Last update
Loading...
হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে পাশ্ববর্তী বায়লাদেশে আশ্রয় নেয়ায় বিশ্ব সমালোচনা, পর্যবেক্ষণ, তিরস্কার ও নিন্দার মুখে রয়েছেন অং সান সুচি। রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতাকে জাতি নিধনের এক ন্যক্কারজনক উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান জায়েদ রাদ আল হোসেইন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী যেভাবে নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে তাতে দেশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেনাবাহিনীর হাতে। দেশের নেত্রী, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচির হাতে নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, ২৫ আগস্টে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ৩০টি পোস্টে হামলা চালায়। এতে ১২ নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। তারপর থেকে সেনাবাহিনী ও তাদের সঙ্গ নেয়া বৌদ্ধরা রাখাইন রাজ্যজুড়ে অভিযান চালাচ্ছে। তারা টার্গেট করছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের। এটাকে নাম দেয়া হয়েছে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশনস’। দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া অথবা পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলেছেন, তাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বহু নিকটজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাদেরকে আর কখনও ফেরত দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎও হয়নি। অনলাইন সিএনএন-এ এ কথা লিখেছেন সাংবাদিক জেমস তারাবে। তিনি আরো লিখেছেন, ১৯৬২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার শাসন করে সামরিক জান্তা। এ সময় তারা গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন করায় গ্রেপ্তার করে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেত্রী অং সান সুচিকে। জারি করে সামরিক আইন। প্রতিবাদীদের হত্যা করতে থাকে। সেই সামরিক বাহিনী এখনও দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী, পুলিশ ও সরকারের মন্ত্রিসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এর ফলে করার মতো কিছুই আসলে নেই সুচির হাতে। সিডনিতে লোউয়ি ইন্সটিটিউটের ইস্ট এশিয়া প্রোগ্রাম বিষয়ক রিসার্চ ফেলো আরোন কোনলি বলেন, মিয়ানমারের সংবিধানের অধীনে কমান্ডার ইন চার্জ (মিয়ানমার সেনাবাহিনীর) নিজেই নিজের বস। তিনি অং সান সুচির কাছে রিপোর্ট করেন না।  দেশের নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সম্মানের মধ্যে পছন্দ বেছে নিতে বলা হয় যদি সেনাবাহিনীকে তাহলে তারা নিয়ন্ত্রণকেই বেছে নেবে। তবে এখানে প্রশ্ন হলো, তারা স্বেচ্ছায় (বেসামরিক প্রশাসনের হাতে) কতটুকু ক্ষমতা ছেড়ে দেবে। আরোন কোনলি বলেন, ২০০৮ সালে মিয়ানমারে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছে তার বাইরে একদানাও তারা স্বেচ্ছায় ছাড় দেবে এমন কোনো প্রমাণ আমি দেখতে পাইনি।
কি আছে ২০০৮ সালের সংবিধানে
২০০৮ সালে মিয়ানমারে নতুন সংবিধান প্রণীত হয়। তাতে জাতীয় পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর জন্য এক-চতুর্থাংশ আসন বরাদ্দ রাখা হয়। এটা ছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি কৌশল। এর মধ্যমে তারা অচল অবস্থায় পড়ে যাওয়া রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক সংস্কার, বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সুচিকে সাধারণ্যে নিয়ে এসে মিয়ানমারকে অচলায়তন থেকে বের করে আনে। কিন্তু সংবিধানের অধীনে সেনাবাহিনীকে পেশীশক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা দেয়া হয়। সেটা করা হয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে তাদের স্বাধীনতা দিয়ে। এই সংবিধানেই রাখা হয়েছে সংঘাতময় কিছু ধারা। তাতে বলা হয়েছে, কোনো দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এমন ব্যক্তি (হতে পারে সেটা পিতামাতা বা সন্তান) মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। অং সান সুচির প্রয়াত স্বামী ছিলেন একজন বৃটিশ। তাই তাদের দু’সন্তানও বৃটিশ নাগরিক। এ কারণে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি সুচি। কিন্তু তিনি যাতে মূল দায়িত্ব পালন করতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন সে জন্য একটি বিশেষ পদ সৃষ্টি করা হয়। তা হলো স্টেট কাউন্সেলর। ২০১৫ সালে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচন হয়। তখন তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, তার দল যদি বিজয়ী হয় তাহলে তিনি এমন একটি সরকার গঠন করবেন, যেখানে তিনি থাকবেন প্রেসিডেন্টের ওপরে। এটা একটি অতি সাধারণ বিষয়। কিন্তু সংবিধানের অধীনে কমান্ডার ইন চিফ, যিনি সেনা কর্তৃপক্ষেরও প্রধান, তিনি প্রেসিডেন্টেরও ওপরে। তার মধ্যে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সেনাবাহিনীর জন্য নির্ধারিত আসনে কাকে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে সেটা নির্ধারণ করেন তিনি। এ ছাড়া সংবিধানের অধীনে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কর্তৃত্বও কমান্ডার ইন চিফের হাতে। এটাকে বলা হয় রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তি। এ ছাড়া সংবিধানে বাতিল করা হয়েছে অতীতের দণ্ডবিধি আইন। এর অধীনে সেনাবাহিনী অতীতে অং সান সুচিকে গৃহবন্দি রেখে, ১৯৯০ সালের নির্বাচনকে বাতিল করে দিয়ে যেসব অপরাধ করেছে সেই অপরাধের বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ১৯৯০ সালের নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে সেনাবাহিনী কার্যত তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে।
১৯শে সেপ্টেম্বর মিয়ানমারে কূটনীতিকদের সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ রেখেছেন অং সান সুচি। এ সময় তিনি বলেছেন, এখনও তার সরকার তরুণ। মাত্র ১৮ মাস ক্ষমতার বাইরে ছিলো। এখনও দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তিনি বলেছেন, অর্ধ শতাব্দী বা তারও বেশি সময়  স্বৈরাচারের শাসনের পর আমরা এখন আমাদের জাতি গঠনের পথে রয়েছি। আমাদের সরকার তরুণ, নাজুক (ফ্রাজিল)। অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবু আমরা সেগুলোর সঙ্গে লড়াই করছি। আমরা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের বিষয়ে আবদ্ধ থাকতে পারি না।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী যে নির্মমতা চালাচ্ছে তাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গণতন্ত্রের পক্ষের মানুষরা ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। কিন্তু সুচির শাসনের অংশীদার কমান্ডার ইন চিফ সিনেটর জেনারেল মিন অং হ্লাইং যথারীতি তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অং সান সুচি যখন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিলের ঘোষণা দিলেন, তখন মিন অং হ্লাইং     দেশে পররাষ্ট্র বিষয়ক কূটনীতিকদের আপ্যায়ন করছিলেন, সেনা কর্মকর্তাদের সামনে বক্তব্য রাখছিলেন এবং ডোনেশন গ্রহণ করছিলেন রাখাইনে বিদ্রোহীদের কারণে সৃষ্ট বিশৃংখলায় বাস্তুচ্যুত মানুষকে সহায়তার জন্য। তার আনুষ্ঠানিক সব কর্মকাণ্ডের কথা নিত্যদিনই ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হচ্ছে। এটি ফেসবুক কর্তৃপক্ষের ভেরিফাই করা পেজ। সেখানে তার অনুসারীর সংখ্যা ১২ লাখ ৮০ হাজার। ১৫ই সেপ্টেম্বরে সেখানে তিনি ইংরেজিতে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তাতে বলেছেন, ২৫শে আগস্ট থেকে ‘এক্সট্রিমিস্ট বাঙালি’দের সঙ্গে ৯৩ টি সংঘর্ষ হয়েছে। তিনি এক্সট্রিমিস্ট বাঙালি বলতে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের বুঝিয়ে থাকেন, যারা উগ্রপন্থায় লিপ্ত। ওই পোস্টে তিনি আরো দাবি করেছেন, এসব উগ্রপন্থি রাখাইন রাজ্যে তাদের শক্ত ঘাঁটি গাড়তে চায়। তারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি চায়। মিয়ানমারে কোনোদিনও রোহিঙ্গা নামের কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই। বাঙালি ইস্যুটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে সত্য তুলে ধরতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর আগে ১লা সেপ্টেম্বরে আরেকটি পোস্ট দেন তিনি। তাতে তিনি ১৯৪২ সালে রাখাইন রাজ্যে রাখাইনদের প্রাণহানীর দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, বাঙালিরা হামলা চালিয়েছিল। মানুষ হত্যা করেছিল। তাদের বাড়িঘর ছেড়েছিল। আমরা সেই ভয়াবহতা আবার ঘটতে দিতে পারি না কখনো। অং সান সুচি ও সেনাবাহিনী উভয় পক্ষই দাবি করছে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা করেছে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা। সুচি প্রকাশ্যে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি। তিনি বলেছেন, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। মিয়ানমারের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কুসংস্কার বা ঘৃণা কাজ করে। ১৮২৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত বৃটিশ শাসনের সময়ে কিছু রোহিঙ্গাকে শ্রমিক হিসেবে নেয়া হয়েছিল রাখাইনে। ওই সময় আরাকান ছিল বৃটিশ শাসিত ভারতের অংশ। তাই রোহিঙ্গা শ্রমিকদের স্থানান্তরকে বৃটিশরা দেখতো আভ্যন্তরীণভাবে একস্থান থেকে আরেক স্থানে চলে যাওয়া হিসে। বহু রোহিঙ্গা বলেছেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বহু মুসলিম ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা ছিলেন রাখাইনে এবং তারা তাদের পূর্বসুরি। এমন অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে। বাস্তবে সেখানে জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মিশ্রণ ঘটেছে। ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব আইন পাস করে। তাতে বলা হয়, রোহিঙ্গারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে যদি তারা সরকারিভাবে স্বীকৃত ভাষায় কথা বলতে পারে, প্রমাণ দেখাতে পারে তাদের পূর্ব-পুরুষরা মিয়ানমারের স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকে সেখানে বসবাস করছে। কিন্তু বেশির ভাগ রোহিঙ্গা তাদের অতীতের রেকর্ডপত্র দেখাতে পারেননি এবং তার ফলে তারা কার্যত হয়ে পড়েন রাষ্ট্রহীন। মিয়ানমারে স্বীকৃত ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠী আছে। এ তালিকায় রোহিঙ্গা নেই। সরকারি বিবৃতিতে তাই মিন অং হ্লাইয় রোহিঙ্গা শব্দ উচ্চারণ করেননি। এর পরিবর্তে তিনি উচ্চারণ করেছেন ‘বাঙালি’।
অস্ত্র বিক্রি ও নিষেধাজ্ঞা
পশ্চিমা দুনিয়ার সমালোচনা, নিন্দাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এর কারণ কি? কারণ, তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ দিলে কিছুই হবে না এমনটা মনে করে তারা। দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্রের মতো আরো অনেক দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত আকারে রেখেছিল। মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করার পরিবর্তে সেখানে প্রতিরক্ষা বিষয়ক এটাচেকে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তাদেরকে যোগাযোগ রক্ষা করতে বলা হয় মিয়ানমারের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের অধীনে দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্কে জোর দেয়া হয় আইনের অধীনে থেকে সেনা প্রশিক্ষণ, মানবাধিকার ও বিপর্যয়ে থ্রাণ, বহুপক্ষের মহড়ায় অংশগ্রহণ বিষয়ে। আরোন কোনলি বলেছেন, কোথায় ওই সম্পর্ক বিদ্যমান। এখনও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তা সত্ত্বেও চীন, ভারত, রাশিয়া এমনকি ইসরাইলের মতো মিত্ররা তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সেনাবাহিনীকে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অস্ত্র ও সামরিক ব্যয় বিষয়ক সিনিয়র গবেষক সিমোন ওয়েজেম্যান বলেছেন, এশিয়ায় সবচেয়ে কম স্বচ্ছতার দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার অন্যতম। আপনি যদি দেখেন তাহলে মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হলো চীন। আমরা যেসব অস্ত্র মিয়ানমারের হাতে দেখতে পাচ্ছি তার বেশির ভাগই চীনের। হোক সেটা স্থল, আকাশ বা সমুদ্রে ব্যবহারের অস্ত্র। তিনি বলেন, মিয়ানমারকে রাশিয়া সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছে হেলিকপ্টার ও হালকা যুদ্ধবিমান। ভারত সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছে নৌবাহিনীর জন্য অস্ত্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অনেক ইউরোপিয়ান দেশ অস্ত্র দিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধকে কোন চোখে দেখে মিয়ানমার
মিয়ানমারের জাতীয় বাজেটের শতকরা ১৪ ভাগই বরাদ্দ রাখা হয় প্রতিরক্ষাখাতে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার পরেও মিয়ানমার অস্ত্র কিনতে ও হার্ডওয়্যার কিনতে সক্ষম হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ব্যবসায় তাদের যে সম্পদ রয়েছে তার অন্যতম মিয়ানমার ইকোনমিক করপোরেশন। এখান থেকে কলকারখানায় উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন এমন কি অন্যান্য খাতও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সিগারেট ও জ্বালানি আমদানিতে ক্ষমতাসীন জেনারেলদের লোভ দেখানো হয় মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিংস লিমিটেড। দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন অংশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে, এমনকি শেয়ারহোল্ডারও হয়ে ওঠে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে এ কথা বলেছেন ইয়েশুয়া মোসের পুয়াংসুওয়ান। তিনি বলেন, মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও নিরেট নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে সেনাবাহিনী। বিশ্বনেতারা এখন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবরোধ বাস্তবায়নের জোর আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর তাদের নৃশংসতা বন্ধ করে।
যেন রাজনীতির দাবা। ঘোড়ার চাল দিয়ে আড়াই কোর্ট অতিক্রম করতে চেয়েছেন অং সান সুচি। আটকাতে চেয়েছেন ‘বিশ্ববিবেক’ নামের রাজাকে। কিন্তু পারেননি তিনি। উল্টো তার ঘোড়াই এখন দৌড়ের মুখে। বিশ্ববিবেক তাই সমালোচনায় মশগুল। জাতির উদ্দেশে দেয়া তার ভাষণ নিয়ে কটাক্ষ হচ্ছে জনে জনে। কেন? উত্তর খুব সোজা। তিনি অনেক আশা দিয়েছেন ওই ভাষণে। কিন্তু সেইসব কথার মাঝে রয়েছে চোরাবালির মতো ফাঁদ। সেগুলোকে অতিক্রম করে রাখাইনে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি তার ভাষণে অনেক কিছুই এড়িয়ে গেছেন। তিনি সব মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যে লোমহর্ষক ভিডিও ক্লিপ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ওইসব ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে সেনা সদস্যরা, বৌদ্ধরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। হত্যারও তো একটি রকমফের আছে। শুধু গলা কেটে, ধর্ষণ করেই তারা ক্ষান্ত হচ্ছে না। ধর্ষিতা নারীর স্তন পর্যন্ত কেটে ফেলছে। তার হাত-পা কেটে ফেলছে। তারপর গলা কেটে মাথা আলাদা করছে। নগ্ন যুবতীকে গাছে বেঁধে রাখা হয়েছে। জীবন্ত মানুষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। চোখের ভেতর লম্বা ধারালো ছোরা দিয়ে খুঁচিয়ে গলিয়ে দেয়া হচ্ছে। পিতামাতার সামনে টিনেজ, যুবতী মেয়েকে, সন্তানের সামনে মাকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। মানবাধিকারের কথা বলেছেন সুচি। কিন্তু এসব বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলেন নি। তিনি বলেননি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের স্যাটেলাইটে ধরা পড়া গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার প্রমাণের বিষয়টি। তিনি রাখাইনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। এখানে একটি তবে আছে। তা হলো, তার ভাষায়- যেসব রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চান তাদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা (রিফিউজি স্ট্যাটাস) যাচাই করতে প্রস্তুত মিয়ানমার। এর অর্থ হলো, তিনি বুঝাতে চেয়েছেন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নয়, শরণার্থী মর্যাদা দেয়া হতে পারে। কিন্তু রোহিঙ্গারা কি শরণার্থীর মর্যাদার দাবিদার তার জন্মভিটায়, যেখানে তার পূর্বপুরুষরা যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। তাদের যে নাগরিকত্বের সুপারিশ করেছে কফি আনান কমিশন, এর মাধ্যমে সুচি তা একদিকে বাস্তবায়ন অন্যদিকে প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বেশির ভাগই এখনো রাখাইনে রয়েছেন। নিরাপদে রয়েছেন। তাদের বাড়িঘরে কোনো স্পর্শ লাগেনি সহিংসতার। খুবই ভালো কথা। এমনটাই শুনতে চায় বিশ্ববিবেক। এখানেও একটি কিন্তু আছে। তাহলো, যদি তা-ই হবে, যদি বেশির ভাগ রোহিঙ্গা তাদের ভিটেমাটিতে থেকেই থাকেন, তাদের বাড়িঘর অক্ষত থাকে, তাহলে কি কারণে চার লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে! কি কারণে উত্তর নাফ নদ, বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন! কি কারণে কোনো মানুষ তার জন্মভিটা  ছেড়ে পঙ্গপালের মতো! কেন ২৫শে আগস্ট সহিংসতা শুরু হওয়ার পর আক্রান্ত এলাকায় জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন, নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি। ২৫শে আগস্ট থেকে ১৯শে সেপ্টেম্বর প্রায় এক মাস সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে কেন কোনো পর্যবেক্ষককে ওই এলাকায় যেতে দেয়া হলো না! এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি সুচি। তিনি জানেন এর কোনো উত্তর তার কাছে নেই। তিনি জানেন, এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন। তাই তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি গা বাঁচাতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যে নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছেন, যেসব ভিডিও তারা দেখাচ্ছেন মোবাইলে সে সবই কি মিথ্যা! এপারে নাফ নদের ধার থেকে ওপারে রাখাইনে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার যে দৃশ্য দেখা গেছে, কালো ধোঁয়া আকাশকে গ্রাস করতে দেখা গেছে- সে সব কি মিথ্যা! সুচি জানেন ওই এলাকায় সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকদের প্রবেশ করতে দিলে তার সরকারের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে। আর এই এক মাস নিশ্চয় হত্যা করা মানুষগুলোর লাশ গুম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে কি এটা ধরে নিতে হবে, গত প্রায় এক মাস ওই এলাকায় কোনো সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক প্রবেশ করতে না দেয়ার অর্থ হলো ওই লাশগুলো গায়েব করে দেয়া, যাতে তাদের কোনো নাম-নিশানা না থাকে! পুড়িয়ে দেয়া গ্রামগুলোর ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলার জন্য এ সময় নেয়া হচ্ছে! সুচি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকে তোয়াক্কা করেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। হ্যাঁ, এমন কথা রাজনীতির ভাষায় কার মুখে মানায় তা নিশ্চয়ই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত অং সান সুচির জানার কথা। কারণ, তিনি জীবনে ১৫ বছর জেলে কাটিয়েছেন। তিনি জানবেন না তো কে জানবে! সুচি তার বক্তব্যে একটিবারের জন্য ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন নি। এর অর্থ কি! তিনি তাহলে কাদের নিয়ে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন! তিনি ও তার সরকার, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে দেখে না। তারা রোহিঙ্গাদের দেখে বাঙালি অথবা সন্ত্রাসী হিসেবে। তিনি যে, এখনো সেই অবস্থানেই আছেন, ভাষণের মধ্যে একটিবার রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং তার সরকার দেশত্যাগীদের শরণার্থী মর্যাদার প্রক্রিয়াটি যাচাই করতে প্রস্তুত বলে জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গারা যদি শরণার্থী হন তাহলে তাদের দেশ কোন্‌টি! তার যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া কি হবে সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন নি। কি পরিমাণ ‘শরণার্থী’ ফেরত নেবেন তাও তিনি বলেন নি। যদি তার যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ায় দুই হাজার রোহিঙ্গা  টেকেন তাহলে তাদেরকেই তিনি নেবেন! বাকিদের কি হবে! মনে রাখার কথা, ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বাইরে রাখা হয়। তাদের কোনো স্বাধীনতা নেই। এমন কি নিজের গ্রাম থেকে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি নেই। এ নিয়ে বিশ্ব দরবারে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা, সমালোচনা। এবার যে পরিমাণে বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে এর আগে এতটা হয়নি। দৃশ্যত রোহিঙ্গা সংকট সমাধান একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া বা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এ অবস্থায় সচেতন অনেকেই বলছেন, রাখাইন ও রোহিঙ্গা সংকট কি তবে ফিলিস্তিন, কাশ্মীরের মতো রূপ নিতে যাচ্ছে! যেখানে বহুপক্ষ জড়িত। মাঝখান দিয়ে দুর্ভোগে বাংলাদেশ। অং সান সুচি ভাষণ দেয়ার পরে আবার মুখ খুলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরাঁ, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোন, নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ বুহারি। তারা অবিলম্বে রাখাইনে সেনা অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। আর মিয়ানমারের সেনাদের প্রশিক্ষণ আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে বৃটেন। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে এই রোহিঙ্গা, রাখাইন ইস্যু বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে কথা বলছেন বিশ্ব নেতারা। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সোচ্চার রয়েছেন। বিশ্বের অনেকের টনক নড়েছে। কিন্তু টনক নড়েনি চীন ও ভারতের। মিয়ানমারকে সমর্থন দেয়ার কথা প্রকাশ্যে বলে দিয়েছে চীন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রোহিঙ্গা সংকটের ভেতরে মিয়ানমার সফরে গিয়ে সুচির সঙ্গে অভিন্ন অবস্থান জানিয়ে এসেছেন। মিয়ানমার হলো চীন, রাশিয়া, ইসরাইল, বৃটেন সহ আরো অনেক দেশের অস্ত্রের বাজার। তাছাড়া আঞ্চলিক রাজনীতির কৌশলে কেউ কাউকে নাহি ছাড়ি অবস্থা। এতে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। কক্সবাজার উপকূলে আর্তনাদ ভারি হচ্ছে। রাখাইনের বাতাসে পোড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে। সে গন্ধ সুচির নাকে লাগছে না। তাই তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে মঙ্গলবার কূটনীতিকদের জড়ো করে তার অবস্থান প্রকাশ করলেন। কিন্তু কেবলই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের দুটো লাইন মনে পড়ছে- ‘অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি, তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি’।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দেশটির মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নিধন করার অভিযোগ উঠেছে অনেকদিন হলো। কিন্তু বেশ কয়েক সপ্তাহ নিরবতা বজায় রাখার পর, দেশটির নেত্রী অং সান সুচি অবশেষে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। কিন্তু জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তার ভাষণের পর, এই সংকট নিরসনে বিশ্ব আশাবাদী হওয়ার বদলে যেন আরও ক্ষুদ্ধ হয়েছে। বিতর্কিত এই বক্তব্যের পর তার সমালোচনা আরও বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই বক্তব্যে তিনি অনেক কিছু বলেছেন, যেগুলো ‘নির্জলা মিথ্যা’ কিংবা ‘বিভ্রান্তিকর’। এরই প্রেক্ষাপটে বৃটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান সুচি’র বক্তব্যের কিছু আলোচিত অংশ যাচাই-বাছাই করে তুলে ধরেছে সেগুলোর সত্যতা কতটুকু। 
সুচির বক্তব্য: আমি মনে করি, আমার উচিত আপনাদের মনে করিয়ে দেওয়া যে আমাদের সরকার ক্ষমতায় এসেছে এখনও এমনকি ১৮ মাসও হয়নি।
গার্ডিয়ান: সত্য। ২০১৫ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরাট বিজয় অর্জন করেন সুচি। অবসান ঘটে কয়েক দশক ব্যাপী দীর্ঘ সামরিক শাসনের। তবে সেনাবাহিনী এখনও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছে: প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত। ফলে এই সংকটে বেসামরিক সরকার ছিল অনেক দুর্বল ও অনেকের মতে স্বল্প-কার্যকরী।
সুচি’র বক্তব্য: কয়েক মাস ধরে শান্ত পরিস্থিতি চলার পর, ২৫শে আগস্ট ৩০টি পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। এটা ঠিক যে, এবারকার সহিংসতার পর্ব শুরু হয়েছিল ২৫শে আগস্ট সহিংস রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর আক্রমণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু উত্তর রাখাইনে কখনই ‘শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি’ ছিল না। এই হামলার আগেও, শ’ শ’ রোহিঙ্গাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজে বা খাবার সংগ্রহে নড়তে দেয়া হচ্ছিল না। সেনাবাহিনী নিয়মিতই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ চালাচ্ছিল, যেগুলো ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণঘাতীও ছিল। আবার রোহিঙ্গা জঙ্গিদের বিরুদ্ধেও সন্দেহভাজন সরকারি গুপ্তচরদের হত্যা করার অভিযোগ ছিল।
সুচি’র বক্তব্য: দায় ভাগাভাগি করা বা দায়িত্ব পরিত্যাগ করা মিয়ানমার সরকারের উদ্দেশ্য নয়। আমরা সব ক’টি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বেআইনি সহিংস ঘটনার নিন্দা জানাই।
গার্ডিয়ান: মিথ্যা। বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু মিয়ানমারের সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত মিডিয়া সরাসরি এই সংঘাতের দায় ‘চরমপন্থি সন্ত্রাসী’দের ঘাড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে বারবার। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী বা জাতিগতভাবে বৌদ্ধদের হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিন্দা জানানো হয়নি।
সুচি’র বক্তব্য: মানবাধিকার লঙ্ঘণ এবং স্থিতিশীলতা, সম্প্রীতি ও আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করার সব ধরনের কার্যকলাপ কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসারে মোকাবিলা করা হবে।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। রাখাইন রাজ্যে মোতায়েনরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার রেকর্ড খুবই কম। রোহিঙ্গাদের পেটানোর একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর, জানুয়ারিতে দেশটি চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায়। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে কিনা, সেটি স্পষ্ট নয়। সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে গঠিত একটি সরকারি কমিটি ‘তদন্ত’ শেষে জানায়, ওই অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
সুচি’র বক্তব্য: যাদেরকে নিজ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছে তাদের মধ্যে শুধু মুসলিম বা রাখাইন নয়, অনেকেই আছে। আছে কিছু ছোট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যেমন দাইং-নেট, ম্রো (কামি), থেট, ম্রামাগ্যি ও হিন্দু। এদের উপস্থিতির ব্যাপারে পুরো বিশ্ব সম্পূর্ণই অন্ধকারে।
গার্ডিয়ান: সত্য। আন্তর্জাতিকভাবে নজর দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা গ্রাম পোড়ানোর দিকে, যেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি দ্বারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এবং নজর দেয়া হয়েছে ৪ লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গার দিকে যারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, এমন রিপোর্টও এসেছে।
সুচি’র বক্তব্য: ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে কোনো সশস্ত্র সংঘাত চলছে না। চলছে না কোনো ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’।
গার্ডিয়ান: মিথ্যা। গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা চলছেই। বাংলাদেশ থেকেও সেগুলো দেখা যাচ্ছে। এছাড়া ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে গোলাগুলির আওয়াজ প্রায়ই শোনা গেছে রাখাইনে। এমনকি খোদ সু চি’র কার্যালয়ের ফেসবুক পাতায় বলা হয়েছে, ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে নিরাপত্তা বাহিনী ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’ পরিচালনা করে আসছে।
সুচি’র বক্তব্য: মুসলিমদের ৫০ শতাংশ গ্রাম এখনও অক্ষত।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস করার প্রক্রিয়া অনেকটাই পদ্ধতিগত বা সিস্টেমেটিক। অনেক বড় এলাকায় হলে বাছবিচারহীনভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি উদ্ধৃত করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ২১৪টি গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে, সরকার বলেছিল যে, সেনাবাহিনীর যেসব গ্রাম টার্গেট করেছে, সেগুলোর ৪০ শতাংশ এখন খালি। সেখানে পোড়ানো তখনও থামেনি। রাখাইনে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার মুক্ত না হওয়ায়, ঠিক কত শতাংশ গ্রাম ধ্বংস বা অক্ষত আছে, তা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। আবার রাখাইনে সব মুসলিমই রোহিঙ্গা নয়। ফলে মুসলিম আর রোহিঙ্গাদের এক কাতারে আনার মাধ্যমে সুচি এখানে সংঘাতকে পরিসংখ্যানে প্রকাশ করে বিকৃত করার চেষ্টা করছেন।
সিএনএন এক্ষেত্রে আরেকটি বিশ্লেষণ দিয়েছে: সুচি নিজের বক্তব্যে একবারই রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। তবে তা-ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্দেশ করতে নয়। তিনি আরসা জঙ্গি গোষ্ঠী অর্থাৎ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে বোঝাতে একবার ‘রোহিঙ্গা’ উচ্চারণ করেছেন। লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পেনি গ্রিন বলেন, ‘তিনি (সুচি) মূলত এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে বোঝাতে। এর মানে হলো, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের একটি মাত্র পরিচয় হলো, তার মতে, সন্ত্রাসী। তিনি চান আন্তর্জাতিকভাবেও এই ধারণাটাই গৃহীত হোক।’
সুচি’র বক্তব্য: রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত সকল মানুষের কোনো বৈষম্য ব্যতিরেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার রয়েছে।
গার্ডিয়ান: মিথ্যা। বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই মিয়ানমারে নাগরিকত্ব ও প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্যসেবা খুবই সীমিত। অনেকেই বিদ্যালয়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন না। বিশেষ করে যেসব রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণ শিবিরে থাকেন, তাদেরকে শিবির থেকে বের হতেই বিশেষ অনুমতি লাগে!
সুচি’র বক্তব্য: ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে, স্থানীয় ও বিদেশি গণমাধ্যমকে রাখাইনের এমন সব জায়গায় প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছে, যেগুলোতে আগে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো না। ২৫শে আগস্টের সংঘাত শুরুর পর থেকেও আমরা আক্রান্ত এলাকায় বেশ কয়েকটি সাংবাদিক দলের সফরের ব্যবস্থা করেছি।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। সরকার সাংবাদিকদের জন্য সীমিত সংখ্যক সফরের আয়োজন করেছে। কিন্তু কিছু এলাকায় প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। সাম্প্রতিক সরকারি সফরের সময় বেশ কয়েকজন প্রতিবেদক খেয়াল করেছেন যে, রাখাইন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে।
সুচি’র বক্তব্য: মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে অনেকে আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা যে কোনো সময় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শুরুর জন্য প্রস্তুত।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেছেন, সরকার শুধুমাত্র তাদেরই গ্রহণ করবে যাদের নাগরিকত্ব বা অন্য কোনো বাসিন্দা সনদপত্র রয়েছে। কিন্তু সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে বহুবার সহিংসতার শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে জাতিগোষ্ঠী হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়া হয় না। তাদেরকে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে কার্যত মিয়ানমারে তাদের ঐতিহাসিক অবস্থানকে অস্বীকার করা হয়। এ কারণেই রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন বলা হয়। অর্থাৎ, বর্তমান কাঠামোর অধীনে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব লাভের যোগ্য নন। তবে, সুচি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ‘যাচাইবাছাইকৃত’ শরণার্থীদের হয়তো ফেরানো হবে। এর এ-ও মানে হতে পারে যে, কেবল নাগরিক হলেই ফেরানো হবে, তা নয়।
সুচি’র বক্তব্য: অভিযোগ যেমন আছে, পাল্টা-অভিযোগও আছে।
গার্ডিয়ান: সত্য। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে, এমন দাবির স্বপক্ষে এখন বিপুল প্রমাণ রয়েছে। পোড়া দাগ বা গুলির ক্ষত নিয়ে বাংলাদেশে আসা অনেক শরণার্থীই সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবিতে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়ে ছারখার, কিন্তু প্রতিবেশী বৌদ্ধদের বসতি অক্ষত। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, রাখাইনে যা ঘটছে, তা ‘জাতিগত নিধনের আদর্শ উদাহরণ।’ অপরদিকে, সরকার ও তার সমর্থকরা সব কিছুর জন্য কেবল ‘সন্ত্রাসী’দের দায়ী করেছে।
সুচি’র বক্তব্য: আমরা এখন আরেক দফা মানবিক ত্রাণ প্রদান আরম্ভ করছি। আমরা আশা করছি, ওই অঞ্চলের সকল মানুষ এতে উপকৃত হবে।
গার্ডিয়ান: অর্ধসত্য। মিয়ানমার হয়তো খাবার, পানি ও ওষুধ বিতরণ শুরু করবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা বন্ধের কারণে অনেকে সরকারের নিন্দা জানিয়েছেন। যেমন, সংঘাত-উপদ্রুত এলাকায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে প্রবেশ করতে দেয়নি সরকার। সম্প্রতি, রেডক্রস কমিটিকে সীমিত প্রবেশাধিকার দেয়া হয়েছে।
২৫শে আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সেনাবাহিনীর পোস্টে হামলা চালায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা বিদ্রোহী। ওইদিনই প্রথমবারের মতো স্যাটেলাইটে রাখাইনের গ্রামগুলো জ্বলতে দেখা যায়। হামলার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই একটি একটি করে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে শহরতলীগুলো দাউ দাউ করে জ্বলছিল। এরপর থেকে শুরু হয় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পালিয়ে আসা। বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে সেনাবাহিনীর শুরু করা সামরিক অভিযান থেকে বাঁচতে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দলে দলে প্রবেশ করতে থাকে বাংলাদেশে। শরণার্থীরা ত্রাণকর্মীদের জানান, সেনারা তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের পালিয়ে আসার পথে পেতে রেখেছে স্থলবোমা। পলায়নরত নারী- শিশুদের উদ্দেশ্য করে ছুড়েছে গুলি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। তবে অন্যবারের চেয়ে এবার নির্যাতনের মাত্রার পার্থক্য বিশাল। তিন সপ্তাহে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে ২০০ গ্রাম। ৪ লাখ ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। এদের দুই-তৃতীয়াংশই হচ্ছে শিশু। ইউনিসেফ ও মেডসান সন ফ্রন্টিয়ারের মতন মানবাধিকার সংস্থাকে সংঘর্ষ- আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান সামরিক অভিযানটিকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের একটি পরিষ্কার উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে এতকিছুর মধ্যেও মিয়ানমারে একজন ব্যক্তি এ নিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে চুপ ছিলেন। তিনি হচ্ছেন, মানবাধিকার আইকন ও নোবেলজয়ী দেশটির সামরিক সরকারের কার্যত নেত্রী অং সান সুচি। এই নির্যাতনের প্রতি নিন্দা জানাননি তিনি। সুচির সতীর্থ নোবেলজয়ীরা খুব দ্রুতই এই অসঙ্গতিটি তুলে ধরেন। পাকিস্তানি মানবাধিকার কর্মী ও নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেন, সুচির কথা শোনার জন্য পুরো বিশ্ব অপেক্ষা করছে। দক্ষিণ আফ্রিকান যাজক ডেসমন্ড টুটু পার্থনা করেন, যাতে করে সুচি পুনরায় তার সাহসী ও দৃঢ় হয়ে উঠতে পারেন। তবে সুচি তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ না করে উল্টো সামরিক অভিযান নিয়ে ভুয়া তথ্য প্রচারের অভিযোগ তোলেন। তিনি ঘোষণা দেন, তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিবেন না।
রাখাইনের প্রথম গ্রামে আগুন জ্বলার ২৫ দিন পর বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বক্তব্য রাখেন সুচি। সেনা কর্মকর্তা ও বিদেশি কূটনীতিকদের সামনে দেয়া মিয়ানমারের রাজধানী থেকে প্রচারিত ওই ভাষণে সুচি সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করেননি। তার জায়গায় এই নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, তার সরকার রাখাইনে গ্রাম আগুনে জ্বলার খবর নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে সরকারকে এইসব অভিযোগ ও অভিযোগের বিরুদ্ধে দেয়া পাল্টা-অভিযোগ, সবই বিবেচনা করে দেখতে হবে। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সংঘর্ষ-আক্রান্ত এলাকার জায়গায় যেসব এলাকায় শান্তি বজায় আছে সেসব এলাকার দিকে বেশি মনযোগ দেয়া। তিনি দাবি করেন রাখাইনের বেশিরভাগ মুসলিমই এখনো সেখানেই রয়ে গেছেন, বাংলাদেশে পালিয়ে আসেননি। তিনি বলেন, এটা খুব কম মানুষেরই জানা যে রাখাইন রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রোহিঙ্গাই রাখাইন ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। এটা দুঃখজনক যে, আমাদের কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠকের সময়, আমি শুধুমাত্র আমাদের অল্পকিছু সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে বাধ্য। তার এই প্রতিক্রিয়া বিশ্বজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ বলেন, তার ভাষণের মাধ্যমে জাতিগত নিধনযজ্ঞকে ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এভাবেই আইকনদের পতন ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র সুচিকে শুধু মিয়ানমারের মহান উদ্ধারকারীই বানায়নি, একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অহিংস প্রতিবাদের একজন আদর্শ হিসেবেও তার নাম প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতিসংঘও মিয়ানমার থেকে ভালো কিছু দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিল। কারণ, মিয়ানমার বহুদিন ধরে তার নেতৃত্বের অধীনে রয়েছে। তবে এখন এসে তার অগ্রাধিকার ভিন্ন দিকে ধাবিত হচ্ছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বেন রোডস বলেন, “তিনি এখন ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে পরিবর্তন ঘটতে থাকা মিয়ানমারের একজন রাজনীতিক হিসেবে দেখেন, মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা আইকন হিসেবে না। মিয়ানমারের ভেতর রাজনৈতিক সংস্কার আনার তীব্র ইচ্ছা তার মধ্যে একটি জ্বলজ্বলে ও শোচনীয় ‘ব্লাইন্ড স্পটের’ সৃষ্টি করেছে।” এতে শুধু তার সুনামই ধ্বংস হচ্ছে না। মিয়ানমারের জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস রাজ্যের দ্বিগুণ। চীন, ভারত, থাইল্যান্ডের মাঝখানে অবস্থিত দেশটিতে ভারসাম্যহীনতার কারণে যে কোনো মুহূর্তে সামরিক বাহিনী সরকারের দখল নিয়ে নিতে পারে। এতে করে পণ্ড হয়ে যাবে সকল গণতান্ত্রিক সংস্কার। রোহিঙ্গাদের ওপর এই নির্যাতনকে নিজেদের দলে নতুন লোক ঢুকিয়ে নেয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে অনেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদা তো ইতিমধ্যে মিয়ানমারকে হুমকিও দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাঙ্গরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে চীন। সুচির আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার ওপর, সেই বিদ্রোহী সুচি হিসেবে ওই নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত, বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়ার ওপর লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য নির্ভর করছে। গণতন্ত্র অর্জনের পথ প্রায়ই নোংরা থাকে। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দেশটির সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর লড়াই বহুদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। সাংবিধানিক পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রয়েছে সামরিক বাহিনীর হাতে। এমনকি ক্ষমতা বাড়ছে বৌদ্ধ-জাতীয়তাবাদীদেরও। উভয়পক্ষ থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছেন সুচি। এদিকে, আমেরিকা ফার্স্ট পলিসি নিয়ে গিয়ে চলা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, তারা এই জাতিগত সংঘর্ষ কিভাবে সামলাবে। ওবামার আমলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর থেকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যে কোনো কোনো আইনপ্রণেতা পুনরায় তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে চান। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি সীমিত করে দিতে চান। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতন নিয়ে বিরল বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। তবে চীনের বাধার কারণে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে থামানোর মতন প্রস্তাব এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আর এসবের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের পালানো অব্যাহত রয়ে গেছে।
বিশ্ব হতাশা থেকে ওঠে আসা নায়কদের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিতে ভালোবাসে। ৭২ বছর বয়সী সুচির জন্ম মিয়ানমারের সবচেয়ে আলোচিত পরিবারগুলোর একটিতে। তার বাবা জেনারেল অং সান দেশের আধুনিক সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪০’র দশকে মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তিনি। বৃটেন থেকে মিয়ানমারকে স্বাধীনতা এনে দেন তিনি। সুচির শিশুকালেই তাকে হত্যা করা হয়। শহীদের মর্যাদা পান তিনি। গৃহযুদ্ধে বিভক্ত হয়ে যায় দেশ। পরবর্তীতে সুচির মা’কে ভারত ও নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বড় হয়ে সুচি বিদেশে বসবাস শুরু করেন। রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। জাতিসংঘের হয়ে নিউ ইয়র্ক শহরে কাজ করেন। ১৯৮৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন তিনি। পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা তখনই তার মাথায় ঢুকে যায়। প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি। গৃহবন্দি হয়ে কাটান পরবর্তী ১৫ বছর। গৃহবন্দি থাকার সময়ে ১৯৯০ সালে তার দল ব্যাপক ব্যবধানে নির্বাচনে জয় লাভ করে। কিন্তু সেনাবাহিনী সেই জয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তিনি লড়ে যান। বাড়ির ভেতর থেকেই গণতন্ত্র নিয়ে ভাষণ দিতে থাকেন। এই দীর্ঘ গৃহবন্দি থাকাকালে একবার তাকে সাময়িক মুক্তি দেয়া হয়েছিল। তার স্বামী বৃটেনে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছিলেন তখন। কিন্তু তিনি তার স্বামীকে দেখতে যাননি। তিনি জানতেন, একবার তিনি মিয়ানমার ছেড়ে গেলে, সামরিক জান্তারা পুনরায় তাকে আর সেখানে ঢুকতে দেবে না। ২০১০ সালে তাকে মুক্ত করে দেয়া হয়। মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারে এমন আশার জন্ম হয়। ওবামা তাকে ‘এ হিরো অফ মাইন’(আমার একজন হিরো) বলে আখ্যায়িত করেন। সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন তার প্রশংসায় বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ও সাহসী প্রিজনার অফ কনসায়েন্স। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস পোষণের কারণে কাউকে আটক করে রাখা হলে তাকে প্রিজনার অফ কনসায়েন্স বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র তাকে কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল দিয়ে সম্মান জানায়। তিনি গৃহবন্দি থাকাকালীন সময়েই তার নামে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট থেকে পান সাখারোভ প্রাইজ ফর ফ্রিডম অফ থট। ২১ বছর পর ১৯৯১ সালে ঘোষিত নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে। সে সময় ইউনিভার্সাল ডিক্লিয়ারেশন অফ হিউম্যান রাইটস থেকে তার প্রিয় বাক্যগুলো উচ্চারণ করে শোনান। তিনি বলেন, “যখন নোবেল কমিটি আমাকে ‘পিস প্রাইজ’ দিয়ে পুরস্কৃত করছে, তারা তখন বার্মার (মিয়ানমার) নিপীড়িত ও বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোকে বিশ্বের একটা অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ‘দ্য নোবেল পিস প্রাইজ’ আমার অন্তরে একটি দ্বার খুলে দিয়েছে।” এসব সুখবরের ভেতরে চাপা পড়েছিল একটি কুৎসিত বাস্তবতা।
 কয়েক দশক ধরে রাখাইন রাজ্যের মুসলিমরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশে। দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই নির্যাতনের কারণ খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। ধর্মীয়, জাতিগত ও অর্থনৈতিক কারণ-সব কিছুর জন্যেই তারা নিপীড়নের শিকার। রোহিঙ্গা-সুন্নি মুসলিমদের সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠী। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করে আসছে। সে দেশের সরকার তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অস্বীকার জানিয়েছে, দেশটির ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় স্থান দিতেও। এমনকি মিয়ানমারের বাসিন্দাদের অনেকের ধারণা রোহিঙ্গারা অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী। রাখাইন, মিয়ানমারের দরিদ্র রাজ্যগুলোর একটি। আর সেখানে কয়েক দশক ধরে চলছে বহিষ্কার নীতি। এই নীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, রোহিঙ্গাদের ভোট দেয়ার অধিকার, সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণের অধিকার বাতিল করে দেয়া। এসব বহিষ্কার নীতি রোহিঙ্গা ও রাখাইনের অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা আরো গভীর করে তুলেছে।
বিশেষ করে সুচি তার নোবেল পুরস্কার গ্রহণের আগের সময়টুকু বেশি নির্মম ছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অনুসারে, ২০১২ সালে মুসলিম গ্রামগুলোতে সরকারি বাহিনী সমন্বিতভাবে হামলা চালিয়েছে। গণগ্রেপ্তার চালিয়েছে, ত্রাণ অবরোধ করে রেখছে। তৎকালীন সময়ে সরকারি বাহিনীর এসব কর্মকাণ্ডকে অনেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করার চেষ্টা ছিল বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুচি কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল গ্রহণের সময়ে পুনরায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে পালিয়ে যায় রাখাইন থেকে। ওই সময়ে ইউরোপে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রোহিঙ্গারা কি বর্মী (মিয়ানমারের বাসিন্দা) কি না! তিনি উত্তর দেন, আমি জানি না। তার এমন প্রতিক্রিয়া সমালোচনার সৃষ্টি করে। ওবামার আমলে মিয়ানমারে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেরেক মিচেল বলেন, সবাই অবাক হয়েছিল। তিনি কখনোই বহির্দেশে রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিয়ে মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারেন নি।
২০১৫ সালে সুচি মিয়ানমারের একজন আইন প্রণেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। মিয়ানমারে ২৫ বছরের মধ্যে প্রথম স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তার দল ব্যাপক ব্যবধানে জয় লাভ করে। প্রধানমন্ত্রীর আদলে সুচির জন্যে নতুন পদ তৈরি করা হয়। তিনি হয়ে যান নতুন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর। তবে তার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। কেউ স্বীকার করতে না চাইলেও, গণতন্ত্রও হয়ে যায় আরো ভঙ্গুর। ২০০৮ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তাদের লেখা সংবিধান অনুসারে, পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসন দেশের সেনাবাহিনীর অধীনেই থাকবে। পাশাপাশি, তারা যেকোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনেও বাধা দিতে পারবে। সুচির সন্তানরা বৃটিশ নাগরিক হওয়ায় তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। আর হতে পারলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্ত বিষয়ক ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ প্রধান মন্ত্রণালয়গুলো সেনাবাহিনীই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাহিনীটির কমান্ডার ইন চিফ, জেনারেল মিন অং হ্লাইং। মিয়ানমারের মানবাধিকার কর্মী চেরি জাহাও বলেন, এনএলডি ২০১৫ সালে করা নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তাদেরটাই হচ্ছে একমাত্র রাজনৈতিক দল যেটি সামরিক বাহিনীর মোকাবিলা করতে পারে। তাদের সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজও করতে হবে। ২০১৬ সালের মে মাসে সুচি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে বলেন যে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলার জন্যে তার দেশের কিছু সময় প্রয়োজন। তিনি তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘রোহিঙ্গা’  শব্দটি ব্যবহার না করার জন্যে। তিনি জাতিসংঘের কাছে এ নিয়ে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ওই শব্দ ব্যবহার না করাটা সংহতির প্রচারণা করবে। কেরি বলেন, তিনি সবসময় এটা অনুভব করতেন যে, মিয়ানমারের বাইরের লোকেরা বিষয়টার জটিলতা বোঝে না। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করতেন কিন্তু এখন পর্যন্ত এরকম কৌশলগত যোগাযোগে সে খুব একটা ফলপ্রসূ প্রমাণিত হননি।
ওবামা প্রশাসন চেষ্টা চালিয়েছিল যাতে সুচি রাখাইনে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে সহায়তা করার সুযোগ দেয়। এ বিষয়ে ওবামা বা তার জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক ডজন বৈঠকে বসেন সুচি। ওবামার ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার রোডস জানান,  বৈঠকগুলোতে সাধারণত সঠিক বিষয়গুলোই উল্লেখ করত যেমন- মানবাধিকার রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা, সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা ও নাগরিকত্ব বিষয়ক সমাধান বের করার প্রয়োজোনীয়তা নিয়ে কথা বলতেন তিনি। তবে তিনি প্রতিবার এটাও বলতেন যে, তিনি এ বিষয়ে খুব কমই করতে পারবেন। রোডস বলেন, তিনি যুক্তি দেখাতেন যে, যদি তিনি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে সাহায্য করার দরজাটি খুলে দেন তাহলে, সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা কমে যাবে। রোডস বলেন, আমরাও বিশেষ করে আমাদের দূতাবাস এই ইস্যুটির দিকেই বেশি নজর দিতাম। আর মাঝে মাঝে তা নিয়ে অগ্রগতিও দেখা দিত, যেমন- আরো ভালো মানবাধিকার প্রবেশ। কিন্তু তাদের বিভক্ত রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আমরা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার মতো আরো নিরাপদ কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছি।
২০১৬ সালে ওবামা ও সুচি ওভাল অফিসে এক বৈঠকে বসেন। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সংস্কারের বার্তা বেশ ভালোভাবেই পৌঁছেছে, এমন প্রত্যাশা করে দুই দশক ধরে চলমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন। রোডস বলেন, মূলত মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে নিয়ে যেতে পারে এমন ধরনের বিনিয়োগ আটকে রাখা হচ্ছিল (ওই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে)।  আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে, তিনি ও তার সরকার  তাদের অবস্থান নিয়ে আরো স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী ছিল। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম যে, এতে করে তারা রোহিঙ্গাদের পক্ষে ঝুঁকি নেয়ার মতো আরো শক্ত অবস্থানে থাকবে। তবে মানবাধিকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক রথ বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছে এই পদক্ষেপ যে বার্তা পাঠিয়েছে তা হলো, তারা গণতান্ত্রিক ত্যাগের একটি নিদর্শন দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে। তারা পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে  পারে। অং সান সুচিকে নামমাত্র নেত্রী হোক কিন্তু জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর ওপর নির্যাতন থামানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আর নিষেধাজ্ঞাগুলো সব ওঠে গেছে। তিনি বলেন, ওবামা প্রশাসন খুব জলদি নিজেদের জয়ী ভেবে বসেছিল। তাই এখন যা ঘটেছে তার কিছুটা দায় ওই প্রশাসনের ওপরেও পড়ে।
এদিকে, ইস্যুটির সঙ্গে ট্রামপ প্রশাসন অনেক কম জড়িত। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এনএসসি) এক মুখপাত্র জানান, অফিস গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত সুচির সঙ্গে কথাও বলেননি ডনাল্ড ট্রামপ। উত্তর কোরিয়া পলিসির জন্যে নিয়োজিত বিশেষ রাষ্ট্রদূত জোসেফ ইয়ুন জুলাই মাসে মিয়ানমার সফরে যান। সে সময় তিনি সুচি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তার সফরে তিনি শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্ক নিয়েই মনোনিবেশ করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মনযোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে ওই সফর করা হয়নি। এখন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামপ্রতিক সহিংসতার মাত্রা হয়তো ট্রামপকে বাধ্য করতে পারে এদিকে নজর ঘুরাতে। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট নাজিব রাজাক যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসেন। তখন রাজাকের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ট্রামপ। সে আলোচনায় তারা দুজনেই সম্মত হন যে, মিয়ানমারকে এই সহিংসতা বন্ধ করতে হবে ও সেখানে মানবিক সাহায্য ঢুকতে দিতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন সুচিকে ফোন করে, মিয়ানমার সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দেশটিতে মানবিক সাহায্য নিয়ে প্রবেশাধিকার দেবার জন্যে আহ্বান জানান। পরবর্তী দিনই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের অতিরিক্ত ত্রাণ প্রদানের ঘোষণা দেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি সুচির ভাষণে যোগ দিতে নেপিড’তে সফর করেন। সেখানে তিনি রাখাইনের রাজধানী সিত্তুয়ি শহর পরিদর্শন করেন। কিন্তু স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা তাকে বলেন যে, নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি সংঘর্ষ-আক্রান্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে পারবেন না।
এনএসসি’র এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের মধ্যে সামরিক সমপর্ক এখন পর্যন্ত একেবারে শুরুর পর্যায়ে। আর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এই নির্যাতন ও বাস্ত্যচুত করার ঘটনা না থামায় তাহলে এ সমপর্ক সামনে এগিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জাস্টিন হিগিনস বলেন, ‘আমরা অং সান সুচির প্রতিশ্রুতিকে স্বাগতম জানাই। যে প্রতিশ্রুতিতে তিনি বলেছেন যে, যখন নিরাপদ মনে হবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে। আমরা মিয়ানমারকে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করার অনুমোদন দেয়ার আহবান যাচাই। এ বিষয়ে কংগ্রেসের বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সিনেট মেজরিটি লিডার মিচ ম্যাককন্নেল কয়েক দশক ধরে সুচিকে সমরথন করে আসছেন। সুচির ভাষণের আগে  তিনি তাকে ফোন দিয়েছেন। এমনকি সিনেটে তাকে প্রতিরক্ষা করে কথাও বলেছেন। তিনি বলেছেন, সুচি আগে যে মানুষ ছিলেন, এখনই সেই মানুষই আছেন। তিনি শুধু তার অবস্থার উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করছেন। রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদকে ত্রাণ নিয়ে ঢুকতে না দেওয়ায় সুচির এই সমর্থনকারী সিনেটর তাকে তার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে    একটি চিঠি লিখেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর ডিয়ানে ফেইন্সটেইন চান, কংগ্রেস মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সুচির সরকারের সঙ্গে সমপর্ক পুনরায় বিবেচনা করুক। উল্লেখ্য, ফেইন্সটেইন সুচিকে কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল প্রদানের অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, অন্ততপক্ষে যে নেতারা জাতিগত নিধনযজ্ঞের এই অভিযানের পরিকল্পনা করেছেন ও এর কার্যক্রম চালিয়েছেন তাদের সবাইকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা উচিত। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সকল প্রকার যোগাযোগ স্থগিত রাখা উচিৎ। আর মিয়ানমারের সঙ্গে পক্ষপাতমূলক সুবিধাও শেষ করা উচিত।
পোপ ফ্রান্সিস কতৃক নিয়োজিত মিয়ানমারের শীর্ষ ক্যাথলিক কর্মকর্তা কার্ডিনাল চার্লস মাওং বো বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি যে মোড় নিয়েছে, তাতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সামলানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অং সান সুচি শক্ত রশির ওপর দিয়ে হাটছে। ইতিমধ্যেই পুনরায় সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে কালো শক্তির আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে ।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো। বিশ্ব নেতারা, জাতিসংঘ মহাসচিব থেকে শুরু করে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, ইউরোপীয়, এশীয় মন্ত্রীরা বিভিন্ন বৈঠক ও ভাষণে এ সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। তবে ট্রামপ ব্যতিক্রম ছিলেন। জাতিসংঘের কাছে এ বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি। এদিকে নিজ দেশে অবস্থান করা সুচি চান যে পুরো বিশ্ব একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা বুঝুক। তিনি তার এক বক্তব্যে বলেন, এটা (মিয়ানমার) নতুন এক গণতন্ত্র। বিশ্ব এমনটা প্রত্যাশা করতে পাওে না যে, এটি মাত্র ১৮ মাসেই এর সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ফেলবে। উল্লেখ্য, সুচি স্টেট কাউন্সেলর হয়েছেন ১৮ মাস হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের জবাবে তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, রাখাইনের মুসলিমরা সমানভাবে ও বৈষম্যহীনভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ভোগ করে থাকে। তিনি বৈদেশিক কূটনীতিকদের রাখাইন পরিদর্শনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু শুধুমাত্র সে অংশগুলোই পরিদর্শন করার সুযোগ দেয়া হয় যে অংশগুলো থেকে, মুসলিমরা এখনো পালিয়ে যায়নি। এর পেছনে কারণ ছিলো, এত করে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এটা শিখতে পারবে যে, কেন এই মুসলিমরা তাদের গ্রাম ছেড়ে পালায়নি। তিনি ভাষণ দেয়ার আগে তার সমর্থকরা রাজধানীতে তাকে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন ব্যানার ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু অন্যরা হতাশ। মিয়ানমারের সাবেক রাজনৈতিক বন্দি, একজন গণতান্ত্রিক কর্মী চিত মিন ল্যা  বলেন, তিনি ছিলেন আমাদের পথ প্রদর্শক ছিলেন, আমাদের আইকন, আমাদের নেত্রী। আমরা তাকে ভালোবেসেছিলাম তার মূল্যবোধের কারণে। কেউ কেউ বলেন তিনি প্রয়োগবাদী আচরণ করছেন। কিন্তু আমি জানি না, কেন তিনি এমন করছেন।
এখন থেকে দুই মাস পরে নতুন এক নৈতিক নেতা বিশ্বের দৃষ্টি রোহিঙ্গাদের দিকে নিয়ে যাবেন। পোপ ফ্রান্সিস নভেম্বরে মিয়ানমার সফর করবেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশও সফর করবেন তিনি। মিয়ানমারের সঙ্গে ভ্যাটিকানের সমপর্কের বয়স মাত্র চার মাস। তিনি সবসময় রোহিঙ্গাদের প্রতিরক্ষা করে আসছেন। যেমনটা সুচি করেননি। পোপের এই সফর নিয়ে  দেশ-বিদেশে প্রত্যাশা যত বেশি তেমনি প্রতিবন্ধকতাও তত বেশি। বলেন, ‘আমি আশা করি তিনি মিয়ানমারের মানুষদের কাছে সবকিছু নিয়ে এমনভাবে কথা বলবেন যাতে করে সমাধান আসবে, ঘৃণা নয়। এটাও একটা বাধা, কারণ এখানের একটা গোষ্ঠী সত্যিকারের শান্তি দেখতে চায় না।’ এইসবের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেই। ওই অঞ্চলে থাকা মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, রাখাইনে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যদিও সুচি দাবি করেন, রাখাইনে সামরিক অভিযান ৫ই সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যে ১৪০০০ আশ্রয়ণ সহ নতুন একটি শিবির তৈরির পরিকল্পনা করছে। গত মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ২০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।  বাংলাদেশে নিয়োজিত জাতিসংঘের নাগরিক সমন্বয়ক রবার্ট ওয়াটকিনসের ধারণা, সব মিলিয়ে মিয়ানমার থেকে আরও ১ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, তাদের সবার কাহিনী একই। তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ধর্ষণ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যের হত্যা করা হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, এক পরিবারের চেয়ে অন্য পরিবারের দুর্দশার কাহিনী বেশি শোচনীয়।
(মূল প্রতিবেদনটি আমেরিকান সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘টাইম’-এর অনলাইন ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি লিখেছেন এলিজাবেথ ডিয়াস। অনুবাদ করেছেন রিফাত আহমাদ)।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি।
জেনেভা থেকে গতকাল শুক্রবার দেয়া এক বিবৃতি তিনি বলেন, এ ঘটনা একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারি বাহিনী যাতে সব পরিস্থিতিতে সংযত এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, মিয়ানমার সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইয়াংহি লি বলেন, ‘গত অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যের মংডু ও রুথিডংয়ে সীমান্তরক্ষীদের তিনটি চৌকিতে হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়টি স্মরণ করে আমি বিশেষভাবে শঙ্কিত।’
মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার বলেন, রাখাইন রাজ্যের ঘটনা তদন্তে গঠিত মিয়ানমার সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিশন নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানা অপরাধের অভিযোগ সঠিকভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে স্বীকার করেছে। কমিশন এগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দেখার পরামর্শ দিয়েছে।
তিনি বলেন, রাখাইনের সংখ্যালঘু স্থানীয় জনগোষ্ঠির কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত ৩ আগস্ট ছয়জন ম্রো গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়েছে।
ইয়াংহি লি বলেন, রাজ্যের নিরাপত্তা বিধান করা এবং চরমপন্থীদের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। কিন্তু এ দায়িত্ব সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পক্ষপাত করতে পারে না। নিরাপত্তা বাহিনীর যেকোনো পদক্ষেপ বা অভিযান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা ও মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে।
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও সংক্ষিপ্ত বিচারে মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ারও ইয়াংহি লি’র মতামতকে সমর্থন দিয়েছেন।
এদিকে রয়েটার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে অবস্থান করা ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে ফেরত পাঠানোর একটি পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে আলোচনা করছে ভারত।
এতে বলা হয়, উদ্বাস্তু বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) নিবন্ধন নিয়ে ১৪ হাজার রোহিঙ্গা ভারতে বসবাস করছে। বাকী রোহিঙ্গাদের অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাতে চাইছে ভারত। ভারত উদ্বাস্তু বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ সনদ সই করেনি এবং দেশটির জাতীয় কোনো আইন দ্বারা উদ্বাস্তুরা সুরক্ষিত নয়।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কে এস ধাতওয়ালি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে এ ব্যাপারে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। যথাসময়ে তা আরো পরিষ্কার হবে।’
ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরন রাজ্জু গত বুধবার পার্লামেন্টে বলেছেন, জেলা পর্যায়ে টাস্কফোর্স গঠন করে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশীদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করার জন্য রাজ্য সরকারগুলোকে নিদের্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
১৯৯০ সালের গোড়া থেকে মিয়ানমার সরকারের দমন-পীড়ন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এদের একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে ভারতেও গিয়েছে। রোহিঙ্গারা মূলত ভারতের জম্মু, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, দিল্লি, হায়দ্রাবাদ ও রাজস্থানে বসবাস করছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা নতুন নয়। সেই ১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধের সময় থেকেই দুই দেশের শত্রুতা চরমে। সম্পর্কটা যেন সাপে-নেউলে। তিন বছর ধরে চলা সে যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় মার্কিন সেনাবাহিনী। চালায় ধ্বংসযজ্ঞ। বিধ্বস্ত হয় পুরো দেশ। উল্টেপাল্টে যায় কোরীয়দের জীবনযাত্রা। প্রাণ যায় কয়েক লাখ মানুষের। এরপর থেকে সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি।
উত্তর কোরিয়া একের পর এক পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের রক্তচক্ষুর পরোয়া করেনি। নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ কোনো কিছু দিয়েই নিবৃত্ত করা যায়নি দেশটিকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি উত্তর কোরিয়ার তীব্র ঘৃণার শুরুটা সেই ১৯৫০ সালেই।
যুদ্ধের সময়ের সেই ভয়াবহতা স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার জেনারেল কার্টিস লিমে। ১৯৮৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা কোরিয়া যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। উত্তর কোরিয়ার বেশির ভাগ এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছি।’
১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়ার জনসংখ্যা ছিল ৯৬ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী বলছে, যুদ্ধে দেশটির ১৩ লাখ বেসামরিক নাগরিক এবং সেনাসদস্য আহত হন। আর দক্ষিণ কোরিয়ার ৩০ লাখ বেসামরিক নাগরিক ও আড়াই লাখ সেনাসদস্য আহত হন। সে সময় দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা ছিল দুই কোটির বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ১৯৫১ সালে যুদ্ধবিষয়ক শুনানিতে বলেন, এমন ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। তিনি বলেন, ‘আমি ওই পরিস্থিতি ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না। আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। মনে হয়, আমি সবচেয়ে বেশি মানুষের রক্ত এবং দুর্দশা দেখেছি।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর পর শুরু হওয়া কোরিয়ার ওই যুদ্ধে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সেনাবাহিনীর অনেকেই অনিচ্ছুক ছিলেন। কোরীয় যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে থাকা মার্কিন সেনাবাহিনীর ৩৩ হাজারের বেশি সদস্য নিহত হন। আর উত্তর কোরিয়ার পাশে থাকা চীনা সেনাবাহিনীর ছয় লাখ সদস্য নিহত বা নিখোঁজ হন।
১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়। যুদ্ধ ও সহিংসতার পর চীনা এবং মার্কিন সেনারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যান। তবে উত্তর কোরিয়া থেকে যায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে। শুরু করে বাঁচার লড়াই। যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশটির বড় বড় এলাকা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের কথা প্রচার করে চলেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সাং, তাঁর ছেলে কিম জং ইল এবং নাতি কিম জং উন। বর্তমানে উত্তর কোরিয়া ক্ষমতাসীন কিম জং উন। ফলে মার্কিন মানেই উত্তর কোরিয়ার কাছে শত্রু—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্বরতার প্রচার উত্তর কোরীয় নেতাদের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক চার্লস আর্মস্ট্রং বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান থেকে ৬ লাখ ৩৫ হাজার টন বিস্ফোরক উত্তর কোরিয়ায় ফেলা হয়। আরও ফেলা হয় ৩২ হাজার টন নাপাম। আগুনে বোমায় ব্যবহৃত জমাট বাঁধা থকথকে একধরনের পেট্রল হলো নাপাম।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুশান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক রবার্ট আ কেলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নৃশংস বোমা হামলার কথা উত্তর কোরিয়ায় বারবার প্রচার করা হয়েছে। এই প্রচারকে উত্তর কোরীয় নেতারা কীভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছেন, তাঁর বর্ণনা মেলে রবার্ট আ কেলির কথায়। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ঐতিহাসিক বলে থাকেন কিম ইল সাং দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালানোর পরই যুদ্ধ শুরু হয়। তবে কিম ইল সাং থেকে শুরু করে কিম জং উন সব সময় বলে এসেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করেছে। প্রচারের ধরনটা এমন ছিল যে কেবল কিমের পরিবারই উত্তর কোরীয়দের রক্ষাকবচ।
উত্তর কোরীয়দের মধ্যে মার্কিন বিদ্বেষ শুরু হয় ছোটবেলা থেকেই। কিন্ডারগার্টেনের শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বর্বরতার গল্প শোনে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখে তাঁদের নৃশংসতা। উত্তর কোরিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বার্তা দেওয়া হয় নাটক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে। সিনচন মিউজিয়ামে যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও নৃশংসতার বিভিন্ন নিদর্শন দেখেছে।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিশুরাও যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা ঘৃণা করে, তার প্রমাণ মেলে তাদের আঁকা ছবিতে। পিয়ংইয়ংয়ের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে এক শিশুকে দেখা গেছে মার্কিন ট্যাংক ও যুদ্ধাস্ত্র আঁকতে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র মানেই তাদের কাছে হামলাকারী।
এটা ঠিক যে ১৯৫০ সালের পর থেকে উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। তবে বারবার হামলার হুমকি দিয়েছে। পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে।
তিন বছরের যুদ্ধের পর ১৯৫৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তবে সেটি শান্তিচুক্তি ছিল না। অর্থাৎ উত্তর কোরিয়া কৌশলগতভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এখনো যুদ্ধে জড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেই উত্তর কোরীয়রা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকে। দেশটি বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাবরই বড় ধরনের বরাদ্দ রাখে। ২০০৬ সালে দেশটি প্রথম সফল পরমাণু পরীক্ষা চালায়। তবে এরও আগে ১৯৬৫ সাল থেকেই উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি শুরু হয়। পিয়ংইয়ংয়ের সন্দেহ, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালানো। এই ভয় আর আশঙ্কা থেকেই একের পর এক পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ থেকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান অর্জনসহ বেশ কিছু সুফলও পাচ্ছে দেশটি।
সিএনএন, আল জাজিরা ও নিউজউইক অবলম্বনে শুভা জিনিয়া চৌধুরী
সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সেই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করছেন ইয়েলৎসিন এবং বেলারুশের স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তিনটি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র- রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশের নেতারা সেবছর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করলেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার দুই প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে জানিয়েছেন চুক্তির সময়কার কথা।
১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে যাওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে কমিউনিজমেরও পতন ঘটেছে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনো টিকে আছে। কমিউনিষ্ট পার্টি তখনও ক্ষমতায়, আর পার্টির নেতা তখন মিখাইল গর্বাচভ।
গর্বাচভ তখন এক কঠিন সময় পার করছেন। ১৯৯১ সালের আগস্টে তার বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছে কট্টরপন্থী কমিউনিষ্টরা। তারা গর্বাচভের সংস্কার কর্মসূচি পেরেস্ত্রোইকার বিরোধী ছিল। কিন্তু সেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে গেলেন গর্বাচভ।
কিন্তু এবার দেখা দিল নতুন সমস্যা। ১৫টি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অনেকগুলোতেই স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠলো। ইউক্রেন সহ অনেক ছোট ছোট প্রজাতন্ত্রে স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটও হয়ে গেল।
ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কিভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া যায় তার পথ খুঁজছেন। "একটি স্বাধীন ইউক্রেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। পুরোনো রাষ্ট্রের ধ্বংসাবশেষের নিচে থেকে লাখ লাখ মানুষকে কিভাবে বাঁচানো যায় সেটাই তখন আমার চিন্তা।"
১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে বেলারুশে বৈঠকে বসলেন তিনটি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের নেতারা। বৈঠকটি ডেকেছিলেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ। ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক এবং রাশিয়ার নেতা বরিস ইয়েলৎসিন যোগ দিলেন তার সাথে।
ইউক্রেন ততদিনে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিয়েছে। কিন্তু বেলারুশ তখনো সেরকম ঘোষণা দেয়নি। শুশকেভিচ দাবি করছেন, তখনো এ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছাননি।
"বেলারুশে শীতকালে তেল এবং গ্যাসের সরবরাহ কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা করাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। আমাদের অর্থনীতি তখন সঙ্কট। আমরা তখন এসব জ্বালানির মূল্য পরিশোধের ক্ষমতা নেই। আমাদের কেউ অর্থ ধার দিতে চাইছে না। সেজন্যে আমরা রাশিয়াকে অনুরোধ করতে যাচ্ছিলাম আমাদের সাহায্য করার জন্য, যাতে আমাদের শীতে জমে যেতে না হয়।"
তবে এই বৈঠক সম্পর্কে লিওনিদ ক্রাভচুকের ভাষ্য অন্যরকম। তার মতে, সেখানে একমাত্র আলোচ্য বিষয় ছিল কিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত করা হবে।
"শুশকেভিচ যখন তেল এবং গ্যাসের কথা বলছিলেন, তখন আমার মাথায় আসছিল না, তিনি কি বলছেন। আমি ভেবেছিলাম, আমরা সেখানে গিয়েছি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলার জন্য। দেশ তখন পরস্পরবিরোধী টানাপোড়েনে ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। সঙ্কটের কারণে মানুষ তখন অতিষ্ঠ। আমরা বেলারুশে গিয়ে বৈঠকে বসেছি দেশ কোনদিকে যাচ্ছে তা নিয়ে আলোচনার জন্য।"
আলোচনার পূর্ব নির্ধারিত বিষয় যাই থাক, তিন নেতাই ভালো করে জানতেন, গর্বাচভকে না জানিয়ে এরকম একটা বৈঠকে বসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
"গর্বাচভের নির্দেশে সোভিয়েত গুপ্ত সংস্থা কেজিবির এজেন্টরা আমাদের গ্রেফতার করতে পারতো। কারণ সোভিয়েত কেজিবি তখনো গর্বাচভের অধীনে। কিন্তু আমাদের বেলারুশের গুপ্তচর সংস্থার প্রধান যোগাযোগ রাখছিলেন বরিস ইয়েলৎসিনের গুপ্তচর সংস্থার সাথে। বৈঠকের ১৫ দিন আগে থেকে প্রতিদিন তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে গেছেন যে আমাদের গ্রেফতার হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, বেলারুশের গুপ্তচর সংস্থার প্রধান পরে যখন অবসর নিয়ে রাশিয়ায় গিয়ে বসবাস শুর করলেন, তখন তিনি অনুতাপ করেছেন, কেন আমাদেরকে ১৯৯১ সালে তিনি গ্রেফতার করেননি।"
১৯৯১ সালের ৭ ডিসেম্বর রাশিয়ার নেতা বরিস ইয়েলৎসিন, ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক এবং বেলারুশের নেতা স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ পূর্ব বেলারুশের এক বিরাট খামারবাড়ীতে গিলে মিলিত হলেন।
"বাড়িটা ছিল খুবই বিলাসবহুল। সোভিয়েত শীর্ষ নেতাদের জন্য এ বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। এ ধরণের বৈঠকের যেটা রীতি, একটি স্টীম বাথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সাধারণত এই স্টীম বাথের পর, প্রচুর মদ পানের আয়োজন রাখা হয়। তবে এবারের বৈঠকে দেখা গেল, মদ পানের পরিবর্তে আমাদের জন্য মাসাজ বা শরীর মালিশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সোভিয়েত রীতি অনুযায়ী এই বৈঠকে প্রচুর খানাপিনা এবং আরাম আয়েশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।"
পরদিন ৮ ডিসেম্বর তিন নেতা তাদের প্রধানমন্ত্রীদের সাথে নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসলেন। স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ জানালেন, বৈঠক শুরুর অল্প পরেই তারা সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির লক্ষ্যে চুক্তির প্রথম লাইনটির ব্যাপারে একমত হলেন :
"আমি আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই লাইনটি মনে রাখবো। এটি ছিল আমাদের চুক্তির শুরুর লাইন। কোনো রকম তর্কবিতর্ক ছাড়াই আমরা এ লাইনটির ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন। লাইনটি ছিল এরকম : ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিষয় হিসেবে ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিকস বা ইউএসএসআর এর কোনো অস্তিত্ব আর নেই। এই লাইনটি শুনে আমিই প্রথম বলেছিলাম, এতে আমি সই করবো।"
এই চুক্তির মধ্য দিয়ে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচভ কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলসিনের হাতে আরো বেশি ক্ষমতা দেয়া হলো। পুরো পরিকল্পনাটির পেছনে ছিলেন ইয়েলৎসিন। যদিও এর মধ্য দিয়ে কার্যত কয়েক শতাব্দীর রুশ সাম্রাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান ঘটলো। এটি ছিল এক বিরাট পদক্ষেপ। পরবর্তীকালে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল, এই তিন নেতা যখন এই চুক্তি করেন, তখন তারা সেটি সুস্থ মাথায় করেছিলেন কিনা। বলছিলেন লিওনিদ ক্রাভচুক।
"এরকম একটা কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে যে আমরা মদ্যপ অবস্থায় এই চুক্তির খসড়া তৈরি করেছিলাম। এটা পুরোপুরি ভুল। এটা ঠিক যে সোভিয়েত রীতিতেই ঐ বৈঠকটির আয়োজন করা হয়েছিল। ওই বাড়ির সর্বত্র প্রচুর মদ পানের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু কেউ তা স্পর্শ করেনি। আমরা এক একটা অনুচ্ছেদের ব্যাপারে একমত হওয়ার পর বড়জোর এক দুই ফোঁটা ব্রান্ডি পান করতাম।"
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় তারা চুক্তির মোট ১৪টি অনুচ্ছেদের ব্যাপারে একমত হলেন। রাত ৩টা নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণা করে তৈরি চুক্তির খসড়া তৈরি হয়ে গেল। এখন পুরো বিশ্বের সামনে ব্যাপারটা ঘোষণা করার পালা। বলছিলেন স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ।
"ইয়েলৎসিন এবং ক্রাভচুক মজা করে আমাকে বললেন, আমরা দু'জন মিলে আপনাকে মনোনীত করেছি গর্বাচভকে বিষয়টি জানানোর জন্য। তখন আমি হেসে বললাম, ইয়েলৎসিন, আমি আর ক্রাভচুক মিলে আপনাকে মনোনীত করছি আপনার প্রিয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে ফোন করার জন্য। আমি মস্কোতে মিখাইল গর্বাচভের অফিসে ফোন করলাম। কিন্তু তারা আমাকে গর্বাচভের সাথে সরাসরি কথা বলতে দিচ্ছিল না। তারা আমার কলটিকে একজনের পর আরেকজনের কাছে দিচ্ছিল। আর আমাকে বারবার ব্যাখ্যা করতে হচ্ছিল, আমি কে, কোত্থেকে ফোন করেছি! আর ইয়েলৎসিন এই ফাঁকে ডায়াল করলেন প্রেসিডেন্ট বুশকে। আর তার পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী আঁন্দ্রে কোজিরেভ আরেকটি ফোন লাইনে প্রেসিডেন্ট বুশের কথা অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। ইউক্রেনের নেতা লিওনিদ ক্রাভচুক দুজনের কথা শুনছিলেন।"
এর মধ্যে বেলারুশের নেতা শুশকেভিচ টেলিফোনে গর্বাচভের সাথে কথা বলার সুযোগ পেলেন। এবারও তাদের দু'জনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন ইউক্রেনের নেতা ক্রাভচুক;
"দুজনের মধ্যে কঠিন কথাবার্তা হচ্ছিল। গর্বাচভ খুবই রেগে গিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, আপনারা কি করেছেন! পুরো দুনিয়া উলট-পালট করে দিয়েছেন। সবাই তো আতঙ্কের মধ্যে আছে। তবে এই কথাবার্তার সময় শুশকেভিচ ছিলেন শান্ত, ধীর-স্থির।"
সেই টেলিফোন আলাপের কথা এখনো মনে করতে পারেন শুকেভিচ:
"আমি গর্বাচভকে বুঝিয়ে বললাম, কি ধরণের চুক্তিতে আমরা সই করতে চলেছি। গর্বাচভ তখন একটা ভাব নিয়ে বললেন, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কী হবে? তখন আমি বললাম, আসলে বরিস ইয়েলৎসিন এখন প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে কথা বলছেন। এবং প্রেসিডেন্ট বুশের মনে হয় আপত্তি নেই!"
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই তিন নেতা এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চু্ক্তিতে সই করলেন। এই সংবাদ সম্মেলনের পর এবার তাদের বাড়ি ফেরার পালা। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট স্ট্যানিস্লাভ শুশকেভিচ বাড়ি ফেরার পথে বুঝতে পারলেন, তারা যা করেছেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব :
"গাড়িতে বাড়ি ফেরার সময় আমি রেডিওতে খবর শুনছিলাম দুনিয়ার কোথায় কি ঘটছে। আমি খেয়াল করলাম, খবরে বার বার ইয়েলৎসিন আর ক্রাভচুকের নাম বলা হচ্ছে। আর আমার নাম যখন আসছে, তখন তারা সেটি ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারছে না। চুকচোভিচ, শেশকোভিচ, শাখোভিচ, যার যা খুশি উচ্চারণ করছিল। তখন আমি বুঝলাম, আমরা একটা বিরাট খবর তৈরি করেছি। তবে তখন আমি বেশ ভয়ে ছিলাম। আমাদের আঞ্চলিক পার্লামেন্টের ৮২ শতাংশই সদস্যই হচ্ছে কমিউনিষ্ট। এরা যদি চুক্তিটি অনুমোদন না করে, আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখানেই শেষ।"
তবে শেষ পর্যন্ত তিনটি আঞ্চলিক পার্লামেন্টই এই চুক্তি অনুমোদন করলো। শুধু তাই নয়, অন্য সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোও এতে যোগ দিল। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট গর্বাচভ পদত্যাগ করলেন। বিলুপ্ত হয়ে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন। লিওনিদ ক্রাভচুক স্বাধীন ইউক্রেনের প্রথম প্রেসিডেন্ট হলেন। তিনি এখনো কিয়েভে থাকেন। স্ট্যানিস্লভ শুশকেভিচ ১৯৯৪ সালে ক্ষমতা ছাড়েন। তিনি এখন বেলারুশে একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, থাকেন রাজধানী মিনস্কে।
তুরস্কে ক্ষমতাসীন এরদোগান সরকার এবং তিনি নিজেও প্রায় প্রতিদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর হচ্ছেন। তার বিভিন্ন পদক্ষেপ বিশ্বে নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এবারের একটি সিদ্ধান্ত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্ককে উগ্র সেকুলারিজমের দীর্ঘকালীন ধারা থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বেলায়ও আঙ্কারার একেপি সরকারের পদক্ষেপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, বহুলালোচিত সেই সাবেক মহিলা এমপি মার্ভে কাভাকসি মালয়েশিয়ায় তুর্কি রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়েছেন। তুরস্ক ও মালয়েশিয়া- দুটোই বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দু’টি অগ্রণী দেশ। বিশেষ করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তারা প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। হিজাবশোভিতা কাভাকসি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়ায় মহাদেশের সর্বপশ্চিমের দেশ তুরস্কের প্রতিনিধিত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করবেন।
তুরস্কের বহুলালোচিত পার্লামেন্ট সদস্য মার্ভে কাভাকসি নিকট অতীতে নির্যাতিত ও অপমানিত হয়েছেন এবং শুধু পার্লামেন্টের সদস্যপদই নয়, তুরস্কের নাগরিকত্বও হারিয়েছিলেন। এসব কিছুই হয়েছিল কট্টর সেকুলার শাসনামলে এবং তার অটুট বিশ্বাস ও আদর্শনিষ্ঠার কারণে। সেই আপসহীন নারী মালয়েশিয়ায় স্বদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়ে আরেক রেকর্ড গড়েছেন। মুসলিম অধ্যুষিত তুরস্কে ইসলামের নির্দেশমাফিক হিজাব পরিধানের মাধ্যমে পার্লামেন্টে তিনি মূলত নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর এখন মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রধান কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রে তার নিযুক্তিকে আধুনিক বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে গণ্য করা হচ্ছে।
হিজাব বা মস্তকাবরণ পরিধান করা ইসলামের শিক্ষাগুলোর একটি। এই ধর্মের অনুসারী মহিলারা এর অনুসরণ করাই স্বাভাবিক। কারণ এটা তার অবিচ্ছেদ্য অধিকার। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও তাদের নিজ নিজ ধর্মপালনের অধিকার দেয়া রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। কিন্তু তুরস্কের মতো কোনো কোনো দেশে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এতই বাড়াবাড়ি করা হয়েছে যে, ধর্ম পালন না করার সব সুযোগ দেয়া হলেও ধর্ম পালনে পদে পদে দেয়া হয়েছে নানা রকম বাধা। তুরস্ক একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম রাষ্ট্র হলেও সেখানে পৌনে এক শতাব্দী ধরে উগ্র সেকুলার রাষ্ট্রশক্তি প্রধানত ইসলামকেই টার্গেট করে তাদের অপতৎপরতা চালিয়েছে। কথিত নিরপেক্ষতার আড়ালে ইসলামবিদ্বেষীদের এহেন গোঁড়ামি অনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক। এটা নিঃসন্দেহে মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আধুনিক সভ্য জগতে কোনো সরকার এমন পদক্ষেপ নিতে পারে না। যা হোক, তুরস্কে একেপি সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সে দেশের জনগণের অনুসৃত ধর্ম তথা তাদের লালিত বিশ্বাস ও মূল্যবোধ আবার মর্যাদা পাচ্ছে। নারীর হিজাব পরার অধিকার প্রতিষ্ঠা এর একটি নজির।
তুরস্কে ১৯২৪ থেকে একাদিক্রমে গোঁড়া সেকুলার শাসন অব্যাহত ছিল পঞ্চাশের দশকে আদনান মেন্দারেসের কয়েক বছরের শাসনকাল ছাড়া। হিজাব বা মহিলাদের মস্তকাবরণের ওপর রাষ্ট্রীয় খড়গ নেমে আসে প্রথমে ১৯৮০ সালে। তখন সেনাপ্রধান কেনান এভরান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা জবরদখলের পর সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেন। হিজাব সমর্থক দলগুলোর জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, সরকার ততই শঙ্কিত হয়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে কঠোরতর করেছে। এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও হিজাব হলো নিষিদ্ধ। দেশজুড়ে হিজাবের পক্ষে ব্যাপক বিক্ষোভ সত্ত্বেও একগুঁয়ে সরকার তার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
মার্ভে কাভাকসি ধর্মপ্রাণ তো বটেই, সেই সাথে আধুনিক উচ্চশিক্ষার অধিকারী। বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ভার্সিটির ডিগ্রিধারী এই সংগ্রামী নারী ওয়াশিংটনে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ও হোয়ার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ছিলেন। তবে পাশ্চাত্যের চাকচিক্য কিংবা ‘সর্বোন্নত দেশ’-এর আকর্ষণ তাকে ধরে রাখতে পারেনি। কাভাকসি স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তুরস্কে ফিরে এলেন। রাজনীতির মাধ্যমেই দেশের জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হবেÑ এমন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তিনি পোষণ করতেন। সে মোতাবেক ইসলামি আদর্শে বিশ্বাসী ভার্চু পার্টি থেকে ইস্তাম্বুলের এমপি নির্বাচিত হন এপ্রিল, ১৯৯৯ সালে। এর পরই ২ মে তিনি মাথায় স্কার্ফ দিয়ে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার জন্য গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ভবনে প্রবেশ করেন, কিন্তু সেকুলার ও বামপন্থীরা তার ধর্মীয় অধিকারটুকুও বরদাশত করতে রাজি হননি। স্কার্ফ বা হিজাব পরিহিতা কাভাকসিকে দেখেই ‘ডেমোক্র্যাটিক লেফট পার্টি’র (ডিএলপি) এমপিরা ন্যূনতম ভদ্রতার মাথা খেয়ে ‘বেরিয়ে যাও’ বলে কাভাকসির উদ্দেশে চিৎকার করে ওঠেন। তারা এমনকি তাকে শপথ নিতে পর্যন্ত দেননি। অথচ সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনি জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েই পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছিলেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত এসেভিট ডিএলপি দলের নেতা হিসেবে চরম সঙ্কীর্ণতা ও গোঁড়ামির প্রমাণ রেখেছিলেন তখন। তিনি দলের অসহিষ্ণু এমপিদের শান্ত করার কোনো চেষ্টা না করে উল্টো ‘বিপ্লবী বক্তৃতা’ ঝাড়তে থাকেন এ ভাষায়Ñ ‘এটা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার জায়গা নয়। এই মহিলাকে লাইনে আনুন।’
‘প্রগতিশীল’রা প্রতিনিয়ত ধর্মীয় স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাসহ মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রবক্তা রূপে নিজেদের জাহির করেন। অথচ তারাই মার্ভে কাভাকসির গণতান্ত্রিক অবিচ্ছেদ্য অধিকার সে দিন তুর্কি আইনসভায় পদদলিত করেছিলেন। তাদের নেতা ও সরকারপ্রধান এসেভিটের ‘ফতোয়ামাফিক’ বেলাইনে চলে যাওয়ায় কাভাকসিকে শুধু পার্লামেন্ট থেকে নয়, দেশ থেকেও বহিষ্কার করা হলো। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এমন অসভ্যতার দৃষ্টান্ত সমকালীন বিশ্বে বিরল।
মার্ভে কাভাকসি তার পুরনো কর্মস্থল যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং অচিরেই সেখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করেন। মেয়ে ফাতিমার ভাষায়- ‘আম্মা বিরাট ত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। পার্লামেন্ট থেকে তাকে ভয়ঙ্করভাবে বাইরে ছুড়ে ফেলার পর মা, বোন আর আমার নতুন জীবন শুরু হলো বিদেশে। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা আগের চেয়ে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম যে, আরো উৎসাহ ও অধ্যবসায়ের সাথে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসরণ করে যাবো। সব সময়ই আমাদের লক্ষ্য ছিল ও আছে- কমিউনিটি ও উম্মাহসহ বিশ্বমানবতার সেবা করা।’
তুরস্কে দশকের পর দশক বজায় ছিল প্রগতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী শাসন। অটোমান সুলতানের সেনা কর্মকর্তা মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে ১৯২৩ সালে নতুন তুর্কি রাষ্ট্রের যাত্রার সূচনা। তৎকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কামাল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন। ‘রুগ্ণ’ তুরস্ককে আধুনিকতার পথে ‘শক্তিশালী’ করার লক্ষ্যে কামাল ‘খিলাফত’ উৎখাত করেছিলেন ঠিকই, তবে ‘জমহুরিয়াত’ (গণতন্ত্র) দিয়ে সে শূন্যস্থান পূরণ করেননি। বরং ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত তো বটেই, এর পরও অনেক দিন তুরস্কে গণতন্ত্র ছিল না; ছিল কার্যত একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসন। পরে গণতন্ত্র এলেও স্থায়ী হতে পারেনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ শাসন আর বশংবদ বিচার বিভাগ ও বিকৃত আইন পরিষদের মাধ্যমে পরোক্ষ সেনা শাসনের কারণে। ১৯৬০ সালে জেনারেল জামাল গুর্সেল এবং ১৯৮০ সালে জেনারেল কেনান এভরান সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। সামরিক শাসনের পরও তারা এবং তাদের সমমনা সেকুলাররাই যুগ যুগ ধরে তুরস্ক শাসন করেছেন। অনেক সময় তা করা হয়েছে বেসামরিক পোশাকে এবং গণতন্ত্রের সেøাগান দিয়ে। বিগত শতকের শেষ দিকেও চলছিল এমন একটি শাসনামল। এই প্রেক্ষাপটে মার্ভে কাভাকসির মতো সাহসী নারী বিশ্বমিডিয়ার শিরোনাম হয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে কাভাকসির কন্যা ফাতিমা আবু শানাব লিখেছেন, ‘১৯৯৯ সালের ২ মে; তখন আমার বয়স মাত্র ৯ বছর। একটি ছোট্ট মেয়ে হিসেবে সেদিন দেখেছিÑ আমার মা মার্ভে কাভাকসি বীরের মতো পার্লামেন্টে প্রবেশ করলেন। তুরস্কের নাগরিকদের অনেকের হৃদয়েই ছিল তার স্থান। তাকে নির্যাতিত হতে হলো। তাকে যেন লাথি মেরে পার্লামেন্ট থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। ‘তিনি সেকুলার রাষ্ট্রের প্রতি হুমকি’Ñ এই অভিযোগে তার নাগরিকত্ব পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হলো। আমি সেদিন ভেবেছি, মা এত মহৎ কোনো কাজ করেছেন যে, তিনি সব সময় ওই মুসলিম মহিলাদের প্রতীক হয়ে থাকবেন, যারা মাথায় স্কার্ফ পরিধান করে থাকেন। লাল ও সাদা রঙের রেখা টানা এই নেভি হেডস্কার্ফ শুধু এক টুকরো কাপড় নয়। সেদিন এই টুকরো কাপড় হয়ে উঠেছিল হিজাব নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। একই বিশ্বাসের অনুগামী যে অসংখ্য মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছেন, তাদের প্রতিনিধিত্ব করেছে মাথা ঢাকার বস্ত্রখণ্ডটি। আমার মা নীরবে বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন সে দিন।’
মার্ভে কাভাকসি পার্লামেন্টে অসহিষ্ণু ও মতান্ধ প্রতিপক্ষের চরম অসৌজন্য ও ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। তখন তিনি ছিলেন তুরস্কের প্রখ্যাত রাজনীতিক অধ্যাপক নাজমুদ্দীন এরবাকানের Virtue Party (Welfare Party-এর উত্তরাধিকারী) থেকে সদ্যনির্বাচিত সংসদ সদস্য। এরবাকান দেশের একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে বিভিন্ন সময় সেকুলার সরকারের উগ্রবিদ্বেষের মুখে বিভিন্ন নামে দল গঠন করে ইসলামি আদর্শে সমাজ গঠনের আন্দোলন করেছেন। তিনি সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন ন্যাশনাল স্যালভেশন পার্টি বা মিল্লি সালামি পার্টির নেতা হিসেবে। পরে রেফাহ পার্টি নামেও কাজ করেছেন। এক সময় ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী। ’৯০-এর দশকে জনগণের রায়ে দেশ চালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেও সামরিক বাহিনীর অন্যায় হস্তক্ষেপে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯৭ সালের ১৮ জুন তুরস্কের ইতিহাসের এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ‘উত্তরাধুনিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত। তুর্কি জনগণ তাদের দীর্ঘ দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আর অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সশস্ত্রবাহিনী যেন কলঙ্কিত না হয়, সে জন্য গত বছর ১৫ জুলাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাথে সাথে ব্যর্থ করে দিয়েছে কিছু সেনাকর্মর্তার ক্ষমতা দখলের প্রয়াস।
যা হোক, ১৯৯৭ সালের ব্যতিক্রমী সে অভ্যুত্থানে সেনাকর্মকর্তারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতা নেয়াকে নিরাপদ মনে করেননি, বরং তারা জনসমর্থিত সরকারকে চাপের মুখে তাড়িয়ে দিয়ে পছন্দসই সরকার গঠনে মেতে ওঠেন। এ জন্য তারা ’৯৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গণতান্ত্রিক সরকারকে ভীষণ হুমকির মুখে রেখেছিলেন। মতান্ধ মিডিয়া কাজে লাগিয়ে এবং চরম সেকুলার দলগুলোকে উসকে উর্দিধারীরা এমন অবস্থার সৃষ্টি করেন, বৃদ্ধ এরবাকান পদত্যাগে বাধ্য হলেন। এরপরও ‘ইসলামপন্থী’ রাজনৈতিক মহলকে ভীষণ চাপে থাকতে হয়, যারা সেকুলারদের দৃষ্টিতে ‘রক্ষণশীল’। এমন পরিস্থিতিতেই ’৯৯ সালে মার্ভে কাভাকসি দেশের প্রধান নগর ইস্তাম্বুল থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। তার ক্ষমতাদর্পী প্রতিপক্ষ এটা মেনে নিতে পারেনি। তিন বছর পর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে ‘ভূমিধস বিজয়’ অর্জন করে। তবে বহুকাল ধরে সংসদ, মিডিয়া, বিচারালয়, সশস্ত্রবাহিনী, একাডেমিক অঙ্গন ও সাংস্কৃতিক মহলে হিজাববিরোধী সেকুলার শক্তি এতটাই জেঁকে বসেছিল যে, একেপি সরকার সহজে এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারেনি। তবে দীর্ঘ দিনের বিতর্কের পর ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা। আর হিজাবের অধিকার কায়েমের আন্দোলনের পুরোধা মার্ভে কাভাকসি ২০ বছর পর ফিরে পেলেন তার নাগরিকত্ব। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, তুরস্কের রাষ্ট্রদূতদের এখন আগের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এটা এক দিকে যেমন সমস্যা, তেমনি যোগ্য কূটনীতিকদের সামনে সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একজন তুর্কি ভাষ্যকারের মতে, দু’টি কারণে তুরস্কের কূটনীতিকদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। প্রথমত, তুরস্কের বর্তমান সরকার দেশকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদানের নয়া যুগে প্রবেশ করাতে উন্মুখ। এটা নিশ্চয়ই একটি বিরাট কাজ। দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে একেপির এই সরকার এবং তার নেতা এরদোগানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা তথা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রচারণা ব্যাপক ও জোরালো। এর কার্যকর মোকাবেলা সহজ না হলেও তা করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়াই আঙ্কারার করণীয়।
তুরস্কের বর্তমান সরকারের যারা সাফল্য চান, তারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সব বাধাবিপত্তি, বিরোধিতা ও সমালোচনার মোকাবেলা করে জাতীয় স্বার্থ, তুরস্কের আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং বিশ্বসম্প্রদায়ের মাঝে সে দেশের জোরালো উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে তুরস্কের প্রতিনিধি হিসেবে কূটনীতিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিক দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়ায় তুর্কি রাষ্ট্রদূত মার্ভে কাভাকসি জাতির প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন বলে তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিশ্বাস।
সারাবিশ্বে পুরুষদের শরীরে যে হারে শুক্রাণুর সংখ্যা বা স্পার্ম রেট কমে যাচ্ছে, শুক্রাণু কমে যাবার সেই হার বজায় থাকলে মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন এক চিকিৎসক।
প্রায় দুইশোটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ৪০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে পুরুষদের স্পার্ম কাউন্ট।
উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের পুরুষদের ওপর করা হয়েছিল এসব গবেষণা।
মানব প্রজন্মের সাম্প্রতিক তথ্য নিয়ে অবশ্য কিছু গবেষক সন্দেহও প্রকাশ করেছেন।
তবে তথ্য সংগ্রহের এই গবেষণা দলের প্রধান ড: হ্যাগাই লেভিন জানাচ্ছেন, ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা নিয়ে তিনি 'খুবই উদ্বিগ্ন'।
এই তুলনামূলক গবেষণাটি করা হয় ১৯৭৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। এই সময়কালে করা ১৮৫টি গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা কাজটি করে ড: লেভিনের দল।
ডঃ লেভিন একজন 'এপিডেমিওলজিস্ট'। রোগবিস্তার সংক্রান্ত বিদ্যা ও এর সাথে সম্পর্কিত ওষুধের শাখা, রোগের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ এসব বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ।
বিবিসিকে ডঃ লেভিন জানান, "এভাবে স্পার্ম কাউন্ট কমতে থাকলে একসময় মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে"।
শুক্রাণু কমে যাবার সংখ্যা 'দিনে দিনে বাড়ছে'
"আমরা যদি নিজেদের জীবনযাপনের ধরন, পরিবেশ এবং রাসায়নিক ব্যবহারে পরিবর্তন না আনি, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে তা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন" ।
"একটা সময়ে এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, আর তাতে মানব প্রজাতির বিলুপ্তিও দেখা যেতে পারে" -বিবিসিকে বলেন ড: লেভিন।
যেসব বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার সঙ্গে ছিলেন না তারাও এই গবেষণার মানের প্রশংসা করে বলেন, তাদের কাজ খুবই ভালো, তাদের তথ্যও ঠিক আছে। কিন্তু এখনই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে 'মানব প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে'।
জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির গবেষক ড: লেভিন তাঁর অনুসন্ধানে দেখেছেন, শুক্রাণুর ঘনত্ব কমে এসেছে ৫২.৪ শতাংশ এবং স্পার্ম কাউন্ট কমে এসেছে ৫৯.৩ শতাংশ।
গবেষণায় আরো বলা হচ্ছে, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত পুরুষদের মধ্যে স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণুর হার কমে যাবার এই ধারা অব্যাহত রয়েছে এবং এটি দিনে দিনে আরো বাড়ছে।
পূ্র্ববর্তী গবেষণা নিয়ে 'দ্বন্দ্ব'
তবে দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার পুরুষদের মধ্যে স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণুর হার কমতে দেখা যায়নি।
তবে গবেষকেরা বলছেন, এসব দেশে যথেষ্ট গবেষণা হয়নি এবং একটা সময়ে এখানেও স্পার্ম কাউন্ট কমে আসতে পারে বলে ধারণা করেছেন ড: লেভিন।
এসব গবেষণার তথ্য নিয়ে বিতর্ক আছে অনেক কারণে।
এর আগে কয়েকটি গবেষণা কাজে বলা হয়েছিল উন্নত অর্থনীতির দেশে স্পার্ম কাউন্ট কমে আসছে। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকের ধারণা এর মধ্যেও 'বিভ্রান্তিমূলক তথ্য' রয়েছে।এছাড়া আরো কিছু গবেষণা করা হয় কমসংখ্যক পুরুষ নিয়ে। আবার ফার্টিলিটি ক্লিনিক থেকে তথ্য নিয়ে যেসব গবেষণা করা হয় সেখানে স্পার্ম কাউন্ট কম আসা স্বাভাবিক, কারণ মানুষ সমস্যা নিয়েই সেখানে যায়।
আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় হলো, স্পার্ম কাউন্ট কমে আসছে এমন ফলাফল দেখতে পেলে তা জার্নালে প্রকাশিত হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। এই কারণে হয়তো স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণু হার কমে আসছে এমন একটা ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এই গবেষকেরা দাবি করছেন এরকম সব ধরনের সমস্যার বিষয়েই তারা চিন্তা করেছেন এবং গবেষণা করে যে তারা যে ফলাফল পেয়েছেন তা সত্য বলে মানছেন অনেকে।
যেমন শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান পেসি বলছেন "এর আগে স্পার্ম কাউন্টের বিষয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে তাতে আমি খুব একটা আশ্বস্ত হয়নি। কিন্তু ড: লেভিন ও তার দল যে গবেষণা করেছেন এবং তারা যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা পূর্ববর্তী অনেক গবেষণা নিয়ে ভ্রান্তি দূর করে দেয়"।
ধুমপান এবং স্থূলতা
তবে অধ্যাপক পেসি বলছেন, নতুন এই গবেষণাটি অনেক ভ্রান্তি দূর করলেও ফলাফলের বিষয়টি নিয়ে সতর্কতার সাথে এগুতে হবে।
"এ বিষয়টা নিয়ে তর্কের অবসান কিন্তু এখনই হচ্ছে না। এ বিষয়ে আরো অনেক কাজ করতে হবে" -বলেন অধ্যাপক পেসি।
কেন স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণু হার কমে যাচ্ছে তার সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি।
তবে কীটনাশক এবং প্লাস্টিকে থাকা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা, ওবেসিটি বা স্থূলতা, ধুমপান, মানসিক চাপ, খাদ্যভ্যাস, এমনকি অতিরিক্ত টিভি দেখা এক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।।
ড: লেভিন বলছেন, কেন শুক্রাণুর হার কমে যাচ্ছে সে বিষয়টি জানা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। একইসাথে এমনটা যেন না ঘটে সেই উপায়ও খুঁজে বের করতে হবে বলে উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা
ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে ওষুধের পুরো কোর্স শেষ করা সবসময় উচিত কীনা তা এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
তারা বলছেন, পুরো কোর্স শেষ না করে মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করলে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না- এর পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি তারা দেখছেন না।
তারা বলছেন, সুস্থ বোধ করলে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যদি থামিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সেভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব কীনা এনিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
কিন্তু পারিবারিক ডাক্তাররা রোগীদের পরামর্শ দিয়েছেন শুধু একটি সমীক্ষার ভিত্তিতে তারা যেন তাদের অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে কোনো পরিবর্তন না আনে।
ইংলন্ডে জিপি বা পারিবারিক ডাক্তারদের সদস্য সংস্থা রয়্যাল কলেজ অফ জেনারেল প্র্যাকটিশনারস্-এর প্রধান প্রফেসর হেলেন স্টোকস্-ল্যামপার্ড বলেছেন রোগের উপসর্গ কমে যাওয়া বা ভাল বোধ করার অর্থ এই নয় যে সংক্রমণ পুরোপুরি কেটে গেছে।
''রোগীদের জন্য যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা খুবই পরিস্কার- সবসময়ই যেটা আমরা বলেছি যে অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স নিতে হবে। এখন এটা বদলাতে গেলে সেটা মানুষকে বিভ্রান্ত করবে।''
তাহলে কী আছে নতুন গবেষণায়?
ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অংশের একদল গবেষক যুক্তি দেখিয়েছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি মানুষের শরীরে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে সেই সমস্যার মোকাবেলা করতে হলে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোটা জরুরি।
ব্রাইটন ও সাসেক্স মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যাপক মার্টিন লোয়েলিন ও তার কয়েকজন সহকর্মী তাদের গবেষণার ভিত্তিতে বলছেন প্রয়োজনের বেশি সময় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে।
তারা বলছেন, পুরনো ধারণা ছিল দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করালে সংক্রমণ ভেতরে রয়ে যাবে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি শরীরের প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হবে। তারা বলছেন, এই ধারণা এখন সাবেকি।
তারা বলছেন, এখন যেটা বেশি করে প্রমাণিত সেটা হল তিন থেকে পাঁচদিনের সংক্ষিপ্ত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা বহু ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে।
অধ্যাপক লোয়েলিন বলেছেন, এর ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। যেমন- যক্ষ্মার চিকিৎসায় শুধু এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে দ্রুত ওই অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
ওই গবেষক দল বলছে, বর্তমানে সবাইকে গণভাবে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেয়ার যে প্রথা চালু আছে তা বদলানো উচিত। ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে সংক্রমণের গুরুত্ব বিবেচনা করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা ভিন্নভাবে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে এখন রোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং অল্পদিনের কোর্সে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার দিকেও ডাক্তাররা ঝুঁকছেন।
তারা অবশ্য স্বীকার করেছেন, অল্পদিনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেয়ার সুফল বা কুফল নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন আছে।
ব্রিটেনের পারিবারিক চিকিৎসক মণ্ডলী বলেছেন, তারা কখনই সব রোগীকে এক কাতারে ফেলে অ্যান্টিবায়োটিক দেন না। তারাও ব্যক্তিবিশেষের রোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা পরামর্শ দেন।
এদিকে ব্রিটেনে রয়্যাল ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটি বলছে গবেষকদলের নতুন তত্ত্ব অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্কের সুযোগ করে দিল।
'কোর্স শেষ করুন' অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার এই প্রচলিত মন্ত্র বদলে 'ভাল বোধ করলে ওষুধ বন্ধ করে দিন' এই পদ্ধতি চালু করা কতখানি যুক্তিসঙ্গত- তারা বলছেন এর জন্য আরো গবেষণার পথও এর ফলে প্রশস্ত হবে বলে তারা মনে করছেন।
সূত্র : বিবিসি
৭০ বছর বয়সে এসে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি অবশেষে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আরোহণ করতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অন্তত এ কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে আজ যখন একজন নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন অভিযোগে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য ঘোষিত হলেন। এটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন, নয় কি?
অযোগ্যতা!
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ২৫ পৃষ্ঠার এক সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, নওয়াজ শরীফ প্রধানমন্ত্রীর আসনে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এই রায়ের পর পাকিস্তানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট  দেখা দিয়েছে। এখন সংসদ ভেঙে দেয়া হবে, নাকি আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের পথে দেশ এগিয়ে যাবে তা নিয়ে জনগণের মধ্যে জল্পনা শুরু হয়। তবে সময় মতো এই আশঙ্কার জবাব দেয়ার জন্য মুসলিম লীগ-নওয়াজকে ধন্যবাদ। দলটির নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করবে এবং সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত সময়ে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে সময় পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদের একজন শক্তি প্রার্থী হলেন নওয়াজ শরীফের ছোটভাই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। এটা হলে সরকার ও দলের ওপর শরীফ পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত নিশ্চুপ। এই মামলায় প্রত্যক্ষ কোনো হস্তক্ষেপ না করে সুপ্রিম কোর্ট ও অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে দিয়েছে। ফলে আর কোনো সেনা অভ্যুত্থানের গুজব অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায়। তবে, প্রধানমন্ত্রীকে তার পদে অযোগ্য ঘোষণা করা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। পাকিস্তানের ভবিষ্যতের উপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এরই প্রেক্ষাপটে যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে তা হলো: এই অযোগ্যতার ঘোষণা পাকিস্তানকে কোথায় নিয়ে যাবে?
রায়ের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কি হবে?
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পাকিস্তানে কোনো দায়িত্বপালনরত প্রধানমন্ত্রীকে এই প্রথমবারের মতো অযোগ্য ঘোষণা করা হয়নি। ২০১২ সালের ১৯শে জুন আদালত অবমাননার অভিযোগ মাথায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানীকে সরে যেতে হয়েছিলো। পাকিস্তানের ছককাটা রাজনীতিতে সিটিং প্রধানমন্ত্রীদের অযোগ্য ঘোষণা করা একটি নতুন প্রবণতা। ১৯৯০’র দশকে (‘গণতন্ত্রের দশক’ ও পরোক্ষ সেনা হস্তক্ষেপের যুগ) দেখা গেছে মোটামুটি প্রতি দুই বছরে একবার করে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া হয়েছে এবং নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। । কিছু মানুষ পর্দার আড়ালে থেকে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণের সহজ ও নতুন উপায় হিসেবে প্রধানমন্ত্রীদের অযোগ্য ঘোষণা করার এই ‘নতুন চর্চা’ শুরু করেছে।
পাকিস্তানে অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, এই রায় যতটা না বিচার ব্যবস্থার উচ্চস্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ, তারচেয়ে বেশি একটি ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’। এ রকম সংশয় থাকার পরও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আর কোনো প্রধানমন্ত্রী এমন কি কোনো এলিট রাজনীতিককে নওয়াজ শরীফ ও তার পরিবারের মতো এমন উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক ও বিচারিক পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের সম্মুখিন হতে হয়নি।
নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে এই রায়ের প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী হবে, সে কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। নওয়াজ শরীফই প্রথম অযোগ্য ঘোষিত কোনো প্রধানমন্ত্রী না হলেও এখন কেউ আর এ কথা অস্বীকার করতে পারবেন না যে, ক্ষমতার কেন্দ্রে (কেন্দ্রীয় পাঞ্জাব) যার শেকড় সেই রাজনীতিককেও ক্ষমতা ছেড়ে ঘরে ফিরে যেতে হয়। গিলানিকে যখন ঘরে ফিরে যেতে হয়েছিল তখন তার সিরাইকি (পশ্চিম পাঞ্জাবের ক্ষুদ্র একটি সমপ্রদায়) পরিচিতির কারণে এমন ধারণা হয়েছিল যে, ক্ষুদ্র প্রদেশ বা পাঞ্জাবের তুলনামূলক পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর কাউকেই শুধু অযোগ্য ঘোষণা, পরিবর্তন বা সরসরি বরখাস্ত করা সম্ভব। এমন ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান রায়টি শুধু ঐতিহাসিকই নয়, এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। আর সেই বার্তাটি হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে পাঞ্জাবের আধিপত্য নিয়ে। এটা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পাঞ্জাবের প্রভাবের মধ্যে ফাটল ধরেছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানি রাজনীতির গতানুগতিক প্রকৃতিতে যে পরিবর্তন আসছে এই রায়ের মধ্য দিয়ে তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যেমন, এই মামলা ও এ নিয়ে যে পরিমাণ প্রচারণা হয়েছে তাতে নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, পাকিস্তানে যেসব রাজনীতিক নিজেদেরকে ‘সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছুটা ওপরে’ বলে ভাবছেন এবং কোনো জ্ঞাত সম্পদ ও বৈধ আয়ের উৎস ছাড়াই বিলাসবহুল জীবন-যাপন করছেন  তাদের আর আগের রাজনীতির ধারা বজায় রাখা চলবে না। অন্তত সেই নির্লজ্জ চালচলন পরিত্যাগ করতে হবে।
তবে, ১৯৯০ দশকের চেয়ে ২০১৭ সাল অনেক দিক দিয়ে আলাদা হলেও এই দুই যুগের মধ্যে এখনো অনেক কিছুর মিল রয়ে গেছে।
যেমন, এমন রাজনৈতিক সংকট বা অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে যা তাকেও আক্রান্ত করবে সেই আশঙ্কা থাকার পরও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে তার সক্ষমতা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রকাশ করেছে। এরপরও গণতন্ত্রের ভিত্তিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করার ভার এখনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর রয়ে গেছে।
আর তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: শরীফের ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার মানে কি পাকিস্তানে গণতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছে? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। শুক্রবারের রায়ের পর থেকে মিডিয়ায় যে আলোচনা চলছে, যে গণ উৎসব চলছে, আগামী কয়েকদিন ধরে যা চলবে ঠিক একই পরিস্থিতি ১৯৯০’র দশকেও দেখা গিয়েছিলো। তখন বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরীফ দু’জনকেই দু’বার করে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। পাকিস্তানের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক অসিম সাজ্জাদ আখতার বলেন, জনসাধারণের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস ও গণতন্ত্র সুসংহত হচ্ছে বলে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে ১৯৭০’র দশকেও তা দেখা গিয়েছিলো যখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বরখাস্ত এবং পরে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছিল। আখতার আরো বলেন, এ ধরনের বারবার বরখাস্তের ঘটনা ও গণতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছে বলে অতিমাত্রায় আশাবাদ শুধু একটি সুষ্ঠু ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র বিকাশে পাকিস্তানের অক্ষমতা নিয়ে হতাশাকেই জোরদার করছে। এই হতাশা এবং সত্যিকারের কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের অভাব থেকে বুঝা যায় গত ৭০ বছর ধরে বহু প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার এতসব উদাহরণ থাকার পরও পাকিস্তানে জবাবদিহিতা ও যাচাই প্রক্রিয়া কখনোই ‘অভিশপ্ত রাজনীতিকদের’ বাইরে বিস্তার লাভ করতে পারেনি।
আবারো বলছি, এই অযোগ্যতার ঘোষণা যে প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে তা হলো: এর ফলে পাকিস্তানের জবাবদিহিতা প্রক্রিয়া টেকসই হবে কি না এবং অন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে কিনা। সাংবিধানিকভাবে সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই সেগুলোর কাজের জন্য জবাবদিহি করা যায়। কিন্তু পাকিস্তানের ইতিহাস বলে এই প্রক্রিয়া এযাবৎকাল শুধু সরকারের নির্বাহী বিভাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
একজন প্রধানমন্ত্রীকে অযোগ্য ঘোষণার কারণে গণতন্ত্র নিজেই হুমকির মুখে পড়ছে সে কথা বলা না গেলেও এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আবার দেখিয়ে দিলো যে, পাকিস্তানে জবাবদিহিতা ধারণার প্রয়োগ এখনো অত্যন্ত সংকীর্ণ ও সীমিত পর্যায়ে।
ফলে, এখানে যে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উঠবে এবং যার উত্তর পেতে হবে তাহলো: এই জবাবদিহিতা প্রক্রিয়া কি পাকিস্তানের অরাজনৈতিক ও অনির্বাচিত ক্ষেত্রগুলোতেও প্রয়োগ করা হবে? এই প্রক্রিয়া আগামীতেও সীমিত ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে তা পাকিস্তানের ক্ষমতার মূলকেন্দ্রগুলোতে তেমন কোনো আঘাত হানা ও সেগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে না। এতে পাকিস্তানের গণতন্ত্র গুণগতভাবে অগণতান্ত্রিক হিসেবেই রয়ে যাবে।
সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর
বৃটিশ সেনা, বিমান ও নৌ বাহিনীতে ভয়াবহ যৌন হয়রানির তথ্য মিলেছে। বলা হয়েছে ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এসব বাহিনীতে কম করে হলেও ৩৬৩টি যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে। তার মধ্যে শুধু গত বছরে মিলিটারি পুলিশ ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ১১৩টির তদন্ত করেছে। ফকল্যান্ডে রাজকীয় বিমান বাহিনীর (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতে এ রকম যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন রেবেকা ক্রুকশ্যাঙ্ক নামের এক নারী। ওই ঘটনার ছবি প্রকাশ হয়েছে। তা বৃটিশ মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছে। ওই সময় রেবেকা ছিলেন ২১ বছর বয়সী যুবতী। তিনি তখন ফকল্যাল্ডে আরএএফ মাউন্ড অ্যালিস ঘাঁটিতে নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে পুরুষ সহকর্মীদের হাতে তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে দু’পুরুষ সহকর্মী নিজেরা একেবারে নগ্ন অবস্থায় রেবেকাকে জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে নিয়েছেন। একজন সামনের দিকে। অন্যজন পিছন দিকে। তারপর তারা অসংলগ্ন আচরণ করছেন। ছবিতে এমন কিছু অংশ আছে যা সেন্সর করে প্রকাশ করতে হয়েছে। রেবেকা ১৭ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন রয়েল এয়ার ফোর্সে। তারপর সেখানে চার বছর দায়িত্ব পালন করে। এরপর ২০০১ সালে তাকে চার সপ্তাহের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয় ফকল্যান্ডের ওই ঘাঁটিতে। সেখানে প্রায় ২৮ জন পুরুষ সহকর্মীর মধ্যে তিনি একজনই ছিলেন নারী। বর্তমানে তার বয়স ৩৬ বছর। বসবাস উত্তর লন্ডনে। বর্তমানে তিনি একজন লেখিকা ও অভিনেত্রী। রেবেকা বলেছেন, তিনি ওই ঘাঁটিতে যোগ দেয়ার পরই তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ওই পুরুষ সহকর্মীরা। তারা বলেছিলেন, এটাই অন্ধকার সময়ের সূচনা। সেখানে অশালীন আচরণ শুরু করেন তারা। তারই কিছু ছবি তুলে রেখেছিলেন রেবেকা। তিনি বলেন, এর পরে তাকে একজন পুরুষ কর্মকর্তার সঙ্গে নিজের বেডরুমে ব্যক্তিগতভাবে মিটিং করতে হয়েছিল। ওই পুরুষ কর্মকর্তা তাকে এসব বিষয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছিলেন। বিনিময়ে তাকে প্রস্তাব করেছিলেন টর্নেডো এফ-৩তে একটি ফ্লাইটে নেয়ার। রেবেকা বলেন, এখন সম্মুখ যুদ্ধে যোগ দিতে সক্ষম নারীরা। কিন্তু যেভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে সেনাবাহিনী যথেষ্ট কাজ করছে না। যেখানে কর্মক্ষেত্রে সমতার শিক্ষা প্রশিক্ষণকালে দেয়া হয়। যৌন হয়রানি, অন্যান্য হয়রানির বিরুদ্ধে শূণ্য সহনশীলতার কথা বলা হয়, সেখানে প্রশিক্ষণের শুরুতে এসব বিষয় নজরে আনা দরকার। রেবেকার ভাষায়, এখন থেকে অনেক আগে ২০০১ সালে আমি যে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি তা আমার জীবনের ওপর বিরাট একটি প্রভাব ফেলেছে। আমার কণ্ঠকে থামিয়ে রাখা যাবে না। যদি অন্য কোনো মানুষ আমার কাহিনী পড়েন এবং তারা হোক সেনাবাহিনী বা অন্য যেকোনো কর্মক্ষেত্র সেখানকার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা যদি সাহস করে প্রকাশ করেন, তাহলে আমরা সবাই মিলে এ ধরনের আচরণ পাল্টাতে পারবো। অবিচারের বিরুদ্ধে শূণ্য সহনশীলতা দেখাতে পারবো। রেবেকা দাবি করেন, করপোরালরাও যুবতী প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। গত বছরে মিলিটারি পুলিশ এমন ১১৩ টি অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। বলা হয়, প্রতি সপ্তাহে একজন নারী সদস্য দু’বার যৌন আক্রমণের শিকার হন। তথ্য পাওয়ার অধিকার সংক্রান্ত আইনের অধীনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মোট ৩৬৩ টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৮২ টি মামলা পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে। ৯৯ জন  ইন্সট্রাক্টরকে বরখাস্ত করা হয়েছে।  এখন পর্যন্ত বৃটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এমন হয়রানির শিকার নারীদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছে ২০ লাখ পাউন্ডের বেশি। এ মন্ত্রণালয়ের মতে, মিলিটারি পুলিশ গত বছর ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও হয়রানির কমপক্ষে ১১৩টি অভিযোগ তদন্ত করেছে। তবে অনেক  যৌন নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয় বলে অভিযোগ আছে। বিবিসি প্যানোরমা তদন্তে দেখেছে যে, নির্যাতিতরা যাতে পুলিশের কাছে রিপোর্ট না করেন বা অভিযোগ দাখিল না করেন সে জন্য কর্মকর্তারা তাদেরকে চাপ দিয়েছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ক্যাডেটদের সুরক্ষা দেয়ার বিষয়টিতে জোর দেয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা মুসলিম আয়মার বাগন যখন তার স্বামীকে জানান যে তার গর্ভাবস্থার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে মিয়ানমারের সৈন্যরা তাকে গণর্ধষণ করে, তখন তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান।
এরপর থেকে চেয়ে-চিন্তে জীবনধারণ করছেন আয়মার।
তিনি মিয়ানমারের বহু রোহিঙ্গা নারীর মধ্যে একজন, যারা রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর মাসের পর মাস চলা 'নির্মূল অভিযানের' সময় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হবার অভিযোগ করেন।
জাতিসংঘের আশঙ্কা, ওই অভিযান এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধের সমান।
বার্তা সংস্থা এএফপি সম্প্রতি মিয়ানমারের সরকারের পরিচালিত একটি সফরে রাখাইন প্রদেশে গিয়ে আয়মার বাগনের সঙ্গে কথা বলে।
তিনি কায়ার গং টং নামে একটি গ্রামের বাসিন্দা। ওই গ্রামে বার্তা সংস্থার সংবাদদাতা সরকারি লোকজনের অজ্ঞাতসারে একদল রোহিঙ্গা মহিলার সাথে কথা বলেন, যারা সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনা করেন সংবাদদাতার কাছে।
"সন্তান প্রসবের মাত্র কয়েকদিন আগে আমাকে ধর্ষণ করা হয়। আমার তখন নয় মাস চলছিল। তারা জানতো আমি গর্ভবতী, কিন্তু তাতেও দমেনি তারা," ছোট্ট একটি কন্যা শিশুকে কোলে নিয়ে বলছিলেন আয়মার বাগন। তিনি বলছিলেন, "এটা ঘটবার জন্য আমাকে অভিযুক্ত করে আমার স্বামী। একারণে সে অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করে আরেক গ্রামে গিয়ে থাকছে এখন।
আয়মার বাগনের বয়স মাত্র কুড়ি।
দুই সন্তানের মাতা হাসিন্নার বায়গনের বয়েসও কুড়ি। তিনি বলছেন, তাকেও পরিত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে তার স্বামী। কারণ গত ডিসেম্বরে তিনজন সৈন্য তাকে ধর্ষণ করেছিল।
এসব ঘটনা যখন ঘটছিল তখন রাখাইনের গ্রামগুলো ছিল পুরুষশুন্য, রয়ে গিয়েছিল শুধু মহিলা, শিশু আর বয়স্ক মানুষেরা।
সৈন্যদের ধর্ষণ করবার এসব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের সরকার।
এই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
কিন্তু বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৭৪ হাজার রোহিঙ্গাদের অনেকেই জাতিসংঘ তদন্তকারী এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর কাছে যেসব অভিযোগ জানিয়েছে, সেগুলোর সাথে এগুলো মিলে যাচ্ছে।
কায়ার গং টংয়ের রোহিঙ্গারা বলছে, তাদের গ্রামে পনেরোটির মত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে তিনটি ধর্ষণের ব্যাপারে তারা মামলা করেছেন, কিন্তু কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।
বাকিরা ভবিষ্যত হয়রানীর আশঙ্কায় অভিযোগ জানাতে চায়নি।
'কিছু মহিলা সম্মানহানির ভয়ে অভিযোগ জানায়নি', বলছিলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রামবাসী।
মানবাধিকারী গোষ্ঠীগুলো বহুদিন দরেই অভিযোগ করে আসছে যে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সীমান্তের জাতিগত সংঘাতগুলোতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশার শেষ নেই। দেশে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেদেশের সেনাবাহিনী। এমনকি জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্মূলের যে অভিযোগ এনেছে সেই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন মিয়ানমারের এখনকার মূল নেত্রী অং সান সুচি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসন পরিকল্পনার কথা বলেছে বাংলাদেশ সরকার। তবে তাতে তাদের ইতিবাচক সাড়া নেই। তারা চান তাদের বিষয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধান। তাদের অনেকেই বলেছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতার পক্ষে তারা। এমন সমঝোতার মাধ্যমে তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন। তাদের একজন দিলরুবা নামের এক শরণার্থী। তিনি বলেছেন, যদি এমনটা না হয় তাহলে আমাদেরকে বোমা দিয়ে মেরে ফেলুন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন পিবিএস নিউজআওয়ার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের দুর্দশা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে এমন প্রায় অর্ধ মিলিয়ন বা ৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে। তাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। ওই দ্বীপটি বসবাসের অনুপযোগী বলেও অনেকের মত রয়েছে। তবে সেখানে গাছ লাগিয়ে বসবাসের উপযোগী করার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার বিষয়ক কর্মী হাফেজ বলেছেন, যদি আমাদেরকে সেখানে পাঠানো হয় তাহলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো। আমরা মূল ভূখন্ডেই নিরাপদে আছি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ মাসে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৭০ হাজার। তবে এখানে তাদের জীবনধারণও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বর্ষা মৌসুমে ও ঘূর্ণিঝড়ে তাদের অনেক বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় নির্জন দ্বীপ ঠেঙ্গারচরে ৬০ হাজার রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করে এ সমস্যা সমাধান করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ পরিকল্পনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পিবিএসের রিপোর্টে বলা হয়েছে ঠেঙ্গারচর মূল ভূখন্ড থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। পলি মাটি জমে সৃষ্টি হয়েছে এ দ্বীপ। সেখানে যাতায়াতও খুব বিপদজনক। স্থানীয় সরকারের একজন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, অতীতে রোহিঙ্গারা মাদক সমস্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা পাচারের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ওই অঞ্চলে যেসব মানুষ বসবাস করেন তাদের মূল জীবিকা হলো মাছ ধরা। মিজানুর রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের এই খারাপ আচরণে প্রভাবিত হবেন স্থানীয়রা। এ জন্য তাদেরকে দেশের জনগণ থেকে আলাদা রাখাটাই যুক্তিযুক্ত। এ বিষয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় একজন বিশেষজ্ঞ হলেন ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেছেন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রধানত একটি বিপদজনক এলাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে আমরা বিশ্বাস করি ঝড়ের মাত্রা অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে। তাই তাদেরকে কংক্রিটে তৈরি ভাল অবকাঠামোতে রাখা উচিত। বিশেষ করে জরুরি অবস্থার কসময়। ওই রিপোর্টে বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পে বর্ণবাদী আমলের মানুষের মতো বসবাস করছেন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সেদেশের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে তাদেরকে। তাদের নেই কোনো নাগরিকত্ব। বিয়ে করতে গেলে তাদেরকে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এমন কি তারা নিজেদের গ্রামের বাইরে যেতে চাইলেও অনুমতি নিতে হয়। গত বছর ৯ই অক্টোবর রোহিঙ্গা জঙ্গিরা হত্যা করে মিয়ানমারের ৯ নিরাপত্তা কর্মীকে। তার প্রতিশোধ নিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। এতে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। তাদের বাড়িঘর, মসজিদ পুড়িয়ে দেয়া হয়। তবে এ অভিযোগকে বাড়িয়ে বলা হয়েছে বলে দাবি মিয়ানমার সরকারের। এর পর যে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন তার মধ্যে দিল নওয়াজ অন্যতম। তাকে সেনাবাহিনী গণধর্ষণ করেছে। তার চোখের সামনে তার স্বামীকে হত্যা করেছে তারা। তিনি বলেন, আমার চোখের সামনে রাস্তার ওপর আমার স্বামীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তারা। তারপর তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। সেনাবাহিনী তারপর নারীদের নিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে চলে যায়। তাদের কয়েকজনকে নিয়ে যায় আলাদা করে। ৫ সেনা সদস্য পর্যায়ক্রমে তাদেরকে ধর্ষণ করে। লোকজনের স্বর্ণালঙ্কার, আংটি, কানের দুল সব নিয়ে যায়। তারা শিশুদের হত্যা করে। এ জন্যই আমরা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। তবে রোহিঙ্গা হাফিজ বলেন, বাংলাদেশ ছোট্ট দেশ। ঘনবসতিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও তারা আমাদেরকে ঠাঁই দিয়েছে। এটা একটি বড় বিষয়। আমাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পাঠানোর চেয়ে মিয়ানমার সরকার যেন আমাদেরকে নাগরিকত্ব দেয় আমরা সেই দাবি করি। ৪৫ বছর বয়সী দিলবারের কণ্ঠে তীব্র হতাশা। তিনি বলেন, আমাদের জীবনের সব কিছু ফেলে, ত্যাগ করে এখানে এসেছি। যদি আমাদের জীবনে কোনো শান্তিই না থাকে তাহলে মরে যাওয়াই ভাল। মিয়ানমারে আমাদের শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। যদি আমাদেরকে এখন ওই চরে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেটাও হবে একরকম হত্যার সামিল। আমাদের পায়ের নিচে তো মাটি নেই।