Last update
Loading...
‘চোখের ইশারায় ছুড়ে দেব সুতীক্ষ্ণ চুম্বন
তুমি দিশেহারা হয়ে যাবে
তুমি পথহারা হয়ে যাবে’
ব্যান্ড সংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী জেমসের গানটি বাংলাদেশি সমাজে ভালোবাসা জানান দেওয়ার নতুন এক ভাষার সূচনা করে, যেখানে ভালোবাসার এক বোহেমিয়ান জাদুকরি প্রভাব নব্বইয়ের তরুণসমাজকে উদ্বেলিত করেছিল। আমার মতো ভক্তকুলের চোখে জেমস ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের রহস্যময় পুরুষ ‘হিমুর’ মতো। এ কথা মানতেই হবে যে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশক ছিল অনেকটা অলিখিত রেনেসঁার মতো; যেখানে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য ও নাটক, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও হেলাল হাফিজের কবিতা আর জেমসের নগর বাউলের মতো ব্যান্ড এ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটা নীরব বিপ্লবের মতো ঘটিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ওই সময়ের সাহিত্য, নাটক ও কবিতা নিয়ে যতটুকু লেখালেখি ও গবেষণা হয়েছে, সে তুলনায় ব্যান্ড সংগীত নিয়ে তেমন কোনো কাজ হয়নি। আমাদের গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এ ধরনের সংগীত থেকে গেছে অচ্ছুতের মতো আর গণমাধ্যমের চোখ থেকে ব্যান্ড সংগীতের শিল্পীদের ‘তারকা’র চোখধঁাধানো কাঠামো থেকে বের করা যায়নি। অথচ আমাদের দেশের ব্যান্ডের শিল্পীরা তঁাদের গানের মাধ্যমে এক নীরব সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন, যে বিপ্লব প্রেমের পাশাপাশি বলে এসেছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কথা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা, দেশপ্রেমের কথা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের কথা, অসাম্প্রদায়িক এক বাংলাদেশের কথা। আমরা জানি যে বিশ্বজুড়ে নানা রকম গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনে সংগীতের ভূমিকা ঐতিহাসিক।
বিশেষ করে ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বর্ণবাদের বৈষম্য ঘোচানোর ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের যে আন্দোলন, সেই বিখ্যাত ‘সিভিল রাইটস মুভমেন্ট’-এর ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানটি বিশ্বব্যাপী এখনো অনেক জনপ্রিয়। এ ছাড়া সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী সংগীতশিল্পী বব ডিলান, ব্রিটিশ ব্যান্ড পিঙ্ক ফ্লয়েড, আইরিশ ব্যান্ড ইউ টু, মার্কিন হিপহপ সংগীতশিল্পী টুপ্যাক শাকুরের যুদ্ধবিরোধী ও সামাজিক বৈষম্যবিরোধী নানা রকম গান সমাজ পরিবর্তনে বিস্ময়কর ভূমিকা রেখেছে। এদের নিয়ে লেখা হয়েছে বিস্তর গবেষণাপত্র এবং প্রকাশিত হয়েছে বহু বই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও সংগীতের ভূমিকা অপরিসীম। শুনেছি এবং ইতিহাস পড়ে জেনেছি, যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত ‘মোরা একটি ফুলকে বঁাচাব বলে যুদ্ধ করি’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানগুলো আমাদের বীর মুক্তিসেনাদের আরও উজ্জীবিত করত দেশ স্বাধীন করতে। যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের হাত ধরেই শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন ধারার সংগীত, যা এখন ব্যান্ড সংগীত নামেই পরিচিত। আজম খানের পর নব্বইয়ের দশকে পুঁজিবাদের বাজার বিস্তার এবং স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে ব্যান্ড সংগীতে আসে এক নতুন জোয়ার। দেশের তরুণসমাজের এক বিরাট অংশের চোখে সমাজে মূল্যবোধ পরিবর্তনের তারকা হিসেবে উঠে আসেন মাকসুদ, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, ওয়ারফেজ, রকস্ট্রাটা, ফিডব্যাক, নোভা, প্রমিথিউস, অর্থহীনসহ অনেক ব্যান্ড ও সংগীতশিল্পী। সমাজ সম্পর্কে কী রকম ছিল এসব ব্যান্ড দলের চিন্তা-ভাবনা? উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যায় ওয়ারফেজ ব্যান্ডের ১৯৯৮ সালের ‘ধূসর মানচিত্র’ নামের এক গানের কিছু কথা, যেখানে ব্যান্ডটি দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের স্বরূপ দেখিয়েছিল এভাবে:
‘এ এক দুঃসময় যখন দেখি সারা পথজুড়ে
নিত্য মৃত, জীর্ণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস উড়ে বাতাসে
আর রাজপথ ভেঙে ছুটে চলে নীল মার্সিডিজ
উদ্যম বৈভবে গণতন্ত্র যার মাঝে বসে
চোখ মারে আর হাসে।’
গণতন্ত্রের নামে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতার (সবাই নন) রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যে হাহাকার, তা-ই উঠে এসেছিল ১৯৯৮ সালে ওয়ারফেজের গানটিতে; কিন্তু তেমন গুরুত্ব পায়নি আমাদের গণমাধ্যম, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে। আর সেখানেই সংঘটিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক ভুল, যার ফল এখন আমরা দেখছি ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণু সামাজিক সংস্কৃতিতে এবং এক সুবিধাবাদী রাজনীতির শিকল, যা গণমানুষের মুক্তি ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের কথা কমই বলে। গণতন্ত্র মানে আসলে কী? আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষের কাছে এটা হয় নির্বাচন অথবা উন্নয়ন কিংবা নির্বাচন ও উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক থেকে গণতন্ত্রের মানে অনেকটা সাংস্কৃতিক। এই সংস্কৃতিতে আছে কথা বলার স্বাধীনতার সংস্কৃতি, নিজের অধিকার রক্ষার সংস্কৃতি, গরিবের দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে ছুটে চলা ‘গণতন্ত্রের নীল মার্সিডিজে’ বসে থাকা রাজনীতিবিদদের গরিবের কাছে জবাবদিহির সংস্কৃতি, ভিন্নমতকে সম্মান করা, অর্থাৎ মুক্তমনের সংস্কৃতি ইত্যাদি। যেকোনো সংস্কৃতি একটা সামাজিক অভ্যাস হিসেবে ব্যাপক চর্চার মধ্যে সংস্কৃতিতে রূপ নেয় এবং এ জন্য দরকার হয় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। কিন্তু ব্যান্ড সংগীত আমাদের দেশে একটা ‘অনাহূত আগন্তুকের’ মতোই থেকে গেল। একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই সংস্কৃতির খোঁজ পাওয়া যাবে না বাংলাদেশ নিয়ে লেখা কোনো ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞানের বইয়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো গবেষণায়। ব্যান্ড সংগীত কেমন যেন অচ্ছুতের মতো—এটাকে ব্যবহার করা যাবে কিন্তু স্বীকৃতি জানানো যাবে না—এই মনোভাব প্রকারান্তরে ক্ষতি করেছে বাংলাদেশের। কারণ আগেই বলেছি, এই ব্যান্ডগুলো শুধু প্রেম-ভালোবাসার গানই করেনি; বছরের পর বছর ধরে তাদের গানে উঠে এসেছে গণতন্ত্রের নামে অর্থনৈতিক লুটেরাদের সামাজিক চোটপাট (‘গণতন্ত্র মানে মুক্তবাজারের দগ্ধ আগুন আর শেয়ারবাজার লুটেরা কোটিপতি বেড়েছে কতশত গুণ, তাই গণতন্ত্র মানে মধ্যবিত্তের হয়ে যাওয়া অন্ধ’,—মাকসুদ ও ঢাকা), স্বৈরাচারের সঙ্গে ওঠবস (‘গণতন্ত্র মানে বিশ্ববেহায়া মুক্ত বাতাসে কবিতা লেখে আর দেশপ্রেমিক জনতা নব্বইয়ের ইতিহাস ভুলেই গেছে’—মাকসুদ ও ঢাকা), গণতন্ত্রের নামে রাজপথে শহীদ হয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া মানুষগুলোর কথা (‘গণতন্ত্র মানে কিছু বোকার মিছে শহীদ হওয়া, আজ কাকের হাগায় তাদের স্মৃতিসৌধ ছাওয়া’—মাকসুদ ও ঢাকা), উগ্রবাদের সমালোচনা (‘কোন পথে আমরা চলছি হায় পরওয়ারদিগার, তোমার অস্তিত্ব স্বীকার করি আমরা যে গুনাহগার, ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের নাম দিলাম মৌলবাদ, পাল্টে জবাব ওরা দিল আমাদের “তোরা নাস্তিক মুরতাদ”’—মাকসুদ ও ঢাকা) এবং সর্বোপরি আমজনতার ক্ষমতাহীন হয়ে থাকার কথা (‘এক রাজ, আর গণতন্ত্র মিশে একাকার, আমরা যে ভাই আমজনতা, একটু ক্ষান্ত দাও’—অর্থহীন ব্যান্ড)। কিন্তু এত মেধাবী মাধ্যম হওয়ার পরও এই সাংস্কৃতিক মাধ্যমকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে উপেক্ষা করার সংস্কৃতি প্রকারান্তরে ক্ষতি করেছে বাংলাদেশের।
ব্যাপারটার পেছনে কিছুটা রাজনীতিও জড়িত। কারণ, আমরা যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করেছি, সেখানে নেই ব্যান্ড সংগীত। কারণ নিন্দুকের মতে, তারা হচ্ছে ‘অপসংস্কৃতি’ বা ‘বাজে ছেলেদের’ সংগীত। আরও নানা রকম সামাজিক কারণও আছে, যেমন নব্বই অথবা এর পরের দশকের সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক গবেষক—যঁাদের অনেকেই আমার শিক্ষক ও সাংবাদিক, লেখক—তঁারা তরুণদের এই সংগীত বুঝতে পারেননি বা চাননি। এটা ছিল অনেকটা ইচ্ছা করে নাক সিটকিয়ে থাকার মতো ব্যাপার। কারণ, যঁারা ব্যান্ড সংগীতের আন্দোলনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তঁাদের অনেকেই হয়তোবা একটা বঁাধাধরা নিয়মে জীবন যাপন করেননি। কারও কারও ব্যক্তিগত উদ্দামতা, জীবনযাপনের ধরনও দূরে ঠেলে দিয়েছে আমাদের নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের। কিন্তু শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন ও তঁার শিল্প বা তঁার সৃষ্টি যে আলাদা হতে পারে, তা অনেকেই মানতে চাননি, বুঝতে চাননি। ফলে আজম খানের শুরু করা এই সংগীত আন্দোলন কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বোঝা দরকার, উগ্রবাদের এই যুগে ব্যান্ড সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দরকারি। মনে রাখতে হবে যে গণতন্ত্রহীনতা ও জঙ্গিবাদ যেমন একধরনের সংস্কৃতি, তেমনি গণতন্ত্র ও সহিষ্ণুতাও একধরনের সংস্কৃতি। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু এবং নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে—যে সংস্কৃতি গণমানুষের কাছে পৌঁছায়, যে সংস্কৃতি উদারতার কথা বলে, সেই সংস্কৃতিকে প্রণোদনা দেওয়া, উপেক্ষা না করা। ব্যান্ড সংগীতের এই শক্তিটাকে রাষ্ট্রের ও সমাজের নীতিনির্ধারকদের বোঝা দরকার—মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করার লক্ষ্যে।
ড. মোবাশ্বার হাসান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
হজযাত্রায় মধ্যস্বত্বভোগী দালাল ঠেকাতে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এ জন্য চূড়ান্ত নিবন্ধনের সময় হজ প্যাকেজের সব টাকা ব্যাংকে জমা নেয়ার বিধান করতে যাচ্ছে তারা। এতে হজযাত্রার শেষদিকে প্রতি বছর বিমান টিকিটের অভাবে অনেকেই হজে যেতে না পারার বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী হজে ট্রলি ব্যাগ হাবের পরিবর্তে হাজীদের নিজেদের কিনে নেয়ার বিধান করতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। এভাবে হাজীবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ২০১৮ সালের হজের নীতিমালা করতে যাচ্ছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহে এ নীতিমালা মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত বছর হজ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সঙ্কট দেখা দেয়। দফায় দফায় ফ্লাইট বিপর্যয়ের পর শেষ দিকে অনেক হাজী প্রতারণার শিকার হয়ে হজে যেতে পারেননি। ফলে তারা হজক্যাম্পে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তদন্তে জানা যায়, গত বছর দু’টি হজ প্যাকেজের সর্বনি¤œ প্যাকেজ ছিল তিন লাখ ১৯ হাজার টাকা। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী দালালরা গ্রামের হজযাত্রীদের এর থেকে কম টাকায় হজ করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে তিন লাখ ১৯ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। মূল হজ এজেন্সির সাথে হজযাত্রীদের সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় এসব দালাল হজযাত্রীদের কাছ থেকে বেশি টাকা নিলেও এজেন্সিগুলোকে কম টাকা দেন। বাকি টাকা তারা নিজেরা রেখে দেন। আর হজ প্যাকেজ থেকে কম টাকা পাওয়ায় বেসরকারি এজেন্সিগুলো এসব হজযাত্রীকে এড়িয়ে চলেন। তাদের পরিবর্তে রিপ্লেসমেন্টের সুবিধা নিয়ে তালিকার বাইরে থাকা হজযাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে হজে পাঠিয়ে থাকেন। এসব হজযাত্রী শেষ দিকে সমস্যায় পড়লে যেমন দালালদের খুঁজে পান না, তেমনি হজ এজেন্সিগুলোরও দেখা পান না। হজক্যাম্পে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনতে দেখা যায় তাদের। কয়েক বছর থেকেই এ রকম ঘটনা ঘটে আসছে। এ জন্য বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। ২০১৮ সালের হজ নীতিমালায় এ জন্য বেশ কিছু নতুন নিয়ম সংযোজন করতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। জানা যায়, এরই মধ্যে হজ নীতিমালা তৈরির পর মন্ত্রিপরিষদ দফতরে পাঠানো হয়েছে। আগামী সভায় এটি মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেতে পারে। জানা যায়, প্রতি বছরই হজ প্যাকেজের সব টাকা আগাম পরিশোধ করে ভিসা থাকার পরও শুধু টিকিটের টাকা নিয়ে ঝামেলায় হজে যাওয়া হয় না অনেক হজযাত্রীর। গত বছরও এ ধরনের প্রায় দুই শ’ প্রতারিত হজযাত্রী টিকিটের টাকা পরিশোধ করেও হজে যেতে পাারেননি। দালাল-ফড়িয়া ও সাব-এজেন্ট টিকিটের টাকা আত্মসাৎ করায় এবার এ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এবারের নীতিমালায় ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেয়া বিমানের টিকিটের টাকা কিছুতেই মূল বা সাব-এজেন্ট উত্তোলন করতে পারবে না। হজ প্যাকেজের ঘোষিত টাকা ব্যাংকে জমার পর তা ব্লক করে রাখা হবে। পরে এ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে শুধু বিমান টিকিট বাবদ বাংলাদেশ বিমান বা সৌদি এয়ারলাইন্সের অনুকূলে ব্যয় করতে পারবে হজ এজেন্সি। হজ চূড়ান্ত নিবন্ধনের সময় সব টাকা নেয়ার বিষয়ে বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাবের পক্ষ থেকেও হজ এজেন্সিগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি হাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তা এজেন্সিগুলোকে ডেকে নিয়ে বলে দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে হাবের মহাসচিব শাহাদাত হোসাইন তসলিম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে চাই। এ জন্য পুরো টাকা নিয়ে তার পর নিবন্ধন করার জন্য বেসরকারি হজ এজেন্সি মালিকদের বলে দেয়া হয়েছে। পরে কোনো সমস্যা হলে দায়ভার তাদের বহন করতে হবে। তিনি বলেন, দালাল প্রতিরোধ ছাড়া হজযাত্রার প্রতারণা বন্ধ করা যাবে না। এ দিকে প্রতি বছর হাজীদের ট্রলি ব্যাগ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। গত বছরও ব্যাগ না পেয়ে চার শতাধিক হজযাত্রী সৌদি চলে যেতে বাধ্য হন। এ ছাড়া অনেক এজেন্সি নি¤œমানের ব্যাগ সরবরাহ করেন। মূলত গত বছর ট্রলি ব্যাগ বানানোর দায়িত্ব দেয়া হয় হাবকে। কিন্তু বিগত সময়ের দুর্নামের কারণে গত বছর তারা নিজেরা না করে এজেন্সিগুলোকে ব্যাগ বানানোর দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ধর্ম মন্ত্রণালয় সময়মতো তাদের আগেই জমা দেয়া টাকা ফেরত না দেয়ায় গত বছরও ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এ জন্য এ বছর ট্রলি ব্যাগের দায়িত্ব হাজীদের নিজেদের ওপর দেয়ার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়।এ ছাড়া প্রস্তাবিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিমান টিকিটের পেছনে মক্কা-মদিনার বাড়ির ঠিকানা লেখা থাকতে হবে। নইলে জেদ্দা এয়ারপোর্ট থেকেই তাকে ফেরত দেয়া হবে। ঢাকা থেকে হজযাত্রী ফ্লাইটের টিকিট যখন বুঝে পাবেন, তখনই তার পেছনে মক্কা-মদিনার যেই বাড়ি বা হোটেলে থাকবেন, তার নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে দেয়া হবে; যাতে জেদ্দা বিমানবন্দরে নামার সাথে সাথে সেখানকার প্রতিনিধিরা বুঝতে পারেন এরই মধ্যে তার বাড়িভাড়া নিশ্চিত করা হয়েছে। গত বছর অনেক হজযাত্রীকে বাড়িভাড়া না করেই ঢাকা থেকে মক্কা নেয়া হয়। সেখানে তাদের হেরেম শরিফ থেকে অনেক দূরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাসাবাড়িতে রাখা হয়। এয়ারকন্ডিশন নেই এমন বাড়িঘর, এমনকি কবুতরের খোপের মতো ঘরে হজযাত্রীদের রাখা হয়। গতবারের মতো এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আর যাতে কোনো হজযাত্রীকে পড়তে না হয় সে জন্য এবার ঢাকা থেকেই হজযাত্রীর সুনির্দিষ্ট বাসাবাড়ি বা হোটেলের ঠিকানা নিশ্চিত করতে হবে। যদি কোনো এজেন্ট এ কাজটি না করে তাহলে ওই হজযাত্রীকে ফ্লাইটের টিকিট দেয়া হবে না। এবার রিপ্লেসমেন্টের বিষয়ে খুব কড়াকড়ি করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। গত বছর প্রথমে ছিল ৫ শতাংশ। পরে সেটি ১৫ শতাংশ করা হয়। এবার তা কিছুতেই ৫ শতাংশের বেশি করা হবে না বলে জানা গেছে। মৃত্যু ও গুরুতর অসুস্থতাজনিত কারণ ছাড়া অতিরিক্ত রিপ্লেসমেন্ট হবে না। এ ব্যাপারে ধর্ম মন্ত্রণালয়রে যুগ্মসচিব (হজ) হাফিজ উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, হজযাত্রীদের সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাবনা রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে এবারের হজ নীতিমালা। নীতিমালা ইতোমধ্যে কেবিনেট শাখায় পাঠানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে আগামী সপ্তাহেই এ নীতিমালা কেবিনেট বৈঠকে অনুমোদিত হবে।
এই কলামের প্রেক্ষাপট
দিল্লি দূর-আস্ত। মানে, দিল্লি অনেক দূর। ‘দিল্লি’ শহরের নামটি প্রতীকী অর্থে নিলাম। আজকের কলামের প্রথম অর্ধেকে ইতিহাসের একটি গল্প তুলে ধরব; দ্বিতীয় অর্ধেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিকতম রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মন্তব্য করছি। ইতিহাসের গল্পটি এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার জন্য সম্মানিত পাঠককে অনুরোধ করব। ইতিহাসের গল্পটিতে ছয় শ’ বছর আগের তুঘলক বংশের এবং প্রসিদ্ধ আউলিয়া হজরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার কথা আছে। মোগল সম্রাটরা তথা ভারত শাসনকারী মোগল বংশের কথা সবারই জানা। এর আগে যারা ভারত শাসন করেছিলেন, সে সম্বন্ধে জানার সুযোগ কম। মামলুক বংশ ও খিলজি বংশের পর ভারত শাসন করেছিল তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৪)। তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতার আদি নাম গাজী মালিক; কিন্তু তিনি সুলতান হিসেবে গিয়াস আল-দ্বীন তুঘলক বা গিয়াসউদ্দিন তুঘলক নামেই ইতিহাসে সুপরিচিত; তার পরবর্তী সুলতান ছিলেন তারই দ্বিতীয় ছেলে জুনা খান, যিনি মুহাম্মদ বিন তুঘলক নামে শাসন করেছেন। ‘আউলিয়া’ শব্দের অর্থ অনেকটা এ রকম : আল্লাহর বন্ধু তথা সৎ কর্মশীল বান্দাগণ বা প্রকৃত মুমিনগণ অর্থাৎ সার্বিকভাবেই দ্বীন ইসলামের শরিয়ত ও মারেফত পালনকারী ব্যক্তিগণ। পবিত্র কুরআনের দশম সূরা (ইউনুস) ৬২ নম্বর আয়াতে বলা আছে : নিশ্চয়ই আল্লাহর আউলিয়াগণের দুঃখিত বা শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যা হোক, আমার আলোচনা ‘আউলিয়া’ শব্দের সংজ্ঞার ওপরে নয়; আমার আলোচনা মানুষের আশা আর সৃষ্টিকর্তার নির্দেশের মাঝখানের অংশ নিয়ে। অর্থাৎ, ইংরেজিতে যাকে বলে- ‘ম্যান প্রপোজেস অ্যান্ড গড ডিসপোজেস।’
ইতিহাসের একটি গল্প
সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক কঠোর প্রকৃতির শাসনকর্তা ছিলেন। মানুষ তার শাসন থেকে নিষ্কৃতি চাচ্ছিল। তৎকালীন রাজধানী দিল্লি শহরে একদিন প্রত্যুষে গুজব রটে গেল যে, বাদশাহ গিয়াসউদ্দিন তুঘলক মারা গেছেন। রাজধানীর নাগরিকরা, সত্য মনে করে খবরটিতে খুব আনন্দিত হলো, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল। এই খবর যখন বাদশাহ’র কাছে পৌঁছল, তখন তিনি রাগান্বিত হলেন। ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন- ‘মানুষ আমাকে গুজবের মধ্যে মেরেছে, আমি তাদেরকে আসলেই মারব।’ নগরীর কোতোয়ালকে হুকুম দিলেন, গুজব রটনাকারীদের হত্যা করা হোক। কোতোয়াল এই কার্য সম্পাদনে লিপ্ত হলেন। কে গুজব রটনা করেছিল আর কে করেনি, এটা বের করা কঠিন ছিল। অতএব, নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু হলো। কয়েক হাজার মারা গেল, হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকে। সম্রাটের হুকুমে মারা যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য দিল্লির নাগরিকরা আশ্রয়ের সন্ধান করলেন। তৎকালীন দিল্লি থেকে মাইল তিরিশেক দূরে ছিল ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আস্তানা। দিল্লি থেকে নাগরিকরা পালিয়ে সেই আস্তানায় উপস্থিত হলেন। আস্তানায় মানুষ বাড়তে লাগল; খাবার পানি ও ব্যবহারের পানির সঙ্কট দেখা দিলো। ভূগোলের জ্ঞান আছেÑ এমন মানুষমাত্রই জানেন যে, অতীতের বা বর্তমানের দিল্লি মহানগরী চতুর্দিকে মরুভূমি দ্বারা বেষ্টিত। পানির সঙ্কট মেটানোর জন্য নিজাম উদ্দিন আউলিয়া ভক্তদের বললেন, পুকুর খনন করো। যেই কথা সেই কাজ; বিনা পারিশ্রমিকে শত শত, হাজার হাজার ভক্ত পুকুর খননের কাজে লাগলেন। রাজধানী দিল্লিতে সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক এই সংবাদ পেয়ে রেগে গেলেন। উজিরকে হুকুম দিলেন, ঘোষণা করে দাও, আমার এখানে পুকুর খোঁড়া হবে এবং পারিশ্রমিক হিসেবে প্রত্যেকেই দিনে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা পাবে। বাদশাহ অনুমান করলেন, স্বর্ণমুদ্রার আশায় দিল্লিবাসী দূরে যাবে না এবং যারা গেছে তারা ফেরত আসবে। কিন্তু বাদশার ঘোষণায় কাজ হলো না। দিল্লিবাসী ফকির নিজাম উদ্দিনের আস্তানার দিকে যেতেই থাকলেন। এতে বাদশাহ আরো ক্রুদ্ধ হলেন। হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘তবে রে!’ সেনাপতিকে বললেন, ‘ফকিরের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়া হোক, সৈন্যদল পাঠাও।’ ফকিরের আস্তানা ধ্বংসের অভিযান শুরু করার আগেই সুলতান গিয়াসউদ্দিনের কাছে সংবাদ এলো, দূরবর্তী প্রদেশে বিদ্রোহ হয়েছে। সুলতান বিবেচনা করলেন, বিদ্রোহ দমন করা অতিশয় জরুরি; ফকিরের আস্তানা পরে ধ্বংস করা যাবে। তিনি দূর প্রদেশে বিদ্রোহ দমনের জন্য সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে রওনা দিলেন। হাতে-কলমে যুদ্ধবিদ্যা ও সেনানায়কত্ব শিক্ষা দেয়ার জন্য, বড় ছেলে আহমদ বিন তুঘলককে সাথে নিলেন। রাজধানী দেখাশোনা করার জন্য রেখে গেলেন দ্বিতীয় ছেলে মুহাম্মদ বিন তুঘলককে। ইতিহাস বলে, মুহাম্মদ বিন তুঘলক ফকির নিজাম উদ্দিনের ভক্ত ছিলেন। সুলতান বিদ্রোহ দমনার্থে দূরবর্তী প্রদেশে পৌঁছলেন, বিদ্রোহ দমন করলেন এবং পুনরায় দিল্লি অভিমুখে রওনা দিলেন। প্রতিদিন যোজন পথ অতিক্রম করে দিল্লির নিকটবর্তী হতে থাকেন। ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আস্তানায় ভক্তরা নিবেদন করেন, হুজুর বাদশাহ এসে তো আপনাকে এবং আমাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে। নিজাম উদ্দিন আউলিয়া উত্তর দেনÑ দিল্লি দূর-আস্ত। এর বাংলায় অর্থ, দিল্লি অনেক দূর। ভক্ত, যুবরাজ মুহাম্মদ বিন তুঘলক নিজেও ফকিরের নিকট এসে আরজি পেশ করলেন : ‘আমার বাবা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। তিনি দিল্লির অনেক কাছে চলে এসেছেন। তিনি এসেই আস্তানা আক্রমণ করবেন। তিনি আপনাকে অপমান করবেন। আস্তানা ধ্বংস করবেন। আপনি এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যান ভক্তদের নিয়ে, আমি সাহায্য করব। রাজকোষ থেকে কিছু লাগলে আমি দেবো, বাদশার নিষ্ঠুরতার কথা কল্পনা করে আমার আত্মা কাঁদছে। হুজুর, আপনি চলে যান।’ ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়া যুবরাজ মুহাম্মদকে উদ্দেশ করে বললেনÑ ‘বাবা, চিন্তা করো না। দিল্লি অনেক দূর, দিল্লি দূর-আস্ত। সম্রাটের বহর রাজধানীতে ঢোকার মাত্র দুই দিনের পথ বাকি। যুবরাজ মুহাম্মদ বিন তুঘলক ঠিক করলেন বিদ্রোহ দমনকারী পিতাকে সংবর্ধনা দেবেন, জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা দেবেন, বিরাট প্যারেডের মাধ্যমে স্যালুট দেবেন। যেই কথা সেই কাজ। যুবরাজ ভাবলেন, এই অছিলায় একটা দিন তো পাওয়া যাবে; নিজাম উদ্দিন আউলিয়া সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন আস্তানা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। ফকিরের নিকট পুনরায় সংবাদ গেল; কিন্তু তিনি জানালেন. দিল্লি এখনো অনেক দূর, দিল্লি হনুজ দূর-আস্ত।’ যুবরাজ মুহাম্মদ কিছুই বুঝলেন না। কারণ, তিনি দেখছেন সবাই দেখছে, বাদশাহ দিল্লি ঢোকার জন্য মাত্র এক দিনের পথ বাকি। কিন্তু কথাটা কেউ বলতে পারছে না মুখ ফুটে। কেউ ফকির নিজাম উদ্দিনের কথার হিসাবও মেলাতে পারছে না। সংবর্ধনা শুরু হলো; মঞ্চের সামনে দিয়ে অশ্বারোহী বাহিনী, উট আরোহী বাহিনী পার হয়ে গেল। সবশেষে পার হচ্ছে হাতি-বাহিনী। অনেকগুলো হাতি সুশৃঙ্খলভাবে, মাহুতের নির্দেশে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং শুঁড় তুলে বাদশাহকে সালাম দিচ্ছে। হঠাৎ একটি হাতি উত্তেজিত হয়ে উঠল; প্রথমে নিজের পিঠে চড়া মাহুতকে পিঠের ওপর থেকে শুঁড় দিয়ে তুলে ধরে দূরে নিক্ষেপ করল। তারপর উন্মত্ত হাতি ছুটে গেল মঞ্চের দিকে। মঞ্চের মোটা মোটা থাম ধরে দিলো টান। ফলে মঞ্চ ভেঙে পড়ল। অনেক হতাহত হলো। উন্মত্ত হাতি আশ্রয় নিলো উন্মুক্ত মরুভূমিতে। উদ্ধারকারী কর্মীরা মঞ্চের ভগ্নস্তূপ সরালেন; দেখলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক উপুড় হয়ে তার ছেলে আহমদ বিন তুঘলককে আগলে রেখেছেন। সুলতান চেয়েছিলেন নিজে মারা গেলেও প্রিয় ছেলে আহমদ যেন বাঁচে। কেউই বাঁচেননি, গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ও আহমদÑ দু’জনই নিহত হয়েছিলেন। ফলে যুবরাজ মুহাম্মদ বিন তুঘলক অপ্রত্যাশিতভাবেই সিংহাসনে আরোহণ করলেন।
এ কাহিনীর উপসংহার
সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক পরবর্তী প্রথম প্রহরেই ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার আস্তানায় ছুটে গেলেন; মহান আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তিনি নতুনভাবে নব উদ্যমে ফকিরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের জন্য দিল্লি নিজের হয়ে গেল। অপর দিকে, গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ও তার সন্তান আহমদ বিন তুঘলকের জন্য দিল্লি অনেক দূরেই থেকে গেল। অপবিত্রদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয় পবিত্ররা; যারা লক্ষ্যবস্তু থেকে দূরেই থাকে। দয়াবানগণ আক্রমণের শিকার হন নিষ্ঠুরদের; নিষ্ঠুরতারও একটা শেষ থাকে। চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলাম। ক্লাস এইটে অথবা নাইনে যখন পড়ি, র‌্যাপিড রিডার হিসেবে একটি বইয়ের অংশ পড়েছিলাম। বিংশ শতাব্দীর মধ্য অংশের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বিনয় চাঁদ মুখোপাধ্যয় (বহুলপরিচিত ছদ্মনাম যাযাবর)-এর লেখা অন্যতম উপন্যাস বা গল্পের বইয়ের নাম দৃষ্টিপাত; যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। ‘দৃষ্টিপাত’-এর একটা অংশ আমাদের পড়তে হয়েছিল। ওই অংশেই ছিল, নিরীহ প্রজাদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালানো এবং আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ হজরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার সাথে বেয়াদবি করার পরিণতিতে দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিনের ভাগ্যে যা ঘটেছিল, তার বর্ণনা। পরবর্তীকালে নিজের উদ্যোগে ‘দৃষ্টিপাত’ উপন্যাস পুরোটাই পড়েছি। আমার মূল্যায়নে সুখপাঠ্য ইতিহাসনির্ভর গল্পের বই এটি। বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করতেই হয় আমাকে। কারণ নিজে একজন সাবেক সেনা কর্র্মকর্তা এবং এখন রাজনৈতিক কর্মী। কারণ, আমি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামক একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান। কল্যাণ পার্টি ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল। এরূপ চিন্তা করতে গেলে মাথায় অনেক কিছুই আসবে। ওপরের অনুচ্ছেদগুলোতে প্রকাশিত বা উদ্ভাসিত বিষয় অনেকগুলো। আমরা কয়েকটা সংক্ষিপ্ত বাক্যে মূল বিষয়টা তুলে ধরি। এক. সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক নৃশংস ছিলেন। দুই. তিনি ফকির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার প্রতি আক্রমণাত্মক তথা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতি আক্রমণাত্মক ছিলেন। তিন. গিয়াস উদ্দিন তুঘলক চেয়েছিলেন, তার পরে তার প্রথম ছেলে যখন সালতানাতের দায়িত্ব নেবে, সে যেন শাসনকার্যে ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হয়। চার. মুহাম্মদ বিন তুঘলক ফকির নিজাম উদ্দিনের ভক্ত এবং প্রজাবৎসল ছিলেন। পাঁচ. নিজাম উদ্দিন আউলিয়া মানুষকে ভালোবাসতেন; মানুষকে ফেলে তিনি অন্যত্র চলে যাননি। ছয়. সাধারণত মানুষ জানে না, তার ভাগ্যে কী আছে; যেমনÑ গিয়াসউদ্দিন তুঘলক জানতেন না যে, অদৃষ্টে অপমৃত্যু আছে বা মুহাম্মদ বিন তুঘলক জানতেন না যে, তার ভাগ্যে সিংহাসন আছে।
টেইলর মেড কাকে বলে বা কেন বলে?
আজকাল রেডিমেড পোশাক প্রচুর। ঈদের সময় ছাড়া দর্জির কাছে গিয়ে প্যান্ট ও জামার মাপ দিয়ে কাপড় বানানোর রেওয়াজ প্রায় উঠে যাচ্ছে। দর্জি প্রত্যেকের পছন্দ মোতাবেক কাপড় সেলাই করে দেন। কাস্টমারের শরীরে যেন ফিট হয় সে ভাবেই কাপড়টি সেলাই করা হয়। তাই এটার নাম টেইলর মেইড, অর্থাৎ দর্জির বানানো। সেই থেকে ইংরেজি শব্দযুগল ‘টেইলর মেইড’। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক কর্তৃক প্রদত্ত রায়টিও ছিল আমার মূল্যায়নে টেইলর মেড; তদ্রƒপ জনমনে ব্যাপক ধারণা হলোÑ বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে প্রদত্ত রায়টিও টেইলর মেইড, অর্থাৎ ফরমায়েশ মোতাবেক বানিয়ে দেয়া। চলছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ৮ ফেব্রুয়ারি বের হলো বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে সেই রায়। এটা স্পষ্ট যে, এ মামলাটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা এবং রায়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে টেইলর মেইড।
সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী? রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো, যে নিয়মেই হোক না কেন, ইংরেজিতে : বাই হুক অর বাই ক্রুক, অর্থাৎ ছলে বলে কৌশলে যেভাবেই হোক না কেন, আগামী নির্বাচনে জিততে হবে। ইংরেজি পরিভাষায় : বাই ফেয়ার মিনস অর আনফেয়ার মিনস, দ্যাট ইজ, টু সে বাই এনি মিনস। অর্থাৎ সৎ বা অসৎ নিয়মে, যেভাবেই হোক, আগামী নির্বাচনে জয়ী হতেই হবে। এ কথাটাকে খেয়ালে রেখেই বর্তমান রাজনৈতিক সরকার তাদের কর্মপন্থাগুলো স্থির করছে। তাদের উদ্দেশ্য পূরণের পথে অনেক প্রকার বাধা আছে; যথা এক. অপহরণ গুম ও খুনের অভিযোগ। দুই. অব্যাহত ও বিবিধমুখী ‘ঐতিহাসিক’ দুর্নীতিগুলো। তিন. বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড যথা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এর বিডিআর হত্যাযজ্ঞ, একতরফাভাবে ভারতকে সুবিধা দেয়া। তাদের সামনে বাধাগুলোর মধ্যে ভিন্ন ধরনের বাধা হলোÑ বিএনপির জনপ্রিয়তা তথা বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা। আপাতত আমরা কলামের এই অংশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং বেগম জিয়া প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা : যুগে যুগে দেশে দেশে
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য অস্বচ্ছ অবৈধ পন্থা অবলম্বনের উদাহরণ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আছে। ১৯১৭ সালে লেনিন রাশিয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করলে, ট্রটস্কি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দেন। একপর্যায়ে লেনিন ট্রটস্কিকে সশরীরে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেন। পরবর্তী শাসক স্টালিনও অনুরূপ কাজ করেছেন। বিশ্ববিখ্যাত ও মালয়েশিয়ার ২২ বছরের প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ তার প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার ইবরাহিমকে রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে বিতাড়নের জন্য তার বিরুদ্ধে সমকামিতার মতো অবিশ্বাস্য অভিযোগ এনে ফরমায়েশি রায়ের মাধ্যমে তাকে দণ্ডিত করেন। আমেরিকার এককালীন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে হয়রানি করার জন্য এর হেডকোয়ার্টারে আড়িপাতার যন্ত্র বসিয়েছিলেন (ইতিহাসে এটা ‘ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত)। নিকট অতীতে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে, হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ব্যক্তিগত ই-মেইল আইডি থেকে সরকারি বার্তা আদান-প্রদান করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি তার দেশের, সরকারি অর্থ তহবিল, সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি গোয়েন্দাবাহিনী ও বিচার বিভাগের অনুগত ব্যক্তিদের ব্যবহার করেছেন নিজের ক্ষমতার স্বার্থে। মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, ইরানের শাহানশাহ রেজা পাহলভী, রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট চসেস্কু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এ ক্ষেত্রে কয়েকটি মাত্র উদাহরণ।
ওয়ান-ইলেভেন সরকারের উত্তরসূরি
রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম জিয়াউর রহমান তথা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও এর নেত্রী চক্ষুশূল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর চক্ষুশূল। আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এ নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। তবে প্রতিযোগিতা স্বচ্ছ হওয়া বাঞ্ছনীয়; কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা ওইরূপ স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। তাই তারা প্রতিদ্বন্দ্বীকে দৃশ্যপট থেকে অপসারণ করতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য বেছে নেয়া বেশ কিছু পন্থার মধ্যে অন্যতম পন্থা বা অস্ত্র হলো রাজনৈতিক মামলা। ২০০৭ ও ২০০৮ এই দু’টি বছরকে বাংলাদেশে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সময় বলা হয়। ওই সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রকাশ্য প্রধান ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ এবং অপ্রকাশ্য প্রধান ছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। তাই বলা হয়, এটা উদ্দীনদের সরকার। ওই সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকার বাংলাদেশকে বিরাজনীতিকরণ করতে চেয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য সম্পাদনের লক্ষ্যে ওই সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অনেক মামলা দিয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেন সরকার দু’নেত্রীকে বিভিন্ন প্রকারের হয়রানি করে। হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য ভুক্তভোগী মাননীয় শেখ হাসিনা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোÑ ওয়ান-ইলেভেন সরকারকে আশ্বাস দেয়া যে, আমি তোমাদের পক্ষে আছি এবং তোমাদের সব কর্মকাণ্ডকে অনুমোদন দেবো; তথা তোমাদেরকে অভিযুক্ত করব না।’ ওয়ান-ইলেভেন সরকার যখন দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কাবু করতে পারল না, তখন সেই সরকার দু’জনের যেকোনো একজনের সাথে আপস করার সিদ্ধান্ত নিলো। বেগম জিয়া ছিলেন আগ থেকেই আপসহীন নেত্রী; তিনি আপস করতে রাজি হলেন না। শেখ হাসিনা ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সামরিক সরকারের সাথে আপস করেছিলেন, ফলে আপসের কিঞ্চিত অভিজ্ঞতা ছিল; তিনি ‘উদ্দীন’দের সাথে আপস করলেন। অতিসম্প্রতি প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক বইয়ের মাধ্যমে জানতে পারলাম, ভারতের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ২০০৮ সালে এই কাজে মধ্যস্থতা করেছিলেন। ২০০৮-এর ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন হলো। ‘উদ্দীন’দের সরকার এবং আওয়ামী নেত্রীর মধ্যকার আপসের শর্ত মোতাবেক, ওই সরকারের কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কোথাও উপস্থাপিত হলো না। সে আপসের শর্ত মোতাবেক, তিনি ওই সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে অনুমোদন দিলেনÑ কোনো ক্ষেত্রে নীরবে, কোনো ক্ষেত্রে সরবে। অনুমোদন দেয়া কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, ওয়ান-ইলেভেন সরকার কর্তৃক বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো চালু রাখা। ওই রকমই অব্যাহত রাখা একটা মামলার রায় প্রকাশ করা হয়েছে গত ৮ ফেব্রুয়ারি। সম্মানিত পাঠককে আমার পক্ষ থেকে জানিয়ে রাখতেই হবে, ওয়ান-ইলেভেন সরকার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যতগুলো মামলা দিয়েছিল; সেই মামলাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আইনকানুনের ফাঁক ব্যবহার করে ‘আইনি’ পন্থাতেই প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। কোনো আদালতে সে মামলাগুলোর বিচার হয়নি। এই যে পুরো প্রক্রিয়া, এটাকে কি বলা যায়- দুই নেত্রীর মধ্যকার ভালোবাসার নমুনা, নাকি এটা প্রতিহিংসার নমুনা? প্রতিহিংসা বেশির ভাগ সময়েই খারাপ পরিণতি বয়ে আনে। প্রতিহিংসার মাধ্যমে, আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আরো পাঁচ বা সাত বা দশ বছর বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকতে চায়। থাকতে চাওয়া অপরাধ নয়, বিতর্কিত ও অবৈধপন্থায় থাকতে চাওয়া হলো অন্যায়। ক্ষমতায় পুনরায় আরোহণ কি দশ মাস দূরে নাকি অনেক দূরে, আমি জানি না। বর্তমান যুগের কোনো নিজাম উদ্দিন আউলিয়া থাকলে হয়তো বলতে পারেন, যদি মহান আল্লাহ চান যে, তিনি বলুন।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ই-মেইল : mgsmibrahim@gmail.com
জীবন মানেই যাত্রা। শৈশব থেকে যৌবনে, যৌবন থেকে বার্ধক্যে, স্থান থেকে স্থানান্তরে, কাল থেকে অন্য কালে। মনে পড়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কথা। তখন আমি নোয়াখালী জেলা স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের নির্দয় গুলিবর্ষণ ও ছাত্র নিহতের খবরে সারা দেশ শোকে স্তব্ধ। সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। মনে পড়ে কালো ব্যাজ পরে আমরা শোক মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। সেই মিছিলে আমাদের সমবেত কণ্ঠে সমস্বরে তীব্র প্রতিবাদÑ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। সে এক আজব অসাধারণ অভিজ্ঞতা আজো ভুলিনি। আমাদের স্বরূপ সন্ধানে শিকড়ের সন্ধানে সেটা ছিল এক সুতীব্র অনুভবের স্ফুলিঙ্গ। কবেকার সেইসব দিন। জাগ্রত অমর একুশে আজো হাজির হয় আমাদের দ্বারে। সময়ের কোনো মতিগতি নেই। শোকের মাতম স্তিমিত হয়ে এখন সেটা ব্যাপক উচ্ছ্বাস আর আবেগে পরিণত। ভোর থেকেই হাজির হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, যেখানে ধ্রুপদী স্থাপত্যের সৌন্দর্য নিয়ে চত্বরের এক দিকে সমুন্নত গাম্ভীর্যে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিসৌধ। অসংখ্য পুষ্পস্তবকে নিবেদিত হচ্ছে শহীদদের অমলিন স্মৃতির প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।মহান একুশে এবং আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উপলক্ষে এবারো ঢাকাসহ সারা দেশে মাসব্যাপী সেমিনার, সাহিত্য আলোচনা, কবিতা পাঠ, সঙ্গীতানুষ্ঠান ইত্যাদির সর্বাত্মক আয়োজন চলছে। অবশ্য মূল আকর্ষণ বইমেলা। নিখাদ বইমেলা। বেশ জাঁকজমকে প্রতিদিনই নবীন, প্রবীণ ও সদ্যনবীন লেখকদের প্রকাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং সমাগত দর্শক ও পাঠকদের কলকাকলিতে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ মুখরিত। প্রকাশনার সৌষ্ঠবও বহুলভাবে প্রশংসিত। বইমেলায় লেখক, পাঠক ও ক্রেতাদের সংখ্যা দিনদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বইমেলার যেমন সুনাম আছে, তেমনি আছে দুর্নাম। বইমেলায় প্রতিদিনই বিস্তর জনসমাগম হচ্ছে। এমনটি বছরের অন্যসব বইমেলায় দেখা যায় না। কেউ কেউ বলেন, এ শুধু হুজুগেপনা। অনেকেই বই কেনে না, শুধু ভিড় জমায়। কিন্তু হুজুগে বইমেলায় ঘুরতে যাওয়ার দৃষ্টান্তও তো অন্যত্র নেই। আগন্তুকেরা যে একেবারে বই কেনে না তাও নয়। বেরোনোর সময় কারো কারো হাতে যেনতেন একটা বই প্রায়ই দেখা যায়। তবে ইদানীং বইমেলায় ঢুকে কেন যে খুব হতাশ লাগে। এত বড় মেলায় কোথায় কোন স্টল খুঁজে বেড়াব, আর ওই চাপবাঁধা ভিড়ের মধ্যে এগোবই বা কী করে? নামকরা যেকোনো দোকানেই পাগলাটে ভিড়। সেই ছিমছাম চেহারা, ঘরোয়া পরিবেশের প্রারম্ভিক বইমেলা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে! তবু চাই বইমেলা। শতেক ঝামেলার জীবনে বই পড়ার সময় যদিও মানুষের ক্রমান্বয়ে কমে আসছে, কিন্তু ভালোবাসার রকমেরই মতো বই পড়তে ভালো লাগার কারণও আলাদা। যানবাহন ও যাতায়াতের অসুবিধা সত্ত্বেও প্রতিদিন প্রচুর লোক আসে। কেন আসে এত মানুষ?
সবাই কি সত্যিই সাহিত্যপ্রেমী? বাঁকা চোখের মন্তব্য- এটা তো এখন তরুণ-তরুণীদের নিভৃত মিলনস্থল। যা হোক, বই পবিত্র। বই মানে জ্ঞান। বই মানে মনুষ্যত্বের বিকাশ। বই তুমি কার- যে পড়ে তার। তবে এ কথা বলা ভালো, বই বেছেবুছে পড়তে হয়। আজকাল বইমেলার লক্ষ্য থাকে বাণিজ্যের দিকে। সেটা অবশ্য খারাপ কিছু নয়। বই বাণিজ্য করলে কাগজ-বিক্রেতা থেকে প্রকাশক, মুদ্রক বা বাইন্ডাররা দুটো পয়সা পান। তবে লেখকদের কতজন পয়সা পান? সেই প্রশ্ন থেকে যায়। এতদসত্ত্বেও বইমেলার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বইমেলার চরিত্র যতই বদল হোক, বাবা-মায়ের হাত ধরে ছোটে ছেলেমেয়েরা আসছে, ফেরার সময় তাদের হাতে হাতে দু-একটা বই থাকুক, এ দৃশ্যটি সবচেয়ে মধুর। কেউ কেউ বলেন, বর্তমানের কম্পিউটার যুগে ছাপাখানা ও প্রকাশনানির্ভর বইয়ের দিন শেষ হয়ে আসছে। গ্রন্থবিহীন সব রকম রচনা প্রকাশের দায়িত্ব নাকি নেবে কম্পিউটার। কাগজ ছাড়া ই-বুক! কিন্তু এখনো সেই সতর্কবাণী তেমন গুরুত্ব পায়নি। প্রিয় লেখকের সদ্য বাঁধাই করা বইয়ের ঘ্রাণ অনেক বেশি প্রিয়। নিরালায় বসে একটি গ্রন্থ পাঠের যে-আনন্দ তা কখনো কম্পিউটার থেকে পাওয়া যেতে পারে না। তরুণ প্রজন্ম কী বলে! বইমেলায় তরুণ-তরুণীদের যে উদ্দীপনা প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে দূরাগত বইয়ের মৃত্যুঘণ্টা শুনতে আমাদের আরো বেশ কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।বস্তুত বইয়ের পোকা  ছোটবেলায় মাথায় ঢুকে গেলে বাকি জীবন আর বইয়ের পাতা থেকে মুখ তোলা যায় না। বলা বাহুল্য, বাংলা ভাষার স্থান পৃথিবীর প্রধান ভাষাগুলোর মধ্যে পঞ্চম। যদিও অনেকের মতে চতুর্থ। আবার কেউ কেউ বলেন, মহাভাষায় এর স্থান ষষ্ঠ। যা হোক এটা অনস্বীকার্য, ক্রমেই বাংলা ভাষার পরিধি বাড়ছে। বাংলা ভাষার ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নানান দেশের সুধীজনও এই ভাষা শিক্ষা ও চর্চা করতে এগিয়ে আসছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সাহিত্যের তথ্য, ইতিহাস ও পাঠভিত্তিক চর্চা সাধারণভাবে বহুগুণ বর্ধিত করা প্রয়োজন। পাশ্চাত্যে যে-ধরনের তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ থাকে, বাংলা সাহিত্যেও সেগুলো নির্মাণ করার একটা সংহত পরিকল্পনা হাতে নেয়া একান্তভাবে কাম্য। প্রসঙ্গত, বিদগ্ধ মনোযোগী পাঠকদের অভিমত, আমাদের সাহিত্যের ভূমিতে এখন অকিঞ্চিতকর বীজই বপিত হচ্ছে। শূন্যে তো আর প্রতিভার বিকাশ ঘটে না। সংগ্রহে রাখার মতো বই নিতান্তই অপ্রতুল। তবে হতাশ হওয়ার তেমন কিছু নেই। কিছু মানুষ এ সংসার, এ সমাজের চেয়ে অনেক বড়মাপের। সে কারণেই বোধ হয় তারা এখানে পুরোপুরি অচেনা এবং অচেনা বলেই তাদের খুঁজে পেতে হয়। প্রিয় বই সম্পর্কে রাসকিনের উক্তি : যে বই পড়ে মনে হবে আহা আমিও তো এমনই ভেবেছিলাম, সে বই আদৌ মূল্যবান নয়। অন্যপক্ষে যে বই পড়ে পাঠকের মনে হবে, আশ্চর্য এমনটা তো আমি ভাবিনি, বই পড়ে নতুন এক ভাবনার দ্বার খুলে গেল, সে বই-ই মূল্যবান।
রাশিয়ার দু’টি যুদ্ধবিমানকে জাপান সাগর আকাশে টহল দিতে দেখা গেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বুধবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম একথা জানিয়েছে। খবর সিনহুয়ার।
মন্ত্রণালয় জানায়, তু-৯৫এমএস নামের দু’টি যুদ্ধবিমান জাপান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশের আকাশে টহল দেয়। তারা জানায়, বিমান দু’টি জাপানের এফ-৪, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের কঠোর নজরদারির মধ্যে ছিল। তারা আরো জানায়, নিরপেক্ষ জলসীমার ওপর আকাশ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক আইন মেনেই এ টহল পরিচালনা করা হয়।
তিনি মুসলিম, মুসলিমই থাকতে চান। হলফনামা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জানালেন হাদিয়া। কেরালার উগ্রহিন্দুবাদীদের 'লাভ জিহাদ' মামলার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি। গত মে মাসে স্বামী শাফি জেহানের সাথে তার বিয়ে কেরালা হাইকোর্ট বাতিল করে দেয়। এর পর থেকে হাদিয়া বারবার সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানান, তাকে স্বামীর সাথে থাকার অনুমতি দেয়া হোক। কেরালা হাইকোর্ট দু'জনের বিয়েকে 'লাভ জিহাদের' উদাহরণ বলেছিল, হাদিয়ার বাবা তার বৈধ অভিভাবক বলেও জানিয়েছিল। হলফনামা দিয়ে হাদিয়া সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছেন, তিনি শাফি জেহানের স্ত্রী থাকতে চান। শাফিকে বিয়ে করতেই হাদিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কেরালা হাইকোর্টের রায় সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেন হাদিয়া। সুপ্রিম কোর্ট এ ব্যাপারে এনআইএ তদন্তের নির্দেশ দেয়। এনআইএ তদন্ত রিপোর্ট পেশ করে সর্বোচ্চ আদালতে জানায়, কেরালা একটা সংগঠিত চক্র মহিলাদের উগ্রবাদে আকৃষ্ট করে মগজ ধোলাই করছে আইসিসের হয়ে লড়তে পাঠানোর জন্য। এমন ৮৯টি ঘটনার খবর মিলেছে বলেও তারা জানায়। হাদিয়ার ব্যাপারটাও এমনই। যদিও হাদিয়া হলফনামায় দাবি করেছেন, তার স্বামীকে অন্যায়ভাবে উগ্রবাদী বলে প্রচার করছে এনআইএ। স্বামীর সাথে আইএসের কোনো সম্পর্কই নেই।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস মঙ্গলবার বলেছেন, সিরিয়ার পূর্ব গৌতায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় তিনি ‘গভীরভাবে শঙ্কিত’। সেখানে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সরকারি বাহিনীর বিমান হামলায় শতাধিক লোক নিহত হওয়ার পর তিনি এ শঙ্কা প্রকাশ করলেন। খবর এএফপি’র। খবরে বলা হয়, গুতেরেস বেসামরিক নাগরিক রক্ষাসহ মানবিক আইনের মূল নীতি সমুন্নত রাখতে সকল পক্ষের প্রতি আহবান জানান।
জাতিসংঘ মুখপাত্র স্টিফান দুজারিক বলেন, ‘পূর্ব গৌতায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ায় জাতিসংঘ মহাসচিব গভীরভাবে শঙ্কিত।’ মানবাধিকার বিষয়ক সিরীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানায়, মঙ্গলবার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্ব গৌতায় সিরিয়া ও রাশিয়ার ব্যাপক বিমান হামলায় কমপক্ষে ১০৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে ১৯ শিশু রয়েছে। সেখানে এরআগের দিন সোমবারের বিমান হামলায় সিরিয়ার ১২৭ নাগরিক নিহত হয়। দুজারিক বলেন, ‘পূর্ব গৌতায় বিমান হামলা ও গোলা বর্ষণের কারণে সেখানকার প্রায় চার লাখ লোক আতংকের মধ্যে রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর অবরোধের কারণে পূর্ব গৌতার বাসিন্দারা অপুষ্টিসহ চরম দূরাবস্থার মধ্যে বসবাস করছে।’ গুতেরেস স্মরণ করিয়ে দেন যে পূর্ব গৌতা রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ঘোষিত একটি অস্ত্রবিরতি অঞ্চল হিসেবে আখ্যায়িত। এ ব্যাপারে তিনি সকল পক্ষকে তাদের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি মনে করিয়ে দেন। এদিকে জরুরি মানবিক সাহায্য সরবরাহ ও চিকিৎসার সুযোগ দিতে ৩০ দিনের অস্ত্রবিরতি দাবির খসড়া প্রস্তাবের বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আইভোরিয়ান এক ব্যক্তির আট বছর বয়সী এক ছেলেকে সুটকেসের ভেতরে ভরে পাচার করা হয়েছিলো। তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো মরক্কো থেকে স্পেনে। সরকারি আইনজীবীরা এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে পিতা আলী ওয়াত্তারার কারাদণ্ড চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই কড়া শাস্তি হয়নি। সন্তানকে যে সুটকেসে করা পাচার করা হচ্ছে সেটা পিতা জানতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর এ কারণে তার শুধু সামান্য জরিমানা হয়েছে। "আমি এবং আমার বাবা - আমরা কেউই জানতাম না যে তারা আমাকে একটি সুটকেসের ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে," বিচারকদের একথা বলে পাচার হওয়া ছেলেটি। তার নাম আদু। এখন বয়স ১০ বছর। তার পিতা ওয়াত্তারা ইতোমধ্যে এক মাস জেলে কাটিয়েছেন।
শিশুটির অভিজ্ঞতা
বিচারকদের আদু জানায় তার পিতা তাকে সবসময় বলেছিলেন যে তারা একটি গাড়িতে করে স্পেনে যাবেন। সুটকেসের ভেতরে করে পাচার হওয়ার সময় তার কেমন লাগছিলো সেই অভিজ্ঞতার কথাও আদু বিচারকদের জানিয়েছে। সে জানায় যে সেসময় তার শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। ঘটনাটি ছিলো ২০১৫ সালের মে মাসের। অল্প বয়সী একটি মেয়েকে ভারী একটি ব্যাগ টেনে নিতে দেখে মরক্কো ও স্পেনের সুতা দ্বীপের সীমান্তের কর্মকর্তারা তাকে থামান। ১৯ বছর বয়সী এক নারী ওই ব্যাগটি টানছিলো। তারপর তারা যখন ওই ব্যাগটি স্ক্যান করে দেখেন তখন তার স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। দেখেন যে ব্যাগের ভেতরে ছোট্ট একটি শিশু। মায়ের গর্ভের ভেতরে একটি শিশু যেমন ভঙ্গিতে অবস্থান করে শিশুটিও ব্যাগের ভেতরে ওভাবে বসেছিলো। পরে ব্যাগটি খুলে কর্মকর্তারা শিশুটিকে উদ্ধার করেন। তাকে বিধ্বস্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিলো। কর্মকর্তারা প্রথমে ভেবেছিলেন ব্যাগের ভেতরে করে হয়তো মাদক পাচার করা হচ্ছে। কিন্তু পরে সুটকেসের ভেতরে শিশুটিকে দেখতে পেয়ে তারা অবাক হয়ে যান।
সামান্য জরিমানা
এই অপরাধের বিচারকরা মি ওয়াত্তারাকে ৯২ ইউরো জরিমানা করেছেন। স্পেনের সংবাদপত্রে সেসময় বরা হয়েছিলো যে নারী সুটকেসটি টানছিলো সে শিশুটির কোন আত্মীয় ছিলো না। শুধু ব্যাগটি টানার জন্যে তাকে অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করা হয়েছিলো। বাচ্চাটি এখন তার মায়ের সাথে পারিসিয়ানে থাকে। তবে সাক্ষ্য দিতে সে এসেছিলো স্পেনের সুতা দ্বীপের একটি আদালতে। "এখন তো সবকিছুর অবসান হয়েছে। আমি আমার স্ত্রী, কন্যা ও ছেলেকে নিয়ে এখন নতুন করে জীবন শুরু করতে পারি," বলেন পিতা ওয়াত্তারা। তিনি জানান, স্পেনের উত্তরাঞ্চলে তারা নতুন করে তাদের জীবন শুরু করবেন।
বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও, দেশটির বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই উচ্চ শিক্ষা হিসাবে বাংলা পড়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ সেখানে বাংলার জন্য কোন বিভাগই নেই। এর কারণ হিসাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের আগ্রহের অভাবকে দায়ী করছেন। বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য ড, মোঃ. আনোয়ারুল কবির বলছিলেন, ক্যারিয়ার বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ না থাকার কারণেই বাংলা বিভাগ খোলা হয় না। তিনি বলছেন, ''উদ্যোক্তা হিসাবে যারা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি গঠন করেছেন, তারা ডিসিপ্লিন বা বিভাগগুলো খোলার ক্ষেত্রে দেখেছেন, কোন বিভাগগুলোর প্রতি বাজারের আগ্রহ আছে। কেননা, একজন ছাত্র ছয়লাখ সাত লাখ টাকা দিয়ে একটি বিষয়ে অধ্যয়ন করলো, এরপর বাজারে তারা জায়গাটা খুঁজে পেল না, সেটা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যেমন দুঃখজনক, তেমনি তার ক্যারিয়ারের জন্যও হতাশার।'' ''হয়তো একসময় যখন দেখা যাবে, শিক্ষার্থীরা এই পরিমাণ টাকা দিয়ে বাংলা সাহিত্য পড়তে আগ্রহী হবে, তখন হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এগিয়ে আসবে।'' বলছেন আনোয়ারুল কবির। তিনি বলছেন, ''তবে শুধুমাত্র ক্যারিয়ারের দিকটি বিবেচনা নিয়েই নয়, বাংলা বিভাগে পড়তে হলে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আলাদা একটা আগ্রহও থাকা দরকার। কিন্তু শুধু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও সেই আগ্রহে যেন কমতি দেখা যাচ্ছে।'' বাংলাদেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৯৫টি। তার মধ্যে মাত্র ১৪টিতে বাংলার জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগটি ভুগছে শিক্ষার্থী খরায়। ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের রেজিস্টার অধ্যাপক ইফাত কায়েস চৌধুরী বলছেন, বৃত্তি ঘোষণার পরে ও তাদের এই বিভাগে তারা শিক্ষার্থী পাচ্ছেন না। তিনি বলছেন, ''বাংলাদেশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে সবার আগে আমরাই তিন চার বছর আগে থেকে বাংলা বিভাগ খুলি। প্রথম বছর থেকেই আমরা প্রথম ভর্তি হওয়া পাঁচজনের জন্য বৃত্তি ঘোষণা করেছিলাম। কিন্তু স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কয়েকজন ছাত্র পেলেও, স্নাতক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীও পাইনি। আমাদের শিক্ষক আছে, ক্লাস আছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত স্নাতক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি।'' এর কারণ হিসাবে তিনি মনে করেন, ''শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ধারণা আছে যে, বাংলায় পড়ে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে না। অথচ আমরা আমাদের নিজেদের স্কুল বা কলেজেই বাংলার জন্য ভালো শিক্ষক খুঁজে পাচ্ছি না।'' বাংলা বিভাগ রয়েছে, এরকম আরো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোজ নিয়ে জানা গেলো, সেখানেও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের কিছু কর্মজীবী শিক্ষার্থী থাকলেও, স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। বাংলায় উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন, এরকম একজন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা সোহানা ইয়াসমিন। তিনি বলছেন, ''আমি বাংলায় অনার্স মাস্টার্স করে দেখলাম, স্কুল কলেজ আর সরকারি চাকরির এর চাহিদা কম।
বিসিএসের চেষ্টাও করেছি। কিন্তু সেটি না হওয়ায় পরে ম্যানেজমেন্ট আর ইংরেজির উপর কয়েকটা শর্ট কোর্স করে এখন গার্মেন্ট সেক্টরে কাজ করছি।'' তবে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হওয়া একজন ছাত্র শাহরিয়ার হোসেন বলছেন, ''আমি শিক্ষকতাতে পেশা হিসাবে নিতে চাই। তাই বাংলা বেছে নিয়েছি, যাতে এর পাশাপাশি আমি পার্টটাইম চাকরিও করতে পারি, আর পড়তে খরচও কম লাগে।'' সরকারি একটি কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল হক অবশ্য মেধা তালিকায় বাংলা পেয়েছেন। তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনি খুব বেশি মাথা না ঘামিয়ে আপাতত পড়াশোনা শেষ করতে চান। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বাংলা বিভাগের সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাদের কেউ কেউ এই বিভাগটি যেমন বেছে নিলেও, বেশিরভাগই মেধা তালিকার কারণেই বাংলায় পড়াশোনা করেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলার প্রতি এই অনাগ্রহের বিষয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য মোঃ. আখতার হোসেন বলছেন, ''পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে বেসরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই সংস্কৃতি এখনো হয়নি। এগুলো যেমন বাংলাদেশের শিক্ষায় অনেক অবদান রাখছে, তেমনি আবার তারা এমন সব বিষয়ে বিভাগ খুলতে চান, যেগুলো শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি। তবে প্রোগ্রাম হিসাবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রাম হিসাবে বাংলা খুলেছে। পুরোপুরি বিভাগ হিসাবে খুলতে হয়তো আরো খানিকটা সময় লাগবে।'' তবে পুরোপুরি বিভাগ খুলতে বাধ্য করতে না চাইলে, অন্তত একটি কোর্স হিসাবে বাংলাকে ছড়িয়ে দিতে চায় মঞ্জুরি কমিশন। এজন্য বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে তারা একটি কোর্স তৈরি করেছেন, যা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে, সব বিভাগেই পড়ানো হবে। এ বছর থেকেই এই কোর্সটি পুরোদমে চালু হবার আশা করা হচ্ছে। কমিশনের আশা, এর মাধ্যমে অন্তত সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলাকে পৌঁছে দেয়া যাবে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে দেশের সবচেয়ে বড় ফুলের পাইকারি হাট যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে গত তিন দিনে ১৮ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। চাহিদা বেশি থাকায় আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দাম পেয়েছেন ফুলচাষিরা। যশোর শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার পশ্চিমে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশের এই হাটে প্রতিদিনই সকাল ছয়টায় শুরু হয়ে নয়টার মধ্যে বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। বিশেষ দিবসের ফুল বেচাকেনার সময় বাড়ে। এসব ফুল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। আশপাশের এলাকা থেকেও আসেন ক্রেতারা। ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানালেন, স্বাভাবিক সময়ে গদখালী ফুলের হাটে দিনে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ফুল বেচাকেনা হয়। তবে বসন্তবরণ উৎসব, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বেচাকেনা কয়েক গুণ বাড়ে। ফুলের দামও বেড়ে যায়। এবারের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে গত তিন দিনে গড়ে প্রায় ৬ কোটি করে মোট ১৮ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে গোলাপ ৯ কোটি টাকার, গ্লাডিওলাস ২ কোটি ৬০ লাখ টাকার, রজনীগন্ধা আড়াই কোটি টাকার, গাঁদা প্রায় দেড় কোটি টাকার এবং জারবেরা বিক্রি হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকার।
ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সকালে গদখালীর হাটে ফুল কিনতে এসেছিল যশোরের শার্শা উপজেলা বেনাপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র জুবায়ের হোসেন ও আসিফ হোসেন। দুই ছাত্র জানায়, ২২ কিলোমিটার পথ বাইসাইকেল চালিয়ে ফুল কিনতে এসেছে তারা। ১৪০ টাকার ফুল কিনেছে। এই ফুল দিয়েই ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হবে। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, কয়েক দিন আগে রজনীগন্ধার প্রতি স্টিকের দাম ছিল ২-৩ টাকা। গত তিন দিনে তা সাড়ে ৭ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৭-৮ টাকার গ্লাডিওলাস বিক্রি হয়েছে ১৪-১৫ টাকায়। এ ছাড়া ৬-৭ টাকার জারবেরা ১২-১৫ টাকা, ৭-৮ টাকার গোলাপ বিক্রি হয়েছে ১৫ টাকা এবং ২-৩ টাকার চন্দ্রমল্লিকা বিক্রি হয়েছে ৪-৫ টাকায়। ফুল বাঁধাইয়ের জন্য ১০ টাকার কামিনী পাতার আঁটি বিক্রি হয়েছে ১৫ টাকায়। গদখালী ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুর রহিম জানান, ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী এলাকার ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পাঁচটি ও পরীক্ষামূলকভাবে আরও ছয়-সাতটি জাতের ফুল চাষ হচ্ছে। এবারের বসন্তবরণ উৎসব, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গদখালীতে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে।
এক কাপ গরম পানির মধ্যে কিছু চা–পাতা। এ পানীয়ের কত রকমের স্বাদ হতে পারে? বাংলাদেশেই অন্তত ১৫ রকম স্বাদের চা উৎপাদিত হচ্ছে। এই চা বিশ্ববাজারে রপ্তানি করছে এ দেশেরই প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার দেশের বাজারেও বিপণন করা হচ্ছে বৈচিত্র্যপূর্ণ স্বাদের চা। নানা রকম চায়ের স্বাদ নেওয়া যাবে ঢাকার চা প্রদর্শনীতে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় তিন দিনের এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ চা বোর্ড। প্রদর্শনীটি আজ মঙ্গলবার শেষ হবে। মেলায় বিভিন্ন ধরনের চায়ের স্বাদ নেওয়া যাচ্ছে বিনা মূল্যে। মেলার দ্বিতীয় দিনে গতকাল সোমবার মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের বেশ ভিড়। বিভিন্ন স্টলে ঘুরে ঘুরে অনেকে চায়ের স্বাদ নিচ্ছেন। কোম্পানিগুলোর বিশেষ ছাড়ে চা কিনে নিচ্ছেন অনেকে। মেলায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, নতুন নতুন চায়ের প্রতিই মানুষের আগ্রহ বেশি। প্রদর্শনীতে ফিনলে টি ১২ রকমের চা প্রদর্শন করছে। এর মধ্যে রয়েছে মসলা চা, আদা চা, তুলসী চা, গ্রিন টি, বিভিন্ন ধরনের ব্ল্যাক টি, ন্যাচারাল গ্রিন টি ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কিউ আই চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, চায়ের স্বাদে এ পরিবর্তনের শুরু তিন-চার বছর আগে থেকে। মানুষের পছন্দে পরিবর্তন আসছে। বাজার ধরতে নতুন নতুন স্বাদের চা আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আগামী দিনগুলোতে আরও ১৯ রকমের চা আসবে। প্রতিবছর আমরা চার–পাঁচ রকম স্বাদের চা নিয়ে আসব।’ চায়ের ধরনে শুধু স্বাদের পরিবর্তন নয়, এর নানা রকমের গুণাবলি আছে। কী রকম, জানতে চাইলে এ কিউ আই চৌধুরী বলেন, যাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে, যকৃৎ পরিষ্কার রাখা দরকার, তাদের জন্য আদা চা খুবই উপকারী। গোল্ড ব্ল্যাক টি সবচেয়ে ভালো লিকার দেয়। ইংলিশ ব্রেকফাস্ট টি সকালে খাওয়ার জন্য খুব ভালো।
তিনি জানান, ফিনলে মিডোরো নামের একটি চা এনেছে জাপানে রপ্তানির জন্য। এ চা বেশ দামি, প্রতি কেজি ১৮ ডলার দরে রপ্তানি করতে চায় ফিনলে। বিভিন্ন ধরনের চা উৎপাদন ও রপ্তানি করার ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কাজী অ্যান্ড কাজী টি। চা প্রদর্শনীতে কাজী টির স্টলে ১৩ রকমের চা বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রিন টি, ব্ল্যাক টি, গ্রিন লেমনগ্রাস টি, তুলসী চা, আদা চা, জেসমিন গ্রিন টি, লেমন গ্রাস হারবাল ইনফিউশন, ওলং টি ইত্যাদি। কাজী টির কর্মকর্তারা বলেন, জেসমিন গ্রিন টিয়ে জুঁই ফুলের সুবাস রয়েছে। মেডলি টিতে চার ধরনের স্বাদের চা মিলবে। তুলসী টি কাশির ক্ষেত্রে উপকারী। হালদা ভ্যালি নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে এসেছে হোয়াইট টি। এ চায়ের প্রতি ৫৫ গ্রামের প্যাকেটের দাম ৫৯৫ টাকা। হোয়াইট টি তৈরি হয় চা–গাছের কুঁড়ি থেকে, এর দামই সবচেয়ে বেশি। হালদার কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা হোয়াইট টি চীনে রপ্তানি করছেন। টি বোর্ডের স্টলে নানা স্বাদের পাশাপাশি হোয়াইট টি ও রোজ টি চেখে দেখা যায়, যা থেকে গোলাপ ফুলের সুবাস পাওয়া যায়। এ ছাড়া কাঠের সুদৃশ্য বাক্সে মেলে হাইকু টি, যার মূল্য ৮৫০ টাকা। এ চা কয়েক স্তরে পরিশোধন করে তৈরি করা হয় বলে জানান স্টলের কর্মীরা। চা বোর্ডের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, সাধারণ চায়ের চেয়ে গ্রিন টিয়ে চার গুণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। হোয়াইট টিতে গ্রিন টির চেয়েও তিন গুণ অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট আছে। চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে দেশে ৪ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হয়। ২০১৭ সালে তা বেড়ে ৭ কোটি ৯০ লাখ কেজিতে উন্নীত হয়েছে। দেশে চায়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন রপ্তানি কমে গেছে।
ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় দুটো শব্দের সঙ্গে পরিচয় হয়: শহীদ দিবস এবং প্রভাতফেরি। শহীদ দিবস হলো একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের ওই দিনে ঢাকায় কয়েকজন তরুণের বুকের রক্ত ঝরেছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। প্রতিবছর ওই দিনটি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। স্কুল বন্ধ থাকে। সব বয়সের মানুষ ভোরবেলা হাতে ফুল নিয়ে জামায় বা শাড়িতে কালো ব্যাজ পরে খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে যান শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানাতে—এটাই প্রভাতফেরি। এখন প্রভাতফেরি উঠে গেছে। ইউরোপীয় কেতায় রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সরকারপ্রধান শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি দেন। তা ছাড়া শহীদ দিবস কথাটা আর তেমন শোনা যায় না। এই অভাগা দেশে বছরের এমন কোনো দিন নেই, যেদিন কোনো না কোনো মায়ের বুক খালি হচ্ছে। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ তারকাখ্যাতি পেয়েছেন। আমরা ঘটা করে তাঁদের নামে দিবস পালন করি। যারা ‘ইতরজন’ তাদের জন্য কোনো দিবস নেই। সারা বছর ধরেই যেহেতু শহীদেরা সংবাদ শিরোনাম হন, তাঁদের নিয়ে আলোচনা, সেমিনার কিংবা খবরের কাগজে ক্রোড়পত্র ছাপা হয়, বায়ান্নর শহীদদের আলাদা করে বোঝানোর ও চেনানোর উপায় একটা বের হয়েছে। আমরা এখন বলি ‘ভাষাশহীদ’। অর্থাৎ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের এ অঞ্চলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। একাত্তর সালে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম।
স্বাধীনতার বীজটি কিন্তু বোনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। সুতরাং বলা চলে, ভাষাশহীদেরাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ। মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু হয়ে ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেল, এ রকম একটি সরল গল্পে আমরা অনেকেই বুঁদ হয়ে আছি। মুক্তিযুদ্ধের যে দীর্ঘ বিস্তৃত পটভূমি, তাকে উপেক্ষা করে বা হিসাবে না রেখে এ দেশের ইতিহাস হবে খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ। বায়ান্নর ভাষাশহীদেরাই আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের পথচলার শুরুটা করে দিয়েছিলেন এবং নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে একটা সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা আলাদা রাষ্ট্র পেয়েছি। বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি নিয়ে অনেক লেখাজোকা হয়েছে। আরও হবে। আমরা পাঁচজন শহীদের নাম বেশি বেশি শুনতে পাই: সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর। এঁদের মধ্যে বরকত ও জব্বার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রফিক ছিলেন বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে। এঁরা তিনজন নিহত হন ২১ তারিখে। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে মারা যান রিকশাচালক সালাম এবং হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদের ভাষ্যে জানা যায়, ২২ ফেব্রুয়ারি ভিক্টোরিয়া পার্কের (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক) আশপাশে, নবাবপুর রোড ও বংশাল রোডে গুলিতে কতজন মারা গেছেন, তার সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। আহমদ রফিক তাঁর একুশ থেকে একাত্তর বইয়ে নিহতদের মধ্যে আবদুল আউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহ ও সিরাজুদ্দিনের নাম উল্লেখ করেছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে প্রথম স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালের মার্চে। এর প্রকাশক ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সভাপতি মোহাম্মদ সুলতান। সম্পাদক ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। ওই বইয়ে কবির উদ্দিন আহমেদ ‘একুশের ঘটনাপুঞ্জী’ নামে একটি প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘শহীদদের লাশগুলো চক্রান্ত করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মেডিকেল হোস্টেলের ভেতর “গায়েবি জানাজা” পড়া হলো।...(পরদিন) সকাল নয়টায় জনসাধারণের এক বিরাট অংশ মর্নিং নিউজ অফিস জ্বালিয়ে দেয় এবং সংবাদ অফিসের দিকে যেতে থাকে। সংবাদ অফিসের সম্মুখে মিছিলের ওপর মিলিটারি বেপরোয়া গুলি চালায়। অনেকেই হতাহত হয় এখানে।’ প্রশ্ন হলো ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি মোট কতজন ‘হতাহত’ হয়েছিলেন, কতজন ‘নিহত’ হয়েছিলেন তার সঠিক সংখ্যাটি কি আমরা জানি? কখনো জানার চেষ্টা করেছি? কবির উদ্দিন আহমেদের বিবরণ অনুযায়ী, ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘সর্বদলীয় কর্মপরিষদের’ পক্ষ থেকে ‘সর্বমোট ৩৯ জন শহীদ হয়েছেন বলে দাবি করা হয়’ এবং একই সঙ্গে সরকারের কাছে একটি ‘নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন নিয়োগের’ আহ্বান জানানো হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের প্রতিবাদ হয়েছিল ব্যাপক। ওই দিন সন্ধ্যায় গণতান্ত্রিক যুবলীগের চট্টগ্রাম জেলা শাখার আহ্বায়ক এবং সীমান্ত পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রোগশয্যায় বসে ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন। কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল:
ওরা চল্লিশজন কিংবা আরও বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রোদ্রদগ্ধ
কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়...
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত...
এখানে কবি যে ৪০ সংখ্যাটি উল্লেখ করলেন, তা কি নিছক ছন্দ মেলানোর জন্য, নাকি এর মধ্যে সত্যতা আছে? আমরা এযাবৎ আটজন শহীদের নাম পেয়েছি। সংখ্যাটি কি এখানেই শেষ? এ দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে লাশ গুম করার অভিযোগ তো নতুন নয়। পাকিস্তানের নির্বাসিত লেখক লাল খান তাঁর পাকিস্তানস আদার স্টোরি: দ্য ১৯৬৮-৬৯ রেভল্যুশন বইয়ে লিখেছেন, পুলিশের গুলিতে ২৬ জন নিহত এবং ৪০০ জনের মতো আহত হয়েছিলেন। বইটি ২০০৮ সালে লাহোরে প্রকাশিত হয়। তাঁর ওই বইয়ে তথ্যসূত্রের উল্লেখ নেই। তিনি পুলিশ বা গোয়েন্দা রিপোর্টের সাহায্য নিয়েছিলেন কি না জানি না। বায়ান্নর ২১-২২ ফেব্রুয়ারি তারিখে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁরা আমাদের জাতীয় বীর। তাঁদের রক্তের পথ বেয়েই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। অথচ তাঁরা সংখ্যায় কতজন, কী তাঁদের নাম, কোথায় তাঁদের বাড়ি, কী ছিল তাঁদের পেশা—এ নিয়ে অনুসন্ধানের কোনো আগ্রহ আমরা দেখাইনি। এটা সত্য যে ভাষা আন্দোলনে ওই সময়ের কোনো নেতা বা অ্যাকটিভিস্ট প্রাণ দেননি। প্রাণ দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ। ইতিহাসে আমজনতা বরাবরই থাকেন উপেক্ষিত, এলিটরা পদ-পদক-পদবি পাওয়া কিংবা না-পাওয়া নিয়ে মান-অভিমান করেন। পুলিশের কাজের ধরন আমার জানা নেই। তাদের মহাফেজখানায় কি পুরোনো কোনো রেকর্ড নেই, যার সূত্র ধরে আমরা ভাষাশহীদদের সংখ্যা ও পরিচয় জানতে পারব? আমার জানতে ইচ্ছে হয়, এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়েছে কি না, অথবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে? অনাদরে, অবহেলায় আমরা ইতিহাসের অনেক তথ্য-উপাত্ত হারিয়েছি। অথচ একটু উদ্যোগ নিলে, একটু সদিচ্ছা দেখালে এ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালানো যায়। আমরা ইতিহাস নিয়ে রাজনীতি করি, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির নালিশ জানাই। কিন্তু ইতিহাসের সত্য জানার জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ইতস্তত করি। শহীদেরা কি সব সময় রাজনীতির কাঁচামাল এবং ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবেই ব্যবহৃত হবেন? বছরে একদিন তাঁদের স্মরণে একটি বিবৃতি দিয়েই কি আমরা দায়িত্ব সারব? এ দেশে সর্বজনীন ‘শহীদ’ কয়জন? রাজনীতির বিভাজনের কারণে এক পক্ষের শহীদ অন্য পক্ষের কাছে খলনায়ক। কিন্তু ভাষাশহীদেরা তো সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তাঁরা আমাদের সবার। এখন হয়তো তাঁদের নিয়ে মাতম হয় না। কিন্তু যত দিন বাংলা ভাষা থাকবে, আমরা বায়ান্নর কথা স্মরণ করব। ভাষাশহীদদের জন্য আমরা আবেগ অনুভব করব। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। আমি প্রস্তাব করছি, এই সেতু ভাষাশহীদদের নামে উৎসর্গ করা হোক, নাম রাখা হোক ভাষাশহীদ সেতু। আমাদের পূর্বসূরিদের রক্তের ঋণ শোধ করার এটি হবে একটি অকিঞ্চিৎকর প্রয়াস। শহীদস্মৃতি অমর হোক।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
mohi2005@gmail.com
গৃহকর্মী থেকে হয়ে গেলেন মাইক্রোসফটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর! এমনও কি সম্ভব? গল্পের মতো শোনালেও বিষয়টি সত্যি হয়েছে কুড়িগ্রামের ফাতেমার বেলায়। বাল্যবিয়ের হাত থেকে মুক্ত হওয়া এই কিশোরী এখন জগৎখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীদের অগ্রগতিতে অবদান রাখার কুড়িগ্রামের নিভৃত পল্লী নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা গ্রামের মেয়ে ফাতেমা। রীতিমত জীবনযুদ্ধে জয়ী। সদিচ্ছা থাকলে যে অনেক কিছুই করা সম্ভব, তারই যেন জ্বলন্ত উদাহরণ। অভাবের সংসারে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেয় ফাতেমা। দুই বছর পর হঠাৎ ডাক আসে বাড়ি থেকে। হাসিমুখে গিয়ে ফাতেমা দেখে, তার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে ফাতেমার। বাল্যবিয়ের হাত থেকে তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠন ‘আশার আলোর পাঠশালা’র প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিত বর্মণ। ফাতেমার বাবা-মাকে বুঝিয়ে তার লেখাপড়ার দায়িত্বও নেয় তারা। গল্পের শুরুটাও এখান থেকেই। লেখাপড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ওয়ার্ল্ড উইনার আইটি পাঠশালা থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেয় ফাতেমা। হঠাৎ একদিন মাইক্রোসফটের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা স্কুল পরিদর্শনে এসে ফাতেমার অদম্য প্রাণশক্তির গল্প শোনেন। ব্যাস, পাল্টে যায় কিশোরী ফাতেমার জীবন। তাকে মনোনীত করেন মাইক্রোসফটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে। ফাতেমা খাতুন জানান, তার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে বড় হবে। তিনি বলেন, বিশ্বজিত স্যার আমাকে তথ্য প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছেন। আমার স্বপ্ন বড় হয়ে নারীদের আইটি শিক্ষায় অবদান রাখবো। ওয়ার্ল্ড উইনার আইটি পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিত বর্মন বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি ফাতেমাকে পড়াশোনার পাশাপাশি আইটি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সময়োপযোগী প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলায় আমাদের লক্ষ্য। ফাতেমাকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টরিও করেছে মাইক্রোসফট। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে উঠেছে তার উৎসাহ আর জীবনযুদ্ধের গল্প। সূত্র: যমুনা টিভি
বড় ঋণের মতো কৃষিঋণের খেলাপির লাগাম টানা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত কৃষিঋণে খেলাপির পরিমাণ ৫ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। জানুয়ারিতেই খেলাপি বেড়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপির এ অঙ্ক বাড়া ছাড়া কমছে না। মোট খেলাপির প্রায় ৯০ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। এদিকে কৃষিঋণের বিতরণও বাড়ছে। অর্থবছরের ৭ মাসে ১২ হাজার ৭০২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য কৃষক এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এ মৌসুমে কৃষিঋণ বিতরণ আরও বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, কৃষিঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মোটেই ইতিবাচক নয়। এ খেলাপিতে প্রকৃত কৃষকের দোষ নেই। তারা অনিয়ম-দুর্নীতি করে না, বরং কিছু অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী যোগসাজশ করে কৃষককে ফাঁসায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষিঋণে খেলাপির পরিমাণ ৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে ৫০ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। খেলাপির দিক দিয়ে সবার ওপরে আছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। তাদের খেলাপি ২ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এরপরই সোনালী ব্যাংকে ১ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা; রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৮০৮ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়েছে। কৃষিঋণে খেলাপির বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল জানান, কৃষকের নানা ধরনের সমস্যার কারণে অনেক ঋণখেলাপি হয়ে পড়ছে।
তবে তা আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। আমরা কৃষিঋণে অনেক ভালো করছি। শস্য খাতে ঋণ বিতরণে সব সময়ই আমরা প্রথম হই। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) কৃষি খাতে ১২ হাজার ৭০২ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের সাত মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কৃষি খাতে ৫৪৩ কোটি টাকা বেশি বিতরণ হয়েছে। গত সাত মাসে যে পরিমাণ বিতরণ হয়েছে, তা চলতি অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার ৬২ দশমিক ২৭ শতাংশ। একই সময়ে আদায় হয়েছে ১১ হাজার ৮৭৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষি খাতে মোট ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ৮টি ব্যাংকের জন্য নির্ধারিত ৯ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। আলোচ্য সাত মাসে এ খাতের ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৫ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের জন্য এবার ১০ হাজার ৮১০ কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। জানুয়ারি পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ৭ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ২ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ পল্লী অঞ্চলে বিতরণ করতে হবে। ২০০৯ সাল থেকে এটি চালু রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিতরণ হয় প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এ বছর বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয় ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
রাগের বশে অনেকেই বোধবুদ্ধি খুইয়ে বসেন। কিন্তু সাপ কামড়িয়েছে বলে তার মাথা চিবিয়ে খেতে শোনা যায়নি তেমন কোথাও। এই রকম একটি ঘটনা ঘটেছে ভারতের উত্তরপ্রদেশের হরদোইয়ে।রাগের মাথায় কামড়ানোর প্রতিশোধ নিতে সেই সাপেরই মাথা চিবিয়ে খেলেন সোনেলাল নামে এক যুবক। সোনেলালের প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, শনিবার সন্ধ্যায় তাকে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স করে সোনেলালকে নিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, সোনেলালকে সাপ কামড়েছে। সেই মতো সোনেলালের শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। তবে তার দেহে সাপে কাটার কোনও চিহ্ন মেলেনি। ঘণ্টা তিনেক পর রাত ১০টা নাগাদ হুঁশ ফেরে ওই যুবকের। এরপর সোনেলাল জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় গোয়াল ঘরে তিনি গরু-বাছুরদের দেখভাল করছিলেন। সেই সময়ে তাকে একটি সাপ কামড়ায়। আর তাতেই প্রচণ্ড রেগে যান সোনেলাল। এর পরেই সাপটিকে ধরে তার মাথায় কামড়ে দেন তিনি। শুধু তা-ই নয়।
এর পর সাপের মাথা ছিঁড়ে তা চিবিয়ে ফেলেন। মুখ থেকে তা ফেলে দেওয়ার পরই বেহুঁশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সোনেলালকে ওষুধ দেওয়া ছাড়াও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সোনেলালের দেহে সাপে কাটার কোনও চিহ্ন মেলেনি। সাপটি বিষাক্ত হতে পারে। তাই মাথার অংশ চিবিয়ে খাওয়ার ফলেই বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সোনেলালের এই কাণ্ড শোনার পরই তাকে দেখতে হাসপাতালে ভিড় জমে যায়। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী মুকেশ গুপ্ত বলেন, আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। কীভাবে একজন সাপকে কামড়াতে পারে। উত্তরপ্রদেশের মেন্টাল হেলথ সোসাইটির সচিব এসসি তিওয়ারির মতে, এটা কোনও মানুষের স্বাভাবিক আচরণ হতে পারে না। একমাত্র ভয়ানক আগ্রাসী বা মানসিক বিকারগ্রস্ত হলেই এমনটা করতে পারেন কেউ। তবে প্রতিবেশীদের কারও কারও দাবি, সোনেলাল আসলে নেশাগ্রস্ত মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের এক নারী ফেসটাইম এ্যাপের ভিডিওতে তার বোনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখন তার স্ট্রোক হয়। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির বদৌলতে তিনি বেঁচে যান। অপোকুয়া কেওয়াপাং নিউ ইয়র্কে একাকী বসবাস করতেন। তার বোন থাকতেন ম্যানচেস্টারে।ভিডিও কলে কথা বলতে বলতে এক সময়ে অপোকুয়াকে ভালভাবে দেখতে পাচ্ছিলেন না তার বোন আদুমেয়া সাপোং। ইতিমধ্যে তার কণ্ঠে জড়তা চলে এসেছে। ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না।-খবর বিবিসি অনলাইনের। তখন আদুমেয়া সাপোং সতর্ক হয়ে ওঠেন। তিনি বোনকে বললেন, তোমার এ্যাসপিরিন খাওয়া উচিত। অপোকুয়া এ্যাসপিরিন খেতে একটা পানির গ্লাস হাতে নিতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। পড়ে গেল গ্লাসটি। আদুমেয়া বলেন,আমি বোনকে বললাম, এখনই তোমার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।কিন্তু তিনি আমার কথা বিশ্বাস করতে পারলেন না।
পাল্টা আমাকে বললেন,এতো তাড়াহুড়োর কিছু নেই। মামুলি বিষয়েও ডাক্টারের কাছে যেতে হবে কেন! আদুমেয়া বলেন, তখন আমি আমার এক ডাক্টার বোনকে কনফারেন্স কল দিলাম। তিনি কেওয়াপাংয়ের কথা শুনে ও অবস্থা দেখে তাকে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে যেতে বললেন। কেওয়াপাং ফোন স্থগিত করে ৯১১-এ কল দেন। হাসপাতালে গেলে পরীক্ষায় তার মাথার ভেতরে একটা পিণ্ড ধরা পড়ে। স্ট্রোকে তার শরীরের বাঁ পাশটা অবশ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পুষ্টিবিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত কেওয়াপাং বলেন, এতে কোন সন্দেহ নাই, ফেসটাইম আমার জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে। নিজের কর্মব্যস্ততায় খুব একটা ভ্রমণের সময় পাই না, তাই বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন জনের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলতে হয়। এবার সেই ভিডিও কল আমার জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে।
মার্কিন একপেশে নীতির কারণে সম্প্রতি ভেস্তে যাওয়া ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিন নেতা মাহমুদ আব্বাস। খবর আলজাজিরার। মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দেয়া ভাষণে তিনি ওই আহ্বান জানান।
চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকেই এ আলোচনা আবারও শুরু করার তাগিদ দেন তিনি। ২০০৯ সালের পর গত মঙ্গলবার ৮২ বছর বয়সী প্রবীন এ ফিলিস্তিন নেতা আবার জাতিসংঘে ভাষণ দিলেন। তিনি সংঘাতের পথ পরিহার করে ইসরাইলকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
টেকসই উন্নয়নের জন্য ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষা অপরিহার্য উল্লেখ করে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো জানিয়েছে, বিশ্বের বুক থেকে প্রতিনিয়ত ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। কাজেই হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে ভাষা রক্ষায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় সংস্থাটির মহাপরিচালক অড্রে অ্যাজুলাই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন,
প্রতি দুই সপ্তাহে বিশ্বের বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি করে ভাষা। এই ভাষার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি অংশ। মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলার একটি উক্তি উল্লেখ করেন তার বার্তায়। ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, যখন আপনি কোনো ভাষায় কাউকে কিছু বলেন, তা তার মগজে পৌঁছায়, সে তা বুঝতে পারে। কিন্তু যখন তার নিজের ভাষায় বলেন, তখন তা তার হৃদয়ে পৌঁছায়। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাইবার জগতে প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষায় কথা বিনিময়ের চ্যালেঞ্জের কথাও মনে করিয়ে দেন অ্যাজুলেই। বাঙালির ভাষার অধিকার আদায়ের দিন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালির আত্মত্যাগের দিনটি এখন বিশ্বের সব ভাষাভাষীর অধিকার রক্ষার দিন। দিনটির গুরুত্ব তুলে ধরে সদস্য সব রাষ্ট্রকে তা যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানান ইউনেস্কোর মহাপরিচালক অ্যাজু্লেই। দিনটি পালনে প্যারিসে সংস্থার সদর দপ্তরেও বুধবার একটি সংলাপ আয়োজন করা হয়েছে, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, আমার ভাষা,আমার সম্পদ।
বছর ঘুরতে না ঘুরতে আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। পাশাপাশি কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেস তেলের দামও বাড়ানোর চিন্তা-ভাবনা চলছে। চলতি বছরে ১০০০ মিলয়ন ঘনফুট এলএনজি (তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করতে ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে। এ টাকা সমন্বয় করতে গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। আরও জানা গেছে, গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সোমবার এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে বৈঠক করেছে জ্বালানি বিভাগ। বৈঠক শেষে তিতাস গ্যাস কোম্পানিসহ সবগুলো বিতরণ কোম্পানিকে এলএনজির দাম সমন্বয় করতে কি পরিমাণ দাম বাড়াতে হবে তা লিখিত আকারে বিইআরসির কাছে জানাতে বলা হয়েছে। এর পর পরই বিতরণ কোম্পানিগুলো দাম সমন্বয় করার প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে। কোম্পানিগুলো গ্যাসের দাম বাড়ানোসংক্রান্ত প্রস্তাব তৈরি করে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে বিইআরসির কাছে জমা দেবে। যদিও বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কিছু দিন আগে বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন করে আর প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের নেই। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকার গ্যাসের গড় মূল্য ২২.৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে। বিইআরসি দুই দফায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিলেও উচ্চ আদালতের রায়ে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সরকার গত কয়েক বছরে সাড়ে ৩শ’র বেশি শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগের অনুমোদন দিলেও তা অদ্যাবধি কার্যকর হয়নি। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় সরকার এসব শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ দিতে পারছে না। এ কারণে উচ্চ মূল্যের জ্বালানি এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী এপ্রিলে প্রথম দফায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে। দ্বিতীয় দফায় অক্টোবর মাসে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে। এজন্য সরকারকে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা বেশি অর্থ গুনতে হবে। এর মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকা জোগান হবে এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ড থেকে। বাকি টাকার জোগান দিতে সরকার আন্তর্জাতিক ইসলামী ট্রেড ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইটিএফসি) থেকে উচ্চ মূল্যের ঋণ নেয়ার পাশাপাশি গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। ঋণের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব মাহমুদা বেগমের নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দল আইটিএফসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে শিগগির সৌদি আরব সফর করবে। জানা গেছে, আইটিএফসি এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ ঋণের জন্য সরকারকে সুদ গুনতে হবে ৩.৮ শতাংশ হারে। বাকি টাকার জোগান দিতে সোমবার গ্যাসের মূল্য সমন্বয়সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি বিইআরসির সঙ্গে বৈঠক করেছে। বিইআরসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, বৈঠকে তিতাস, জালালাবাদ, কর্ণফুলি, বাখরাবাদ, পিজিসিএলসহ সব বিতরণ কোম্পানিকে দাম সমন্বয় করে প্রস্তাব পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। কোম্পানিগুলো যদি দাম বাড়ানোর বিষয়ে বিইআরসিকে প্রস্তাব দেয় তাহলে তারা যাচাই-বাছাই করে গ্যাসের দাম বাড়ানো যাবে কিনা সিদ্ধান্ত দেবেন। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার এলএনজি বিক্রি হচ্ছে ১৩.৫২ টাকায়। অপর দিকে স্থানীয়ভাবে দেশে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম রাখা হচ্ছে গড়ে ৭.৩৫ টাকা। এতে ঘাটতি দাঁড়ায় ৬.১৭ টাকা। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে বর্তমানে ২৬৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধেক গ্যাস চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে। অথচ এসব ক্ষেত্রে সরকার প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম পাচ্ছে মাত্র ২.৭০ থেকে সাড়ে ৩ টাকায়। এখানেও সরকার সাড়ে ৩ টাকার বেশি ভর্তুকি দিচ্ছে। এলএনজি এলে এ ভর্তুকি দাঁড়াবে ১০ টাকার বেশি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার বিদ্যুৎ ও সার খাতে যদি ভর্তুকি না দিত তাহলে এখন গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। এ খাতে দেয়া ভর্তুকি দিতে গিয়ে এখন জনগণের পকেট কাটার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। অথচ মাত্র ১৪ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে বাসাবাড়িতে আর ২০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে। দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৩৭৮১ এমএমসিএফডি। আর সরবরাহ করা হয়েছে ২৭৪৫.৮ এমএমসিএফডি।
বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) গত সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে। ওই প্রস্তাবে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৭ টাকা আর প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ১৩ টাকা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে অন্য কোনো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কথা উল্লেখ নেই প্রস্তাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৬৫ টাকা। বিপিসির প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন দাম কার্যকর হলে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৭ টাকা বাড়িয়ে হবে ৭২ টাকা। একই ভাবে প্রতি লিটার কেরোসিনের দামও ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭২ টাকা হবে। অপর দিকে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম এখন ৪২ টাকা। নতুন দাম কার্যকর হলে প্রতি লিটার ফার্নেস ওয়েলের দাম পড়বে ৫৫ টাকা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমানে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ–্যৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে ফার্নেস তেলের দাম বাড়ালে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎও বেশি দামে ক্রয় করতে হবে সরকারকে। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। অপরদিকে ডিজেলের দাম বাড়লে আগামী ব্যুরো মৌসুমে সেচ কাজে বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাবে। এতে কৃষি উৎপাদনের খরচ কৃষকদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। তখন পেট্রল-অকটেন লিটার প্রতি ৫ টাকা এবং ডিজেল কেরোসিনের দাম ৭ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। অপর দিকে ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল অকটেন ও পেট্রল প্রতি লিটারে ১০ টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিন প্রতি লিটারে তিন টাকা করে কমানো হয়েছিল।
নতুন ইঞ্জিন, বগি ক্রয় ও পরিবেশবান্ধব সেবা নিশ্চিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩৬ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরিচালনা পর্ষদ। নতুন অনুমোদন হওয়া ঋণে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হবে ৪০টি নতুন ব্রডগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন), ১২৫টি লাগেজ ভ্যান এবং মালবাহী ট্রেনের জন্য এক হাজার ওয়াগন।
এই ঋণে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং তথ্যপ্রযু্ক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও উদ্যোগে নেয়া হবে। মোট ৪৫ কোটি ৩৩ লাখ ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পের জন্য ৯ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের যোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালের জুনে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পরিবহন বিশেষজ্ঞ সুনেয়ুকি সাকায়ি বুধবার এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, রেলওয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে সুলভে, নিরপাদে এবং তুলনামূলকভাবে কম জ্বালানি খরচে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টির ভালো সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগের অভাব আর জরাজীর্ণ বাহনের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ‘এডিবির রেলওয়ে রোলিং স্টক অপারেশনস ইম্প্রুভমেন্ট প্রোজেক্টের আওতায় নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং পরিবেশবান্ধব কর্মপদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মদক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে’, বলেন সুনেয়ুকি সাকায়ি। বিবৃতিতে বলা হয়, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে এক সময় একচেটিয়াভাবে রেলওয়ের প্রাধান্য থাকলেও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ না হওয়ায় এবং বহু পুরনো বাহনের কারণে বাংলাদেশে রেলের ব্যবসা পড়ে যায়। ২০০৬ সালে রেলওয়ে ইম্প্রুভমেন্ট প্রোজেক্ট চালু করার পর এডিবি এ পর্যন্ত চার দফায় ২৮১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশকে।
যুক্তরাজ্যের রাস্তায় মুসলিম নারীদের অহরহ বর্ণবাদী আচরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। দেশব্যাপী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করার অংশ হিসেবে রোববার লন্ডনের ফিন্সবুরি পার্ক মসজিদে ভিজিট মাই মসক ডে নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। করবিন ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন। এ ছাড়া দেশটির আরও দুশটি মসজিদ এ আয়োজন করে। ফিন্সবুরি পার্ক মসজিদ পরিদর্শনে গিয়ে লেবার নেতা বলেন, আমাদের সমাজে ইসলামবিদ্বেষ একটি মৌলিক সমস্যা। ইহুদি কিংবা আফ্রো-ক্যারেবীয় লোকদের প্রতি যে বিদ্বেষ সমাজে প্রচলিত আছে, তার চেয়ে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণার বিস্তার কম নয়। তিনি বলেন, আমি যেসব মুসলিম নারীদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আমার কাছে এমন অভিযোগ করেছেন। নারীরা হিজাব পরলে তাদের হেনস্তা হতে হয়।
এটি তাদের প্রতি অন্যায়, এটি আমাদের সবার প্রতি অন্যায়। মুসলিম কাউন্সিল অফ ব্রিটেন এ কর্মসূচির আয়োজন করে। ইসলাম নিয়ে ভীতি দূর করতে ভিজিট আওয়ার মকস ডেতে বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের লোকদের মুসলমানদের নামাজ দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ সময়ে অন্য ধর্মের লোকেরা যাতে ইসলাম নিয়ে তাদের প্রশ্ন করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা হয়। কোরআন পড়া ও হিজাব পরার এই অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন ছিল। গত বছরের জুনে ফিন্সবুরি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর এই প্রথম এমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। সেদিন ড্যারেন অসবর্ণ নামে এক ব্যক্তি মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়া মুসল্লিদের ওপর ভ্যান উঠিয়ে দিলে একজন নিহত ও ১২ জন আহত হন। এ ঘটনায় মামলার বিচারক বলেন, মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার আদর্শ থেকেই এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
২০৪১ সালে ৩৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু কাঠের ভবন তৈরি করবে জাপানের একটি কোম্পানি। সুমিতোমো ফরেস্ট্রি নামের ওই কোম্পানি বলছে, ৭০ তলাবিশিষ্ট ভবনটি তৈরিতে মাত্র ১০ শতাংশ স্টিল ব্যবহার করা হবে। বাকি পুরোটাই হবে কাঠের।
১ লাখ ৮০ হাজার কিউবিক মিটার দেশীয় কাঠের সমন্বয় করে ভবনটি নির্ণয় করা হবে। বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, টোকিওতে তৈরি এই ভবনে আট হাজার ঘর থাকবে। প্রতিটি ঘরে থাকবে গাছ আর বারান্দায় থাকবে পাতাবাহার। জাপান ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। সারা বছরই ভূমিকম্প হয়। তিনতলা ভবনের চেয়ে ছোট স্থাপনা নির্মাণে কাঠ ব্যবহার করতে ২০১০ সালে জাপান সরকার আইন পাস করে। তবে ভূমিকম্পের বিষয়টি মাথায় রেখেই ভবনটি তৈরি হচ্ছে। বাঁকানো টিউব স্ট্রাকচারে এমনভাবে ভবনটি তৈরি করা হবে, যার ফলে জাপানের স্বাভাবিক ভূমিকম্পগুলো মোকাবিলা করতে পারবে এটি। ভবনটি নির্মাণে ব্যয় হবে ৫৬০ কোটি ডলার। প্রচলিত ভবন নির্মাণের চেয়ে এই খরচ প্রায় দ্বিগুণ। তবে কোম্পানিটি বলছে, ২০৪১ সালের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু কাঠের ভবনটি রয়েছে ভ্যাঙ্কুভারে। শিক্ষার্থী বসবাসের জন্য নির্মিত ভবনটি ৫৩ মিটার উঁচু।
পাকিস্তান বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে শিশুর জন্মের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশে প্রতি হাজার নবজাতকের মধ্যে ৬৪ জনের মৃত্যু হয় জন্মের এক মাসের মধ্যে। শিশুর জন্ম-মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ।
গতকাল সোমবার ‘এভরি চাইল্ড অ্যালাইভ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ইউনিসেফের প্রতিবেদন বলা হয়, পাকিস্তানে প্রতি ২২ জন নবজাতকের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে মৃত্যুহারের নিরিখে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, এমন ১০টি দেশের তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে প্রথম পাকিস্তানের পরই আছে মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র। এ তালিকার ১০টি দেশের মধ্যে ৮টিই সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশ। দুটি দেশ দক্ষিণ এশিয়ার। এর মধ্যে পাকিস্তান বাদে এ অঞ্চলের আরেকটি দেশ হলো আফগানিস্তান। এ দেশের অবস্থান তালিকার তৃতীয় স্থানে। জাপান বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে শিশু জন্মের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। এশিয়ার এ দেশে প্রতি হাজারে নবজাতক মৃত্যুর হার মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আইসল্যান্ড। তৃতীয় স্থানে এশিয়ার আরেক দেশ সিঙ্গাপুর।
খালেদা জিয়ার জীবন থেকে জরুরি অবস্থা যেন ফুরাচ্ছেই না। জরুরি অবস্থার সময় একবার জেলে গেলেন, দ্বিতীয়বার গেলেন ৫ জানুয়ারির সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলে, ২০১৮ সালে। মামলাটাও আবার সেই জরুরি আমলেই করা। কিন্তু ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরের আটকের চাইতে এখনকার পরিস্থিতি আলাদা। সেবার দেশের প্রধান দুই নেত্রীই বন্দী হয়েছিলেন, এখন খালেদা জিয়া একাই দণ্ড ভোগ করছেন। নাজিমুদ্দিন রোডের নির্জন কারাগারের নিঃসঙ্গ দণ্ডিত এখন একজনই। জরুরি অবস্থার সময়ের রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রথমে শিথিল ও পরে বাতিল হলেও তার সুফল বিএনপির ঘরে আসেনি। ২০০৯ সাল থেকে মহাজোট সরকার বিএনপিকে যেভাবে হামলা-গ্রেপ্তার-নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাতে বিএনপি যেন এখনো ‘জরুরি অবস্থা’র মধ্যেই আটকে আছে। সেবার খালেদা জিয়াকে কারাগারে কাটাতে হয়েছিল ৩৭২ দিন। এবার তা কত হবে রাজনীতির এই দুয়োরানির, তার দিনগণনা শুরু হয়েছে কেবল। শুধু খালেদা জিয়া বা বিএনপির হাজারো নেতা–কর্মীই নয়, দলটির সমর্থকদের জীবনেও এটা এক জরুরি অবস্থার মতোই।
স্বাধীন রাজনৈতিক কার্যকলাপ তাঁরা করতে পারছেন না, জেল-জুলুম-হুলিয়ার খাঁড়া তাঁদের জীবনের ওপর। একেকটি ঘটনা ঘটে আর কয়েক শ বা হাজার বিএনপি কর্মী আটক হন। খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের ঘটনায়ও প্রায় পাঁচ হাজার নেতা–কর্মী আটক হয়েছেন। যদি দেশের অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষও দলটির সমর্থক হন, তাহলে বলতে হবে বিপুলসংখ্যক মানুষের রাজনৈতিক অধিকার জরুরি অবস্থার সময়ের মতোই খর্ব হচ্ছে। কার্যত না হলেও মানসিকভাবে তাঁরা এখনো জরুরি অবস্থার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন। তাঁরাই কি শুধু আলাদা করে ভুক্তভোগী? যেকোনো প্রতিবাদই এখন হুমকিতে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রথমে ৫৭ ধারা, তারপর ৩২ ধারার পর সাংবাদিক নিপীড়নের আইন বানানো ও বিভিন্নভাবে হুমকিতে রাখার ঘটনা বলে দেয়, রাজনীতি, সমাবেশ এবং মতপ্রকাশের অধিকার সবার জন্য খোলা নেই। যঁারাই বাধা পাবেন, ভয় পাবেন, স্বাধীন নাগরিকের জীবন পাবেন না, তাঁরাই ২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থার জ্বালা বর্তমানেও বোধ করবেন। বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা নতুনও নয়, হয়তো শেষও নয়। সাংবিধানিক ধারা-উপধারায় লিখিত সংজ্ঞা দিয়ে একে বোঝা যাবে না। বরং সেসব সংজ্ঞাকে একটু প্রসারিত করে নিলে দেখা যায়, এক স্থায়ী জরুরি অবস্থাই যেন বাংলাদেশের জন্ম থেকে বিরাজ করছে। কেবল রাজনৈতিক দুর্যোগই নয়, সামাজিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে জনগণের বড় অংশের জীবন সর্বদাই ‘বিপদের সম্মুখীন’। আর জনগণের অজুহাতই হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের প্রধান সরকারি যুক্তি। সংবিধানের ১৪১ গ(১) উপধারা অনুসারে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির সময় বলা হয়েছিল, ‘...দেশে এখন এক জরুরি অবস্থা বিদ্যমান রহিয়াছে, যাহাতে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের দ্বারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপদের সম্মুখীন।’ একজন বিদেশি কূটনীতিক সে সময় দাবি করেছিলেন, ‘আমাদের উন্নয়নকাজের স্বার্থ রক্ষায় এটাই ছিল একমাত্র পথ’ (Restoring Democracy in Bangladesh, Asia Report, ICG, 28 Apr 2008)। অনেকে তা মেনেও নিয়েছিলেন। বর্তমানেও বিরোধী পক্ষকে দমনের পক্ষে সেই উন্নয়নের যুক্তিও কেউ কেউ মানতে রাজি। যাহোক, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে জরুরি অবস্থা জারির কারণ হিসেবে যে অভ্যন্তরীণ গোলযোগকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল, বারবার সেই গোলযোগের ঝুঁকির মধ্যেই তো বাংলাদেশ পড়ছে! ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরের বড় একটা সময় সেই গোলযোগ চলেছিল। এখনো জাতীয় নির্বাচনের দিকে যত এগোচ্ছে বাংলাদেশ, ততই সে রকম গোলযোগের ভয় পাকছে। বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অন্যদের অনেকেই প্রায় বিনা ভোটে ‘নির্বাচিত’ বলে ঘোষিত হওয়ায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বশীলতার সংস্কৃতির বড় রকমের ধাক্কা খায়। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি দেওয়া হলেও কার্যত এটা হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা। এভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার একমাত্র উপায় হলো বলপ্রয়োগ। যেকোনো জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্র প্রধানত আইনের শাসনের বদলে বলপ্রয়োগের হাতিয়ারের ওপরই বেশি নির্ভরশীল থাকে। গণতন্ত্রে বলপ্রয়োগের হাতটা আইনের দস্তানায় ঢাকা থাকে, পর্দার আড়ালে থাকে; সামনে থাকে আলোচনা-সমঝোতার হাত। নির্বাচন এ রকম এক সমঝোতা, যেখানে বিনা বলপ্রয়োগে ক্ষমতার পালাবদল হবে, সরকারের নবায়ন হবে। যার সমর্থন বেশি তাকে বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না। কিন্তু যে শাসন সমর্থনের চাইতে দাপটের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাকে বলে সমর্থনহীন দাপট (ডমিন্যান্স উইদাউট হেজিমনি)। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে আমরা এ রকম মান্যতাহীন (হেজিমনিহীন) দাপটের (ডমিন্যান্স) শাসনেই ছিলাম। প্রশ্ন হলো সমঝোতার সুযোগ যখন দুই পক্ষেরই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তখন আবারও কি আমরা বলপ্রয়োগের খেলায় প্রবেশ করলাম? দৃশ্যত, বিএনপি সরকারের নতুন পর্যায়ের বলপ্রয়োগকে এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই মোকাবিলার কৌশল নিয়েছে। গণহারে গ্রেপ্তার-নির্যাতনের মধ্যে এই ‘শান্তি’ আসলে কতটা টেকসই হবে? যে নামেই ডাকি গোলাপ সুবাস ছড়াবেই, যে নামেই ডাকি গণতন্ত্রের জন্য সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন লাগবেই। আর তার জন্য চাই এমন পরিবেশ, যাতে কারও পিঠই একেবারে দেয়ালে গিয়ে না ঠেকে। নড়াচড়ার কিছুটা জায়গা, আলোচনার কিছুটা পরিবেশ লাগবেই। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নয়, রাষ্ট্রের সবগুলো স্তম্ভের মধ্যে এমন গণতান্ত্রিক লেনদেন ও আলোচনা আপনা–আপনি হবে না। যখন সবাই বুঝবেন যে মীমাংসা করে নেওয়াই মঙ্গলজনক, তখনই সেটা হবে। বিগত জরুরি অবস্থার শেষ সময়ে আমরা দেখেছি অনেকটা বাধ্য হয়েই রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক পক্ষ দেশে ও বিদেশে আলোচনায় বসেছিলেন। সেই সমঝোতার ফল ছিল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন। সেই সমঝোতার ফল যদি ভালো হয়, আবার কেন সে রকম কিছু হতে পারবে না? দুই নেত্রীর জেলে থাকার অবস্থাতেই কিন্তু সেই সমঝোতা হতে পেরেছিল। সুতরাং, খালেদা জিয়া অন্তরীণ বা জেলে থাকা অবস্থাতেও তাঁর বা তাঁর দলের সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ করা ঠিক হবে না।
ফারুক ওয়াসিফ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
faruk.wasif@prothomalo.info
চতুর্থ প্রজন্মের (ফোর-জি) টেলিযোগাযোগ সেবার সিম বদলে দিতে গ্রাহকের কাছ থেকে ১০০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে মোবাইল ফোন অপারেটররা। এই অর্থ নিতে অপারেটরদের যুক্তি হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী সিম প্রতিস্থাপন কর হিসেবে এ অর্থ নেওয়া হচ্ছে। সিম প্রতিস্থাপনের এনবিআর নির্ধারিত ১০০ টাকার পাশাপাশি গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি ১০ টাকা নিচ্ছে এক অপারেটর। আবার এই অর্থ আদায়ে গ্রাহকভেদে বৈষম্যও করছে তারা। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গ্রাহকের কাছ থেকে এ বাবদ কোনো টাকা নেওয়া হচ্ছে না। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেসব গ্রাহক ফোর-জি ব্যবহারের জন্য সিম বদলাচ্ছেন তাঁরা ইতিমধ্যেই এ বাবদ সব ধরনের কর দিয়েছেন। এতে সিমের মালিকানাও পরিবর্তন হচ্ছে না। একই ব্যবহারকারী শুধু পুরোনো প্রযুক্তি থেকে উন্নত প্রযুক্তির সেবা নিতে সিমটি বদলাচ্ছেন। এ জন্য প্রতিস্থাপন কর হিসেবে ১০০ টাকা আদায় করা অযৌক্তিক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফোর-জি সিম প্রতিস্থাপন করতে গ্রামীণফোন সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে ১১০ টাকা করে নিচ্ছে। রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক নিচ্ছে ১০০ টাকা। তবে তিন অপারেটরই তাদের বিশেষ গ্রাহকের কাছ থেকে সিম প্রতিস্থাপনের টাকা নিচ্ছে না। এ ধরনের গ্রাহকের মধ্যে রয়েছেন গ্রামীণফোনের স্টার, রবির ধন্যবাদ ও বাংলালিংকের প্রিয়জন প্যাকেজের গ্রাহকেরা।
এসব গ্রাহক মাসে কমপক্ষে ৫০০ টাকা মোবাইলে খরচ করেন। এসব গ্রাহকের পক্ষে অপারেটররাই সিম প্রতিস্থাপন কর সরকারকে দিচ্ছে। অপারেটররা বলছে, যেসব গ্রাহক বেশি খরচ করেন ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে তাঁদের একটু বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। গ্রামীণফোনের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স মাহমুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের পক্ষে অপারেটররা গ্রাহকের কাছ থেকে ১০০ টাকা সিম প্রতিস্থাপন কর আদায় করছে। বাড়তি যে ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে এ জন্য গ্রাহকেরা দেড় গিগাবাইট ইন্টারনেট ডেটা বিনা মূল্যে পাচ্ছেন, যার বাজারমূল্য ১৪০ টাকা। এর সঙ্গে আছে গ্রাহকসেবার পরিচালন ব্যয়। সব মিলিয়ে কোনোভাবেই গ্রাহকের কাছ থেকে বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে না। টেলিযোগাযোগবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ গবেষক আবু সাইদ খান প্রথম আলোকে বলেন, সিম প্রতিস্থাপনে যেভাবে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে তাতে একধরনের শ্রেণি-বৈষম্য রয়েছে। যিনি ধনবান তাঁকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে, আর যিনি স্বল্পবিত্তের তাঁকে জরিমানা করা হচ্ছে। এ ধরনের নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্দিষ্ট গ্রাহককে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে গ্রাহকের মধ্যে বৈষম্য তৈরির কোনো নীতিই সমর্থনযোগ্য নয়। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আমি বিটিআরসিকে বলব।’ সিম প্রতিস্থাপন করের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, যে কর এনবিআর আরোপ করেছে, তা পুনর্বিবেচনা করতে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
নির্মাণকাজের উপকরণ রডের পর এবার বাড়ল সিমেন্টের দাম। সিমেন্ট কোম্পানিগুলো ৫০ কেজির প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম বাড়িয়েছে ২০ টাকা। গত সোমবার থেকেই সারা দেশে এই বাড়তি দামে সিমেন্ট বিক্রি শুরু হয়েছে। সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা বলেন, সিমেন্ট খাতের পাঁচটি কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। বন্দরে জাহাজজটের কারণে গত বছরের মাঝামাঝি থেকে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে গেছে ক্লিংকারের দামও। আবার মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ির ওজন নিয়ন্ত্রণের কারণে উৎপাদিত সিমেন্ট পরিবহনেও খরচ বেড়েছে। ডলারের বিনিময়মূল্যও বেড়েছে। আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সিমেন্টের ব্যাগের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এই খাতে নিত্যনতুন বাড়তি খরচ যোগ হয়েছে। সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি ও মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে প্রস্তুত পণ্য পরিবহন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই খরচ বেড়েছে। এ কারণে গত অক্টোবর থেকেই সিমেন্ট কোম্পানিগুলো লোকসান দিয়ে আসছে। এখন প্রতি বস্তা সিমেন্টে বাড়তি খরচ হচ্ছে কোম্পানিভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। বাড়তি খরচের একাংশ সমন্বয় করা হয়েছে। এটিকে দাম বাড়ানো হিসেবে দেখা উচিত নয়। খরচ সমন্বয় না করলে এই বড় খাতে বিপর্যয় হবে। বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দাম বাড়ার আগে মানভেদে বিভিন্ন কোম্পানির প্রতি বস্তা সিমেন্ট বিক্রি হতো ৩৪৫ থেকে ৩৯০ টাকা। এখন প্রতি বস্তা সিমেন্টের দাম বেড়ে হয়েছে ৩৬৫ থেকে ৪১০ টাকা। চট্টগ্রামের চকবাজারের ভান্ডার ট্রেডিংয়ের কর্ণধার গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, চারটি কোম্পানির সিমেন্টের প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) তাঁরা খুচরা পর্যায়ে ৩৭০ থেকে ৩৯০ টাকা বিক্রি করতেন। দাম বাড়ার পর এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩৯০ থেকে ৪১০ টাকা। দাম বাড়ার বিষয়টি ক্রেতাদের জানাোনা হয়েছে। সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি ও উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সিমেন্ট খাতে উৎপাদনে রয়েছে ৩৪ কারখানা। এগুলো ২০১৭ সালে সম্মিলিতভাবে উৎপাদন করেছে প্রায় আড়াই কোটি টন সিমেন্ট। এ হিসেবে দাম বাড়ায় সিমেন্ট ব্যবহারকারীদের বছরে বাড়তি ব্যয় করতে হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে বছরে সিমেন্টের বেচাকেনা দাঁড়াবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানির তথ্যানুসারে, ২টি কারখানা ক্লিংকার উৎপাদন করলেও বাকি ৩২টি কারখানা ক্লিংকারসহ অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করেই সিমেন্ট প্রস্তুত করে।
সিমেন্ট উৎপাদনে প্রধান পাঁচটি কাঁচামাল হলো ক্লিংকার, লাইমস্টোন, স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসাম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই পাঁচটি কাঁচামাল আমদানি হয়েছে ২ কোটি ২৯ লাখ টন। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে সিমেন্ট ক্লিংকার আমদানি হয় ১ কোটি ৪৫ লাখ টন। উদ্যোক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম বেড়েছে টনপ্রতি চার থেকে পাঁচ ডলার। ক্লিংকার রপ্তানিকারক দেশ চীন ক্লিংকার আমদানি শুরু করেছে। এতে চাপ পড়ছে বৈশ্বিক বাজারে। মূলত চীনের আমদানিই বিশ্ববাজারের ক্লিংকারের দাম  বাড়িয়ে দিয়েছে। সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি  পরিবহন খরচও বেড়েছে। মহাসড়কে গত নভেম্বর থেকে পণ্যবাহী গাড়ির ওজন নিয়ন্ত্রণের কারণে এখন দুই গাড়ির সিমেন্ট তিন গাড়িতে পরিবহন করতে হচ্ছে। যেমন ছয় চাকার ট্রাকে আগে যেখানে ২০ টন সিমেন্ট পরিবহন করা হতো, এখন সেখানে পরিবহন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ টন। আবার দশ চাকার ডাম্প ট্রাকে আগে যেখানে ২৫ টন পরিবহন হতো, এখন সেখানে হচ্ছে সাড়ে ১৭ টন। এই খরচও যুক্ত হচ্ছে সিমেন্টের দামে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিডব্লিউ রিসার্চ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ সিমেন্ট মার্কেট রিপোর্ট ২০১৭’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নে সিমেন্টের ব্যবহার ৩৫ শতাংশ। ব্যক্তি উদ্যোগে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার ৪০ শতাংশ। আবাসন খাতে ২৫ শতাংশ। দাম বাড়ার প্রভাব পড়বে এই তিনটি খাতে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি আব্দুল কৈয়ূম চৌধুরী বলেন, ইতিমধ্যে রডের দাম টনপ্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। এখন নতুন করে যুক্ত হলো সিমেন্টের বাড়তি দাম। নির্মাণ উপকরণের দাম বাড়লেও ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে না। এতে আবাসন খাতে নতুন করে বিরূপ প্রভাব পড়বে।
ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণসীমা সমন্বয়ে এবার ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে এ সীমা সমন্বয়ে জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল; যা নিয়ে পুরো খাতে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন ঋণসীমা পরিপালনের সময়সীমা ৩০ জুনের পরিবর্তে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পুনর্নির্ধারণ করা হলো। গত ৩০ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল, আগে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে ৮৫ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারত। এখন আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৩ টাকা ৫০ পয়সা ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকগুলো। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো আগে ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৯০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারত, এখন পারবে ৮৯ টাকা। যেসব ব্যাংকের ঋণ নতুন সীমার বেশি রয়েছে, তা আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে হবে। এরপরই ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানত সংগ্রহ নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। গত রোববার অগ্রণী ব্যাংকের এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘একটি বেসরকারি ব্যাংক (ফারমার্স) খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছে। বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত সরিয়ে নিতে চাইছে। একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এ আতঙ্ক আগে শেয়ারবাজারে ছিল, এখন ব্যাংকে চলে আসছে।’ বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের হস্তক্ষেপ চান গভর্নর। পরিস্থিতি সামলাতে অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে বক্তব্যে দেওয়ায় এ নিয়ে পুরো খাতে একধরনের আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এরপর গতকালই আগের অবস্থান থেকে পিছু হটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
২০১৭ সালে ১৪১ শতাংশ মুনাফা বেড়েছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির। ওই বছর কর-পূর্ববর্তী মুনাফা হয়েছে ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা হয় ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। মূলত ব্যবসা সম্প্রসারণ ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এশিয়া অঞ্চলকে গুরুত্ব দেওয়ায় মুনাফা বেড়েছে এইচএসবিসির।
২০১৫ সালে ১৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করে এইচএসবিসি। ২০১৬ সালে এসে মুনাফা বেশ কমে যায় ব্যাংকটির। এর অন্যতম কারণ ছিল ব্রাজিলের ব্যবসা বিক্রি থেকে লোকসান। ২০১৭ সালে এশিয়া থেকেই ব্যাংকটির কর-পূর্ববর্তী মুনাফা এসেছে ৮৯ দশমিক ৩ শতাংশ বা ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে ইউরোপে লোকসানের পরিমাণ ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এইচএসবিসি যুক্তরাজ্যের অন্যতম ব্যাংক হলেও এর মুনাফার বড় অংশই আসে যুক্তরাজ্যের বাইরে থেকে। বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চল থেকে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, আঞ্চলিক এশিয়ান বাণিজ্য চুক্তি এবং চীনের বেল্ট এবং রোড প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ঋণের প্রত্যাশায় আশা জাগিয়েছে।
দেশে বই থেকে শুরু করে বেশির ভাগ সৃজনশীল মেধাসম্পদের কপিরাইট নিবন্ধন না করা বা এ ব্যাপারে লোকজনের আগ্রহ না থাকার বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। মেধাসম্পদের কপিরাইট নিবন্ধন না করায় সেসব দেদার নকল হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে। এ পরিস্থিতির অবসান হওয়া খুবই জরুরি। মেধাসম্পদ হচ্ছে মানুষের মেধা, মনন, সৃজনশীলতা থেকে যা সৃষ্টি হয়। কপিরাইট হলো এর আইনি স্বীকৃতি। কপিরাইট মূলত কোনো কিছু সৃষ্টির জন্য স্রষ্টাকে স্বত্ব প্রদান এবং বিনা অনুমতিতে ওই সৃষ্টকর্মের যেকোনো ধরনের অনুলিপি বা অনুবাদ, পুনমু৴দ্রণ, বিক্রি ও প্রচার নিবৃত্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমাদের দেশে বই থেকে শুরু করে শিল্পকর্ম, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, রেকর্ড, কম্পিউটার সফটওয়্যার, মোবাইল অ্যাপস, কম্পিউটার গেম ইত্যাদি সৃজনশীল মেধাসম্পদের কপিরাইট নিবন্ধন করা হচ্ছে না। ঢাকার কপিরাইট অফিসের কার্যক্রম ষাটের দশকে শুরু হলেও ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিবন্ধনকৃত মেধাসম্পদের সংখ্যা মাত্র ৯ হাজার ৯৬১। গত বছর কপিরাইট আইনে ছয়টি বিষয়ে নিবন্ধন হয়েছে ৩ হাজার ১৩৪টি কর্ম। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন প্রণীত হয়েছে ২০০০ সালে। ২০০৫ সালে আইনটির সংশোধন করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আইনটি সম্পর্কে অনেকেই জানেন না।
কপিরাইট সম্পর্কেও অনেকের ধারণা অস্পষ্ট। ফলে অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁদের আইনি অধিকার থেকে। ঢাকার নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে সারা বছর বেআইনি ফটোকপি বইয়ের জমজমাট ব্যবসা চলে। নিম্নমানের কাগজে ছাপানো এসব বই সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। নকল বইয়ের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নকল সিডি-ডিভিডির বাজারও। ফলে ক্রেতা বা ভোক্তারা লাভবান হলেও ক্ষতির মুখে পড়েন এসব মেধাসম্পদের প্রকৃত মালিক ও তাঁদের উত্তরসূরিরা। আমাদের দেশে কপিরাইটের মেয়াদ স্বত্বাধিকারীর মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময় পর্যন্ত উত্তরাধিকার ছাড়া অন্য কেউ মেধাসম্পদ কপি বা বিক্রি করতে পারবেন না। কপিরাইট আইন ভঙ্গের জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্তু দেশে যেহেতু মেধাসম্পদ নিবন্ধনের সংস্কৃতিই গড়ে ওঠেনি, তাই এসব আইনেরও প্রয়োগ নেই। যেহেতু কেউ অভিযোগ করেন না, তাই নকল পণ্য উদ্ধারে কপিরাইট টাস্কফোর্সের অভিযানও বন্ধ রয়েছে। এমন তো চলতে পারে না। স্রষ্টা, উৎপাদক ও ভোক্তা—সব পক্ষকেই সচেতন হতে হবে। সরকারেরও অনেক কিছু করণীয় আছে। কপিরাইট আইনটি সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। প্রয়োজনমতো আইনের প্রয়োগ করতে হবে। কপিরাইট অফিসে গিয়ে কীভাবে নিবন্ধন করতে হবে এবং কেন এটি প্রয়োজনীয়, সে ব্যাপারেও প্রচারণা চালাতে হবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব হলো না। বরং আগাম ঘোষণা দিয়ে ফাঁস করা হয়েছে কিছু প্রশ্ন। শিক্ষাসচিব মহোদয় এবারের মতো অপারগতা স্বীকার করে নিয়েছেন। দুটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, আশা করা যায় এই কমিটি আগামী দিনে সুষ্ঠু পরীক্ষার পথ বাতলে দেবে। তবে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এ বছরের নতুন উৎপাত নয়, বহুদিন ধরেই এটা হচ্ছে। কখনো শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, বেশির ভাগ সময় অস্বীকৃতির মাধ্যমে গা বাঁচিয়েছে। আদতে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ব্যর্থতা আকস্মিক ব্যাপার নয়, শিক্ষায় অনেক অর্জনের মধ্যেও ব্যর্থতার একটা ধারাবাহিকতা আছে। একসময় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় নোট বই-গাইড বই বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু এগুলো বন্ধ হয়নি। কোচিং সেন্টার ও টিউটোরিয়াল বাণিজ্যকে বেআইনি ঘোষণা সত্ত্বেও এগুলো দিব্যি চলছে। আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় একসময় দেদার নকল হতো, একমাত্র সেটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এবং তার কৃতিত্ব গত জোট সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে দিতে হবে। আমরা ভুলব না, বর্তমান আমলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের নেতৃত্বে শিক্ষায় অনেক যুগান্তকারী কাজ হয়েছে। প্রায় শতভাগ শিশু প্রাথমিকে ভর্তি হচ্ছে, প্রতিবছর সব স্কুলে ছাত্রকে বিনা মূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বছর বছর বাড়তে বাড়তে এ বছর ৩৬ কোটি বইয়ে দাঁড়িয়েছে। বইয়ের টেক্সট ও ছাপা-বাঁধাই উন্নত হচ্ছে। মেয়েদের শিক্ষা আশাব্যঞ্জক হারে বেড়েছে, তার জন্য গৃহীত ব্যবস্থাগুলোর জন্য সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাধুবাদ পাবে। কিন্তু এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মানসম্পন্ন শিক্ষার শর্ত পূরণ আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জন্য যেমন সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন, তেমনি চাই প্রয়োজনীয় অর্থায়ন। শিক্ষার লক্ষ্য সঠিকভাবে নির্ধারিত হলে মানোন্নয়নের জন্য করণীয় নির্ধারণ সহজ হবে। সেই সঙ্গে আমাদের দেশীয় বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। আমার ধারণা, এসব ব্যাপারে বিভ্রান্তি থাকার কারণে সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ঘন ঘন পরিবর্তন, বিভিন্ন পরীক্ষামূলক সংস্কার করতে গিয়ে অকারণ জটিলতা ও ভোগান্তি বেড়েছে।
এর ফলাফল হিসেবে শিক্ষায় এক বিপরীত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—আজ পাঠ্যবইয়ের চেয়ে নোট-গাইড বইয়ের গুরুত্ব বেশি, স্কুলের চেয়ে কোচিং সেন্টার মূল্যবান, শিক্ষাকে ছাপিয়ে পরীক্ষাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, শিক্ষক মূল্য হারিয়েছেন টিউটরদের কাছে আর এই উল্টোযাত্রার চূড়ান্ত ফল হলো, শিক্ষার্থীরা সবাই শুরু থেকেই পরীক্ষার্থীতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার অভিযাত্রার এই পরিণতি নিয়ে একটু সিরিয়াসলি ভাবা দরকার। নয়তো সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো নতুন নতুন সমস্যার জটে হাবুডুবু খেতে থাকব। এক বাঙালি মনীষী শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে লিখেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য আসলে সবারই জানা, কিন্তু ‘সেটা প্রকাশ করিয়া বলিতে আমরা সকলেই অল্প-বিস্তর লজ্জিত হই। কেননা উত্তরটা অতি সাধারণ রকমের, এবং বড় কথা বলিয়া ও শুনিয়া যে আত্মপ্রসাদ লাভ করি—সোজা কথা বলায় ও শোনায় আমরা সে সুখে বঞ্চিত হই।’ তারপর তিনি সেই সবার জানা সহজ কথাটা বলেছেন, ‘কথাটা এই যে শিক্ষার উদ্দেশ্য বিদ্যাশিক্ষা দেওয়া, যাকে আমরা বাংলা কথায় বলি লেখাপড়া শেখানো।’ লেখাপড়া একবার শিখলে এবং তাতে আনন্দ পেলে মানুষটার এই অভ্যাস আজীবন বজায় থাকে। ফলে অব্যাহত শিক্ষা বা জীবনব্যাপী শিক্ষা নামের নানা প্রকল্পের প্রহসনের প্রয়োজন পড়ে না যদি ছেলেমেয়েরা ঠিকভাবে লিখতে-পড়তে শেখে এবং তা থেকে আনন্দের খোরাক পেতে থাকে।নীতি শিক্ষা ও চরিত্র গঠন নিয়ে বাঙালি বড়ই ভাবিত। পরিষ্কার বলা দরকার, পড়াশোনা চরিত্র গঠনে তখনই সহায়ক হবে, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ব্যক্তি (শিক্ষক) এবং কার্যক্রম (পাঠ ও সহপাঠ) এই চাহিদার সঙ্গে মানানসই দৃষ্টান্ত ও অনুকূল পরিবেশ রচনা করবে। পরিবার ও সমাজে ব্যক্তিবর্গকে চরিত্র বা নীতিভ্রষ্ট হওয়ার যথেচ্ছ অধিকার দিয়ে রাখলেও সচ্চরিত্রের মানুষ তৈরি করা কঠিন। কিন্তু আমাদের ব্যবস্থা সেখানে বাদ সেধেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর একমাত্র করণীয়, তাদের জন্য শিক্ষা কর্তৃপক্ষ, সমাজ (এবং গণমাধ্যম) স্বীকৃত সাফল্যের একমাত্র ক্ষেত্র পরীক্ষা, তাদের ছাত্রজীবন ঘন ঘন পরীক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা-প্রস্তুতিতেই কেটে যায়। এতে তারা সর্বক্ষণ প্রতিযোগিতার ও সাফল্যের চাপে জর্জরিত থাকে। এমন চ্যালেঞ্জের চাপে যে কচি জীবনটি কাটে, তাতে মানবিক গুণ ও সুকুমারবৃত্তির মতো যেসব গুণাবলি—জীবনযাপন, অনুশীলন ও উপভোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে অর্জনযোগ্য—সেগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকে যায়। বিদ্যালয় ও পরিবার তাদের এ কাজে সহায়তা দিতে পারে না, বরং তারা শিশুদের ইঁদুর দৌড়ে অন্যদের পেছনে ফেলার জন্য বাড়তি চাপ দেয়, নিজেরাও বাড়তি কিছু করে দেখাতে চায়। এই বাড়তি কাজের সর্বশেষটি হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস। নিশ্চিতভাবেই এর লগ্নিকারী প্রযোজক অভিভাবকবৃন্দ এবং এই দুর্নীতির জাল বিস্তৃত হতে হতে এতে জড়িয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকসহ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের লোকজন মায় ছাত্ররাও। তবে কচি ছাত্রগুলো যে এখনো বিবেক ও সংবেদনশীলতা হারায়নি, তা বোঝা যায় প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে ধৃত ছাত্রদের মুখ ঢাকার চেষ্টা বা লজ্জিত মুখাবয়ব দেখে। তারা তো দোষী নয়, বড়দেরসমবেত অবিমৃশ্যকারিতা ও ব্যর্থতার শিকার (victim)। তাদের অভিযুক্ত করে সমাজ বা শিক্ষাকর্তারা কি নিজেদের দায় ও লজ্জা ঢাকতে পারবেন?। সব মিলে বলা যায়, এটাই আমাদের শিক্ষার উল্টোযাত্রার চূড়ান্ত ফল। এই যাত্রায় যদি কেবল প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধের উপায় বের করার মধ্যেই সমস্যার সমাধান খুঁজি, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে পরীক্ষার ফলের পেছনে ছুটন্ত অভিভাবক-শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রাণান্ত প্রয়াস অচিরেই বিকল্প পথের সন্ধানে ব্যয়িত হবে। তাতে শিক্ষার লক্ষ্যভ্রষ্ট যাত্রায় পুরোনোর সঙ্গে নতুন রোগের উপসর্গ যোগ হয়ে মাথাব্যথার কারণ বাড়বে বৈ কমবে না। এই উল্টোযাত্রায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি বোধ হয় এই হয়েছে যে শিক্ষায় শিক্ষকই খলনায়ক রূপে চিহ্নিত হচ্ছেন, অন্তত শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের কথায় তা-ই মনে হয়। কিন্তু শিক্ষায় মূল চরিত্র হলো শিক্ষক, শিক্ষার্থীকে বলব মূল পাত্র। ব্যবস্থার ‘গুণে’ কিছু শিক্ষক নিশ্চয় দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন, কিন্তু তাই বলে শিক্ষার মূল চরিত্রকে ভিলেন বানিয়ে অভিযুক্ত করে কীভাবে শিক্ষাররোগ সারাব? আমাদের স্কুলশিক্ষার মূল দুর্বলতাই হলো আদর্শবান মেধাবী তরুণদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। অধিকাংশের অনিচ্ছার পেশা এটি, আগ্রহের ঘাটতি থাকলে নিজেকে তৈরি করা ও কাজে আন্তরিকতার ঘাটতি থাকবেই। প্রশিক্ষণ বা আর্থিক প্রণোদনাকে ছাপিয়ে তাঁদের আগ্রহ প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং সেন্টারে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং খাবে। পরীক্ষামুখী এই ব্যবস্থা তাঁদের শিক্ষা–বাণিজ্যের চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে, স্কুল হলো ছাত্র ধরার মৃগয়াক্ষেত্র। এই ব্যবসায় মূল পুঁজি হলো ছাত্রের ফলাফলের ভিত্তিতে অর্জিত ‘গুডউইল’। এভাবে ছাত্ররা বাণিজ্যের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর সব মিলে নীতিনির্ধারক, কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং অভিভাবক ও ছাত্রদের যোগসাজশে আমাদের শিক্ষার উল্টোযাত্রা সব দুর্নীতি ও ব্যাধি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। বিনা মূল্যে বই, বইয়ের মান বৃদ্ধি, সৃজনশীল প্রশ্ন—সবই এই ব্যবস্থার জ্বালানি হিসেবে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো শিক্ষা ব্যবস্থার রোগের বাড়াবাড়ি অবস্থা, যাকে বলে যাই যাই অবস্থা। তাই এর জন্য অবিলম্বে কার্যকর কড়া ডোজের ওষুধ দিতে হবে হয়তো র‍্যাব-পুলিশের তৎপরতাসহ। কিন্তু এতে রোগের সাময়িক উপশম হবে, সেই ফাঁকে এইচএসসি পরীক্ষাটাও পার করতে পারলে ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে। তবে বেশি কালক্ষেপণ না করে আসল জায়গায় হাত দিতে হবে। শিক্ষানাট্যের মূল চরিত্রকে উপেক্ষা করে, তাঁদের নষ্ট পথে ঠেলে দিয়ে ও রেখে এবং বিষয়কে (শিক্ষা) বিকৃত করে (পরীক্ষায় বন্দী করে) এই নাটকের মিলনান্তক সমাপ্তি আশা করা যায় না। বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং দুই শিক্ষামন্ত্রী—চারজন মিলে (চতুরানন হলেন ব্রহ্মা) ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে শিক্ষার উল্টোযাত্রা বন্ধ করে তার অগ্রযাত্রার পথ সুগম করবেন।
আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক