Last update
Loading...
কেউ আছেন জেলে। কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নানা অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ঈদ তারা পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছেন। কিন্তু  এবারের ঈদ হয়তো তাদের কাটাতে হবে জেলখানাতে। কারণ ঈদের আগে তাদের জামিন হবে কি হবে না- এ নিয়েও বেশ অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে আদরের সন্তান আর প্রিয়জনকে ছাড়া ঈদ করতে হবে- এমনটা ভাবতে পারছেন না তাদের পরিবারের সদস্যরা। কোটা আন্দোলনের নেতা রাশেদ খানের ছোট বোন সোনিয়া মানবজমিনকে বলেন, মা ও ভাবি গতকাল খুব সকালে উঠে ভাইয়ার সঙ্গে কেরানীগঞ্জ জেলখানায় দেখা করতে গেছেন। একটু বেলা হয়ে গেলে জেলখানার অন্য আসামিদের সঙ্গে মারামারি ও ধাক্কাধাক্কি করে ভাইয়ার কথা বলতে হয়।
বাবা-মা দুজনই ভাইয়ার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মা অসুস্থ শরীর নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন ভাইয়াকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্য। বাবার কিডনির ব্যথাটা বেড়েছে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন করতে হবে। কিন্তু বাবার এক কথা রাশেদ জেল থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত তিনি অপারেশন করাবেন না। ভাইয়া প্রতিবছর ঈদের এক সপ্তাহ আগে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতেন। অথচ এবছর ভাইয়াকে ছাড়া আমাদের প্রথম ঈদ করতে হবে।
এটা ভেবেই মা কান্না করে আর বলে আমার বাবুকে ছাড়া আমি কেমনে ঈদ করবো। এরকম ঈদ যেন আর কখনো না আসে। গত সপ্তাহে ভাইয়া মা’কে বললো মা তুমি ঈদে বাসায় যাবে না। তখন মা বললো মনি তোমাকে ছাড়া আমি বাড়ি যাবো না। আগামী বছর তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে ঈদ করবো। সোনিয়া বলেন, ভাইয়াকে ছাড়া ঈদ কি কখনো ভালো হয়। প্রতিবছর ঈদের আগে ভাইয়া বাড়ি যাওয়ার সময় বলতো তোমাদের কি লাগবে, কি নিয়ে আসবো। ভাইয়া ঈদের সময় বাসায় গেলে আমাদের কাছে উৎসব মনে হতো। এখন মনে হয় সবকিছু অন্ধকার।
ভাইয়াকে ছাড়া চারদিক কেবলই ফাঁকা আর শূন্য মনে হয়। এরকম ঈদ আমরা চাই না। ভাইয়ার স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষে ভালো একটা চাকরি করবে। তখন আর আমাদের কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। গত সপ্তাহে ভাইয়া মাকে বলেছিল, মা ঈদের আগে তুমি আরেকবার দেখা করতে আসবে। অনেক দিন তোমার হাতে বাসার রান্না করা খাবার খাই না। প্রতিবছর ঈদে বাসায় গেলে যেভাবে রান্না করে খাওয়াতে ঈদের দিন খুব সকালে ঠিক তেমন খাবার রান্না করে নিয়ে আসবে। কোরবানির ঈদে ভাইয়া গরুর মাংস আর খিচুড়ি বেশি পছন্দ করতো। তাছাড়া ঈদের দিন সকালে মায়ের রান্না করা সেমাই খেয়ে নামাজ পড়তে যেতেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও কোটা আন্দোলনের নেতা পি এম সুহেলের ছোট ভাই সুমন রহমান বলেন, এটা ভাবতেই কষ্ট হয় ভাইয়াকে ছাড়া এবছর আমাদের ঈদ করতে হবে। আমাদের জীবনে এমন একটি ঈদ আসবে ভাবতেও পারিনি। প্রতিবার ঈদের ৩ থেকে ৪ দিন আগে ভাইয়া বাসায় চলে আসতেন। বাসায় চাচাতো ভাইদের ছেলেমেয়ে, চাচা-চাচী, মা সবার জন্য জামা-কাপড় নিয়ে যেতেন। গরিব লোকদের টাকা ও কাপড় কিনে দিতেন।
ঈদে গরুর মাংস দিয়ে চালের রুটি খেতে ভাইয়া বেশি পছন্দ করতো। গতকাল সকালে ভাইয়াকে দেখে এসেছি। ভাইয়া বললো আমার জন্য চিন্তা করিস না। ঈদের দিন আমরা যারা জেলখানায় আছি তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসবি। ভাইয়া বলেছে, তাদের ১০ জনের জন্য মায়ের হাতের খাবার রান্না করে নিয়ে যেতে।
কোটা আন্দোলনের নেতা মশিউরের বাবা মজিবুর রহমান বলেন, এ বছর আমাদের ঈদ হবে না। আমাদের ঈদটা মাটি হয়ে গেছে। তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে একত্রে ঈদ করবো সেটা আমার কপালে নেই। ঈদ নিয়ে আমাদের আনন্দ বলতে কিছু নেই। আছে একবুক কষ্ট আর চোখভর্তি জল। গত শনিবার মশিউরের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। ঈদের দিন আমার ছেলেকে জেলখানায় খাবার  দেবে এমন কেউ নেই। বরিশালের ঝালাকাঠিতে তাদের বাড়ি।
মশিউরের বাবা পেশায় একজন রিকশাচালক। তিন ভাইবোনের মধ্যে মশিউর মেজ। বড় ভাই ঢাকাতে প্রাইভেট গাড়ি চালায়। মশিউরের বাবা বলেন, মশিউর ঈদে তার মায়ের হাতে রান্না করা গরুর মাংসটা বেশি পছন্দ করতো। আমরা তো গরিব মানুষ তাই কোরবানি দিতে পারি না। দশজনে যেটুকু মাংস দিতো তাই দিয়ে ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঈদ করতাম। এবছর কোরবানি দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছেলেকে জেলে রেখে কোরবানি দেই কীভাবে।
উল্লেখ্য, কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মামলায় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দশ জন নেতা গ্রেপ্তার হন।
পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে বেশ কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিক দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। গতকাল দিনের শুরুতে ১০ জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের একটি দল পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান। ওই দলে ২৮ রাষ্ট্রের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের ঢাকাস্থ কার্যালয়ের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সসহ ওই জোটের সদস্য ৮ দেশের আবাসিক মিশনের প্রধান এবং ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে- পশ্চিমা দূতরা নিজে থেকেই সচিবের সঙ্গে দেখা করেন।
সচিবের দপ্তর সংলগ্ন সভাকক্ষে তারা বৈঠকে মিলিত হন। এক ঘণ্টা স্থায়ী বৈঠকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সন্দেহভাজনদের আটক-রিমান্ড, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলা, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। সূত্র মতে, এই মুহূর্তে পশ্চিমা বেশির ভাগ রাষ্ট্রদূতই ঢাকায় নেই।
মূলত চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সরাই সচিবের সঙ্গে কথা বলেন। তারা মোটা দাগে সরকারের প্রতি যে বার্তাটি দেয়ার চেষ্টা করেন তা হলো- রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ যেভাবে তার সীমান্ত এবং হৃদয় খুলে দিয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে কোনো একটি ঘটনা বা কঠিন পরিস্থিতি যেন সেই অর্জনকে ম্লান করে না দেয়।
পশ্চিমা কূটনীতিকরা ‘ডিফিক্যাল্ট চ্যালেঞ্জ’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন জানিয়ে বৈঠকে উপস্থিত ঢাকার এক কূটনীতিক মানবজমিনকে বলেন- আসলে তারা সম-সাময়িক ঘটনাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আরো স্পষ্ট করে বললে- নিরাপদ সড়কের দাবিতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই বুঝিয়েছেন তারা।
ভিন দেশি জ্যেষ্ঠ ওই কূটনীতিকরা বরাবরের মতো গতকালের বৈঠকেও সব পক্ষের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূিচ পালনের অধিকারসহ মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া এবং রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। সচিব ও পশ্চিমা দূতদের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে আটক দেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী শহীদুল আলমের বিষয়টি স্থান পায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সচিব ও  দূতদের বৈঠককে ‘অনানুষ্ঠানিক এবং নিয়মিত’ বৈঠক হিসাবেই দেখছেন। এক কর্মকর্তা বলেন- এমন বৈঠক প্রায়ই হয়। তবে এবার সংখ্যায় একটু বেশী এবং তারা একসঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের পশ্চিমা বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা সরকারকে জানিয়েছেন শহীদুল আটকের বিষয়ে তাদের নিজ নিজ দেশের সিভিল সোসাইটি ও গণমাধ্যম খুবই উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তারা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে চলেছেন। দূতাবাসের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের কাছেও তারা তার মামলার বিষয়ে প্রায়শই জানতে চান।
তারা এ নিয়ে তাদের হেড কোয়ার্টারের বেশ চাপে আছেন বলেও জানান বিদেশি কোনো কোনো কূটনীতিক। তবে প্রায় সব কূটনীতিকই আন্দোলন চলাকালে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকদের ওপর হেলমেটধারী বাহিনীর আক্রমণের নিন্দা জানান। তারা এসব ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের অনুরোধ জানান। যদিও সরকারের তরফে ছাত্রদের ব্যাগ থেকে চাপাতি নিয়ে আক্রমণের সচিত্র তথ্য তুলে ধরা হয়। কূটনীতিকরা আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তার না করে সাধারণ ছাত্র এবং যারা শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল তাদের হয়রানির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এদিকে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়ি বহরে হামলার বিষয়েও জানতে চান ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে এ ঘটনা পরবর্তী সরকারের পদক্ষেপ বিষয়েই জানার আগ্রহ ছিল তাদের। এ নিয়ে এক কূটনীতিক বলেন- আলোচনায় বিষয়টি তুলেন ইউরোপের এক কূটনীতিক।
সম-সাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বিষয়টি আসে। এ নিয়ে আলাদা কোনো কথা হয়নি। পররাষ্ট্র সচিব কূটনীতিকদের বলেছেন- হামলার ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক। বিশ্বব্যাপী ‘বিদেশী বান্ধব বাংলাদেশ’ এর যে ঐতিহ্য ও সুনাম রয়েছে, এ হামলা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
সচিব প্রশ্ন রাখেন মোহাম্মদপুর এলাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নৈশভোজে যাওয়ার বিষয়টি কেন আগে থেকে পুলিশকে অবহিত করা হয়নি? যদিও পুলিশের ত্বরিত পদক্ষেপেই রাষ্ট্রদূত এবং তার সহযাত্রীরা নিরাপদে অক্ষত অবস্থায় প্রস্থান করতে পেরেছেন। সচিব এ-ও বলেন, একজন কূটনীতিকের গাড়িতে হামলা বরাবরই নিন্দনীয়। সরকার আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তদন্ত করছেন। খানিক অগ্রগতিও আছে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়ে সচিব কূটনীতিকদের বলেন, এ হামলার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের কেউই দায়মুক্তি পাবে না। উল্লেখ্য, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার পরবর্তী সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নিয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
সেখানে তিনিও পুলিশের তদন্ত চলছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে অবহিত করেছেন। রাষ্ট্রদূতকে ডেকে নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের এক কূটনীতিক এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তিনি বলেন- আমরা সব সময় স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি।
বৈঠকে অংশ নেয়া ইতালি, স্পেন ও ডেনমার্কের কূটনীতিকরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি সম্পর্কে  জানতে চান। জবাবে সচিব বলেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বাংলাদেশের কর্মকর্তারা রাখাইন ঘুরে এসেছেন। তারা মিয়ানমারের তরফে নেয়া প্রস্তুতির অগ্রগতিও দেখেছেন। তবে এটি দ্রুত বাস্তবায়নে এবং রোহিঙ্গাদের নির্ভয়ে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে অবশ্যই আন্তর্জাতিক চাপ ধরে রাখতে হবে।
প্রতিবছরের মতো এবারও রাজধানীর হাটে হাটে ভিন্ন ধাঁচের ও দামের কোরবানির পশু এসেছে। গাবতলীর হাটে এসেছে মরুভূমির জাহাজখ্যাত উট। তার নাম ‘জামাল’। এই উট কেনার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যাই বেশি। হাজারো গরুর মাঝে রয়েছে এই উট। ফলে এখানে মানুষের ভিড় একটু বেশি। হাট ঘুরে দেখা যায়, উৎসুক অনেকেই সেলফি তুলছেন, কেউ একনজর দেখার জন্য কাছে এসে উঁকি দিচ্ছেন। কেউ দাম জিজ্ঞেস করছেন।
আবার কেউ জানতে চাইছেন, কোন দেশ থেকে আনা হয়েছে? আমজাদ নামের এক বেপারি উটটির মালিক। তিনি  ভারতের রাজস্থান থেকে ‘জামাল’কে আনেন। প্রতিবছরই আনেন উট ও দুম্বা। মূলত কোরবানির বাজার উপলক্ষেই তার এই উটের ব্যবসা। গত বছর ব্যবসা ভালো যায়নি। তাই এবার একটি উট তুলেছেন হাটে। গত বছর কিনে আনার পর থেকেই উটটি রাখা হয়েছে গাবতলী হাটে। উটটির দাম হাঁকিয়েছেন ১৮ লাখ টাকা। আর দুম্বা দুটির দাম চাইছেন সাত লাখ টাকা।
আফতাব নগরে চমক হিসেবে উঠেছে কুষ্টিয়া থেকে আগত ‘বাদশা’। বিশালাকার এই গরুর মালিক মাহমুদ হাসান ২২ লাখ টাকায় বিক্রি করবেন বলে জানান। তিনি বলেন, এই গরু লম্বায় সাড়ে ছয় ফুট। এর পেছনে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। সাড়ে তিন বছর বয়স। এবার পরিণত হওয়ায় হাটে তুলেছি। এদিকে গাবতলীর হাটে ‘রাজা বাবু‘ নামের আরেকটি চমক নিয়ে এসেছেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার খাইরুল ইসলাম। সঙ্গে তার মেয়ে ইতিও রয়েছেন রাজা বাবুকে দেখভালের জন্য। তিন বছর দশ বছর বয়সী এই গরু লম্বায় ৬ ফুট ১০ ইঞ্চি। রাজা বাবুর মালিক এর দাম হাঁকাচ্ছেন ১৮ লাখ টাকা।
কোরবানির পশু শুধু যে দেশের মধ্যে বা পাশ্ববর্তী ভারত থেকে আসে তা নয়। বিশেষ কিছু ব্যক্তিরা কোরবানি দেন আমেরিকা থেকে গরু আমদানি করে। বিলাসী ক্রেতাদের জন্য এবার টেক্সাস থেকে বিমানে চড়িয়ে আনা হয়েছে ৭টি গরু। এসব ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে গরুগুলো আনা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা দিয়ে। গরুগুলো আমদানি করেছে সাদিক অ্যাগ্রো ফার্ম। সবচেয়ে বেশি দামে যে গরুটি বিক্রি করেছে সাদিক অ্যাগ্রো ফার্ম তার দাম ছিলো ২৮ লাখ টাকা। খামারের ম্যানেজার সুমন জানান, সাতটি গরুর সবগুলোই ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। এর মধ্যে বাহাদুর নামের সবচেয়ে বড় গরুটি বিক্রি হয়েছে ২৮ লাখ টাকায়। বাহাদুরের ওজন ১৫’শ কেজি আর লম্বায় ১০ ফুট। ১১’শ কেজি ওজনের আরেকটি গরু বিক্রি হয়েছে ২৫ লাখ টাকায়।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ অব্যাহতভাবে ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গারা আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছে, বেঁচে থাকার অন্য কোনও অবলম্বন না পেয়েই তারা ইয়াবা পরিবহনের মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। কুতুপালং আশ্রয় শিবিরের থাকা ইয়াবা পরিবহনে জড়িত একজন রোহিঙ্গা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানিয়েছে, অর্থের অভাবে ইয়াবা পরিবহন করলেও সে এই কাজ করতে চায় না। সে মিয়ানমারে ফিরতে চায়, যেখানে তার জমি আছে, সম্পদ আছে। সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গা ইয়াবা পরিবহনকারীর ভাষ্যে উঠে এসেছে কুতুপালং থেকে কক্সবাজারে ইয়াবা পরিবহনের তথ্য: সে কীভাবে ইয়াবা জুতায় ভরে পাহাড়ি পথ ধরে কক্সবাজার যায়, কোথায় চালান হস্তান্তর করে, কীভাবে আশ্রয় শিবিরের নিরাপত্তা কর্মীদের ফাঁকি দিতে কৌশল অবলম্বন করে ইত্যাদি।
যেসব মাদকের কারণে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার বাংলাদেশে মহামারির আকার ধারণ করেছে তার কেন্দ্রে এখন রয়েছে ‘মেথ পিল’ নামে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ইয়াবা। থাইল্যান্ডে ‘ক্রেজি মেডিসিন’ আখ্যা পাওয়া ইয়াবা প্রবল আসক্তিমূলক একটি দ্রব্য যা মেথাফেটামিন এবং ক্যাফেইনের সমন্বয়ে বানানো হয়। ট্যাবলেটগুলোতে চকোলেটের মতো রঙ ব্যবহার করা হয়। মিয়ানমার থেকে এসব ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার করা হয়। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মিয়ানমারে উৎপাদিত হওয়া এই মাদক পাচার রুখতে হিমশিম খাচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশ মনে করে মিয়ানমারে অন্তত ৫০টি মাদক উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। কক্সবাজার জেলায় কর্মরত সহকারী পুলিশ কমিশনার সাইফুল হাসান আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যখন পালিয়ে আশা শুরু করেছিল তখন আমরা তাদের খুব একটা চেক করতাম না। প্রথ দিকে ওই সুবিধা পাওয়ার কারণে বেশ কিছু ইয়াবা বাংলাদেশে ঢুকেছে।’ ইয়াবা পাচারের বিষয়ে কিছু এনজিওর পুলিশকে তথ্য দেওয়ার উদাহরণ থাকলেও সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কতিপয় এনজিওর নাম ব্যবহার করেও অপতৎপরতা চালায়। ইয়াবা পাচারের সূত্রে ৬০০ রোহিঙ্গাকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০ থেকে ৫০ পিস ইয়াবার জন্য ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা ৪৬ লাখ। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, ছয় বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৭ গুণ।
কিন্তু কেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে জড়িত হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তরে একজন ইয়াবা পাচারকারী আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘আমি বেঁচে থাকার অন্য কোনও পথ না পেয়ে ইয়াবা পাচার করি। আমাকে আমার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য এ কাজ করতে হয়। অর্থে অভাবে আমার পক্ষে সৎভাবে জীবনযাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইয়াবা পাচারকারী রোহিঙ্গার পূর্ণ নাম প্রকাশ না করে আল জাজিরা তাকে ‘এ’ হিসেবে সম্বোধন করেছে। এই প্রতিবেদনে তাকে ‘আলতাফ’ ছদ্মনামে সম্বোধন করা হবে।
গত বছর বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ ইয়াবা পাচারের দায়ে ৬৪৯ জনকে গ্রেফতার করেছে যার মধ্যে ১৫ জন মিয়ানমারের নাগরিক। কিন্তু আলতাফ ধরা পড়েনি। ৩৬ বছর বয়সী আলতাফ এক হাজার পিস ইয়াবা কুতুপালং আশ্রয় শিবির থেকে কক্সবাজারে পাচারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পায়। ইয়াবা পাচারে কীভাবে জড়িয়ে পড়েছিল আলতাফ? প্রথম যখন সে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নিতে গিয়েছিল তখন সেখানে থাই হয়নি তার ও তার পরিবাররে। তখন সে বাধ্য হয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। পরে যখন সে কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে পরিবারসমেত গিয়ে ওঠে, তখন দেখে সেখানে পানি ও থাকার মতো ঘরের প্রচণ্ড সংকট। খাবার অপ্রতুল; দিনে একবেলার মতো হতো। হাতে কোনও অর্থ ছিল না। তাদের যাছে এমন কি বিক্রি করার মতো কিছুও ছিল না।
প্রথমে আলতাফ একটি ছোট দোকান খুলতে চেয়েছিল। কিন্তু কেউ তাকে ঋণ দিতে রাজি না হওয়ায় সে দিকান দিতে পারেনি। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে শিবিরে ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত দলটির সঙ্গে দেখা করে সে। সেখানেই আলতাফ জানতে পারে কীভাবে ইয়াবা তৈরি হয়, পাচার হয়, খাওয়া হয় এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইয়াবার উৎপাদন খরচ খুব কম কিন্তু বিক্রি করে লাভ বেশি।
আলতাফ নিশ্চিত করেছেন, মিয়ানমারের কিছু নাগরিক বিশেষ করে বাংলাভাষী নাগরিক টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমারে প্রবেশ করে এবং মিয়ানমার থেকে ইয়াবা নিয়ে আবার বাংলাদেশে ঢোকে। তারপর সেগুলো দেওয়া হয় মাদক পরিবহনকারীদের হাতে। তাদের মাধ্যমে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে। এ বছরের শুরুতে বিষয়টি কেমনভাবে হয় তা দেখার জন্য আলতাফ পাচারকারীদের সঙ্গে রওনা হয়েছিলেন। তার সঙ্গে ২০ জনেরও বেশি পাচারকারী ছিল। আলতাফের ভাষ্য, ‘আমরা জানতাম কোন কোন চৌকিতে পুলিশ তল্লাসি করে। সুতরাং আমরা এক সঙ্গে না গিয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রওনা হয়েছিলাম। কেউ হেঁটে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ বা বাইসাইকেলে চড়ে মিয়ানমার সীমান্তের দিকে গিয়েছিলাম আমরা। মাইক্রবাস বা অটোরিকশায় করে গেলে নিশ্চিতভাবে তল্লাসি চালানো হতো।’
আলতাফের ভাষ্য, ইয়াবা পরিবহনের যে কাজে সে জড়িত, তা কোনও নিয়মিত কাজ নয়। কখনও সপ্তাহে এক বার কখনও ১৫ দিনে একবার বা কখনও কখনও তার চেয়ে বেশি সময়ে পর পর সে চালান নিয়ে যায়। ব্যবসা চাঙ্গা থাকলে মাসে আত থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করে সে। এসব টাকা খরচ হয়ে যায় ঋণ পরিশোধ, মুদি দোকানের বাকি পরিশোধ এবং চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহে খরচ হয়ে যায়।
কুতুপালং আশ্রয় শিবির থেকে কক্সবাজারে কীভাবে ইয়াবা পরিবহন হয় তার বর্ণনা দিয়েছে আলতাফ: প্রথমে পাচারকারীদের কেউ একজন আমার ঘরে বা ক্যম্পের ভেতরের দিকের কোনও এলাকায় ইয়াবার চালান হস্তান্তর করে। কোনও কোনও চালানে ১০০/২০০ পিস ইয়াবা থাকে। কোন কোনও চালানে সর্বোচ্চ এক হাজার পিস ইয়াবাও থাকে। এক হাজার পিসের মতো বড় চালান হলে কখনও জুতার মধ্যে আর কখনও পলিথিনে মুড়িয়ে বেল্টের নিচে করে পরিবহন করি। আর চালান ছোট হলে কাগজে মুড়িয়ে হাতে করেই নিয়ে যাই। হাতে ইয়াবার প্যাকেটটি রেখে তার ওপর মোবাইল ফোন রাখলে কেউ টের পায় না যে অন্য কিছু নিয়ে যাচ্ছি।
ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার চেয়ে ফিরে আসা সহজ। কারণ কুতুপালং শিবিরে সন্ধ্যার পরে শিবির থেকে বের হওয়ার বিষয়ে নিশেধাঙ্গা রয়েছে। সন্ধ্যার পর কাউকে শিবিরের বাইরে যেত দেখলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর ফলে আলতাফের জন্য কাজটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আলতাফের ভাষ্য, ‘আমি যখন ইয়াবা নিয়ে যাই, তখন মেরিন ড্রাইভের রাস্তা ব্যবহার করি না; পাহাড়ি পথ ধরে যাই। এরপর কক্সবাজার পৌঁছানো খুব সহজ। আমি শুনেছি ইয়াবা পরিবহনকারীদের অনেকে ধরা পড়েছে। কারণ তারা ঠিক মতো বাংলা বলতে পারে না। কিন্তু আমি সবসময়ই বেঁচে গেছি। কক্সবাজার পৌঁছে পূর্বনির্ধারিত স্থানে ইয়াবা হস্তান্তর করি আমি। সাধারণত বিমানবন্দর এলাকার কাছে অবস্থিত বাহারছড়া ও ফিশারি ঘাটে চালানটি বুঝিয়ে দেই।
কাজ শেষে টেকনাফ থেকে বাসে করে সে ফেরত যায় কুতুপালংয়ে। শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের প্রশ্নের মুখে পড়লে যাতে জাবাব দিতে পারে সেজন্য সে তার সঙ্গে কিছু জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যায়। দেরিতে শিবিরে ফেরা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আলতাফের ভাষ্য, ‘সঙ্গে জিনিসপত্র কিনে নিয়ে গেলে আমি বলতে পারি, আমার কিছু জরুরি জিনিসপত্র কেনার দরকার ছিল।’
আল জাজিরা লিখেছে, আশ্রয় শিবিরে চারশ থেকে পাঁচশ ইয়াবা পরিবহনকারী আছে। কিন্তু তারা নিজেরাও নিজেদের সবাইকে চেনা না। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মাদক ব্যবসায়ীরা এই ব্যবস্থা করেছে। আলতাফের ভাষ্য, ‘আমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত নই। যদি হতাম, তাহলে পুলিশের নজর পড়ত আমাদের ওপর এবং তারা খুব সহজকেই চিহ্নিত করে আমাদের গ্রেফতার করতে পারত।’
নিরাপত্তা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়ে আলতাফের ভাষ্য, ‘আমি বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার বিষয়ে শুনেছি। জেলে যাওয়ার বিষয়েও আমি জানি। ভীতি আমাদের সবার মনেই আছে। কিন্তু আমি কি করতে পারি? আমার যদি টাকা থাকত তাহলে আমি এই কাজ করতাম না।’
মিয়ানমারের ফিরে যেতে ইচ্ছুক আলতাফ বলেছে, ‘প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা হলে আমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। এখানে আমরা আটকে পড়েছি। মিয়ানমারে আমাদের জমি আছে, সম্পদ আছে। আমরা সেখানে কৃষিকাজ করতে পারব। এখানে তো একটা মুরগিও পালন করা যায় না।’
প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সবাই ছুটছে যার যার গন্তব্যে। বাস, ট্রেন-লঞ্চে করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। গতকাল সকাল থেকেই বাস-লঞ্চ টার্মিনাল রেল স্টেশনে ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। বাড়তি মানুষের চাপে সড়কে কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে যানজট। আবার ভাঙা ও বৃষ্টির কারণে কর্দমাক্ত সড়কে কিছুটা দুর্ভোগ  পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। ঈদ যাত্রায় পথে পথে দুর্ভোগে পড়লেও মানুষের চেহারায় ছিল বাড়ি ফেরার আনন্দ। গতকাল মহাসড়কে কোথাও কোথাও যানজটের কবলে পড়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের। ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের।
সরজমিন কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা যায়, সকাল থেকেই মানুষ আর মানুষ। ব্যাগ, লাগেজ হাতে নিয়ে সবাই ছুটছেন কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের দিকে। তবে ট্রেন ছাড়তে দেরি হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। উত্তরবঙ্গের চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৮টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও ১০টা ৪৫ মিনিটেও প্ল্যাটফরমে দাঁড়ানো ছিল। পুরো ট্রেন জুড়েই যাত্রীতে ঠাসা, পা ফেলার জায়গাটুকুও নেই। ট্রেনটি বিলম্বে আসার কারণে আগে থেকেই প্ল্যাটফরমে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। ট্রেন প্ল্যাটফরমে বিলম্বে পৌঁছানোর পরই যাত্রীদের হুড়োহুড়ি।
মানুষের ভিড় ঠেলে তখন সবার  ট্রেনে ওঠার চেষ্টা। নিমিষেই ট্রেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কেউবা ভিড় ঠেলে গেট দিয়ে ভেতরে উঠছেন, যারা পারেননি তাদের কেউবা জানালা দিয়ে প্রথমে ব্যাগ, পরে পরিবারের সদস্যদের ট্রেনের ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, এরপর নিজেও উঠছেন ওই জানালা দিয়েই। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ট্রেনের ছাদেও ফাঁকা নেই। পুরো ট্রেনের ছাদ জুড়ে মানুষ আর মানুষ।
ঈদযাত্রার তৃতীয় দিন গতকাল  কমলাপুর স্টেশনের এমনই দৃশ্য চোখে পড়ে। গত ১০ই আগস্ট যারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পর অগ্রিম টিকিট পেয়েছিলেন, তারাই গতকাল ট্রেনযোগে ঢাকা ছাড়ছেন। ঈদ এলেই টিকিটপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে বাড়ি পৌঁছা পর্যন্ত পথে পথে ভোগান্তি পোহাতে হয় ঘরমুখো মানুষের। তবুও ঘরে ফেরাতেই যেন সব আনন্দ। নীলসাগর ট্রেনের যাত্রী  কামরুল হাসান বলেন, সকাল ৮টার ট্রেন এটি, ১০টা ৪০ মিনিটেও ট্রেনটি স্টেশনই আছে।
২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিলম্বেও ট্রেনটি ছাড়তে পারেনি। হাজার হাজার মানুষ স্টেশনে বিরক্তি ভোগান্তি-বিড়ম্বনার মধ্যে আছেন। এই ট্রেনের অগ্রিম টিকিটের জন্য ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটেছেন। অথচ ঈদযাত্রা দিন আবার ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লেটেও ট্রেন ছাড়েনি। মানুষের তো ভোগান্তির একটা সীমা আছে! শুধু নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনই নয়; রোববার ঈদযাত্রার তৃতীয় দিনেও সকাল থেকেই বেশ কয়টি ট্রেন দেরিতে এসে দেরিতে ছেড়ে গেছে। এ ছাড়া সকাল ৯টায় কমলাপুর স্টেশন থেকে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বেলা ১১টাতেও স্টেশনেই পৌঁছায়নি ট্রেনটি।
দিনাজপুরগামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকলেও বেলা ১১টাতে ছেড়ে যায়নি ট্রেনটি, অথচ শিডিউল অনুযায়ী ট্রেনটি সকাল ১০টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীরা বলেন, এই ক্ষোভ কাকে জানাব, এই ভোগান্তির কথা কাকে বলব? রংপুর এক্সপ্রেস টেনটি সকাল ৯টায় ছাড়ার কথা অথচ ১১টা ১৫ মিনিটেও স্টেশনে আসেনি।
স্ত্রী-ছোট সন্তানসহ আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবো? গত ১০ই আগস্ট ১৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে আজকের টিকিট পেয়েছিলাম কিন্তু আজকের ভোগান্তিটা আরো বেশি, কারণ সঙ্গে আছে স্ত্রী, ছোট  সন্তান। রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস সকাল ৬টায় কমলাপুর ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছেড়ে যায় ৭টার পর। খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছেড়ে যায় সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে।
ঈদ স্পেশাল ট্রেন ৯টা ১৫ মিনিটে স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বেলা ১১টা ২০ মিনিটেও ছেড়ে যায়নি। ট্রেনের এমন বিলম্ব বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ট্রেনগুলো দেরিতে কমলাপুর স্টেশনে আসার কারণে ছেড়ে যেতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। ঈদের সময় যাত্রীর চাপ থাকায় ট্রেনে ধীরগতি থাকে, আবার সব স্টেশনে দুই/এক মিনিট বেশি সময় প্রয়োজন হয় যাত্রী ওঠানামার জন্য। তবুও আমরা সবসময় চেষ্টা করছি যাতে কোনো ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় না হয়। কমলাপুর স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, রোববার মোট ৬৮টি ট্রেন ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এর মধ্যে ৩১টি আন্তঃনগর, ৪টি ঈদ স্পেশাল, বাকি ট্রেনগুলো লোকাল ও মেইল সার্ভিস।
এদিকে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে অগ্রিম টিকিট কিনেও বাসের জন্য বসে ছিলেন যাত্রীরা। সমস্যা হতে পারে এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে টার্মিনালে আসেন তারা। গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সূত্র জানায় যায়, ঘরমুখো মানুষের চাপ ছিল। বিভিন্ন রুটের যাত্রীর কাউন্টারে কাউন্টারে ভিড় ছিল। কাঙ্ক্ষিত সময়ের বাস আসার অপেক্ষা করছিলেন তারা। ভোর বেলা থেকে বিভিন্ন রুটের বাস যথাসময়ে ছেড়ে গেছে।
তবে কিছু বাস দেরিতে ছাড়ার এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। গাবতলীর হানিফ, এসআর, নাবিল, শ্যামলী ছাড়াও প্রত্যেকটি কাউন্টারেই বেশ ভিড় ছিল। অন্যদিকে সকাল থেকেই আস্তে আস্তে সদরঘাটে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবার-পরিজন নিয়ে লঞ্চযাত্রীরা আগেভাগেই ঘাটে পৌঁছান। কাঙিক্ষত লঞ্চের অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করেন টার্মিনালে। বরিশালাগামী যাত্রী  রাইসুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় বাড়ি যেতে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। তারপরেও বাবা-মা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদে বাড়ি থাকলে আনন্দের কমতি থাকে না। ঘাটে কোনো লঞ্চ না পেয়ে যাত্রীরা টার্মিনাল থেকে নৌকাযোগে নদীর মাঝখানে নোঙর করে রাখা লঞ্চে উঠেন। পল্টুনে আসার আগেই নদীর মাঝখানেই লঞ্চগুলো পরিপূর্ণ হয়ে যায়। কিছু কিছু লঞ্চে ছাদে উঠে বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা।
সোমবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, লিরার বিরুদ্ধে চলা ষড়যন্ত্র দেশটির সার্বভৌমত্ব বা আজানের বিরুদ্ধচারনের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়! লিরা সংকটের মূল উদ্দেশ্য ‘তুরস্ক ও তুর্কি জনগণকে পদানত করা, পরাজিত করা।’ বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দুইটি আন্তর্জাতিক আর্থিক রেটিং সংখ্যা তুরস্কের রেটিং নিচে নামিয়ে দিয়েছে, যার অর্থ দেশটিতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় অনিবার্য।
দীর্ঘ সময় ধরে ডলারে ঋণ নেওয়ার পর এখন সেসব ঋণ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য নেই তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর। দেশটির মুদ্রা লিরা দ্রুত মূল্য হারাচ্ছে। ফলে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। অবস্থা সামাল দিতে এরদোয়ান দেশবাসীকে ডলার বিক্রি করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন পণ্য বয়কটেরও। এদিকে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তুরস্ক সন্ত্রাসের অভিযোগে যে খ্রিস্টান ধর্মযাজককে গ্রেফতার করেছে তার মুক্তি দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই ধর্মযাজককে গ্রেফতার করায় তুর্কি স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন। তার ওপর তুর্কি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ওপর বর্ধিত হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আল জাজিরা তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছিল, আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা তুর্কি অর্থনীতি ঝাঁকুনি খেয়েছে মার্কিন সিদ্ধান্তে।
ঈদ উপলক্ষে টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে এরদোয়ান বলেছেন, ‘লিরার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তা আমাদের পতাকা বা আজানের বিরুদ্ধে হওয়া হামলার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। এর উদ্দেশ্য একই। লিরা সংকটের মূল লক্ষ্য, তুরস্ক ও তুর্কি জনগণকে পদানত করা, পরাজিত করা। কিন্তু যারা মনে করে লিরার বিনিময় হার নিয়ে ষড়যন্ত্র করে তারা সফল হবে, খুব তাড়াতাড়িই তারা তাদের ভুল বুঝতে পারবে।’ এ সময় এরদোয়ান সরাসরি কোনও দেশ বা সংস্থার নাম উচ্চারণ করেননি। কিন্তু রয়টার্স লিখেছে, আগে তিনি লিরা সংকটের জন্য পশ্চিমা রেটিং সংস্থা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেছিলেন।
ডলারের বিপরীতে লিরার মান আজ বেড়েছে। কিন্তু এখনও ডলারের সঙ্গে লিরার বিনিময় হার ৬.১। অথচ ২০১১ সালে  ডলারের বিপরীতে লিরার বিনিময় হার ছিল ১.৯! লিরার দরপতনের কারণে রেটিং এজেন্সি মুডিস এবং স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর তুরস্কের রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। নেদারল্যান্ডের রাবোব্যাংকে কর্মরত বাজার বিশেষজ্ঞ পিওটর মাতিস মন্তব্য করেছেন, রেটিং সংস্থাগুলোর এই রেটিং কমিয়ে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাদের বিবেচনায় তুরস্কের অর্থনীতির গতি হারাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং লিরার দরপতন দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতার পক্ষে উদ্বেগজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খানের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। প্রথম পর্ব নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। গত পর্বে আমরা ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গের অবতারণা করে আসর গুটিয়ে নিয়েছিলাম। বলেছিলাম যে, বর্তমান বিশ্ববাস্তবতা এবং সময়ের দাবি মোতাবেক তেলনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে নতুন নতুন খাত নির্ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে ইরান। যাই হোক আজকের পর্বেও আমাদের সঙ্গে থাকছেন ড. সিদ্দিকুর রহমান খান।
বন্ধুরা! ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইরান বর্তমানে একটি সফল দেশ। রপ্তানি খাতে ইরানের অর্জন উল্লেখ করার মতো। ইরানের শীর্ষ দশ শ্রেণির রপ্তানি পণ্যসামগ্রীর তালিকায় প্রথমেই রয়েছে তেলসহ খনিজ জ্বালানি। মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগই অর্জিত হয় এ খাত থেকে। ইউরোপের বাজারেও ইরানের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগে ইরানের বৈচিত্র্য আনার ক্ষমতাও রয়েছে যথেষ্ট। গত বছর ২২টি বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তি করতে সমর্থ হয় ইরান। ইতোমধ্যে দেশটির পানি ও বিদ্যুত খাতে ৮ বিলিয়ন ডলারের অধিক বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট স্থিতিশীল বলে ইউরোপ, চীন, আমেরিকা,আফ্রিকা, ভারতসহ লাতিন আমেরিকার দেশগুলো দেশটিতে বিনিয়োগে ছুটছে। ড. সিদ্দিকের ভাষ্য শোনা যাক:       
তেল সম্পদের বাইরেও বিভিন্ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান এবং সফলও হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। যেমনটি ড. সিদ্দিক বললেন। আসলে বিপ্লব বিজয়ের পর থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে ইরান। বিপ্লব-পূর্ব সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে ইসলামের চেতনায় ঐশী আলোয় আলোকিত হয় ইরান। বলাবাহুল্য ইরান ইতোমধ্যেই পৃথিবীর সচেতন ও আলো প্রত্যাশী মানুষকে আরো বেশি সত্য ও সুন্দরের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে ইরান এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত হয়।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ এবং শিক্ষাবিদ ড. সিদ্দিকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ইরানের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে। তিনি বললেন:
শিক্ষাক্ষেত্রে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থানে রয়েছে। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে যেসব বৈশিষ্ট্য কাজ করেছে তা হচ্ছে শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি। ইসলামি শিক্ষা-দর্শনের ভিত্তিতে দেশের প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি রেখে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ফলে ইসলামি দর্শনের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি এখন এককথায় বিস্ময়কর। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নানা রকমের বাধা-বিপত্তি,পাশ্চাত্যের অসহযোগিতা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত ইরানি বিজ্ঞানীরা চরম আত্মত্যাগ ও সাধনার পরিচয় দেয়ায় দেশটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক উন্নতি ও সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৭ ‘হাইলি সাইটেড রিসারচারস’ শীর্ষক তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ইরানি বিজ্ঞানীরা। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে রয়েছে ইরান।
মহাশূন্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সক্ষম দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান নবম এবং মহাকাশযানে প্রাণী পাঠানোর ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ষষ্ঠ। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এর সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে ইরানে বিগত দু’দশকে বায়োটেকনোলজি বিষয়ে লক্ষণীয় উন্নতি সাধিত হয়েছে।
ভ্যাকসিন উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যে ১ম। স্টেমসেল গবেষণার ক্ষেত্রে ইরান প্রথম সারির ১০টি দেশের মাঝে অবস্থান করছে। স্টেমসেল রিপ্লেস করার ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান দ্বিতীয়। হাড়,হার্টভাল্ভ ও ট্যানডন রিপ্লেস করার ক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান তালিকার শুরুর দিকে। ন্যানোটেকনোলজি খাতে ইরানের প্রবৃদ্ধি বিস্ময়কর।
বিদ্যুৎ,জ্বালানি খাত এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানেও একইরকমভাবে  সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।গত প্রায় চার দশকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইরানের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ইরানের নাম এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যাধুনিক ও জটিল। ইরানি বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত জরুরি এ ক্ষেত্রে দর্শনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। ইরানি বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী মৌলিক কোষ তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় ইরান এ ক্ষেত্রে বিশ্বের ৫টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। ক্যান্সার চিকিৎসায়ও ইরানি বিজ্ঞানীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। বর্তমানে এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে মেডিক্যাল ট্যুরিজম ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় ইরানের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে।
একইভাবে শিল্প ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও ইরানের অগ্রগতি থেমে নেই। সংস্কৃতি মানুষের জীবনবোধ বিনির্মাণের কলাকৌশল। এটি মানুষের জীবনের একটি শৈল্পিক প্রকাশ। ইসলাম সুস্থ ও মানবিক চিন্তার বিকাশের পথে সাংস্কৃতিক চর্চার বিরোধী তো নয়ই,বরং সংস্কৃতির উন্নত সংস্করণ উপহার দিতে সক্ষম- এটাই প্রমাণ করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।  এ বিষয়ে ড. সিদ্দিকুর রহমান বললেন:
সংস্কৃতির উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবতার কথাটিও বলা যায়। ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে,বিশ্বমানবতা ও বিশ্ব-মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ করার অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বর্তমান অর্জনের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আজ বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের অনন্য মডেল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
নাইজেরিয়ায় সিঙ্গেল মেয়েরা কষ্টে আছেন। তারা বাড়ি ভাড়া পাচ্ছেনা। নাইজেরিয়ার অনেক বাড়ির মালিক সন্দেহ করেন একা মেয়ে মানেই যৌনকর্মী। যার ফলে একা থাকা মেয়েদের পক্ষে বাসা ভাড়া পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিবিসি বাংলা এ রিপোর্ট দিয়েছে।  নুফানমিলোলার বয়স ৩০। পেশাজীবনে ইতোমধ্যে সফলতা পেয়েছেন তিনি। খুব সহজেই তিনি একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে বাসা খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ঠাঁই হয়েছে এক বান্ধবীর বাসার সোফা। ভালো একটা চাকরি পেয়ে সে লেগোস থেকে আবেওকুটা তে চলে আসে। আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার পরেও মধ্যবিত্ত বা একটু বিত্তবানদের এলাকাতে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে পারেননি। কারণ একটাই তিনি একা থাকবেন ওই বাসাতে। অনুফানমিলোলা বলছিলেন প্রথম যে প্রশ্ন আমাকে শুনতে হয়- সেটা হল আমি কি বিবাহিত? আমি বলি না,তারপর প্রশ্ন করা হয় কেন আমি বিয়ে করিনি। আমি বিভ্রান্ত হই। একটা বাসা ভাড়া নেয়ার সাথে বিয়ের কী সম্পর্ক? উত্তর আসে আমরা ভদ্র লোককে বাসা ভাড়া দিতে চাই। অনুফানমিলোলা বলছিলেন, এই বৈষম্য ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। বিবিসিকে তিনি বলেন " ৯৯% বাড়ির মালিক যাদের সাথে আমি সাক্ষাত করেছি, তারা কেউ আমাকে বাসা ভাড়া দেয়নি। কারণ আমি একা নারী। অনেক মালিক এবং এজেন্ট আমাকে বলেছে তুমি কি তোমার পুরুষ-সঙ্গী বা স্বামীকে আনতে পারবে? এই ধরণের অ্যাপার্টমেন্টে আমরাই চাই না কোন পুরুষ আসুক, আমরা চাই একজন ভদ্র মানুষকে ভাড়া দিতে।
সিলভিয়া রিটেইল সেক্টরের একজন প্রডাক্ট ম্যানেজার। ৩১ বছরে তার বাগদান হয়। কিন্তু প্রতি বাড়িওয়ালা তাকে বলেন আগে তার হবু স্বামীকে আনতে হবে তারপর তারা অ্যপার্টমেন্ট দেখাবে। নাইজেরিয়াতে একটা কথা প্রচলিত আছে 'স্মল গার্ল, বিগ গড'। এই কথার অর্থ অনেকটা এমন, যারা সিঙ্গেল মেয়ে তাদের অর্থের যোগানদাতা বেশির ভাগই হয় বৃদ্ধ লোক। সিলভিয়া বলছিলেন, বাড়ির মালিকরা মনে করেন বেশির ভাগ তরুণী যারা একা থাকে তারা ওইরকম। কোলম্যান ওয়াফোর একটি বাড়ির মালিক এবং বেশ কিছু সম্পত্তির মালিক। তিনি বলছিলেন, তিনি এক্ষেত্রে বৈষম্য করেন না। কিন্তু তার বেশির ভাগ ভাড়াটিয়া এবং ক্রেতাই পুরুষ। কারণ তাদের তুলনামূলক বেশি অর্থ আছে। তিনি বিবিসিকে বলেন "বেশির ভাগ একা মেয়েরা হয় তাদের বাবা মা অথবা পুরুষসঙ্গীর ওপর  নির্ভরশীল। প্রতিটা বাড়িওয়ালা চান কোন ঝামেলা ছাড়া মাসের ভাড়া পাবে আর সময়মত কন্ট্রাক্ট নবায়ন করবে। তিনি বলছিলেন, বেশির ভাগ একলা মেয়ে কোন কাজ করে না। এখানে  মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের জন্য কাজের সুযোগ বেশি। এটাই এখানকার পরিস্থিতি।
পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন তার ক্রিকেট জীবনের সতীর্থ সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার নভোজিৎ সিং সিধু। শপথ অনুষ্ঠানে সিধুকে আলিঙ্গন করেছেন ইমরান খান, সেই সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াও। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, সিধুর সঙ্গে বাজওয়ার হওয়া কথোপকথনের বিষয়ে আগ্রহী অনেকেই। সিধুকে কী বলেছিলেন বাজওয়া? সিধু নিজেই জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের সদিচ্ছার কথা তার কাছে উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান। পাশাপাশি পাকিস্তানে অবস্থিত শিখ তীর্থস্থানে ভারতীয়দের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে দেশটির আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি সিধুকে।
গত মাসের ২৫ তারিখ পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল নির্বাচন। তাতে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পেয়েছিল সবচেয়ে বেশি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন না পেলেও তারা জোট গঠন করে পাকিস্তান মুত্তাহিদা মজলিসের সঙ্গে। গত শনিবার ইমরান নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের বেশ কয়েক জন সাবেক ক্রিকেটার। আর বড় আকর্ষণ হিসেবে সেখানে হাজির হয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটার নভোজিৎ সিং সিধু, যিনি নেজে এখন পাঞ্জাব থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসের সংসদ সদস্য। ইমরান অবশ্য শুধু সিধুকে নন সুনীল গাভাস্কার ও কপিল দেবকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন শুধু সিধু।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে দেওয়া ভাষণে ইমারন খান বলেছিলেন, ভারত সুসম্পর্কের জন্য এক পা আগলে তার সরকার দুই পা আগাবে।ভারতের প্রতি পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে ইমরান দায়িত্ব নিলে, এমন আশাবাদের কথা সিধু আগেই বলেছিলেন। এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ইমরান ভালো কিছুর দিকেই আগাবেন। আর ভালো যেকোনও কিছু খারাপ যেকোনও কিছুর চেয়ে গ্রহণযোগ্য।’ শপথ অনুষ্ঠানে সিধুকে বসানোর ব্যবস্থা করানো হয়েছিল একেবারে সামনের সারিতে, পাকিস্তানের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে। সেখানে ইমরান সিধুকে জোরে জড়িয়ে ধরেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান।
সামনের সারিতে বসা সব রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানরা এক এক করে শুভেচ্ছা বিনিময় করছিলেন। একসময় বাজওয়া উপস্থিত হন সিধুর সামনে। সেখানে তিনি সিধুকে আলিঙ্গন করেন। বাজওয়া সিধুকে বলেন, ‘আমি একজন জেনারেল, যে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিল।’ তদের আলাপ এরপর সিরিয়াস বিষয়ের দিকে যতে শুরু করে। সিধুর জবানিতে এনডিটিভি জানিয়েছে জেনারেল কামার বাজওয়ার ভাষ্য, পাকিস্তান শান্তি চায়। ২০১৯ সালে শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকের ৫০০ তম জন্মদিনে পাকিস্তানে অবস্থিত কারতারপুরে ভারতীয়দের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে পাকিস্তান।
শিখ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, কারতারপুরের শিখ তীর্থস্থানটিতে গুরু নানক তার জীবনের শেষ সময় অতিবাহিত করেছেন। শিখরা অনেক দিন ধরেই ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন, যেন তারা কারাতপুরে যাওয়ার বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করেন। তীর্থস্থানটিতে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পাকিস্তান ও ভারত ১৯৯৮ সালে সমঝোতায় উপনীত হয়েছিল। কিন্তু তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
এনডিটিভি লিখেছে, পাকিস্তানের শান্তি প্রত্যাশার ঘোষণাকে ভারত গুরুত্বে সঙ্গে নেয় না। ভারতের ধারণা, পাকিস্তানের এসব বক্তব্য লোক দেখানো। তবে গুরু নাকের স্মৃতিবিজড়িত কারতারপুরের তীর্থস্থানটিতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে নভোজিৎ সিং সিধু বলেছেন, ‘এটা একটা স্বপ্ন সত্য হওয়ার মতো বিষয়। এটা একটা পরিবর্তন এবং যে কোনও পরিবর্তনই আশা জাগানিয়া। আশা অদৃশ্যকেও দেখতে পায়, অসম্ভবকেও জয় করতে পারে।’ কামার বাজওয়া সিধুকে শেষে বলেছেন, ‘আমরা আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা করব।’ সিধুর প্রত্যাশা, সম্পর্কের উন্নয়নে ভারত এক কদম আগাবে।
সিধুর পাকিস্তান সফর নিয়ে ভারতে বিজেপির রাজনীতিবিদরা সমালোচনা করেছেন। হরিয়ানার আনিল ভিজ বলেছেন, পাকিস্তানি আমন্ত্রণ গ্রহণ করাটা ‘অবিশ্বস্ততার’ পরিচায়ক! বিজেপির নেতা সম্ভিত প্যাটেল মন্তব্য করেছেন, সিধুর ইমরান খানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাকিস্তান যাওয়াটা ‘লজ্জাজনক কাজ।’ পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা দরকার বোঝাতে সিধু হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘যোগাযোগের অভাবে বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়া তুরস্কের প্রতি সংহতি জানিয়ে তুর্কি মুদ্রা লিরা কিনছেন পাকিস্তানিরা। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে ‘বাই লিরা’ বা ‘লিরা কিনুন’ শীর্ষক তিনদিনের এক ক্যাম্পেইনের ডাক দিয়েছেন দেশটির রাজনীতিক, সুশীল সমাজ ও সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাক্টিভিস্টরা। শনিবার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি।
ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে রাজধানী ইসলামাবাদ, করাচি, লাহোরসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে লিরা কিনছেন পাকিস্তানিরা। দেশটির রাজধানীতে এ ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে বড় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় ইসলামাবাদ প্রেস ক্লাবে। পাকিস্তানি রাজনীতিক ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টরা যৌথভাবে এর আয়োজন করেন।
রাজনীতিক কাজী হুসাইন আহমেদের পুত্র ড. আসিফ লুকমান কাজী বলেন, পাকিস্তানি ও তুর্কিরা একই জাতি। তুরস্ক সবসময়ই পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে গেছে। এখন তাদের আমাদেরকে প্রয়োজন। আমরাও তাদের পাশে আছি।
তিনি বলেন, তুর্কি লিরা সংগ্রহ এবং তুরস্কের পণ্য কেনার এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
আজাদ কাশ্মিরের এমপি আবদুল রাশিদ তুরাবি বলেন, তুরস্কের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি জানাতে আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি। প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব আইন অনুযায়ী কাজ করার অধিকার রয়েছে। অন্য দেশের ওপর হস্তক্ষেপের অধিকার কোনও দেশের নেই। সার্বভৌমত্ব রক্ষার সব অধিকার তুরস্কের রয়েছে।
স্থানীয় মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ২০০ তুর্কি লিরা কিনেছেন করাচির স্মল ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হামিদ। তিনি বলেন, তুর্কি জনগণকে তাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে তাদের নিজেদের একা ভাবার কোনও কারণ নেই। পাকিস্তানের জনগণ তাদের পাশে আছে।
পাকিস্তানের পাশাপাশি তুর্কি লিরা কিনছেন কাতারি নাগরিকরাও। সংকট উত্তরণে গত ১৫ আগস্ট তুরস্কে এক হাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। ওই ঘোষণার পর আঙ্কারায় নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত সালিম বিন মুবারাকা আল শাফি বলেন, ‘২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় যেমন কাতার তুরস্কের পাশে ছিল, তেমন করে ভবিষ্যতেও তুর্কি ভাইদের পাশে থাবে কাতার। তুরস্ককে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বের করে আনতে কাতারের নাগরিকরা প্রচুর পরিমাণে তুর্কি লিরা কিনেছে।’
এদিকে শনিবার দলীয় এক অনুষ্ঠানে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, যারা আমাদের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে চায় তাদের কাছে তুরস্ক আত্মসমর্পণ করেনি এবং করবেও না। আমরা তাদের খেলা দেখবো এবং তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবো।
রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, থেরেসা মে এবং হাসান রুহানি
পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী যুক্তরাজ্য, চীন, তুরস্ক ও ইরান। শনিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় নিজ নিজ দেশের এমন অবস্থানের কথা জানান দেশগুলোর নেতারা। তারা আশাবাদ জানিয়েছেন, ইমরানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পিটিআই নেতা ইমরান খানের শপথগ্রহণের পর থেকেই আসতে শুরু করে বিশ্বনেতাদের ফোন ও শুভেচ্ছা বার্তা। এ তালিকায় রয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানিসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ফোনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সঙ্গে কথা বলেছেন ইমরান খান। ওই ফোনালাপের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দফতর ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, নির্বাচনে জয় এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় ইমরান খানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে থেরেসা মে বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগেছে। যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দুই দেশের একসঙ্গে করার মতো প্রচুর কাজ রয়েছে।
ফোনালাপে শিগগিরই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ব্যপারে একমত হন দুই নেতা।
ইমরান খানকে পাঠানো এক চিঠিতে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান তার সফলতা কামনা করেছেন।
চিঠিতে এরদোয়ান বলেন, আমি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও সমৃদ্ধ হবে; যা দুই দেশের জনগণের জন্য কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে আসবে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, তুরস্কের সংকটকালে আপনি যে সংহতি প্রদর্শন করেছেন তাতে আমাদের দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস, আপনার সৎ নেতৃত্ব তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়ক হবে।
শনিবার ইমরান খানকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখা এক চিঠিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। ইসলামাবাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে তেহরান প্রস্তুত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শপথগ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে ইরান যাবেন ইমরান খান। এরপর তিনি সৌদি আরব সফর করবেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট লি কেকিয়াং ইমরানকে অভিনন্দন জানিয়ে দেওয়া বার্তায় বলেছেন, চীন ও পাকিস্তান সব সময়ের বন্ধু। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও উভয়দেশের সম্পর্ক ছিল ভালো ও স্থিতিশীল। চীন-পাকিস্তান উন্নয়ন সম্পর্ক নিয়ে ইমরানের ইতিবাচক মন্তব্যেরও প্রশংসা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র হেদার নোয়ার্ট নিজের অফিসিয়াল টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শপথগ্রহণকে স্বীকৃতি দেই এবং তাকে স্বাগত জানাই। পাকিস্তান এবং এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য নতুন বেসামরিক সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য অপেক্ষা করছে ওয়াশিংটন।
এছাড়া সম্প্রতি পাকিস্তানে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সি দেদভ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ইমরানের কাছে। ওই বার্তায় পুতিন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। সূত্র: ডন।
দখলকৃত সীমানায় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য নতুন প্রস্তাব দিয়েছে জাতিসংঘ। সাধারণ পরিষদের অনুরোধে সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া এক প্রতিবেদনে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে রয়েছে দখলকৃত এলাকায় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সুরক্ষা জোরালো করতে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর খসড়া। প্রস্তাবে অন্যান্য বিকল্পের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের অধীনে বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিবেদনটি বিতরণ করেছে জাতিসংঘ। তবে প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। আর সুরক্ষা বাহিনী গঠনে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের দরকার হবে। ইসরায়েলের আপত্তির কারণে তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে ‘গ্রেট রিটার্ন অব মার্চ’ কর্মসূচি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় ১৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এরপর সমস্যার সমাধানের জন্য প্রস্তাব দেওয়ার জন্য মহাসচিবকে অনুরোধ জানায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ১৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় চারটি সম্ভাব্য বিকল্পের খসড়া প্রস্তাব করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এতে ফিলিস্তিনিদের জন্য সহায়তা বাড়ানো থেকে শুরু করে জাতিসংঘের অধিকার পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং জাতিসংঘের অনুমোদনে পুলিশ ও সেনা মোতায়েন বা নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরানোর ঘোষণা দেন। এরপরই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একক উদ্যোগ মেনে নেবে না তারা। তাই শান্তি উদ্যোগের ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতার মধ্যেই ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় নতুন প্রস্তাব দিল জাতিসংঘ। বেশ কয়েক বছর আগে সর্বশেষ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তিগুলো এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শান্তি প্রক্রিয়া ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে ওই পরিকল্পনা সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প এই পরিকল্পনাকে শতাব্দীর সেরা চুক্তি আখ্যা দিলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, চুক্তিতে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বানানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি ভবিষ্যত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক রবার্ট ফিস্ক পরিকল্পনাটি সম্পর্কে বলেছেন, টাকার বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের অধিকার কিনতে চাইছেন ট্রাম্প। জাতিসংঘ কূটনীতিকরা মার্কিন শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলতে শুরু করেছেন, ওই পরিকল্পনা চিরদিন অসম্ভব হয়েই থাকবে।
এদিকে জাতিসংঘের নতুন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে শুক্রবার (১৭ আগস্ট) বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি দূত ড্যানি ড্যানোন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের কাছ থেকে ফিলিস্তিনি জনগণকে রক্ষার উপায় দেখানোর পরিবর্তে জাতিসংঘের উচিত নিজেদের জনগণকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে থাকা ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকেই দায়বদ্ধ রাখা।’ তিনি বলেন, প্রতিবেদনে দেওয়া পরামর্শগুলো শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের অব্যাহত বর্জন তত্ত্বকেই সক্রিয় করবে।
জাতিসংঘের অধীনে কোন সুরক্ষা বাহিনী গঠন করতে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের দরকার পড়বে। তবে ইসরায়েলের আপত্তি রয়েছে এমন প্রস্তাব তাদের মিত্ররাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র নিজের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে আটকে দিতে পারে।
শুক্রবার ফিলিস্তিনি জাতিমুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডলইস্ট আই’কে বলেন, ফিলিস্তিনি অঞ্চল থেকে সব ধরনের হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইসরায়েল গাজা উপত্যকার সব ক্রসিং খুলে দেওয়া ও উপত্যকাটি থেকে সাইপ্রাস পর্যন্ত সমুদ্র পথে প্রবেশাধিকারের প্রস্তাব দিয়েছে। মিসরীয় মধ্যস্থতার এই চুক্তি নিশ্চিত হলে গাজা ও এর নিয়ন্ত্রক সংগঠন হামাসের জন্য তা বিশাল স্বস্তি আনবে। তবে পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে হামাসের সঙ্গে পুনর্মিলন বিষয়ক ফাতাহ কর্মকর্তা আজম আল-আহমাদ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হামাস ‘শত্রুতাপূর্ণ পরিকল্পনা’য় যুক্ত হতে যাচ্ছে। এতে ফিলিস্তিনিদের একতা নষ্ট হবে। বৃহস্পতিবার মিডলইস্ট আই’কে তিনি বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধবিরতি বিষয়ে ইসরায়েলের সমঝোতা বা গাজার জন্য আলাদা করে বন্দোবস্ত করার মাধ্যমে হামাস নিজে একটি শত্রুতাপূর্ণ পরিকল্পনায় যুক্ত হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’ 
হামাসের একটি সূত্র বলেছে, হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মিসরীয় মধ্যস্থতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির ব্যাপারে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘শতাব্দীর চুক্তি’র অংশ হিসেবে এটা করা হচ্ছে। ওই সূত্রের মতে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণসহ সুড়ঙ্গ খোড়া বন্ধ করা ও গাজায় বন্দি বা নিখোঁজ হওয়া ইসরায়েলিদের মুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েল তাদের ঐতিহাসিক দাবিগুলো বাদ দিয়েছে। এছাড়া গাজায় পানি, বিদ্যুৎ ও সুয়ারেজসহ মানবিক প্রকল্প চালুর জন্যও হামাস চাপ দিচ্ছে। তবে তার মতে, আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হলো হামাসকে সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার দেওয়ার সময় নির্ধারণ। এছাড়া এই সমুদ্র পথের অন্যান্য আইনগত বিষয় নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।
আগস্টের ৬ তারিখ শহিদুল আলমকে যখন ঢাকার একটি আদালত কক্ষে নেয়া হচ্ছিল, তিনি তখন কাতরাচ্ছিলেন। হাতকড়া পরা শহীদুলের চারপাশে তখন পুলিশ। হঠাৎ তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন যে, তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। ঠিক আগের রাতেই তাকে ৩০ জনেরও বেশি সাদা পোশাকধারী কর্মকর্তা বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে প্রখ্যাত এই আলোকচিত্রী, শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী আল জাজিরায় একটি সাক্ষাৎকার ও বেশকিছু ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে বক্তব্য রাখার পরপর গ্রেপ্তার হন। সেখানে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সরকারের সহিংস প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন তিনি। শহীদুল আলমসহ ওই প্রতিবাদ কাভার করতে যাওয়া অনেক ফটোসাংবাদিককে পুলিশ ও শাসক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন সশস্ত্র গোষ্ঠী আক্রমণ করে।
তার বিরুদ্ধে এখন বাংলাদেশের আইসিটি আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই আইনানুযায়ী কেউ অনলাইনে সরকারের সমালোচনা করলে কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। অন্তত ১১ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাকে কারাগারে থাকতে হবে। এই সপ্তাহে তার জামিন আবেদন দাখিল করা হলেও শুনানি হবে ওই দিন।
বহু মানবাধিকার সংস্থা এবং সাংবাদিকতা ও ফটোগ্রাফি বিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা বেশ জোরালোভাবে তার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি অনতিবিলম্বে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বন্ধ ও শহীদুল আলমকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি পরিচালক ওমর ওয়ারাইখও তার নিঃশর্ত মুক্তি চেয়েছে। তিনি বলেন, ‘কাউকে শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণভাবে নিজের মতপ্রকাশের কারণে আটক করার মধ্যে কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।’
বাংলাদেশে ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে ফটোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত শহীদুল আলম। তিনি বড় ঘটনাবলী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ক্ষমতার পালাবদল, গার্মেন্ট শ্রমিকদের মৃত্যু এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে কাজ করেছেন। নিজের ছবির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীকে বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি অসংখ্য তথ্যচিত্রনির্মাতা তৈরিতে সহায়তা করেছেন। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন। ৩০ বছর ধরে তার পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইন্সটিটিউট বহু প্রতিভাবান আলোকচিত্রীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বাংলাদেশে একটি চমৎকার আলোকচিত্রী সম্প্রদায় থাকার সুনাম তৈরিতে সহায়তা করেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে তিনি যেই ছবি মেলা উৎসব চালু করেছেন, তাতে যোগ দিতে বিশ্বের বহু জায়গা থেকে আলোকচিত্রীরা আসেন ঢাকায়। ১৯৮৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দৃক ফটো এজেন্সি। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি আলোকচিত্রীদের কর্ম বিশ্বব্যাপী বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন।
পশ্চিমা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের মতো দেশ কীভাবে চিত্রিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল পশ্চিমাদেরই। ২০১৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দরদী গল্পমালা বাংলাদেশের মনন ও অর্থনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশের ছবি ব্যবহার করে এক ধরনের উপনিবেশিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশকে সবাই শুধু দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চেনে।’
শহীদুল আলম মানেন যে, দারিদ্র্যও বাংলাদেশের গল্পের অংশ। তবে রিপোর্টিং যখন শুধু দারিদ্র্যকে কেন্দ্র করে হয়, তখন এর মাধ্যমে এক ধরনের ক্ষতিকর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই উপস্থাপিত হয়। পশ্চিমা মিডিয়া বা তাদের নিয়োগ দেয়া বিদেশি সাংবাদিকরা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে, এমনটা হয়েছে খুবই কম।
তার ভাষ্য, ‘একটি আফ্রিকান প্রবাদ আছে, যেটাকে আমি প্রাসঙ্গিক মনে করি। সেটি হলো, ‘যতদিন পর্যন্ত সিংহ নিজের গল্প বলার মতো কাউকে খুঁজে না পাবে, ততদিন শিকার নিয়ে হওয়া গল্পে শুধু শিকারিরই গুণগান গাওয়া হবে।’ আমাদের গল্প আমাদেরকেই বলতে হবে। আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদের বিষয়বস্তুর প্রতি আমরা সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হবো। পাশাপাশি, মানুষকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাতে যেন তার আত্মমর্যাদা ঠিক থাকে।’
পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গ আলোকচিত্রী বা অন্য কেউ বাংলাদেশের গল্প বলুক, তাতে তার আপত্তি নেই। কারণ, বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গিকেও চ্যালেঞ্জ করার লোক থাকতে হবে। তবে বাংলাদেশের গল্প বলার ক্ষেত্রে পশ্চিমা আলোকচিত্রীরাই একচ্ছত্র এখতিয়ার পাবে, তা নিয়ে শহীদুলের ভীষণ আপত্তি।
আজ থেকে ২৫ বছর আগে শহীদুল আলম ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর মতো বৈশ্বিক ফটোগ্রাফি বিষয়ক সংস্থাকে বলতে থাকেন যে, বিশ্বের সব দেশের আলোকচিত্রীকেই সহায়তা দিতে হবে। প্রতিযোগিতার বিচারকদের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকতে হবে। তখন শহীদুলের সঙ্গে তাল মেলানোর কেউ ছিল না। অথচ, আজ অনেকেই পূর্বধারণাবশত উপস্থাপনার বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন।
এই বছর নিউ ইয়র্ক পোর্টফোলিও রিভিউতে যেসব ফটোসাংবাদিক ও সম্পাদক অংশ নিয়েছেন তারা কাছ থেকে দেখেছেন ফটোগ্রাফি নিয়ে তার অনুরাগের কিয়দাংশ। তিনি বেশ দারুণ এক আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের লেন্স ব্লগের অন্যতম সম্পাদক ডেভিড গঞ্জালেজের সঙ্গে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গানিক কেমিস্ট্রিটে পিএইচডিধারী শহীদুল একটি কথা প্রায়ই বলে থাকেন, সেটি ওই অনুষ্ঠানেও তিনি বলেছেন। সেটি হলো, তিনি ‘তৃতীয় বিশ্বে’র মতো শব্দগুচ্ছ পরিহার করেন। তার মতে, বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই এই তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বে বসবাস করেন। সুতরাং, তিনি একে বলেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্ব’ (মেজরিটি ওয়ার্ল্ড)।
২০০৭ সালে তিনি মেজরিটি ওয়ার্ল্ড ফটো এজেন্সি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি আফ্রিকান, লাতিন আমেরিকান ও এশিয়ান আলোকচিত্রীদের জন্য সুযোগ ছড়িয়ে দিয়েছেন। গত বছর তিনি উইমেন ফটোগ্রাফি, ডাইভারসিফাই, এভরিডে প্রজেক্ট ও নেটিভ এজেন্সির সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রিক্লেইম।’ এই সংস্থাটির উদ্দেশ্য হলো নারী ও বৈচিত্র্যময় ব্যাকগ্রাউন্ডের অধিকারী মানুষের জন্য ফটোগ্রাফির সুযোগ বিস্তৃত করা।
নিজের ক্যারিয়ারে শহীদুল আলম বহুবার বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০১৩ সালে ভিন্নমতাবলম্বীদের বলপূর্বক অন্তর্ধান নিয়ে তার আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরুর কয়েক মিনিট আগে পুলিশ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু দমে না গিয়ে, শহীদুল আলম ও তার সহযোগীরা গ্যালারির বাইরে সড়কের ধারে ওই প্রদর্শনী চালিয়ে যান। ২০০৯ সালে দৃক গ্যালারিতে তিব্বতের ওপর ছবির প্রদর্শনী আয়োজন করেন। কিন্তু চীন সরকার বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়ে দাঙ্গা পুলিশের মাধ্যমে ওই প্রদর্শনী বন্ধ করায়। ১৮ বছর আগে তার দৃক গ্যালারি ছিল সরকারবিরোধী কর্মীদের বৈঠকস্থল। তখন একদিন রাতে শহীদুল আলমকে রিকশায় একদল লোক আটকায়। তার কম্পিউটার নিয়ে যায়। আর তাকে ৮ বার ছুরিকাঘাত করে।
হুমকি ও আক্রমণ সত্ত্বেও, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র, সাম্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে ফটোগ্রাফির শক্তি ব্যবহারে শহীদুল আলমের অঙ্গীকারে এতটুকু চিড় ধরেনি। ২০০৭ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কী পদচ্ছাপ ফেলে গেলাম সেটা আমার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমি কীভাবে বিশ্বকে প্রভাবিত করলাম বা করলাম না। আমি কিছু পন্থায় চেয়েছি হস্তক্ষেপ করতে, যাতে করে যেই পৃথিবীতে আমার বসবাস, সেটিকে আমি যেভাবে পেয়েছি, তার চেয়ে ভিন্ন অবস্থায়-মঙ্গলের পথে-রেখে যেতে পারি।’
(জেমস এস্ট্রিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার লেন্স ব্লগের অন্যতম সম্পাদক। তার এই নিবন্ধ নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত।)
ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর গত ৪০ বছর ধরে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে নানা ভিত্তিহীন অভিযোগ আরোপ ও শত্রুতামূলক আচরণ করে আসছে। আমেরিকার একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে ইরান সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দিচ্ছে। আর এ অজুহাতে তারা এ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে বহু পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৮মে পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর এবং ইরানের বিরুদ্ধে ফের নিষেধাজ্ঞা বলবত করার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ১২টি শর্তে ইরানের সঙ্গে সংলাপে বসার প্রস্তাব দেন। এসব শর্তের মধ্যে আমেরিকার স্বেচ্ছাচারী মনোভাব ফুটে উঠেছে যা ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই ১২টি শর্তের মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত থাকা, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীতে হস্তক্ষপে বন্ধ করা এবং ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামীদের সমর্থন না দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। আমেরিকার দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো প্রতিরোধ যোদ্ধারা হচ্ছে সন্ত্রাসী।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গতকাল (শুক্রবার) আবারো ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের প্রতি সমর্থন দেয়ার অভিযোগ তুলে দাবি করেছেন, "ইরান মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে অস্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।" তিনি ইরানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিদ্বেষী নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আরো দাবি করেছেন, ইরানের উত্থান ঠেকানোর জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে শামিল হতে মিত্র দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও।
পম্পেও এমন সময় ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন যখন আমেরিকা সৌদি আরবের সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্যে তৎপর দায়েশসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রতি সর্বাত্মক সাহায্য সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এটা সবারই জানা আছে ইরান এ অঞ্চলে উগ্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইরাক ও সিরিয়ায় দায়েশ সন্ত্রাসীদের প্রতি আমেরিকা ও সৌদি আরবের সরাসরি সহযোগিতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। বিষয়টি খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক ও সিরিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশে সন্ত্রাসীদের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কারণে এ অঞ্চলে চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। সন্ত্রাসীদের প্রতি আমেরিকার সমর্থনের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে এ অঞ্চলে ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামীদের দুর্বল করে দেয়া।
যাইহোক, ইসলামি ইরান তার সংবিধান অনুযায়ী বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
মমি। ছোট্ট একটা শব্দ। কিন্তু তারই মধ্যে অমোঘ রহস্যের হাতছানি। হাজার হাজার বছর আগেকার পৃথিবীর দিনকাল ভেসে ওঠে চোখের সামনে। সেই সঙ্গে অবধারিত অতিলৌকিক সব আখ্যান। লেখকের কল্পনা হোক বা হলিউডের রুপোলি পর্দা— মমির আবেদন সর্বজনবিদিত। তুতেনখামেনের অভিশপ্ত মমি হোক বা অন্য ফারাওদের মমি— সাধারণ মানুষদের পাশাপাশি গবেষকদেরও কৌতূহলের শেষ নেই। এ নিয়ে নতুন নতুন আবিষ্কারও তাই হয়ে চলেছে। সম্প্রতি এক বহু পুরনো মমিকে ঘিরে নতুন আবিষ্কারের কথা সামনে এল। জানা গেল, ফারাওদের আগেও মমি প্রথা চালু ছিল প্রাচীন মিশরে! চাঞ্চল্যকর এই খবরে স্বাভাবিক ভাবেই উত্তেজিত কৌতূহলী মানুষরা।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘লাইভসায়েন্স.কম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ওই মমিটি পাওয়া গিয়েছিল গত শতাব্দীর একেবারে গোড়ায়। ১৯০১ সাল থেকে ইতালির তুরিন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে মমিটি। মোটামুটি ভাবে ৩৭০০ থেকে ৩৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের সময়কালের ওই মমিটি সম্পর্কে এতদিন সকলের ধারণা ছিল, ওই মমিটি কৃত্রিম ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। কোনও দুর্যোগের পরে মরুভূমিতে প্রাকৃতিক ভাবেই ওই দেহটি সংরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গবেষকরা এখন জানতে পেরেছেন, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ওই যুবকের দেহটিকে কৃত্রিম ভাবেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই এহেন আবিষ্কারে মমির ইতিহাস নিয়েই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে গবেষকদের। কেননা, গবেষকদের এই দাবির অর্থ, এতদিনের জানা সময়েরও ১ হাজার বছর আগেই এই বিদ্যা আয়ত্ত করেছিল মিশরের মানুষ।
গত ১৫ অগস্টে ‘জার্নাল অফ আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্রটি। ওই গবেষক দলের অন্যতম গবেষক অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বাসিন্দা জানা জোন্স জানিয়েছেন, মমিটির ডান কবজি, ধড় খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পরে বোঝা গিয়েছে সেটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা করা হয়েছে দেহের সঙ্গে থাকা ব্যাগটিও। দেখা গিয়েছে, জৈব তেল, প্রাণীজ চর্বি ও আরও বহু পদার্থের প্রলেপ দিয়ে কাপড়ে মোড়ানো হয়েছিল দেহটি। উদ্দেশ্য অবশ্যই সংরক্ষণ।
ওই মমিটি এত প্রাচীন, যখন লেখার ভাষাও আবিষ্কৃত হয়নি। সম্ভবত মুখে মুখেই ওই সংরক্ষণের প্রক্রিয়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়েছে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, ওই সময়ের মানুষের মধ্যে মরণোত্তর জীবন সম্পর্কে অটুট বিশ্বাস ছিল। তারা চাইত দেহটি সংরক্ষণ করতে। আর সংরক্ষণের পদ্ধতিও তারা আবিষ্কার করে ফেলেছিল।
কবেকার এক যুবকের শরীর এইভাবেই প্রাচীন পৃথিবীর দরজা আচমকাই যেন খুলে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের সামনে। তাঁরা বিস্মিত হয়ে লক্ষ করছেন, সেই সুদূর অতীতেও মানুষ চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগিয়েই কীভাবে দেহ সংরক্ষণের আশ্চর্য পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিল।
সূত্র- এবেলা
ইরানি প্রযুক্তিতে তৈরি এস-৩০০
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান শিগগিরি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মোড়ক উন্মোচন করবে। ইরান এ ব্যবস্থার নাম দিয়েছে বাবর-৩৭৩।
ইরানের উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ আহাদি গতকাল (শুক্রবার) তাবরিজ শহরে এক অনুষ্ঠানে একথা বলেছেন। তিনি জানান, চলতি ফারসি বছরের শেষ নাগাদ এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উন্মোচন করা হবে। আগামী ২০ মার্চ ফারসি বছর শেষ হবে।
জেনারেল আহাদি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইরান প্রতিরক্ষা খাতে খুবই কম বিনিয়োগ করে যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের সঙ্গেও তুলনার যোগ্য নয়। সৌদি আরব বিশ্বের তৃতীয় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ অথচ ইরান এ খাতে কম বিনিয়োগ করেই মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা দিচ্ছে। জেনারেল আহাদি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীন নীতি অনুসরণ করার কারণে ইরানের পক্ষে প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচনের দাবিতে প্রস্তুত হয়েছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের খসড়া রূপরেখা। জাতীয় ঐক্যের রূপরেখায় রয়েছে কারাবন্দি খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি, নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনের সময়ে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন, নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনী তফশিল ঘোষণার পর বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে নতুন মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান বন্ধসহ চলমান সব রাজনৈতিক ইস্যুর সমন্বয়। ইস্যুভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের কৌশল ও গতি-প্রকৃতির বিষয়টিও রয়েছে রূপরেখায়। দলের তৃণমূল নেতাদের মতামত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনি ও সোমবার দুই দফায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ খসড়া তৈরি করেছে বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরাম। প্রস্তুতকৃত খসড়াটি লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হবে।
পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়াকেও বিষয়গুলো অবহিত করা হবে। তাদের মতামত ও নির্দেশনার ভিত্তিতে ঈদের পর দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক ডাকা হবে। সেই বৈঠকের পরই প্রকাশ্যে আসবে জাতীয় ঐক্যের প্লাটফর্ম। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন আহূত সমাবেশে এ রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। ২২শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে সমাবেশের প্রস্তুতি হিসেবে ড. কামাল হোসেনের বাসায় বুধবার একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে সমাবেশ থেকে কী ঘোষণা দেয়া হবে, সমাবেশে কাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে- এ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আহূত সমাবেশেই এক মঞ্চে উঠতে পারেন দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তবে এই ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে পারে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত ইসলামী।
জাতীয় ঐক্যের রূপরেখার বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, রূপরেখা তৈরির আগে তারা কয়েক দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকগুলোতে নেতারা যেসব ইস্যুতে একমত পোষণ করেছেন সেসব বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে রূপরেখায়। এরমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মুুক্তির বিষয়টি অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষার্থীদের মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির দাবিটিও যুক্ত করা হয়েছে সেখানে।
রূপরেখা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিএনপির এক নেতা জানান, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য তারা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক ও মতবিনিময় করেছেন। ওইসব দলের নেতাদের মতামত নিয়েছেন। যুক্তফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর পাশাপাশি বাম ও ডান দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপি নেতারা। কেবল বিএনপি নয়, যুক্তফ্রন্টের নেতারা এ ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে প্রথমদিকে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। কিন্তু জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের একটি মতামতের মধ্যদিয়ে সে দ্বিধার সমাপ্তি ঘটেছে। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী নয়, তিনি দেশের সিংহভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। গণতন্ত্রের জন্য আজ তিনি কারাগারে রয়েছেন।
তাই সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনিসহ দেশের সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জাতীয় নির্বাচনের আগে মুক্তি দেয়ার দাবিকে প্রাধান্য দিতে হবে। জাসদ সভাপতির এ মতামতের প্রেক্ষিতে অন্যান্য দলের নেতারাও এই ইস্যুতে একমত পোষণ করেছেন। বিএনপির অন্য এক নেতা বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে বিগত কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রকৃত অবস্থা দেখে সব রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছেন, এই সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার দাবি এখন আর শুধু বিএনপির একার নয়। এটা সবার। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া আর রাজনৈতিকভাবে আত্মহত্যা করা এখন একই বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিষয়টি বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা উপলব্ধি করতে পারছেন। আর সে কারণেই জোরালো হয়েছে বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি। যুক্তফ্রন্টের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবেই পুরো প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাসের প্রথমপক্ষে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের জন্য আমরা যাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে এসেছি- তাদের অনেকেই তো এখন কথা বলছেন। ফলে বিষয়টি যে ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে তা পরিষ্কার।
এটি একটি প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে কাজ করছেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, দেশের বামপন্থি ও মধ্যপন্থি দলগুলোর নতুন নতুন গ্রুপ হচ্ছে। তারা জাতীয় নির্বাচনসহ সার্বিক ইস্যুতে সোচ্চার হচ্ছে। যেসব রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, লুটপাট ও নৈরাজ্যমুক্ত একটি সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সরকার চায় তারা এ নিয়ে কাজ করছে। সার্বিকভাবে বিষয়টির প্রগ্রেস হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, ক্ষমতার বাইরে থাকা বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠন এবং নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে রাজপথে নামার পরিকল্পনারও অগ্রগতি হয়েছে বেশ। বিকল্প হিসেবে রয়েছে প্লাটফর্মের বদলে ইস্যুভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের কৌশল। বিএনপি স্থায়ী কমিটির শনি ও সোমবার অনুষ্ঠিত বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী দিনে যুগপৎ আন্দোলনের জন্য বৈঠকে জাতীয় ঐক্য গড়ার বিষয় নিয়ে নানাবিধ পরামর্শ নেয়া হয়। এর মধ্যে আগামী মাসে জাতীয় ঐক্যের ফর্মুলা প্রকাশ্যে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া সংকট নিরসনে সরকার সংলাপের উদ্যোগ নিলে ইতিবাচকভাবে সাড়া দেবে বিএনপি। তবে সে সংলাপ হতে হবে অবশ্যই এজেন্ডা নির্ভর। সময়ক্ষেপণের জন্য এজেন্ডাবিহীন কোনো সংলাপে যাবে না তারা।
এদিকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের আত্মপ্রকাশের আগে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে সমাবেশের মাধ্যমে বড় ধরনের শো-ডাউন করতে চায় বিএনপি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের উপস্থিতির মাধ্যমে সরকারকে একটি বার্তা দিতে চায় বিএনপি। এর আগে বিভিন্ন দলের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন নেতারা। এছাড়া আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে নিরসন করা হবে দলের অভ্যন্তরে বিরাজমান ছোটখাটো বিরোধ, কোন্দলগুলো।
এদিকে বিএনপির তৃণমূল থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে রাজপথে জোরালো আন্দোলনের রোডম্যাপের যে খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়েছে সেটা চূড়ান্ত হবে ঈদের পর দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায়। তবে ঈদের আগে দলের নীতিনির্ধারক ফোরামের কয়েকজন সদস্য বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া ও আন্দোলনের পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচনের কৌশল প্রণয়ন ও প্রস্তুতির জন্যও কাজ করবে দলের একটি দায়িত্বশীল টিম। তারা জোট ও বৃহত্তর ঐক্যের শরিকদের চাহিদা ও সেখানকার বাস্তবতা নিয়ে কাজ করবেন। এছাড়া দলের সাবেক ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও সার্বিক তথ্য-উপাত্ত ও নেতাকর্মীদের মতামত এবং স্থানীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ভিত্তিতে একটি সারসংক্ষেপও তৈরি করবেন, যা দলের ইশতেহার প্রণয়ন ও প্রার্থী বাছাই এবং জোট এবং জাতীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনায় সুবিধা হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আগামী আন্দোলনে ঢাকা মহানগর বিএনপির ভূমিকাকে অগ্রগণ্য হিসেবে দেখতে চায় দলের নীতিনির্ধারক ফোরাম। আর সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ দুই সাংগঠনিক ইউনিট ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের কমিটিতে বঞ্চিত নেতাদের অন্তর্ভুক্ত ও কিছু থানা কমিটি পুনর্গঠনের যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর রাজধানীর সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দলের ঢাকা মহানগর দুই ইউনিটের নেতাদের তাগিদ দেয়া হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অটোরিকশা রাজধানীর একাধিক এলাকায় নিষিদ্ধ। তবুও এগুলো চলছে। ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিষিদ্ধ এলাকায়। আর এজন্য তারা নির্দিষ্ট থানা ম্যানেজ করে। পুলিশ থানা থেকে তাদের টোকেন দেয়। প্রতিমাসেই এ টোকেন পরিবর্তন হয়। এগুলোর লেনদেন আবার চালকরা সরাসরি নিজেরা করেন না। নিয়ন্ত্রণ করেন সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাকর্মীরা। আবার কিছু কিছু এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো চলে গ্যারেজ মালিকানায়। তারাই থানাকে ম্যানেজ করে চলেন। তারা দৈনিক ভিত্তিতে চালকদের কাছে রিকশা ভাড়ায় দেন। চালকরা জানান, মাস প্রতি তাদের থানায় চাঁদা দিতে হয় ১০০০ টাকা। তবে যারা গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়ায় চালান তাদের সরাসরি থানায় টাকা দিতে হয় না। সবকিছু গ্যারেজ মালিকরাই ম্যানেজ করেন। তারা শুধু দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করেন। গত ২৯শে জুলাই রাজধানীর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ড ঘটে। এরপরে দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তারা অবৈধ যানবাহন কিভাবে বন্ধ করতে হয় তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন কর্তৃপক্ষকে। আন্দোলনের মধ্যেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ট্রাফিক সপ্তাহ পালন শুরু করেন। তারাও অবৈধ যানবাহন বন্ধে অভিযানে নামেন। তবে সাধারণ মানুষ মনে করেন, সরষের মধ্যে ভূত থাকলে কোনোভাবেই এসব বিশৃঙ্খলা বন্ধ হবে না। যেভাবে পুলিশ গাড়ি থেকে চাঁদা তুলে তারা কিভাবে যানবাহন বন্ধ করবে। তার মধ্যে যা রাজধানীতে একেবারেই নিষিদ্ধ তাও চলছে। গতকাল সরজমিন রাজধানীর একাধিক এলাকা ঘুরে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে দেখা যায়। রাজধানীর পল্লবী থানাধীন মিরপুর ১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকা। মাঝখান থেকে চলে গেছে বেগম রোকেয়া সরণি। এই প্রধান সড়কের দুই পাশের ভিতরের এলাকাতেই চলে এসব রিকশা। কথা হয় একাধিক রিকশা চালক ও মালিকের সঙ্গে। তারা জানান, রিকশার পিছনে লাগানো কার্ডটিই থানা থেকে দেয়া মাসিক টোকেন। এজন্য থানা তাদের কাছ থেকে এক হাজার টাকা নেয়। তারা সড়কের এক পাশে মিরপুর ১১ ও ১২ থেকে বাউনিয়াবাঁধ, কালশী ও মিরপুর ১৪ নম্বর পর্যন্ত এলকাগুলোতে চালাতে পারেন। অন্যপাশে পূরবী সিনেমা হল থেকে আবাসিক, দুয়ারীপাড়া, শিয়ালবাড়ী মোড় ও রূপনগরের কিছু এলাকায় এগুলো চালান। তবে কোনোক্রমে প্রধান সড়কে যেতে পারেন না। কখনো গেলে পুলিশ আটকে দেয়। পরে টাকা দিয়ে ছাড়াতে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালক আফজাল। তিনি বলেন, আমি যে রিকশাটি চালাই এটা আমার নিজের। পূরবী সিনেমা থেকে ভিতরের এলাকায় শুধু চালাতে পারেন। এজন্য প্রতি মাসে থানায় এক হাজার টাকা দেন। বিনিময় থানা থেকে একটি মাসিক টোকেন দেন। তিনি রিকশার পিছনে লাগানো ৪ম লেখা একটি কার্ড দেখিয়ে বলেন, এটিই ওই কার্ড। আরেক চালক মো. শাহীন। তার রিকশাটি চলে মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের উল্টোপাশে। মিরপুর-১১, লালমাটি, বাউনিয়াবাঁধ, কালশী থেকে মিরপুর ১৪ নম্বর পর্যন্ত এলাকায়। তিনি গ্যারেজ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়ায় নেন। সব খরচ গ্যারেজের এজন্য তাকে দিনে দিতে হয় ৩৫০ টাকা। আর দুই চার্জের গাড়ি নিলে ৩০০ টাকা। শাহীন বলেন, আমি দুই মাস ধরে এ রিকশাটি চালাই। এজন্য রিকশায় থানা থেকে নেয়া একটি পাশ কার্ড দিয়ে দিয়েছেন গ্যারেজ মালিক। অনেকজন মালিক এক হয়ে এই রিকশাগুলো চালান। যারা প্রত্যেকেই সরকার দলের নেতাকর্মী। শাহীনের রিকশায় সটকানো কার্ডে লেখা দেখা যায় ‘অটোরিকশা মাসিক কার্ড’। সেখানে তিনটি ফোন নম্বর দেয়া রয়েছে। এগুলোতে কল দিয়ে এ রিকশা কিভাবে চলে জানতে চাইলে একটি নম্বর থেকে আসাদ পরিচয়ে বলেন এর সঙ্গে আমি জড়িত নাই। কেন আমার ফোন নম্বর তারা ব্যবহার করছে জানি না। অন্য আরেকটি নম্বরে কল দেয়া হলে তিনি নাম না বললেও জানান আমি সিকিউরিটি ফোর্সের লোক। এরা গরিব চালক। তারা গ্যারেজ থেকে ভাড়ায় নিয়ে রিকশা চালান। তার দুইটি রিকশা রয়েছে জানিয়ে বলেন, এটা অবৈধ নয়। মালিকদের মাধ্যমেই ভিতরের এলাকায় চলে।
তবে চালক শাহীনের কাছ ঠিকানা নিয়ে বাউনিয়াবাঁধ ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় ব্যাটারিচালিত রিকশার একাধিক গ্যারেজ। যেখানে একজন কেয়ারটেকার দায়িত্ব পালন করছেন। কিছুক্ষণ পর পর চালকরা রিকশা নিয়ে আসছেন আর চার্জ দিচ্ছেন। এসব কেয়ারটেকার জানান, ওইসব গ্যারেজের মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্যারেজ কেয়ারটেকার বলেন, আমার মালিক প্রতিমাস শেষে থানা থেকে একটি কার্ড দিয়ে যান। সেটা রিকাশায় লাগিয়ে দেই। আমি আর কিছু জানি না।
ধানমন্ডির ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মো. আবদুল আজিজ মিয়া। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর রায়েরবাজার একালায় বসবাস তার। সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে ঠিকমতো হাঁটা-চলা করতে পারেন না তিনি। তিনি ছাড়া সংসারে আর কর্মক্ষম কোনো মানুষ নেই। তিনি তার স্ত্রীর জমানো কিছু টাকা ও লোন করে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনেছেন। ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে গত জুন মাসে রিকশাটি কিনেছেন। একবার ফুল চার্জ দিলে, ৯৫ ভোল্টের ৪টি ব্যাটারিতে ২০ ঘণ্টা মতো চলে তার রিকশা। পা দিয়ে প্যাডেল করা লাগে না বলে, বেশ সহজেই এক এলাকা থেকে যাত্রী নিয়ে খুব সহজেই ছুটে বেড়াতে পারে সে। তার রিকশাটি চালাতে পুশিকে টোকেনের জন্য প্রতি মাসে দিতে হয় এক হাজার টাকা। তবুও মেইন রোডে উঠলেই হাইকোর্টের নিষিদ্ধ এই অটোরিকশা নিয়ে পড়তে হয় বিপাকে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা দেখলেই আটক করেন। তাদের আবার টাকা না দিলে রিকশা নিয়ে যায় ডাম্পিংয়ে। রিকশার পিছনে লাগানো টোকেন দেখিয়ে আজিজ বলেন, আমরা কেউই এই কাগজ সম্পর্কে তেমন কিছু বুঝি না। তবে এই কাগজ সিটি করপোরেশনের কাগজ। আর এর জন্য প্রতি মাসে আমাদের ১০০০ টাকা করে দিতে হয়। কার কাছে টাকা জমা দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনে যাওয়া খুব ঝামেলা। তবে আমাদের মহাজনরা এইসব কাজ ভালো পারেন। তাদের সব লাইন-ঘাট চেনা। তাই আমরা প্রতি মাসে মাহজনের কাছে শুধু টাকাটা দিয়ে দিই। সেই আমাদের কার্ড এনে দেয়। আমরা শুধু পুরনোটা খুলে নতুন কার্ডটা লাগাই। মাহাজন এক হাজার থেকে ৮০০ টাকা জমা দেয় আর খরচ হিসাবে বাকি ২০০ টাকা নিজে কমিশন রাখেন। আজিজের রিকশার পিছনে লাগানো রয়েছে। এগুলো তিনজন মহাজনের মোবাইল নম্বর।
তাদের একজন মো. রাজ্জাক মির্জা। তবে তিনি এইভাবে রিকশা চলার কথা অস্বীকার করেন। কার্ডে তার মোবাইল নম্বর ভুলে দেয়া হয়েছে বলে জানান। তবে তার অধীনে ১০টা ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। কিন্তু তার একটির জন্যও তাকে টাকা পয়সা দিতে হয় না।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রত্যেককেই বিভিন্ন ‘ব্যাটারিচালিত রিকশামালিক-শ্রমিক কল্যাণ সমিতির কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে প্রতি মাসে বৈধতা নিতে হয়। তবুও সরকারি খাতায় এরা অবৈধ। নাম জানাতে অনিচ্ছুক এক মহাজন জানান, এটা আসলে একটা চলমান প্রক্রিয়া। সিটি করপোরেশনের কথা বললেও ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে তেমন কিছুই খোঁজ রাখেন না। আমাদের মহাজনদের কিছু সমিতি আছে। চালকদের বিপদের দিনে যাতে তাদের কারোর কাছে হাত না পাতা লাগে এই উদ্দেশে আমরা প্রতিমাসে তাদের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে টাকা নেই। এর সামান্য কিছু আমরা রাখি আর পুরোটা তুলে দিই সমিতির হাতে।
তবে যে থানার অধীনে এসব রিকশা চলছে সেই থানাই নাকি এসব নিষিদ্ধ রিকশা সম্পর্কে জানেন না। এ বিষয়ে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, আমার থানায় টাকা দিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে সেটা আমার জানা নেই। আমি এ থানায় নতুন জয়েন করেছি। একমাসও হয়নি। তবে এসব নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল এবং থানায় টাকা নেয়ার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নিপীড়ন বিরোধী প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন না পাওয়ায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। তার মতে, এ নিয়ে জাতিসংঘে দফায় দফায় প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে কিন্তু তাতে ধারাবাহিকভাবে ভেটো প্রদান করে আসা চীন ও রাশিয়ার অবস্থান এখনও পাল্টায়নি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিকীকরণের পরিবর্তে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনা এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পক্ষেই অবস্থান চীন ও রাশিয়ার। তবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হলেও বাংলাদেশ বারবার বলে আসছে, আন্তর্জাতিক চাপ সরে গেলে মিয়ানমার তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করবে। এ কারণে বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সব ফোরামেই মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার নীতি নিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
সেই বৈঠকে রোহিঙ্গা নিপীড়নের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব আসে পশ্চিমা দুনিয়া থেকে। কিন্তু তাতে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করে চীন ও রাশিয়া। দেশ দুটি মিয়ানমারের পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করে। সেই বিতর্কে জাতিগত নিধনযজ্ঞের জন্য মিয়ানমারের তীব্র সমালোচনা করে পরিষদের স্থায়ী ৩ সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সসহ অস্থায়ী প্রায় সব সদস্য। সেই সমালোচনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে (ভোটো প্রদান করে) চীন ও রাশিয়া প্রস্তাবটি আটকে দেয়। ফেব্রুয়ারির আগেও একাধিকবার নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে আলোচনা হয় এবং সেখানে নিন্দা প্রস্তাব পাসের চেষ্টা ছিল মানবাধিকার সংবেদনশীল রাষ্ট্রগুলোর। কিন্তু চীন ও রাশিয়া তাতে আপত্তি দিয়েছে, ভেটো প্রদান করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের কাছে আল-জাজিরা জানতে চায় রাশিয়া ও চীনের ভেটো বন্ধে ঢাকার তরফে কোনো চাপ দেয়া হচ্ছে কি না?
জবাবে এ নিয়ে হতাশাসূচক জবাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তিনি বলেন, ‘তাদের মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বোঝাতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। তারপরও এ প্রশ্নে যদি আগামীকালও ভোট হয় তারা তাদের একই অবস্থান বজায় রাখবে।’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করেছে। সে প্রসঙ্গ টেনে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘১৫ সদস্য দেশের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আসার মধ্যদিয়ে দারুণ একটি কাজ করেছে নিরাপত্তা পরিষদ। তারা সবাই মিডিয়ায় কথা বলেছে, তাদের মতামত জানিয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে। একইসময়ে তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ ও তাদের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে পেরেছেন। নিরাপত্তা পরিষদের ১৩টি দেশের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার পার্থক্য হলো এ দুই দেশ মনে করে আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় থাকতে হবে, ধীর গতিতে চলতে হবে।’ উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫শে আগস্ট রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো হয়।
হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। আর তার আগে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে তিন লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারিতে সম্পাদিত ঢাকা-নেপিডো প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তাছাড়া, জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সংস্থা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, রাখাইন এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়।
দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, আসামে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথা পদক্ষেপ নিতে সরকার ব্যর্থ হলে তা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রবিহিন জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে পারে। তারা সুপারিশ করছে, এই প্রক্রিয়ার বিকল্প  হলো বর্তমানে নেপালি ও ভুটানি নাগরিকরা যেভাবে ভারতে উন্মুক্ত যাতায়াত করতে পারছে, তেমন একটি ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশ আলোচনা শুরু করতে পারে। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিষয় ও নিরাপত্তাকে একত্রে নয়, দুটিকে আলাদা বিষয় ধরে ভারত ও বাংলাদেশ আলোচনা চালাতে পারে। তবে এভাবে চলতে থাকলে ভারতে ‘বাংলাভাষীরা’ আমেরিকার মেক্সিকান সংকটে রূপ নিতে পারে।   
১৬ই আগস্ট প্রকাশিত সংস্থাটির রিপোর্ট মতে, সমপ্রতি প্রকাশিত প্রাথমিক খসড়ায় ৪০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে এবং তাদের সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন যদিও ওই তালিকা যাচাইয়ের কাজ চলছে। কিন্তু কোনো কারণে যদি খসড়া তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত ছিল, এখন যাচাইয়ের কাজ যদি তাদের দ্বারাই করা হয় তাহলে ভুল থাকার আশংকাই সত্য হতে পারে। সংস্থাটির ভাষায়, আগের তালিকাই ‘নিয়ার রিপিট’ বা প্রায় পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
সংস্থাটির রিপোর্টে বলা হয়, অ-নাগরিক হিসেবে ৪০ লাখ মানুষকে চিহ্নিত করার ফলে এখন যাচাইয়ের কাজটি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। কারণ এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে দৈহিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া কঠিন বিষয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যখনই তাদের নাগরিক নন বলে ঘোষণা করা হবে, তখন তারা বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যেতে পারবে। পশ্চিমা দেশগুলো এ ধরনের ব্যক্তিদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগ পর্যন্ত বিশেষ শিবিরে রেখে থাকে। ভারতও তামিল ও রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু শিবিরে রেখেছে। কিন্তু সেসব অভিজ্ঞতা থেকে এবারের এই অভিজ্ঞতা হবে ভিন্ন।
লক্ষণীয় যে, অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন রিপোর্ট দাবি করেছে, অসাম প্রক্রিয়ায় যেভাবে ৪০ লাখ মানুষকে প্রাথমিকভাবে অনাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেছে তা দেশের সকল মিডিয়া সমর্থন করেছে। মিডিয়া এটাও ইঙ্গিত করেছে, এই ৪০ লাখ মানুষই বাংলাদেশি। ভারত বেশি হলে এটা প্রমাণ করতে পারে, তাদের সবাই ভারতীয় নয়। ভারত এর আগে এমনটা বার্মা থেকে আসা ‘উদ্বাস্তু’ এবং তামিলদের বিষয়ে করেছে। ভারত আশা করতে পারে না যে, যখনই এই ব্যক্তিদের ফেরত নিতে অনুরোধ জানাবে, তখন বাংলাদেশ সরকার তা পালন করবে। বাংলাদেশ এমনতিই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়ে বিপদে আছে। এবং ভারত নিজেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গণ্য করে ফেরত নিতে অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের উদারনৈতিক নেত্রী অংসান সুচি নীরবতা পালন করছেন। ভারত সরকার যদিও বারংবার আশ্বস্ত করছে, যে খসড়া তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে তা কেবলই খসড়া, এনিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু গোটা ভারত জুড়ে এটাই এখন চলছে, যেখানেই প্রধানমন্ত্রী মোদিও নেতৃত্বাধীন বিজিপি সরকার রয়েছে সেখানেই একই রকম বিদেশি খেদাও দাবি উঠেছে। এখন যদি তা মানা শুরু হয় তাহলে বাস্তবে কোনো সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তা আরো জটিল হতে পারে।
রিপোর্টে আরো দাবি করা হয়, বর্তমানে লাখ লাখ না হলেও হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারত জুড়ে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছে। এখন তাদের বিতাড়নের ব্যাপারে যদি সামাজিক প্রতিবাদ গড়ে ওঠে তাহলে তা আমেরিকার মেক্সিকান সমস্যার মতো একটি ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। আমেরিকার নির্বাচনগুলোতে অবৈধ মেক্সকান বিতাড়ন একটি অব্যাহত স্লোগানে পরিণত হয়েছে। যেটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা বেশি করেছেন। কিন্তু আপিল কোর্টকে হতাশ করা ছাড়া তারা এ পর্যন্ত এর কিছুই করতে পারেনি।
ওই রিপোর্টে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়, সারা ভারতে যদি এখন ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে ‘বিদেশি’ খেদাও অভিযান শুরু হয় তাহলে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ এবং তার আশেপাশের বিহার, আসাম, ওড়িশা ও ত্রিপুরার বাংলাভাষী এবং সম্ভবত যারা ধর্মে মুসলিম তারা ভিকটিম হতে পারেন।
আইনের সঠিক প্রয়োগ, নীতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার মাধ্যমে ঢাকাকে বাঁচানো সম্ভব বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। শুধু তাই নয়, এভাবে সবচেয়ে কম সময়ে ঢাকাকে পৃথিবীর সেরা শহরগুলোর একটিতে পরিণত করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি। মোবাশ্বের আহমেদ বলেছেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আমাদের শিখিয়েছে যে চাইলে তিন দিনেই ঢাকাকে বাসযোগ্য করা যায়। ঢাকার বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান এবং একজন মানুষ দরকার যাকে ছাতা হিসেবে ধরে তার নির্দেশে কাজ করা যাবে। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপাকালে এসব কথা বলেন তিনি।
লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইইইউ)’র বার্ষিক জরিপে বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে ঢাকা। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন এবং ঢাকাকে বাসযোগ্য করার উপায়ই বা কি- এমন প্রশ্নে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘যে মাপকাঠিতে ঢাকা শহরকে বসবাসের অযোগ্য বলা হয়, সেই মাপকাঠি হলো উন্নত শহরের মাপকাঠি। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ যে কত ভালো এবং কত অল্প সময়ের ভিতর আইন মানতে জানে সেটি পৃথিবীর কম দেশেই আছে।’ উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাত্র তিনদিনে ঢাকার মানুষ আইন মানা শুরু করলো। শিক্ষার্থীরা পুলিশও না, এ বিষয়ে তাদের কোনো ক্ষমতাও নেই। কিন্তু তাদের কথামতো মানুষ আইন মানলো কেন? পৃথিবীর কেউ দেখাতে পারবে যে তিনদিনে মানুষ আইন মানা শুরু করতে শিখেছে! এর মানে আইনের সঠিক  প্রয়োগ, নীতি এবং বিশ্বাসযোগ্যতা হলো বড় বিষয়। এই জিনিসগুলো অর্জন করতে পারলে ঢাকাকে শুধু রক্ষা করাই নয়, পৃথিবীর সেরা শহরগুলোর একটি বানানো সম্ভব এবং পৃথিবীর ভিতরে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যেই তা বানানো সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘দেশে প্রতি বছর বন্যা হয়। বন্যা প্লাবিত এলাকায় ডাকাতি হওয়ার কথা শোনা যায় না। মানুষ রিলিফ নিয়ে বন্যা প্লাবিত এলাকায় যায়। কিন্তু আমেরিকাতে বন্যায় বাঁধ ভেঙে যাওয়াতে সেনাবাহিনী নামাতে হয়েছে যাতে লুটপাট না হয় সেজন্য। কিন্তু এই পার্থক্যগুলো কেউ বিবেচনা করে না। আমরা বলি, নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলাম, সেখানে সবাই আইন মানে। কিন্তু সেখানে পাঁচ মিনিট আইনের দৃষ্টি বন্ধ করুক তারপর দেখা যাবে পরিস্থিতি কি হয়।’
ঢাকার বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার মনের মতো কাজ করে। ঢাকা শহরের দুইজন মেয়রের একজন মশা তাড়ালেন, আরেকজন মশা তাড়ালেন না। তাহলে মশা মারার যে সুবিধা, সেটি কি পাওয়া যাবে? এই যে সমন্বয়হীনতা এর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান এবং একজন মানুষ দরকার যাকে আমরা বলি আমব্রেলা অর্থাৎ ছাতা। এই ছাতার নির্দেশে সকলেই কাজ করবে।’ ঢাকাকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন উল্লেখ করে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘কেউ যখন অসুস্থ হয় তখন তার সব ট্রিটমেন্ট একসঙ্গে করতে হয়। বাদ দিয়ে করা যায় না। ভেঙ্গে ভেঙ্গে করা যাবে না। এইখানেই আমাদের ব্যত্যয়। একটি দেশ, রাষ্ট্র ও শহর একটি মানুষের শরীরের মতো। এখানেও সমন্বিতভাবে সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে।’
ঢাকার সিটি করপোরেশনের মেয়রদের ক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন বাস ড্রাইভার ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে মেয়র কি তাকে কিছু করতে পারে? পারে না। একজন পুলিশ যদি ঘুষ খায় তাহলে মেয়র তাকে বরখাস্ত করতে পারে না বা ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাই এসব বিষয়ে আগে অর্জন থাকতে হবে। তাহলেই বিদেশের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে।’
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘মানুষ ট্রাফিক আইন মানে না। যখন মন্ত্রী, এমপিরা ট্রাফিক আইন মানে না তখন কেউ তা মানে না। কিন্তু এই দেশের গ্রামের মানুষগুলো যখন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে যায় তারা তো কেউ গাড়িচাপা পড়ে না, ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে না। কারণ, সেখানে তারা আইন মানে। ঢাকা শহরের কিছু শিক্ষিত লোক অন্য দেশের বিমানবন্দরে পৌঁছে নিয়ম মানা শুরু করে। কিন্তু আমাদের বিমানবন্দরে এসেই তারা মারামারি শুরু করে দেন। এটি হয় আইনের সঠিক ও সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ না থাকার কারণে।’ তিনি বলেন, ‘মাত্র তিনদিনে বাচ্চারা বাংলাদেশে এমন কোনো উচ্চপর্যায়ের লোক নেই যে যাকে তারা আটকায়নি। এমনকি একজন পুলিশ কনস্টেবলকে লাইসেন্স না থাকার কারণে ওই পুলিশকে দিয়েই নিজের নামে মামলা করিয়েছে। এরকম নজির বিগত ৪৭ বছরের ইতিহাসে নেই। মানুষ যখন দেখেছে যে ছেলে মেয়েগুলো প্রত্যেককে সমানভাবে দেখছে এবং তাদের বাবার গাড়িকেও চার্জ করেছে তাই চাইলেই এই সমস্যা তিনদিনে সমাধান করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা এসব নিয়ে কাজ করি তারা বলি ৬/৭ মাস লাগবে। কিন্তু তারা তো তিনদিনেই এটি করে দেখিয়েছে। তাই এটি দ্রুতই সম্ভব বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই, পাশেই কলকাতা। সেখানে সবাই আইন মানছে। কলকাতায় মাত্র ৪/৫ বছরে পরিবর্তন হলো কিভাবে? অথচ আমাদের চেয়ে তাদের অবস্থা খারাপ ছিল। সেখানে একটি গাড়ি জেব্রা ক্রসের লাইনের ওপরে দাড়ানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মোবাইলে এসএমএস চলে আসে যে এত টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার বিষয়টি পুলিশও জানে না। আমাদের দেশের গাড়িতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নম্বর প্লেট লাগানো হয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই শেষ। এটি ব্যবহারের জন্য বাকি যে কাজ সেটি আর ব্যবহার করা হয়নি।’ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘দেশে আইনের প্রয়োগ হয়। কিন্তু রহিমের বেলায় হয়, করিমের বেলায় হয় না। আমাদের এ মানসিকতা পরিহার করতে হবে। যে মুহূর্তে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না তখনি রাতারাতি সবকিছু এমনিতেই বদলে যাবে।’
গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আমরা তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ  প্রকাশ করছি। তিনি ব্যস্ত মানুষ। এতবড় দায়িত্ব নিয়ে আমাদের সময় দিবেন সেটা আমি দাবি করতে পারি না।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি যদি ১০ মিনিট সময়ও দেন, তাহলে এখানে যারা আছেন তাদের থেকে যাকে সময় দিবেন তিনি গিয়ে দেখা করবেন। একটা লিখিত সারসংক্ষেপ আপনার কাছে পাঠাবো।
গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আয়োজিত এই সভায় সিরাজগঞ্জ থেকে গত বুধবার গ্রেপ্তার হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক লুৎফুর নাহার লুমার মা রাশেদা বেগমের আহাজারি কাঁদিয়েছে দর্শক-স্রোতাদের।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের মালিক জনগণ। তা বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত সংবিধানে স্বীকৃত। তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়। দেশের মালিক হিসেবেই এখন জনগণকে দাঁড়াতে হবে। গতমাসে ছাত্ররা যা করেছে তা আমাদের জন্য গর্বের। তারা উচিত কথা বলেছে, উচিত কাজ করেছে। এজন্য তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দিন দিন তা বাড়ছে। নির্যাতন করা হচ্ছে। ছাত্রদের মারধর করা যাবে না। ছাত্রদেরকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হচ্ছে। স্বাধীন দেশে এমন বর্বরতা চলতে পারে না।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ঈদুল আজহার আগে গ্রেপ্তার করা ছাত্রদের মুক্তি দিন। এজন্য ৮১ বছর বয়সে আমি আপনার পা ধরে আবেদন করতে পারি। তারা যেন বাড়ি গিয়ে ঈদ করতে পারে।
তিনি বলেন, এদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে উপর-নিচ সবাই রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। এদেশে শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। যে লক্ষ্য বা সমাজ-রাষ্ট্রকে সামনে রেখে এত মানুষ জীবন দিয়েছে তা বৃথা যেতে পারে না। এদেশে অন্যায়, অবিচার, অনুচিত কাজ চলতে পারে না। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সবাই একমত। তা রাজনৈতিক বা দলীয় বক্তব্য নয়। সবার অন্তরের কথা। রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি কর্মকর্তারা দেশের মালিক জনগণের সেবক। পুলিশকে দিয়ে কেউ অন্যায় কাজ করাতে চাইলে সাংবিধানিক বা আইনগতভাবে পুলিশ তা মানতে বাধ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশ আজ ভয়ানক অসুস্থ। এতটাই অসুস্থ যে, সরকার তা বুঝতেও পারছে না। অসুস্থতা বাড়ছে। চবি ভিসি সাবেক প্রধান বিচারপতিকে জুতা মারতে চান। তা অসুস্থতা। রাষ্ট্রপতি অসুস্থ। দুই-তিন মাস পর পর চিকিৎসা করতে দেশের বাইরে যান। বিচারকরা অসুস্থ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ ও আওয়াজ সত্ত্বেও ফটোগ্রাফার শহীদুল আলমকে জামিন দেন না। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে কথা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে তিনি নিয়মিত ঔষুধ খাচ্ছেন না। তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়া নাকি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত। তখন তো খালেদা স্রেফ গৃহবধূ ছিলেন। গুছিয়ে কথাও বলতে পারতেন না। প্রধানমন্ত্রী এসব কী বলেন? ছাত্র আওয়াজ উঠিয়েছিল এই রাষ্ট্রের মেরামত প্রয়োজন। রাষ্ট্রযন্ত্রের চিকিৎসা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, কোটা বা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের চেয়ে যৌক্তিক দাবি আর কী হতে পারে? গণতান্ত্রিক দেশে সে আন্দোলনে রাস্তায় যাওয়া কী অপরাধ? পৃথিবীর কোন দেশে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে হাসি-তামাশা হয় না? গণতন্ত্র মানে সহনশীল হওয়া।
তার আগে বক্তব্য রাখা লুমার মা রাশেদার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, লুমার মায়ের বিলাপে আমার লজ্জা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তার পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নিই। কেন আমরা এই দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধ করেছিলাম। তিনিও আগামী ঈদুল আজহা উপলক্ষে গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রদের মুক্তির দাবি জানান।
ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হৃদয় পাষাণ। ১৫ই আগস্টের আগে অনুরোধ জানিয়েছিলাম গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রদের মুক্তি দিতে। কিন্তু তা হয়নি। নিরাপদ সড়কের মতো এমন ছাত্র আন্দোলন উপমহাদেশে আর হয়নি। কোটা ও নিরাপদ সড়কের এই আন্দোলন মারা যাবে না। তিনি আরো বলেন, এরশাদের আমলে দেশ চালাতো ডিসি, এসপিরা। এখন দেশ চালায় কনস্টেবলরা। সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধীসহ বিভিন্ন ইস্যু কাজে লাগানোর পর এখন টিকে থাকতে দেশ ও সমাজকে বিভক্ত করতে আবার মুক্তিযোদ্ধা ইস্যু ব্যবহার করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা এখন চুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে চুক্তি করো। আমার দল করো। তাহলে তুমি মুক্তিযোদ্ধা। তারা তো আসলে চুক্তিযোদ্ধা।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে সবাইকে কাঁদিয়ে গেল গ্রেপ্তার হওয়া লুমার মা রাশেদা বেগম। মাইক্রো ফোন হাতে নিয়েই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বিলাপে হারিয়ে যায় তার অনেক কথা। এ সময় অনুষ্ঠানে পিনপতন নিস্তব্ধতা চলে আসে। লুমার মা রাশেদা বলেন, আমার স্বামী মারা গেছে ৫ বছর আগে। আমি কষ্ট করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি তিন মেয়েকে। লুমা পড়াশোনা করে চাকরি করতে চেয়েছিল। ছোট মানুষ লুমা হয়তো বুঝে নি। যেদিন আন্দোলনে গেছে সেদিন মামলা হয়েছে। তারপর সে পরীক্ষা না দিয়ে বাড়িতে চলে গেছে। ভয়ে পরীক্ষা দিতে আসেনি। তাকে রাতে এ ঘরে, ও ঘরে লুকিয়ে রেখেছি। ভয়ে সে টেলিভিশনও দেখতো না। এরপর সিরাজগঞ্জে তার দাদার বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। সেখান থেকে আমার মেয়েকে ধরে নিয়ে এসেছে।
বর্তমান সরকারকে প্রতারক সরকার আখ্যা দিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিয়ে যে প্রতারণার শুরু হয়েছে তা এখন কোটা ও সড়ক আন্দোলনেও চলছে। প্রধানমন্ত্রী কোটা তুলে দিবেন বলেছিলেন এবং নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করার পর ছাত্রদের এখন চৌদ্দ শিকের ভিতর ঢুকিয়েছেন। দেশকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোটেক সুব্রত চৌধুরী বলেন, এক সড়কেই যদি এত সমস্যা থাকে। তাহলে দেশে কত সমস্যা আছে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি গত দু’দিন আগেও কেঁদেছেন। আপনার কান্নায় আমরা কাঁদি। কিন্তু আপনি এত উপরে উঠে গেছেন যে লুমার মায়ের কান্নায় আপনি কাঁদেন না। এখানেই আপনার সঙ্গে পার্থক্য।
জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টার সদস্য-সচিব মোস্তফা আমিন বলেন, মানুষের মধ্যে ঐক্য হলে সব সমস্যার সমাধান হবে। দেশকে সংবিধান বিধৃত পথে সাংবিধানিক ধারায় নিয়ে যেতে হবে।
আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান এখনও বাতিল হয়নি। চলমান আছে। সেই সংবিধানের আওতায় এমন কোনো কারণ নেই যে, অনুমতি পাওয়া যাবে না।
গণফোরামের যুগ্ম সহসভাপতি শফিউল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের কোনো সৌজন্যতাই রক্ষা করছে না। আমরা এখন টার্নিং পয়েন্টে এসে গেছি।
ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন দেয়ায় চাকরিচ্যুত নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জিয়াউর রহমান বলেন, ছাত্ররা যৌক্তিক আন্দোলনে মূলত সরকারকে সহযোগিতা করছিল। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। তাদের যৌক্তিক আন্দোলনে সমর্থন দেয়ার অধিকার তো আমার আছে। তারা যোগ্যদের মেধাভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র চেয়েছিল। কিন্তু এখন এই ভয়ের আবহ থেকে নিজেদেরকে যদি মুক্ত না করি, তাহলে সেই ভয় আমাদেরকে আরো খারাপ জায়গায় নিয়ে যাবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাহবুব হোসেন বলেন, সরকার কথায় কথায় বলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী দেখলাম। পুলিশ আইনের পোশাক পরে অনবরত বেআইনি কাজ করছে। শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটি দুর্র্র্নীতি সহ্য করবে না।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ঢাকা মহানগরীর সদস্য-সচিব মোস্তাক আহমেদের পরিচালনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, সংগঠনটির ঢাকা মহানগরীর আহ্বায়ক কর্নেল (অব.) লতিফ মল্লিক, যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হুদা চৌধুরী, মোহাম্মদ হানিফ, মো. হাবিবুর রহমান ও ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক মোহাম্মদ উল্লাহ মধু প্রমুখ।