায়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকা শহর দ্বিখণ্ডিত করে সাদেক হোসেনের মেয়রত্বের অবসান ঘটানো হয়। ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল বিভক্ত দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয় বিশেষ পরিস্থিতিতে। এর আগে তিন মাস ধরে বিএনপি জোটের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন চলছিল। অনেকের ধারণা ছিল, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না। কিন্তু তারা নির্বাচনে অংশ নেয় এবং মির্জা আব্বাস ও তাবিথ আউয়াল প্রার্থী হিসেবে সরকারি দলের প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ফেলেন। ভোটের মাঝামাঝি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে না দাঁড়ালে কী হতো, বলা কঠিন। তবে নির্বাচনটি যেমনই হোক না কেন, আনিসুল হক নাগরিকদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছেন। বিশেষ করে, সাত রাস্তার মোড়ের রাস্তা দখল করে ট্রাকস্ট্যান্ড, গাবতলীতে বাসস্ট্যান্ড দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর সাহসী ভূমিকা সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর ক্লিন ঢাকা গ্রিন ঢাকা স্লোগান পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও নগরবাসীর মধ্যে আশা জাগিয়েছিলেন। কিন্তু সোয়া দুই বছরের মাথায় তাঁর অকালমৃত্যু ঢাকা উত্তরের অনেক কাজকেই থামিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের কথা যখন এলই, তখন আরেকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা কথায় কথায় নিজেদের সাচ্চা গণতান্ত্রিক দল বলে দাবি করেন, কিন্তু তাঁরা এক কোটি মানুষ-অধ্যুষিত ঢাকা উত্তরে এমন একজন নেতা তৈরি করতে পারেননি, যাঁকে মেয়র হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন। ২০১৫ সালেও তাঁরা প্রার্থী ধার করেছিলেন চৌকস ব্যবসায়ী নেতা ও টিভি ব্যক্তিত্ব আনিসুল হককে। আর এ বছর দল মনোনয়ন দিয়েছে ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলামকে। তুলনায় বিএনপির প্রার্থীসংকট কম। মামলার কারণে সাদেক হোসেন প্রার্থী হতে না পারলেও দক্ষিণে মির্জা আব্বাস প্রার্থী হন। উত্তরে ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়ালের প্রার্থিতা বাতিল হলে তাঁর স্থলে পুত্র তাবিথ আউয়াল প্রার্থী হন। এবারেও তাবিথকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল এখন বিএনপি করলেও একসময় আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে। বিরোধী দল বলেছে, নির্বাচন হলে সরকারি দল হেরে যাবে। এ কারণে নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবেই ত্রুটিপূর্ণ তফসিল ঘোষণা করেছে, যাতে নির্বাচনটি না হয়। আর ক্ষমতাসীন দল বলছে, আদালতের ওপর তাদের কোনো হাত নেই। তারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তাদের প্রার্থীও পরিচ্ছন্ন ইমেজের। এখন নির্বাচন কমিশনকেই প্রমাণ করতে হবে, তারা কারও ইচ্ছা পূরণ করেনি। এবং সেটি সম্ভব তিন মাসের মধ্যে আইনি জটিলতা দূর করে নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণা করে। সেই কাজ করতে পারলে তাদের বাহবা দেবে, ঢাকা উত্তরও নির্বাচিত প্রতিনিধি পাবে। আর যদি বাকি মেয়াদে ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে কোনো নির্বাচন না করতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে কমিশন নিজেকে যতই স্বাধীন ঘোষণা করুক না কেন, আসলে তারা সরকারের অধীন। তবে এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে উপনির্বাচনের ইতিহাস বড় নির্মম। পাকিস্তানের সূচনাপর্বে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের উপনির্বাচনে তরুণ নেতা শামসুল হকের কাছে মুসলিম লীগের প্রার্থীর পরাজয় ঘটলে নূরুল আমীন সরকার আর কোনো উপনির্বাচন দিতে সাহস পায়নি। ১৯৯৪ সালে মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপির জবরদস্তি ক্ষমতাসীনদের আত্মবিনাশের পথে নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে উপনির্বাচনে কাদের সিদ্দিকীকে জোর করে হারানো হয়েছিল বলে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হেনা সেই নির্বাচনের গেজেট প্রকাশ করেননি। তিনি ছুটিতে যাওয়ার পর গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনটি এখন আদালত আর নির্বাচন কমিশনের মাঝখানে ঝুলছে। সেই সঙ্গে উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কোটি মানুষের ভাগ্যও।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কাসুরে ছয় বছরের শিশু জয়নাবকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার জেলার বাইরে লুকানো অবস্থা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ৪ জানুয়ারি বাড়ির পাশে থেকে নিখোঁজ হয় জয়নাব। ৯ জানুয়ারি একটি আবর্জনার স্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় তার লাশ। এ ঘটনার পর ‘জাস্টিস ফর জয়নাব’ দাবিতে ১০ জানুয়ারি থেকে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সেখানকার মানুষ। অপরাধীর খোঁজ দিলে এক কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সূত্রের বরাত দিয়ে ডনের খবরে বলা হয়, তদন্তকারীরা জয়নাবের লাশের পাশে একটি খালি বাক্স পায়। ফরেনসিক পরীক্ষার সূত্র ধরে গতকাল একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই ব্যক্তি ধর্ষণের ৬ মামলায় জড়িত। অপরজন তার ভাই।
সে-ও ওই সব মামলার কয়েকটির আসামি। সূত্র জানায়, এই দুই ভাই কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা। তারা কোথায় আছে তা নিশ্চিত হতে কাসুরে গত তিন দিন ধরে কাজ করেছে লোকেটর ভ্যান। জয়নাবকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ১০ জানুয়ারি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। তারা ৩০০টি মোবাইল ফোনের তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেখান থেকে ছয়জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে পাওয়া গেছে, যাদের সম্পর্কে আরও তদন্ত করা হবে। তারা জানায়, পুলিশ প্রায় ১৩ শ লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের অনেককে ডিএনএ পরীক্ষার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। পাঞ্জাব পুলিশের মহাপরিদর্শক আরিফ নওয়াজ সাংবাদিকদের বলেছেন, সঠিক পথেই তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় জয়নাবের বাড়ির পাশে ঘোরাঘুরি করছে এমন এক সন্দেহভাজনের নতুন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছে পুলিশের যৌথ তদন্ত দল এ নিয়ে কোনো ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেনি।
উপজেলা ভূমি কার্যালয়। লোকজনের জটলা। ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলেন মুনসেফ আলী। তিনি খাসজমি বিষয়ে পরামর্শ নেবেন। ঘণ্টা দুয়েক এ-টেবিল ও-টেবিল ঘুরে সন্তোষজনক পরামর্শ পেলেন না। ফিরে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একটি বোর্ড নজরে আসে তাঁর। তাতে লেখা, ‘সেবা পেতে কোনো সমস্যা হলে নিচের বেলটি চাপুন, আপনার এসি ল্যান্ডকে ডাকুন।’ সাহস নিয়ে বেল চাপলেন মুনসেফ। সঙ্গে সঙ্গে এলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি (ল্যান্ড) সোহাগ চন্দ্র সাহা। কক্ষে ডেকে নিলেন মুনসেফকে। পরামর্শ দিলেন। কার্যালয়ে আসা সেবাপ্রার্থীরা বললেন, ভূমি কার্যালয়ে কাজ মানেই দালালের দৌরাত্ম্য। দিনের পর দিন হয়রানি। কর্মচারীদের অবজ্ঞার পাশাপাশি বাড়তি খরচ।
ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের চিত্রও একসময় তা-ই ছিল। কিন্তু এখন বদলে গেছে। বদলের পেছনের মানুষটি হলেন সোহাগ চন্দ্র সাহা। সোহাগ চন্দ্র সাহা বলেন, একটা সময় ছিল, কর্মকর্তারা কক্ষে বসে বেল চাপতেন। বাইরে অপেক্ষমাণ সেবাপ্রার্থীরা এক এক করে কক্ষে ঢুকতেন। কর্মকর্তা তাঁর চেয়ারেই বসে থাকতেন। ঢোকার আগে অফিস সহায়কের কাছে অনুমতি নিতে হতো। এই কারণে সেবাপ্রার্থী ও সেবাদানকারীর মধ্যে একটা ফারাক সৃষ্টি হতো। তা দূর করতেই কলবেলের বোর্ড। সোহাগ চন্দ্র সাহা এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পড়ে। ‘এসি ল্যান্ডের মাটির মায়া’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে রাজশাহীর পবা উপজেলার ভূমি কার্যালয়ের তৎকালীন এসি (ল্যান্ড) শাহাদত হোসেনের প্রায় একই রকম উদ্যোগের কথা ছাপা হয়েছিল। শাহাদত হোসেনের ভাবনার সঙ্গে নিজস্ব কিছু ভাবনা যোগ করার চেষ্টা করেছেন সোহাগ চন্দ্র সাহা।
রানীশংকৈলের অভিজ্ঞতা
সম্প্রতি রানীশংকৈল উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, পরিপাটি করে সাজানো ভূমি কার্যালয়। ভবনের বাইরে টবে নানা প্রজাতির ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। কার্যালয়ের মুখেই বোর্ডে নাগরিক সনদ টাঙানো। তাতে জমির নামজারি করতে কত টাকা লাগে, খতিয়ান তুলতে কত, খাসজমি বন্দোবস্ত নিতে করণীয়, কোন বিষয়ে কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে—এসব তথ্য লেখা। বোর্ডের সামনে ‘সেবা টেবিল’ নামের একটি সহায়ক ডেস্ক। সেখানে একজন কর্মচারী সেবাপ্রার্থীদের তথ্য সহায়তা দেন। পাশের বাক্সে থরে থরে সাজানো নানা আবেদন ফরম। সেখান থেকে সেবাপ্রার্থীরা বিনা খরচে ফরম নিতে পারেন। কর্মচারীদের গলায় ঝুলছে পরিচয়পত্র। প্রতিটি কক্ষে ছোট সাদা বোর্ডে তাঁদের প্রতিদিনের কাজ লেখা। দিন শেষে এসি (ল্যান্ড) সেগুলো ধরে মূল্যায়ন করেন। কার্যালয়ের পেছনে রয়েছে সেবাপ্রার্থীদের বিশ্রামের জায়গা। দূরদূরান্ত থেকে আসা লোকজন সেখানে বিশ্রাম নেন। মহেশপুর গ্রামের হুমায়ুন কবীর বলেন, গত বছর তিনি জমির নামজারি করার জন্য বহুবার এসেও কাজ সারতে পারেননি। গত ১৩ নভেম্বর তিনি আবারও আসেন। এবার কার্যালয়ের অনেক পরিবর্তন নজরে পড়ে তাঁর। চোখে পড়ে কলবেলের বোর্ড। সেটি চেপে ধরেন তিনি। মুহূর্তেই তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান এসি ল্যান্ড। তিনি হুমায়ুনের কথা শুনলেন। সঙ্গে সঙ্গে ডিসিআর (নামজারির পর দেওয়া বিকল্প রসিদ) রসিদ কেটে দিলেন। গত বছরের ২০ মার্চ সোহাগ চন্দ্র সাহা ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার পদে যোগ দেন। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি রানীশংকৈলের ভূমি কার্যালয়ে।
যোগ দেওয়ার পর দেখেন, কার্যালয়ে দালালের দল। কাজের জন্য কেউ এলেই পড়তেন এঁদের খপ্পরে। বিনা মূল্যের ফরমে ৫০ থেকে ১০০ টাকা আদায় করতেন। এ অবস্থা দেখে সোহাগ চন্দ্র সাহা চালু করলেন ‘কলবেল সেবা’। সোহাগ চন্দ্র সাহা জানান, এখন কার্যালয়ের সব নথি ক্রমানুসারে সাজিয়ে প্রতিটির সঙ্গে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে যেকোনো নথি এক মিনিটের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া নামজারি ও বিবিধ মামলার শুনানির তারিখ বাদী ও বিবাদীকে মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমি কার্যালয় সূত্র জানায়, গত দুই মাসে এক হাজারের বেশি সেবাপ্রার্থীকে প্রতিকার ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ সময় বিবিধ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১০০টি। নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে আরও ২৫টি মামলা। কার্যালয়ের চেইনম্যান নূরুল হুদা বলেন, আগে কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে সন্তুষ্ট না হলে সেবাপ্রার্থীরা এসি ল্যান্ডের কাছে যেতেন। এখন তাঁরা সরাসরি এসি ল্যান্ডের কাছে যান। সোহাগ চন্দ্র সাহা জানালেন, তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামে। অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে থেকেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বিভিন্ন দপ্তরে কাজে গিয়ে এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষের হয়রানি হওয়া দেখেছেন। ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে বিভিন্ন সময় তাঁর বাবাকেও হয়রানির শিকার হতে দেখেছেন তিনি। সোহাগ চন্দ্র সাহা প্রশাসন ক্যাডারে যোগদানের পর বাবা ডেকে বলেছিলেন, ‘মানুষকে সেবাটা দিয়ো।’ এটাই তাঁকে অনুপ্রেরণা দেয়। জেলা প্রশাসক মো. আবদুল আওয়াল গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সব উপজেলায় এ মডেল চালুর উদ্যোগ নেবেন।
‘মাটির মায়া’ থেকে শুরু
২০১৫ সালে রাজশাহীর পবা উপজেলা ভূমি আফিসের জনবান্ধব সেবা চালু করেছিলেন তৎকালীন সহকারী কমিশনার শাহাদত হোসেন। নিজের অফিসের নিচে একটি টিনের ছোট ঘর তৈরি করেছিলেন তিনি। সকালে এসে সেখানেই বসতেন, গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলতেন সরাসরি। তিনি এই ঘরের নাম দিয়েছিলেন ‘মাটির মায়া’। সমস্যা শুনে যেটার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব সেটা করে দিতেন। আর অন্যদের হাতে চিকিৎসকের মতো তুলে দিতেন একটি করে চিরকুট। তাতে তাঁর সঙ্গে পরবর্তী সাক্ষাতের তারিখ লেখা থাকত। নির্ধারিত দিনে সেবাগ্রহীতা গিয়ে সেবা পেয়ে যেতেন। ২০১৫ সালে প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হলে সব ভূমি অফিসে এই উদ্যোগ চালুর বিশেষ উদ্যোগ নেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমেদ। সেই উদ্যোগ কতটা সফলভাবে চলছে, তা জানতে দৈবচয়ন ভিত্তিতে পাঁচটি উপজেলার ভূমি অফিসগুলো সম্প্রতি ঘুরে দেখা হয়। 
পাঁচ উপজেলার অভিজ্ঞতা
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সার্টিফিকেট পেশকার মকবুল হোসেন নামজারি ও বিবিধ মামলার নোটিশ বোর্ড আপডেট করছেন। হেল্প ডেস্কে বসে গেছেন মাবিয়া খাতুন। এসি (ল্যান্ড) শিমুল আকতার তাকাচ্ছেন পাশের ‘রাজস্ব আদালতের’ দিকে, কোনো সেবাগ্রহীতা এসেছেন কি না। ঈশ্বরদীর ‘রাজস্ব আদালত’-এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মাটির ময়না’। সেদিন নামজারির কাজে এসেছিলেন মহাদেবপুর গ্রামের আকাল সরদার। তৎক্ষণাৎ বললেন, তিনি তাঁর সেবা পেয়ে খুশি। এসি (ল্যান্ড) জাহিদ হাসান সিদ্দিকী পুঠিয়া উপজেলার ভূমি অফিসে যোগদান করার পর গত ১৯ অক্টোবর ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে যেকোনো সেবার জন্য সরাসরি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান। গত ২২ অক্টোবর পুঠিয়া ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, এসি (ল্যান্ড) নেই। কয়েকজন মানুষ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি রাজশাহীতে একটি সভায় আছেন। ফিরে এসে তাঁদের কাজ করে দেবেন। এই প্রতিবেদক ফোন নম্বর দিয়ে আসেন। কাজ না হলে ফোন করে জানাতে বলেন। উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামের রবিউল ইসলাম, বালাদিয়াড় গ্রামের আনোয়ার হোসেন ও বিড়ালদহ গ্রামের আবদুর রহিম পরে ফোন করে জানান, সহকারী কমিশনার এসেই তাঁদের কাজ করে দিয়েছেন। রাজশাহীর দুর্গাপুর ভূমি অফিসে গিয়ে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভূমি অফিস থেকে দালাল দূর করতে গিয়ে তাঁদের এখন নিজের কাজ নিজেকেই করতে হচ্ছে। বাজুখলসি গ্রামের বাবলু বলেন, সব কাগজপত্র দেখে নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে হচ্ছে।
এটা ভালো, তবে সব কাগজপত্র গোছাতে একটু সময় লাগছে। একই কথা বলেন শালবাড়িয়া গ্রামের সালাউদ্দিন। তবে তাঁরা বলেন, এখন দালালকে কোনো পয়সা দিতে হচ্ছে না। এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার সমর পাল প্রথম আলোকে বলেন, তিনি অল্প দিন আগে এখানে যোগ দিয়েছেন। যাঁর কাজ তিনি তাঁকেই আসতে বলছেন, অন্য কারও হাত দিয়ে আসা মানেই সেখানে দালাল ঢুকে পড়তে পারে। যে পবা ভূমি অফিস থেকে এই কার্যক্রম শুরু, সেখানে প্রায় চার মাস ধরে কোনো সহকারী কমিশনার নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলমগীর কবির দায়িত্বে রয়েছেন। কয়েকজন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজ হচ্ছে। তবে আগের মতো একজন এসি (ল্যান্ড) দরকার। তবে বাঘা উপজেলার অভিজ্ঞতা একটু ভিন্ন। গত ৫ অক্টোবর সেখানকার ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, হেল্প ডেস্কে ধুলা জমে রয়েছে। সহকারী কমিশনার জুবায়ের হোসেনকে তাঁর কার্যালয়ে পাওয়া যায়। জনবান্ধব সেবা কার্যক্রম চালু আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি অনেকক্ষণ বিষয়টি বুঝতেই পারছিলেন না। একপর্যায়ে বলেন, ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সেবাগ্রহীতা বলেন, এই অফিসে আবার দালাল ভিড়ে গেছে। দালাল ছাড়া কোনো কাজ হচ্ছে না। টাকাও লাগছে বেশি।


ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সদস্যভুক্ত আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ও বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সাধারণ) পদে যথাক্রমে ৩১, ২৭৮ ও ৫৮টিসহ মোট ৩৬৭টি শূন্যপদে নিয়োগের নিমিত্তে প্যানেল প্রস্তুতির জন্য নিচের শর্তাধীনে বাংলাদেশী নাগরিকদের কাছ থেকে অনলাইনে আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অনলাইনে আবেদনের শেষ তারিখ : ৩১ জানুয়ারি ২০১৮।
পদের নাম : ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (সাধারণ)।
পদের সংখ্যা : ৩৬৭টি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা : স্নাতকোত্তর অথবা চার বছর মেয়াদি স্নাতক/স্নাতক (সম্মান) বা সমমান ডিগ্রি থাকলে আবেদন করা যাবে। এসএসসি এবং তদূর্ধ্ব পর্যায়ের পরীক্ষাসমূহে ন্যূনতম দুটিতে প্রথম বিভাগ বা শ্রেণী কিংবা সমমানের গ্রেড পয়েন্ট থাকতে হবে। কোনো পর্যায়েই তৃতীয় বিভাগ বা সমমানের গ্রেড পয়েন্ট থাকলে গ্রহণযোগ্য হবে না। এসএসসি ও এইচএসসির ফলের ক্ষেত্রে জিপিএ ৩ বা তার বেশি প্রথম বিভাগ, জিপিএ ২ থেকে জিপিএ ৩-এর কম থাকলে দ্বিতীয় বিভাগ ধরা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিজিপিএ’র ক্ষেত্রে ৪ পয়েন্ট স্কেলে ৩ বা তার বেশি প্রথম বিভাগ/শ্রেণী, সিজিপিএ ২.২৫ বা তার বেশি কিন্তু সিজিপিএ ৩-এর কম দ্বিতীয় বিভাগ/শ্রেণী। সিজিপিএ’র ক্ষেত্রে ৫ পয়েন্ট স্কেলে সিজিপিএ ৩.৭৫ বা তার বেশি প্রথম বিভাগ/শ্রেণী, কিন্তু সিজিপিএ ২.৮১৩ বা তার বেশি কিন্তু ৩.৭৫- এর কম দ্বিতীয় বিভাগ/শ্রেণী ধরা হবে। ‘ও’ লেভেল ও ‘এ’ লেভেল পাস হলে দেশীয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড থেকে ইস্যুকৃত সমমানের সার্টিফিকেট এবং বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির ক্ষেত্রে দেশীয় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ইস্যু করা সমমান সার্টিফিকেট অনুযায়ী ডিগ্রি ও ফলাফলের তথ্য দিতে হবে।
বয়সসীমা : ০১-১২-২০১৭ তারিখে সাধারণ প্রার্থীদের বয়স সর্বোচ্চ ৩০ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩২ বছর।
বেতন স্কেল : ২২০০০-৫৩০৬০/- (জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী) ও তার সাথে নিয়মানুযায়ী অন্যান্য সুবিধা দেয়া হবে।
আবেদনের নিয়ম : অনলাইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। কোনো ফি লাগবে না। আবেদনের আগে একটি ডিজিটাল ছবি অথবা স্ক্যান করা ছবি রাখুন। পাশাপাশি স্ক্যান করে রাখুন আপনার একটি স্বাক্ষর। সব ধরনের তথ্য দেয়ার পর সংযুক্ত করতে হবে ছবি ও স্বাক্ষর। ৮০ কিলোবাইটের বেশি ছবি আপলোড করা যাবে না, রেজুলেশন হতে হবে ৬০০ × ৬০০। স্বাক্ষরের বেলায় রেজুলেশন হতে হবে ৩০০ × ৮০, সর্বোচ্চ সাইজ হবে ৬০ কিলোবাইট। তথ্য পূরণ করার পর দিতে হবে পাসওয়ার্ড। কোনো কোটার আওতাভুক্ত হলে ফরমে দেয়া অপশনে ক্লিক করতে হবে। সফলভাবে আবেদন ফরম পূরণ করা হলে দেয়া হবে একটি ট্র্যাকিং নম্বরযুক্ত ফরম। ট্র্যাকিং নম্বরযুক্ত ফরমটি সংরক্ষণ করতে হবে। লিখিত পরীক্ষার সময় এটির দরকার হবে। লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের পর উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনে উল্লিখিত তথ্যাদির সমর্থনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হবে। বিবাহিত মহিলা প্রার্থীদের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করতে হবে।
নিয়োগ পরীক্ষা : প্রার্থীদের ১০০ নম্বরের এমসিকিউ, ২০০ নম্বরের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষার সময়সূচি পত্রিকা ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি করা হবে মেধাতালিকা। সেখান থেকে নির্বাচিত প্রার্থীদের ডাকা হবে মৌখিক পরীক্ষায়। সরকারি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা বেশি হয়। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকে। এ জন্য বিগত বছরের সব ধরনের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সমাধান করলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বেশি সহায়ক হবে।
বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি : নিয়োগের ক্ষেত্রে এমসিকিউ পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণজ্ঞান থেকে প্রশ্ন আসতে পারে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি ও গণিত এ তিন বিষয়ের ওপর প্রশ্ন আসতে পারে। বাংলা বিষয়ে ভাবসম্প্রসারণ, পত্রলিখন, ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ ও বাংলা ব্যাকরণের সাধারণ বিষয়গুলো থেকে প্রশ্ন থাকতে পারে। ইংরেজিতে গ্রামার, অনুবাদ, বাক্য তৈরি ও শুদ্ধকরণ, প্যারাগ্রাফ, কম্পোজিশন ইত্যাদি থেকে প্রশ্ন আসতে পারে। গণিতে প্রশ্ন আসে পাটীগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতি থেকে। বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে প্রস্তুতির জন্য নবম-দশম ও দ্বাদশ শ্রেণীর পাঠ্যবই পড়বেন। সাধারণজ্ঞানের জন্য সাধারণজ্ঞানের বই, দৈনিক পত্রিকা পড়লেই হবে।
মৌখিক পরীক্ষা : এমসিকিউ এবং লিখিত পরীক্ষায় পাস করার পর প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি জানিয়ে দেয়া হবে। এরপর প্রার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। মৌখিক পরীক্ষায় প্রার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, দক্ষতা, উপস্থাপনা, পোশাক দেখা হয়।
অনলাইনে আবেদনপত্র পাঠানোর ঠিকানা : আগ্রহী প্রার্থীদের বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট www.erecruitment.bb.org.bd-এ অনলাইন আবেদন ফরম পূরণের মাধ্যমে দরখাস্ত করতে হবে।
কোটি কোটি বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী, ডাইনোসর। বিশেষজ্ঞদের গবেষণা অনুযায়ী, আকারে প্রকাণ্ড হওয়ার কারণেই ধীরে ধীরে বিলুপ্তি ঘটেছে এই প্রজাতির। শুধু অবশিষ্ট হিসেবে রয়ে গেছে তাদের জীবাশ্ম। সম্প্রতি চীনে এমনই প্রকাণ্ড আকারসম্পন্ন এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে বলে খবরে প্রকাশ।
২০১৪ সালে ১৬১ মিলিয়ন বছর পুরনো একটি মাংসাশী ডাইনোসর বা ভেলোসির‌্যাপ্টরের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল পূর্ব চীনের বাসিন্দা হেবেই প্রোভিন্সে। চীনের ‘প্যালন্টোলজিকাল মিউজিয়াম অফ লিয়াওনিং’-এর গবেষকরা দীর্ঘদিন যাবৎ এই জীবাশ্মটিকে পরীক্ষা করেছেন। চ্যাড এলিয়াশনের গবেষণা অনুযায়ী, ডাইনোসরটির আকার হাঁসের মতো। স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ বা এসইএম দ্বারা পরীক্ষা করার পর প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তারা জানিয়েছেন, প্রাণীটির পিঠে একটি রামধনু রঙের পাখা ছিল। গবেষকরা প্রাণীটির নাম দিয়েছেন চাইহঙ জুজি। এলিয়াশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রাণীটিই পৃথিবীর একমাত্র রামধনু রঙের ডাইনোসর নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোর‌্যাপ্টার নামক আরো একটি চার-পা বিশিষ্ট ডাইনোসরের প্রমাণ ইতিপূর্বেই পাওয়া গেছে, যার পাখও রামধনু রঙের।
সেলিনা হায়াৎ আইভী একজন ব্যতিক্রমধর্মী রাজনীতিবিদ। এখন তার পরিচয় নারায়ণগঞ্জের সীমারেখা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি তার বাবা আলী আহমেদ চুনকার প্রতিবাদী রাজনীতি ধারণ করেন। গোড়ার দিকে যেসব ভালো মানুষ আওয়ামী লীগকে ধারণ করতেন, তিনি তাদের একজন। যারা বয়সী মানুষ তাদের মনে থাকার কথা আওয়ামী লীগ আজ তার সাথে যা করছে, তার বাবার সাথে তাই করেছিল। আরো মজার ব্যাপার ঘটেছিল একই রকম ঘটনা। নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় ‘মানি, মাসল ও মিডিয়া’ যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গী হয়ে ওঠে, তখন চুনকা সরকারি নমিনেশন পেতে ব্যর্থ হন। জনশ্রুতি এ রকম তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘আপনি আমাকে দোয়া করে দিন। নির্বাচনে জিতে যেন আপনার গলায় জয়ের মালা পরাতে পারি।’ প্রায় সাত বছর আগে ৩০ অক্টোবর, ২০১১ আইভী একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। পরবর্তী নির্বাচনে অবশ্য ক্ষমতাসীন দল ঝুঁকি নিতে চায়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাথে কোথাও যেন আইভীর একটি স্বাতন্ত্র্য ফুটে ওঠে। গত নির্বাচনে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অসাধারণদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আইভীকে ভোট দেন। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। নারায়ণগঞ্জ যেন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের একটি নমুনা হয়ে উঠেছে। সেখানে এ সময়ের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনা ঘটে। পরে মেধাবী কিশোর ত্বকী হত্যাকাণ্ড ঘটে।
একজন প্রবীণ শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে ওঠবস করতে হয়। এবার ঘটল আইভীর ওপর সশস্ত্র হামলা। সব অঘটনের ইশারা একই পরিবারের দিকে। অতীতের রাজনীতিতে এই পরিবারের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। আর সে জন্যই হয়তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই পরিবারের অভিভাবকত্বের কথা বলেছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে, তারা সেই অভিভাবকত্বের অসম্মান করছে। খবর বেরিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মেয়রের ওপর সশস্ত্র হামলায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। দৃশ্যত এতে ক্ষমতাসীন সরকারের ভাবমর্যাদার যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার তাৎক্ষণিক বিবরণীতে জানা যায়, মেয়র আইভী হকারমুক্ত ফুটপাথ চেয়েছিলেন। তার এই চাওয়া অন্যায় কিছু নয়। এই পদক্ষেপের আগে মেয়র আইভী ২০০৭ সালে হকারদের জন্য ৬০০ দোকান করে দিয়েছিলেন। হকারদের পুনর্বাসনের জন্য তার আরো পরিকল্পনা রয়েছে। ২০০৭ সালে সব হকারকে দোকান বরাদ্দ দেয়া যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি সব বরাদ্দ যথার্থ ব্যক্তি পায়নি- এ অভিযোগও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিতরণ করা ৬০০ দোকানের মধ্যে এখন ২৫৫ জন যথার্থ মালিকানা ধারণ করছেন। বাংলাদেশের মানুষের সুবিধাবাদী এবং অপেশাদার স্বভাবের কারণে বণ্টনে দলীয়করণ হয়েছে এবং অনেকে দোকান বিক্রি করে আবার ফুটপাথে চলে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে আইভী ফুটপাথকে যখন হকারমুক্ত করার প্রচেষ্টা নিলেন, তখন তার প্রতিপক্ষ ওই সস্তা জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগালেন। আর একটি দুঃখের বিষয়- বাম ধারার রাজনীতিকেরা ঘটনার ভালো-মন্দ দায়িত্বশীলতার সাথে বিবেচনা না করে পরোক্ষভাবে গডফাদারের হাতকে শক্তিশালী করলেন। ফুটপাথ হকারমুক্ত করা একটি অজনপ্রিয় কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজ। ঘটনাক্রমে মনে পড়ছে, ঢাকা মহানগরে মির্জা আব্বাস এই প্রয়োজনীয় কাজটি করে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। তাই সচেতন নাগরিকরা ভাবেন, ‘আমাদের দেশে সেই রাজনীতি হবে কবে, যখন কথা বড় না হয়ে কাজ বড় হবে।’ দৃশ্যত হকার উচ্ছেদের পক্ষে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক হচ্ছে- অসৎ উদ্দেশ্যের হুঙ্কার। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের গডফাদার আগের দিন তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, এটা অনুরোধ না নির্দেশ। নারায়ণগঞ্জের ফুটপাথে হকার বসবে।... যারা আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের জবাব দিতে দুই মিনিটও লাগবে না।’ মেয়র সেলিনা হায়াৎ ঘটনাপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সুস্পষ্টভাবে তার প্রতিপক্ষের নাম উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার দুই গজ সামনেই পিস্তল বের করেছে। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে।... এটা পারিবারিক কোনো দ্বন্দ্ব নয়। আমি কোনো দিন আগ বাড়িয়ে কারো সাথে লাগতে যাই না।
এখানে তো একপক্ষ মারল, আরেক পক্ষ মার খেল। তিনি তো আগের দিনই ঘোষণা দিয়েছেন।’ অপর দিকে, তার প্রতিপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছে, ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে অথবা প্রকৃত সত্য না জেনেই অনেক গণমাধ্যম সংঘর্ষকে দু’জনের সংঘর্ষ বানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো- হকার বনাম আইভীর দ্বন্দ্ব। গরিব বনাম গরিবের বিপক্ষের দ্বন্দ্ব। বস্তুত আইভীর ওপর হামলা একটি প্রকাশ্য সন্ত্রাস। শোনা যায়, পিস্তলধারী ব্যক্তিটি গডফাদারের দীর্ঘ দিনের সন্ত্রাসের সহযোগী। দৃশ্যত তিনি তার ক্যাডারকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘নিয়াজুলের অস্ত্রটি খোয়া গেছে। সেটি ফেরত পাওয়া যায়নি। নিয়াজুল মামলা করলেও পুলিশ মামলা নেয়নি।’ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। শাসক দলের ক্যাডারদের এ ধরনের অস্ত্রবাজি নতুন নয়। বেশ কয়েক মাস আগে বায়তুল মোকাররমে হকার উচ্ছেদে পুলিশের সহযোগী হিসেবে অস্ত্রহাতে সোনার ছেলেদের দেখা গেছে। অবশ্য জনরোষে এবং গণমাধ্যমের কারণে তাকে পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। হয়তোবা সে ইতোমধ্যে জামিনও পেয়ে গেছে। তার কারণ- সে সোনার ছেলে। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় এই, নারায়ণগঞ্জের এবং বায়তুল মোকাররম উভয় ক্ষেত্রেই পুলিশের সামনেই অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং পুলিশের সহযোগী শক্তি হিসেবে এরা সাধারণত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। নারায়ণগঞ্জের ব্যাপারে বিস্ময়ের ব্যাপার যে, পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দৃশ্যত তারা গডফাদারের পক্ষাবলম্বন করেছে। তা ছাড়া মেয়র আইভীকে উপমন্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সেই মর্যাদাবান ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে। কথায় বলে ‘বাঘে-মোষে লড়াই করে, উলুখাগড়া পড়ে মরে’। সংঘর্ষের পর যাদের নিয়ে লড়াই তাদের কোনো উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং পরিকল্পনার কথা কোনো পক্ষই বলেনি। তবে নারায়ণগঞ্জের প্রধান সড়কসহ কয়েকটি সড়কে ফুটপাথে সাময়িকভাবে হকার বসতে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হকাররা ফুটপাথে সর্বত্র পুলিশের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। সবাই জানে, হকারদের নিয়ে ক্ষমতাসীনেরা সবসময়ই লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে আসছে।
এরা উভয় ক্ষেত্রেই স্বার্থবাদী ভূমিকা পালন করে। চাঁদাবাজিতে অংশ নেয়। হকারদের উচ্ছেদের সময় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে পুলিশের সহযোগী হয়। মূলত রাজনীতির আবরণে এরা এক ধরনের শোষক। আইভী এবং এমপির দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। দ্বন্দ্ব ব্যক্তিগত পর্যায়ের মনে হলেও এতে আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পার্থক্য রয়েছে। আইভী লড়ছেন নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ও সুশাসনের জন্য। আইভী এবং তার পরিবারের অতীত ঘাঁটলে দেখা যায়, তারা রাজনীতিকে একটি মহৎ পেশা বলে গণ্য করছেন। মানুষের সেবাই তাদের লক্ষ্য। অপর দিকে তার প্রতিপক্ষের ‘সেকেন্ড জেনারেশন’-এর রেকর্ড মহৎ রাজনীতির সাক্ষ্য প্রমাণ দেয় না। সেখানে রাজনীতির লক্ষ্য হচ্ছে অবাধ লুণ্ঠনের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার। ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃত্ব সম্পর্কে যদি এসব বিষয়ে পরিসংখ্যান নেয়া যায়, তাহলে আমাদের শুধু হতাশই হতে হবে। আওয়ামী মরুভূমিতে আইভী একটি মরূদ্যান। শুধু নারায়ণগঞ্জে এই দ্বন্দ্ব সীমিত নয়। শাসককুলের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। মজার ব্যাপার, এখানে এবং দেশের সর্বত্র ‘সব দোষ নন্দঘোষ’-এর ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টাও চলছে। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায় থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, আইভী ১৬ জানুয়ারি ‘বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের নিয়ে মিছিল করেছিলেন।’ একটি দেশের সর্বত্র গণমাধ্যমের সৌজন্যে এসব অভিযোগ এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও গুণ্ডামির খবরাখবর প্রকাশিত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এখন বন্দরনগরীতে একটি ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশন এলাকার জনগণের শান্তি, স্বস্তি এবং নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ রাজার ধর্ম। এত দিন ধরে সরকার দুষ্টের লালন ও শিষ্টের দমন করছিল বলে- সাধারণ্যের অভিযোগ। নারায়ণগঞ্জের এ ঘটনা এবং আইভীর অনুসৃত গণমুখী অবস্থান থেকে সরকার এবং শীর্ষ নেতৃত্ব কিছু শিখবেন বলে জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com