Last update
Loading...
না, এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটা খুব ভালো করেই জানা আছে যে কংগ্রেস পার্টি হতাশাজনকভাবে নেহরু-গান্ধী বংশের ওপর নির্ভরশীল। কংগ্রেস সভাপতির পদে রাহুল গান্ধীকে মনোনীত করাটা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের নেতা মণি শংকর আয়ার এ ঘটনায় আরেকটি মাত্রা দিয়েছেন। তিনি রাহুলের এই মনোনয়নকে মোগল রাজবংশের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাজার পুত্র সব সময় রাজাই হবে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে যখন কংগ্রেসের সভাপতির পদের জন্য প্রস্তুত করে তুলছিলেন, সেই সময় কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটিতে দলের তৎকালীন সভাপতি ইউ এন ধীবর ইন্দিরা গান্ধীর নাম প্রস্তাব করেন, কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থ বলেছিলেন যে ইন্দিরার স্বাস্থ্যের অবস্থা যেহেতু ভালো নয়, কাজেই তাঁকে এ দায়িত্ব দিয়ে বিরক্ত করা উচিত হবে না। নেহরু তখন তাঁর এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছিলেন যে তাঁর নিজের এবং পন্থের তুলনায় ইন্দিরার স্বাস্থ্য অনেক ভালো। এরপর ইন্দিরা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। রাহুলকে সভাপতি করার ব্যাপারে কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীও কোনো ভিন্নমত পোষণ করেননি। তিনি সোজা তাঁর ছেলেকে সভাপতির আসনে বসান। তবে একটি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল যে, সোনিয়া হয়তো তাঁর মেয়ে প্রিয়াঙ্কার নাম ঘোষণা করতে পারেন, কারণ রাহুল কোনোভাবেই নিজেকে তুলে ধরতে পারছেন না। তবে অন্যান্য ভারতীয় মায়ের মতো তিনি উত্তরাধিকার হিসেবে ছেলেকেই বেছে নেন। সভাপতি পদে রাহুল গান্ধীর মনোনয়নকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বলেন, এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা হচ্ছে। আরেক কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং বলেন, সোনিয়া গান্ধী ও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তে সভাপতির পদে রাহুলকে বসানো হয়েছে। দিগ্বিজয় সিং আরও বলেন, কংগ্রেসের তৃণমূল নেতা-কর্মীরাও এমনটিই চাইছিলেন। হ্যাঁ, এটা তৃণমূল নেতা-কর্মীদের একটি অভিন্ন ইচ্ছা। প্রকৃতপক্ষে এখন ১০ জনপথ থেকে দলের কার্যক্রম চালানো হবে, যেমনটি চালানো হয়েছিল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর আমলে তিন মূর্তি অথবা সফদরজংয়ের বাসভবন থেকে। যেদিন সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস সভাপতির পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ড. মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়, সেদিন আমি পার্লামেন্টের কেন্দ্রীয় হলে ঘটনার সাক্ষী ছিলাম। তখন দলের সদস্যরা কাঁদছিলেন। তাঁরা বলছিলেন যে সোনিয়া গান্ধীরই প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। কিন্তু তখন সোনিয়া নিশ্চুপ ছিলেন, কারণ তখন থেকেই তাঁর মনে ছিল ছেলের চিন্তা এবং তিনি যদি সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হতেন, তখন এটিকে একটি সাজানো মঞ্চনাটকের মতো দেখাত। এমনকি ড. মনমোহন সিংও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, রাহুল গান্ধীর জন্য চেয়ারটা ছেড়ে দিতে হলে তিনি খুশিই হবেন। যাহোক, দেরি করে হলেও রাহুলের সভাপতি হওয়ার সুযোগ হয়েছে; বিশেষ করে সোনিয়া গান্ধীর দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে রাহুল গান্ধীর দলের ভার গ্রহণ করাটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে নামফলকে পরিণত করেছেন। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদের কথা না বললেও এটা পরিষ্কার যে, ২০১৯ সালের নির্বাচনে কেবল হিন্দুত্ববাদের স্লোগান নিয়ে মাঠে নামবে দলটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সত্য গোপন করেননি যে তিনি নাগপুরে আরএসএস সদর দপ্তরে যান এবং মহারাজ ভাগওয়াতের মতো নেতাদের কাছ থেকে পথনির্দেশ চান। তাঁর ‘সাব কা সাথ, সাব কা বিকাস’ স্লোগানটি এখন নিছক একটি স্লোগান বলেই প্রমাণিত হয়েছে। এখন মুসলমানরা আর তাঁর পরিকল্পনা বা কর্মসূচিকে গণনার মধ্যে আনে না এবং এটা খুবই দুঃখজনক যে তারা নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিপুল বিজয় এটা প্রমাণ করেছে যে কীভাবে বিজেপি এই রাজ্যের ক্ষমতা হস্তগত করেছে। এটা স্পষ্ট যে এই দলটি জনগণকে জানাতে চেয়েছিল যে তারা কোনোভাবেই মুসলিম ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। সদ্য শুরু হওয়া গুজরাট নির্বাচনের আগে মোদি এটা স্পষ্ট করে দেন যে যিনি গুজরাটে জয় পাবেন, তিনি ভারতের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করবেন। এই রাজ্যে বিজেপির একটানা প্রায় ২৩ বছরের শাসন অক্ষুণ্ন রাখতে অক্লান্ত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। অন্যদিকে গুজরাট দখলে আনার মরিয়া চেষ্টায় রীতিমতো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রাহুল গান্ধীও। তবে এখন পর্যন্ত রাহুল গান্ধীর রেকর্ড কোনো দিক থেকে চিত্তাকর্ষক নয়। তিনি উত্তর প্রদেশসহ অনেক নির্বাচনে লড়াই করেছেন। উত্তর প্রদেশ নির্বাচনের সময় তিনি সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তারা বিজেপির কাছে শুধু পরাজিতই হয়নি, এই নির্বাচনে কংগ্রেসের অবস্থান চতুর্থ স্থানে নেমে আসে। এখন গুজরাটের নির্বাচনে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে হবে। যদি তিনি তা করতে ব্যর্থ হন, তবে বোঝা যাবে যে তিনি নিজে নিজে আর কোনো জয় পাবেন না। যদি তিনি কংগ্রেসকে ক্ষমতায় দেখতে চান, তাহলে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে দলকে টেনে তোলার কোনো ক্ষমতা রাহুলের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। তবে এ অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে। আমরা ইন্দিরা গান্ধীকে দেখেছি, যিনি ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ বা ‘বোবা পুতুল’ নামে পরিচিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সবার এমনকি বিরোধীদেরও মন জয় করেন। তাঁর ছেলে রাজীব গান্ধী, যিনি রাষ্ট্রপতি জৈল সিংয়ের চাপে পড়ে প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁকেও সবাই মেনে নিয়েছিলেন। তাহলে রাহুল গান্ধীকেও মেনে না নেওয়ারও কোনো কারণ নেই। তবে এটা নির্ভর করবে তিনি দলকে কীভাবে টেনে তুলবেন এবং নির্বাচনে জেতাতে পারবেন, তার ওপর। এই সময়ে এটা করা কঠিন হবে বলেই মনে হচ্ছে; কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতাকে পটভূমি করা হয়েছে যখন কিনা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হিন্দুত্ববাদের আদর্শ। এটি খুবই দুঃখের বিষয় যে একটি দেশ যা বহুত্ববাদের ওপর ভর করে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে, সেই দেশ স্বাধীনতার মূল্যবোধ অনুসরণ করতে সক্ষম হয়নি।
অনুবাদ: রোকেয়া রহমান।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।
গত সোমবার সকালে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বোমা হামলায় কেউ মারা যায়নি—এটা স্বস্তির বিষয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর এ রকম চোরাগোপ্তা হামলার প্রবণতা যে বন্ধ হচ্ছে না, তা যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই এবং শান্তিকামী সব মানুষকে অশুভ সন্ত্রাসবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। সন্দেহভাজন বোমা হামলাকারী ব্যক্তি একজন অভিবাসী বাংলাদেশি—এই তথ্য যারপরনাই দুর্ভাগ্যজনক। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নয়, খোদ বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বাংলাদেশি সমাজের জন্যও। আমরা উদারপন্থী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত হতে চাই, যদিও আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশকে ‘মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ’ বলে বর্ণনা করে থাকে। আমাদের এই ভাবমূর্তিও যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে সন্দেহভাজন হামলাকারী আকায়েদ উল্লাহ বাংলাদেশ, বাংলাদেশি বা মুসলমান সম্প্রদায়—এসবের কোনো কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করেন না। এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটায় তারা বিচ্ছিন্ন সমাজবিরোধী, মানবতাবিরোধী অশুভ শক্তির প্রতিনিধি, যে শক্তিকে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে।
আমেরিকান সমাজে এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই হামলার সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া ভাবনার বিষয়। ঘটনার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দেশে বিদ্যমান অভিবাসনব্যবস্থার ‘ভয়ংকর ক্ষতিকর’ দিকের কথা পুনরুল্লেখ করে বলেছেন যে তিনি এই ব্যবস্থা উন্নত করতে বদ্ধপরিকর, যেখানে ‘আমাদের দেশ’ ও ‘আমাদের জনগণের’ স্থান হবে সবকিছুর আগে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসননীতির বিরুদ্ধে আমেরিকান সমাজে প্রবল প্রতিবাদ আছে। কেননা তা সংকীর্ণ, বহুত্ববাদী নীতির প্রতিকূল এবং বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক। অন্যদিকে এই সংকীর্ণতার পক্ষে কিছু সমর্থনও সে দেশে আছে। এ রকম পরিস্থিতিতে অভিবাসী সম্প্রদায়ের কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির দ্বারা সন্ত্রাসবাদী হামলা পরিচালিত হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকদের অভিবাসনবিরোধী অবস্থান জোরদার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আর হামলাকারীরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যই বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাই আকায়েদ উল্লাহর মতো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত। কিন্তু কাজটা যে খুব সহজ নয়, তা বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী আকায়েদ উল্লাহ পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন যে তিনি হামলা চালাতে চেয়েছেন ইসলামিক স্টেটের ওপর মার্কিন বাহিনীর হামলার প্রতিশোধ নিতে। ইতিমধ্যে ইসলামিক স্টেটের মূল ঘাঁটির পতন ঘটেছে এবং সংগঠনটি অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কিন্তু আকায়েদ উল্লাহর মতো ‘লোন উলফ’ বা ‘একাকী নেকড়ে’দের নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন। সেই কঠিন কাজটা সবাই মিলে করতে হবে।
যে দেশে প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী, সে দেশে নারীকে ফসলের মাঠে কাজ করতে না যাওয়ার ফতোয়ার খবরটি একই সঙ্গে আমাদের উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ করেছে। আমরা আরও বিস্মিত হয়েছি যে এই নারীবিদ্বেষী প্রচারণা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের নীরবতা দেখে। গতকাল প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, নারীদের ফসলের মাঠে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের কল্যাণপুর জামে মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটির যে বৈঠকে এই বেআইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে ইমাম ছাড়াও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য পদাধিকারীও উপস্থিত ছিলেন। অতএব, এটিকে ব্যক্তিবিশেষের সিদ্ধান্ত হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। নারীরা ফসলের মাঠে গেলে ফসল চুরি ও অসামাজিক কাজ হয় বলে মসজিদ কমিটি দাবি করলেও তার পক্ষে কোনো তথ্য–প্রমাণ দিতে পারেনি। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে, তা তিনি নারী হোন বা পুরুষ হোন তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার বিধান আছে। মসজিদ কমিটি কারও বিরুদ্ধে তথ্য–প্রমাণ না দিয়ে ঢালাও অভিযোগ এনে নারীদের মাঠে যাওয়ার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, সেটি কেবল অনৈতিক নয়, আইনের চোখেও অন্যায়। স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবিষয়ক বৈঠকে তোলার কথা বলেছেন। এ রকম একটি গুরুতর বিষয়ে বৈঠক পর্যন্ত অপেক্ষা করার যুক্তি আছে বলে আমরা মনে করি না। দেশের সংবিধান নারী-পুরুষনির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে অবাধে চলাচলের অধিকার দিয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কাউকে বাধা দিলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে। অতএব, প্রশাসনের দায়িত্ব হবে কল্যাণপুর জামে মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। এ ধরনের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে ধর্ম কিংবা সমাজ কোনোটাই নিরাপদ নয়। দ্বিতীয়ত, নারীরা যাতে নির্বিঘ্নে মাঠে যেতে পারেন, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের জানা উচিত, সমাজটা শুধু পুরুষের একার নয়, নারীদেরও সমান অধিকার আছে।
শারমিন সুলতানা ফুটপাতে নাক চেপে হাঁটছেন। তাঁর সামনের পথচারী হাঁটতে হাঁটতে ধূমপান করছেন। পেছনের পথচারীদের মুখে সে ধোঁয়ার ঝাপটা লাগছে। খারাপ লাগলেও কেউ কিছু বলছেন না। শারমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফুটপাতে হাঁটার সময় বা রাস্তায় বাসের জন্য দাঁড়ালে অনেক সময় সিগারেটের ধোঁয়া খেতে হয়! ক্ষতি হলেও করার কিছু থাকে না।’ সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে উন্মুক্ত স্থানে ধূমপানের আধিক্য চোখে পড়েছে। ফুটপাতে, পার্কে, মার্কেটের সামনে—যেখানে জনসমাগম সেখানেই দেখা গেছে কেউ না কেউ ধূমপান করছে। অনেক সময় ফুটপাতে হাঁটার সময় ধূমপায়ীর হাতে থাকা সিগারেটের আগুন অন্য পথচারীদের হাতে, গায়ে লাগছে। চোখ শক্ত করে একবার তাকানো ছাড়া আর কিছু করার থাকে না বলে জানালেন একাধিক ভুক্তভোগী। আইন অনুযায়ী, জনপরিসরে বা উন্মুক্ত স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ। কেউ এমন স্থানে ধূমপান করলে অনধিক ৩০০ টাকা জরিমানা করার বিধান আছে। একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে তিনি দ্বিগুণ হারে দণ্ডিত হবেন। আইনে সিগারেটের দোকান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২০ গজ দূরে থাকতে হবে বলে বলা হয়েছে। সম্প্রতি এই আইন না মানার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫–এর ২(চ) ধারা অনুসারে পাবলিক প্লেস বলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস; গ্রন্থাগার, লিফট, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, আদালত, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণিবিতান, রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণের সম্মিলিত ব্যবহারের স্থান বোঝায়। অন্তত ১০ জন পথচারী নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা ধূমপান নিয়ন্ত্রণে আইন আছে শুনেছেন, কিন্তু প্রয়োগ হতে দেখেননি। তাঁরা বলেন, ধূমপায়ীরা স্থান-কাল মানেন না। অনেক সময় হাতে সিগারেট লেগে পুড়ে যায়। শহরের যেখানে–সেখানে লোকসমাগমের জায়গায় সিগারেটের দোকান, ভ্রাম্যমাণ দোকানে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য পাওয়া যায়। তাঁরা মনে করেন, মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে গেছে বলে ধূমপানের হার বাড়ছে। ধূমপায়ীরা যে ধোঁয়া ছাড়েন, তা নিশ্বাসের সঙ্গে অন্যের শরীরে ঢুকে পড়ে। এটা পরোক্ষ ধূমপান। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো রিসার্চ সাময়িকীতে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার: ঢাকা, বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়েছে, ৮৭ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা সম্প্রতি জনপরিসরে (পাবলিক প্লেস) তথা দোকানে, রাস্তায় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েছে। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ৪০ শতাংশ শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যিনি বা যাঁরা পেশাদার ধূমপায়ীদের সঙ্গে বসবাস করেন, তাঁদের হৃদ্‌রোগ এবং ফুসফুস ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা অন্যদের তুলনায় অন্তত ৩০ গুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকেরা বলেন, পরোক্ষ ধূমপান শিশুদের শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির অন্যতম প্রধান কারণ। এ বিপদ থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে ধূমপান করার ফলে অধূমপায়ী ব্যক্তির অসুবিধা হলেও ভুক্তভোগীর এ নিয়ে অভিযোগ জানানোর সুযোগ নেই। অবশ্য মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় বলে জানিয়েছেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সমন্বয়কারী মো. রুহুল কুদ্দুস। তামাকবিরোধী সংগঠন প্রত্যাশার সাধারণ সম্পাদক হেলাল আহমেদ বলেন, ‘যাত্রীছাউনিসহ সব জায়গাই পাবলিক প্লেস। এ নিয়ে আমরা কিছু বলি না। মনে করি, এটা কোনো সমস্যা না। অথবা বললে ওই ব্যক্তি কী মনে করেন বা বলতে গিয়ে কী বিপদে পড়ি—এসব সাতপাঁচ ভেবে চুপ করে থাকি।’ হেলাল আহমেদ বলেন, একজন পুলিশকে অভিযোগ জানাতে পারবেন। কিন্তু দেখা যায়, পুলিশ নিজেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে। আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতকেও অনেক বাধাবিপত্তি পেরোতে হয়। সরকারের যুগ্ম সচিব ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সমন্বয়কারী মো. রুহুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, ধূমপান নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।
তবে বর্তমানের আইনে এমন কোনো বিধান নেই, যার আওতায় কোনো ব্যক্তি অভিযোগ জানাতে পারেন বা জরিমানা চাইতে পারেন। রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আইন আরও কঠোর করতে তামাক ও জর্দাজাতীয় দ্রব্য বিক্রির বিষয়টি লাইসেন্সের আওতায় আনা যেতে পারে। তাতে যেখানে–সেখানে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি কমতে পারে। এখন আইনের যেসব দুর্বলতা আছে, সেগুলো সংশোধন করে আরও কঠোর করার ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার সৈয়দ মাহফুজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ‘পাবলিক প্লেস’–এর সংজ্ঞা নিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি আছে। আইন অনুযায়ী, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ নয়। একজন ব্যক্তি খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে পারেন। সুতরাং যখন খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ ধূমপান করেন এবং তা কারও ক্ষতি না করে, তা আইন অনুযায়ী অপরাধ বলা যাবে না। তবে যদি দেখা যায় ফুটপাতে লোকজন আছে, সেখানে একজন ধূমপান করলে তিনি আইন অনুযায়ী অন্যের ক্ষতি করছেন। মাহফুজুল হক বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মাঝামাঝি অবস্থায় আছে বলা যায়। অর্থাৎ খুব ভালোও নয়, আবার খারাপও নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আগের চেয়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও পাবলিক প্লেসে ধূমপানের হার কমেছে। দু-একজন চালক বাসে ধূমপান করলেও বাসে ধূমপান তুলনামূলক কমেছে। বাংলাদেশের যে কেউ যেকোনো দোকানে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করতে পারে। ধূমপানের সামগ্রী বিক্রি করতে গেলে কোনো অনুমোদন লাগে না। এ জন্য আলাদা লাইসেন্স নিতে হবে আইনে এমন কোনো ধারা নেই। এটিও ধূমপান নিয়ন্ত্রণে পরোক্ষভাবে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তবে ইদানীং আলাপ হচ্ছে, আইনে এই ধারা সংযুক্ত করা হতে পারে। তখন হয়তো জনসমক্ষে ধূমপান কমে যাওয়া এবং তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করেন মাহফুজুল হক।
লাল ইটে ঠিকরে পড়ছে দুপুরের রোদ। ছড়াচ্ছে বর্ণিল আলো। কৃষ্ণচূড়া, শিমুলের পাতায় মৃদু দুলুনি। এর মধ্যেই ঝাড়-পোঁছের কাজ করছেন একদল নারী-পুরুষ। দম ফেলার ফুরসত নেই। স্মৃতিসৌধটি ঝকঝকে করার কঠিন দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। বরাবরের মতো শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসকে ঘিরে বছরে একবারই ধোয়ামোছার কাজ চলে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে। বাকি সময় যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকে। হকার আর ছিন্নমূলদের রাজত্ব। মাদকসেবীদের আড্ডাও বসে। রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রোকাইয়া হাসিনা মিলি শহীদ বুদ্ধিজীবী রাশীদুল হাসানের মেয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারা বছর স্মৃতিসৌধের যে অবস্থা থাকে, তাতে উপেক্ষা এবং অবহেলা স্পষ্ট। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের জন্য এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও কষ্টকর।’ গতবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে রাজনৈতিক পোস্টারে স্মৃতিসৌধ সয়লাব ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শহীদদের পরিচয় তুলে ধরার তেমন কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। মনে হয় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মানুষের জন্যই এ আয়োজন।’ ১৯৭১ সালে বিজয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। হত্যার জন্য বেছে নেওয়া হয় রায়েরবাজারের ইটখোলা। এই শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৯৯ সালে স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ১১ থেকে ১৩ ডিসেম্বর স্মৃতিসৌধে সর্বসাধারণের প্রবেশ বন্ধ। গতকাল দুপুরে দেখা যায়, ধোয়ামোছা কাজের ঠিকাদার মো. সেকান্দার পাইপ দিয়ে পানি দিচ্ছেন। একসঙ্গে ঝাড়ু দিচ্ছেন ১৫ জন নারী। তাঁদের একজন ৪৫ বছর বয়সী মিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘চাইর দিন ধইরা সব ওয়ালে ব্রাশ মাইরা পরিষ্কার করছি। হাউসের মধ্যে নাইম্যা শেওলা ডলছি। আইজ খালি ঝাড়ু মারতেছি।’ একই কথা জানালেন মো. সেকান্দার। তিনি বলেন, ‘বছরে কয়েকবার পরিষ্কার করলে জায়গাটা পবিত্র থাকত। খরচও কম পড়ত।’ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষাকালজুড়ে স্মৃতিসৌধের সামনের রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। কাদামাটি ভেঙে দর্শনার্থীদের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়েছে। এতে সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়ত নারী-শিশুরা। দেখা গেছে, স্মৃতিসৌধের সামনের রাস্তায় এবং ভেতরে বালু ফেলে ঠিক করা হচ্ছে। লাগানো হয়েছে নতুন ঘাস। ইটগুলো ধোয়া হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতার কাজটি কেবল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসেই কেন, জানতে চাইলে স্মৃতিসৌধের ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. মোহসিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এ ক্ষেত্রে লোকবল কম উল্লেখ করে মো. মোহসিন বলেন, ‘জনগণেরও সচেতনতার অভাব আছে। এ জায়গার পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব সবার।’ স্মৃতিসৌধটি বিনোদন পার্কের মতো ব্যবহৃত হয় বলে উল্লেখ করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে আসিফ মুনীর। তিনি বলেন, ‘স্মৃতিসৌধ নির্মাণকালে এর ভাবগাম্ভীর্য রক্ষায় শহীদ পরিবার থেকে কিছু প্রস্তাব ছিল, যার সঙ্গে কর্তৃপক্ষ একমত পোষণ করেছিল। তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি।’ স্মৃতিসৌধে স্থায়ীভাবে চারজন নিরাপত্তাকর্মী কাজ করেন। তাঁদের একজন মো. মতিন বলেন, ‘সন্ধ্যার পরে এখানে বখাটেরা আসে। তারা আমাদের মারধরের হুমকি দেয়। অনেকের সঙ্গে চাকুও থাকে।’ ২০০৬ সালে নিরাপত্তা রক্ষাকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার একজন নিরাপত্তাকর্মী মারা গেছেন বলে জানা যায়। স্থানীয় লোকজনের বেশির ভাগই জানেন না কেন এ সৌধ। পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত ১৫ নারীর মধ্যে মাত্র একজন বলেছেন ‘এইটা বুদ্ধিজীবী। যুদ্ধের সময় এইহানে মানুষ মারছে।’ এ কথা শেষ না হতেই বাকি ১৪ জন ঝাঁপিয়ে পড়ে বলেন, ‘না, এইটা শহীদ মিনার।’ তবে নিরাপত্তাকর্মীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়া ১০ বছরের শিশু রিয়াদ হোসেন বলে, ‘যুদ্ধের সময় এখানে বুদ্ধিজীবীদের মারা হয়েছে।’ পরের প্রজন্মের কাছে এই আত্মত্যাগের বিবরণ তুলে ধরার কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। এমনকি বুদ্ধিজীবী শহীদদের নিয়ে নেই কোনো স্মরণিকাও। স্মৃতিসৌধ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গণপূর্ত অধিদপ্তরের। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগের তুলনায় গত এক বছরে নিরাপত্তাব্যবস্থা অনেক জোরদার করা হয়েছে। তবে স্থায়ী লোকবলের অভাবে কিছু সমস্যা হয়।’ স্মরণিকা বা শহীদদের পরিচিতি তুলে ধরার বিষয়ে তিনি বলেন, এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কেবল লজিস্টিক (উপকরণগত) সহযোগিতা দেওয়া।
১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে নতুন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। পাকিস্তানের আগ্রাসী থাবা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নের পথে এগোতে থাকে দেশটি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। এর মধ্যে দেশটি ঘুরে দাঁড়িয়েছেও। স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ লাখো মানুষ। প্রায় প্রতিটি ঘরেই তখন শোকের মাতম। একই সঙ্গে রাস্তাঘাট, রেলপথসহ অবকাঠামো নষ্ট হয়ে সে এক ধ্বংসস্তূপের বাংলাদেশ। ব্যাংক ও শিল্প খাতেরও একই অবস্থা। অর্থাৎ সবকিছু পেছনে ফেলে নতুন করে শুরু করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। এমনই এক চ্যালেঞ্জ সামনে। বাংলাদেশ কতটা মোকাবিলা করতে পেরেছে সেই চ্যালেঞ্জ? সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি তুলনা তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশকে শোষণ-নিপীড়নে নিষ্পেষিত করতে চেয়েছিল যে দেশটি, এখন অনেক কিছুতে তার চেয়ে এগিয়ে আছে সে। গত ৪৬ বছরের অগ্রগতিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ এখন পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ১ হাজার ৫৩৮ ডলার। সেখানে পাকিস্তানের তা ১ হাজার ৪৭০ ডলার। স্বাধীনতার পর বিগত ৪৬ বছরে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তিগুলো পাল্টেছে। ক্রমে শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ হয়েছে, যা অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। স্বাধীনতার সময় জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল প্রায় ৫৯ শতাংশ। আর শিল্পের অবদান ছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশ। বর্তমানে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান প্রায় ২৯ শতাংশ। জিডিপির তিনটি খাতের মধ্যে কৃষি খাতের অবদান তৃতীয় স্থানে। সেবা খাতের অবদান শীর্ষে।
স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ১৭ লাখ। এটি এখন বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ। এদিকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে নিজেদের আদমশুমারির ফলাফল প্রকাশ করে পাকিস্তান। এতে দেখা যায়, বর্তমানে পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২০ কোটি ৭৮ লাখ। বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল দেশ এখন পাকিস্তান। ব্রাজিলকে অতিক্রম করেছে। আর এ কারণেই মাথাপিছু জিডিপির হার কমেছে পাকিস্তানের। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এই প্রথম এত উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হলো, যা ছিল নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। তবে স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে দীর্ঘ ২৫ বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি বাড়েনি। এর মধ্যে ১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৭৯-৮০ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের ১০ বছর জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ হারে। এরপর থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে গেছে ৬ শতাংশ। বর্তমানে জিডিপির আকার ২৪ হাজার ৯৬৮ কোটি ডলার। জিডিপির আকার ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়াতে স্বাধীনতার পর ৩৪ বছর লেগেছে। উন্নতি হয়েছে মাথাপিছু আয়েও। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৬৭১ টাকা। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ লাখ ২৮ হাজার ৮০০ টাকা বা ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পর যেখানে মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার লড়াইয়ে নেমেছিল বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশই এখন গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে (বিশ্ব ক্ষুধাসূচক) পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে। ২০১৭ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮; যেখানে পাকিস্তানের ১০৬। যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে যখন বস্ত্র-কাপড়ের সংকট তৈরি হয়েছিল, সেই দেশই এখন ভারত, পাকিস্তানের চেয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান উৎস এখন তৈরি পোশাক খাত। এত বছর পরও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এক পণ্যনির্ভর। পাটের বদলে তৈরি পোশাক এসেছে। তবে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য খুব বেশি আনা সম্ভব হয়নি। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, রপ্তানিতে তৈরি পোশাকের অবদান বাড়লেও পোশাক কারখানার পরিবেশ পাকিস্তান, ভারতের চেয়ে ভালো নয় বাংলাদেশের। এই অবস্থা থেকে দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে।
ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি। এসময় দু নেতা অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান উত্তেজনা এবং প্রাসঙ্গিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, নির্যাতিত ফিলিস্তিনি জনগণ ও প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো এবং অন্য মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে নিশ্চিতভাবে মার্কিন ও ইসরাইলের পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া প্রচণ্ড উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট রুহানি ও হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার মধ্যে সোমবার এ ফোনালাপ হলো।
প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অপমানজনক পদক্ষেপ নিয়েছেন তা অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ এবং এর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন ও মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণার মধ্যদিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, তারা আদৌ সরকারিভাবে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার স্বীকার করে না। এ সময় তিনি ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে ইসরাইল ও আমেরিকার জঘন্য ষড়যন্ত্রের কঠোর জবাব দেয়ার আহ্বান জানান। ফোনালাপে হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার মাধ্যমে মুসলমানদের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। তবে ফিলিস্তিনের জনগণ কখনো ইসরাইল ও আমেরিকাকে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেবে না। কারণ বায়তুল মুকাদ্দাস ফিলিস্তিন ও মুসলমানদের। ফোনালাপে হামাস প্রধান আরো বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে নতুন ইন্তিফাদা বা গণজাগরণ শুরু হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিরা জোরালোভাবে তা অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা ইহুদিবাদী ইসরাইল ও আমেরিকার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে উল্লেখ করেন ইসমাইল হানিয়া।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের উন্নীত পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণে গত ১৫ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আদেশ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ওই আদেশকে ‘অস্পষ্ট’ ‘অসম্পূর্ণ’ ও ‘গোঁজামিলের’ আদেশ বলে আখ্যায়িত করেছেন পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা। দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এবং জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরাই শুধু লাভবান হয়েছেন। দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা শেষে পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে জানান প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নেতারা। শিক্ষক নেতারা বলেন, ওই আদেশে পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। ১৫ নভেম্বরের আদেশের ফলে, পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেডেই রয়ে গেছেন। সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা তিনটি টাইম স্কেল পেয়ে অষ্টম গ্রেডে বেতন পাবেন। জাতীয়করণকৃতরাও একই সুবিধা প্রাপ্য হবেন। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা শেষে পদোন্নতিপ্রাপ্তরা কি সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের চেয়ে ওপরের গ্রেডে বেতন পাবেন? সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে আবার ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৩ সালে নিয়োগপ্রাপ্তরা অষ্টম গ্রেড পাচ্ছেন না। বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে টাইম স্কেল পাওয়া-না-পাওয়া নিয়ে। সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা জানান, ৯ মার্চ ২০১৪’র পর যারা টাইস স্কেল প্রাপ্ত হয়েছেন এবং ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫’র পর যারা টাইম স্কেল প্রাপ্য হয়েছেন, তারাও ১৫ নভেম্বরের আদেশে ক্ষুব্ধ। পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বঞ্চনার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মুহা: আবদুল আউয়াল তালুকদার নয়া দিগন্তকে বলেন, ১৫ নভেম্বরের আদেশে দীর্ঘ দিন শিক্ষকতা শেষে পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকেরা উন্নীত স্কেলের বেতন নির্ধারণী সুবিধা পচ্ছেন না। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদার ঘোষণা দেয়া হলেও তা পাননি, বেতন স্কেলের সুবিধাও তাদের কপালে জুটল না। এটা মানতে নারাজ প্রধান শিক্ষকেরা। তিনি বলেন, বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে অর্জিত সরকারি সুবিধা শুধু যেন ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগী ভূমিকা নেয়া না হলে, হিতে বিপরীত হবে।
একাধিক প্রধান শিক্ষক নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি করা না হলে, বেতন নির্ধারণের সব ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। এটিকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর (ডিপিই) সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা হচ্ছে ৬৩ হাজার ৬০১। এসব স্কুলে প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ৫০ হাজারের মতো। অন্য সব স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। এ ৫০ হাজারের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি হচ্ছেন পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ১৫ হাজার ও জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়গুলোয় প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ১০ হাজারের কাছাকাছি। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা এবং বেতন স্কেল দুই ধাপ উন্নীত করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকদের এক ধাপ বেতন স্কেল উন্নীত করার ঘোষণা দেন; কিন্তু প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদার ভিত্তিতে বেতন স্কেল নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে প্রায় তিন বছরের দাবি-আন্দোলন, দফায় দফায় অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি ও শিক্ষক নেতাদের সাথে বৈঠকের পর গত ১৫ নভেম্বর যে আদেশ জারি করা হয়েছে, তাতে সংশ্লিষ্টদের বৃহৎ অংশই বাদ পড়েছেন। উল্লেখ্য, গত ১৫ নভেম্বর অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে যে আদেশ জারি করা হয়েছিল তাতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণের ফলে উন্নীত বেতন স্কেলে বেতন নির্ধারণের জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে সরকার নি¤œরূপ নীতিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
ক) বেতন স্কেল উন্নীত হওয়ার পূর্বে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকগণ যিনি যে সংখ্যক টাইম স্কেল পেয়েছেন/প্রাপ্য হয়েছেন, উন্নীত বেতন স্কেলের উপরে সেই সংখ্যক টাইম স্কেল গণনা করে বেতন স্কেল উন্নীত করার অব্যবহিত পূর্বে তার সর্বশেষ আহরিত/প্রাপ্য মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন স্কেল উন্নীতকরণের তারিখে সরাসরি নির্ণীত সর্বশেষ স্কেলের কোন ধাপে মিললে ঐ ধাপে, ধাপে না মিললে বি.এস.আর. ১ম খণ্ডের ৪২(১)(২) বিধি অনুসরণে নি¤œধাপে বেতন নির্ধারণ করে অবশিষ্ট টাকা পি.পি. হিসেবে প্রদান করতে হবে এবং উক্ত পি.পি (চবৎংড়হধষ চধু) পরবর্তী বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিতে সমন্বয়যোগ্য হবে।
খ) বেতন স্কেল উন্নীত হওয়ার পূর্বে পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকগণ প্রধান শিক্ষক পদে যিনি যে সংখ্যক টাইম স্কেল পেয়েছেন/প্রাপ্য হয়েছেন, উন্নীত বেতন স্কেলের উপরে সেই সংখ্যক টাইম স্কেল গণনা করে বেতন স্কেল উন্নীত করার অব্যবহিত পূর্বে তার সর্বশেষ আহরিত/প্রাপ্য মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন স্কেল উন্নীতকরণের তারিখে সরাসরি নির্ণীত সর্বশেষ স্কেলের কোন ধাপে মিললে ঐ ধাপে, ধাপে না মিললে বি.এস.আর. ১ম খণ্ডের ৪২(১)(২) বিধি অনুসরণে নি¤œধাপে বেতন নির্ধারণ করে অবশিষ্ট টাকা পি.পি হিসেবে প্রদান করতে হবে এবং উক্ত পি.পি পরবর্তী বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিতে তা সমন্বয়যোগ্য হবে।
গ) উক্ত পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণকালে মাঝখানে কোনো বেতন স্কেল/গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করা যাবে না।
নেপালে সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল। এতে চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত বামেজোট ভূমিধস বিজয় পেয়েছে। আর ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত নেপালি কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। বড় ধরনের কোনো অঘটন না ঘটলে নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন কে পি অলি। এ নিয়ে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রতিবেদন এখানে তুলে ধরা হলো। কয়েক বছর আগেও সম্পর্কটা মধুরই ছিল। এতটাই যে খড়্গপ্রসাদ ওলির কিডনি সংক্রান্ত সমস্ত চিকিৎসাই ভারতে হতো। নয়াদল্লির তত্ত্বাবধানে। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে ভারতের সঙ্গে ওলির তিক্তটা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, তার নেতৃত্বে নেপালের নতুন বাম সরকার পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে ভরপুর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে চলেছে সাউথ ব্লকের সামনে। চীন-ওলি ঘনিষ্ঠতার প্রশ্নটি নতুন নয় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে। কূটনীতির জগতের অনেক মনে করেন, নেপালে মাওবাদী এবং কমিউনিস্টদের একসঙ্গে নিয়ে এসে সরকার গড়ার যে নকশা, তার পিছনে বেইজিংয়ের প্রয়াস রয়েছে যথেষ্ট। সিপিএন-ইউএমএল নেতা ওলি নেপালে সরকার চালিয়েছেন ২০১৫-র অক্টোবর থেকে ২০১৬-র আগস্ট পর্যন্ত। ভারত-নেপাল সম্পর্কের খুবই অবনতি হয় সে সময়ে। ফের তার হাতেই যাচ্ছে নেপালের ভার। ভোটের ফল স্পষ্ট হতেই সরকার গড়া নিয়ে মঙ্গলবার মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ওলি। প্রচণ্ড আগেই জানিয়েছেন ওলি-র নেতৃত্বেই হবে নয়া সরকার। ওলির এই দফাতেও ভারতের সীমান্ত রাষ্ট্রটিতে চীনের প্রভাব আরো বাড়বে বলেই আশঙ্কা করছে নয়াদিল্লি। এই পরিস্থিতিতেও ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর কিন্তু ভারতের ধরাবাঁধা অবস্থানকেই ফের তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন, প্রথমত, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে যে সরকারই আসুক না কেন, তার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক ভাবেই গড়াবে। দুই, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনো তৃতীয় রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল নয়। এরই পাশাপাশি আরে একটি যুক্তিও খাড়া করছে সাউথ ব্লক। সেটা হলো, নেপালের সঙ্গে ভারতের যে আবহমান ধর্মীয় সাংস্কৃতিক যোগসূত্র রয়েছে, কখনোই তা অর্থ দিয়ে কিনতে পারবে না চীন। ভারতকে পরোপুরি বাদ দিয়ে কিছু করা সম্ভবও নয় নেপালের পক্ষে। কিন্তু কঠোর বাস্তবের জমিতে এই যুক্তিগুলি যে তেমন জুতসই হচ্ছে না, সে কথা ঘরোয়া ভাবে স্বীকার করছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বড় অংশ। ডোকলাম প্রশ্নে দীর্ঘ সংঘাত আপাত ভাবে মিটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু এখনও ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে ড্রাগন। এই অবস্থায় নেপালে তাদের আধিপত্য-বৃদ্ধি আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়। নয়াদিল্লি ভোলেনি যে গত বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে এই ওলি-ই চীন সফরে গিয়ে একটি চুক্তি সই করে দু’দেশের মধ্যে রেল আর বন্দর যোগাযোগ-সহ সামগ্রি ভাবে বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতাকে এক ধাপে অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছেন। মদেশীয় বিক্ষোভের সময়ে ভারত থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী রফতানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অবরোধের কারণে। নয়াদিল্লির অভিযোগ, সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চীনের প্রতি নির্ভরতা অনেকটাই বাড়িয়ে নেয় তৎকালীন ওলি সরকার। পাশাপাশি, ওই সময়ে উগ্র ভারত-বিরোধিতার রাজনৈতিক আবহ তৈরি করা হয় নেপালে। যা থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বাস টার্মিনালে আত্মঘাতী বোমা হামলার চেষ্টায় আটক বাংলাদেশি তরুণ আকায়েদ উল্লাহ সাত বছর আগে ফ্যামিলি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। নিউইয়র্ক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ বছর বয়সী আকায়েদ প্রথমে ট্যাক্সি চালাতেন। পরে একটি আবাসন নির্মাতা কোম্পানির বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির চাকরি নেন। ব্রুকলিনের অ্যাপার্টমেন্টে বসে ইন্টারনেট ঘেঁটে তিনি বোমা বানানো শেখেন এবং ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের সূত্রে কর্মস্থলে বসেই বোমা তৈরি করেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সন্ত্রাসীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছেন তিনি। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স ও এএফপির। সোমবার সকালে ম্যানহাটনের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালে নিজের শরীরে বাঁধা ‘পাইপ বোমা’ বিস্ফোরণ ঘটান আকায়েদ। বোমাটি ঠিকমতো বিস্ফোরিত না হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি। কিন্তু গুরুতর আহত হন। তার বিস্ফোরণে আহত হন তিন পুলিশ সদস্য। আকায়েদ চট্টগ্রামের সন্দ্ব^ীপের মুছাপুর ইউনিয়নের মো. সানাউল্লাহর ছেলে। ২০১১ সালে ফ্যামিলি ভিসায় পরিবারের সবার সঙ্গে নিউইয়র্কে যাওয়ার পর ব্রুকলিনেই বসবাস করে আসছিলেন তিনি। বছর দুই আগে নিউইয়র্কেই মারা যান সানাউল্লাহ। আকায়েদের এক ভাই, বোন ও মা রয়েছেন নিউইয়র্কে। বিস্ফোরণের ঘটনার পর তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আকায়েদকে চিনতেন এমন একজন বলেন, বরাবরই নিজের মধ্যে নিবিষ্ট হয়ে থাকত সে। মসজিদে গেলেও কারও সঙ্গে তেমন আলাপ করত না। নিউইয়র্ক প্রবাসী এক বাংলাদেশি ঠিকাদারের অধীনে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন আকায়েদ। একসময় ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্সও তার ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম লিখেছে, আকায়েদের পরিবারকে ইসলামী রীতিনীতি মেনে চলা একটি শান্তশিষ্ট পরিবার হিসেবেই জানত সবাই। উগ্রপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে পারে- এমন সন্দেহ কখনও তাদের হয়নি। নিউইয়র্ক সিটি ট্যাক্সি অ্যান্ড লিমোজিন কমিশন এক বিবৃতিতে জানায়, ২০১২ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত লিমোজিন বা ব্ল্যাক ক্যাব চালানোর লাইসেন্স ছিল আকায়েদের। পরে তিনি আর তা নবায়ন করেননি। আহত আকায়েদকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে ম্যানহাটনের বেলভিউ হাসপাতালে। তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক পুলিশের কমিশনার জেমস ও’নিল বলেন, সিরিয়ায় আইএসের ওপর হামলা ও ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রতিবাদে ক্ষোভ থেকে সে ওই ঘটনা ঘটায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, নিউইয়র্কে বোমা হামলার ঘটনা সেটাই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মার্কিন কংগ্রেসের জন্য অভিবাসন আইন সংস্কার করা ‘কতটা জরুরি’। সোমবার এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, চেইন মাইগ্রেশন নামে পরিচিত মার্কিন নীতির বদৌলতে ফ্যামিলি ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল ওই যুবক। ওই অভিবাসন নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
শুধু কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকা ঋণ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, নিজেও প্রতিষ্ঠান খুলেছেন ভুয়া ঠিকানা দিয়ে। আর সেই কাগুজে কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার লেনদেন করেছেন বেসিক ব্যাংকের বিতর্কিত চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু। যমুনা টিভি মঙ্গলবার এ বিষয়ে চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্প্রচার করে। তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে বাচ্চুর রহস্যজনক লেনদেনের তথ্য। এ টাকা বেসিক ব্যাংকে ঋণ লোপাট করা অর্থের কিছু অংশ। বিশেষজ্ঞরাও এমনটি মনে করেন। জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, মূলত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ভুয়া না সঠিক তা জানার একমাত্র উপায় কেওয়াইসি (ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে যে ফরমটি পূরণ করতে হয় তার সংক্ষিপ্ত নাম) মেনে চলা। কেওয়াইসি হল নো ইউর কাস্টমার বা তোমার গ্রাহককে চেনো। এখানে সেটা হয়নি বলে একের পর এক ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেয়া সম্ভব হয়েছে। এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, আজকে যে তথ্য প্রকাশ হল তাতে বাচ্চু যে অপরাধী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে দুদকের হাত আরও শক্তিশালী হল। এখন তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত দুদকের। এক্ষেত্রে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে দুদককে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে আমরা অবাক হব এবং দুদকের কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেভাবে টাকা-পয়সা নয়ছয় করেছেন বাচ্চু তাতে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্ধ করা উচিত। একই সঙ্গে তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। তাহলে শুধু বাচ্চু নয়, তার পেছনেও যদি কোনো প্রভাবশালী থাকে তাকেও ধরা সম্ভব হবে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ যুগান্তরকে বলেন, বাচ্চুকে নিয়ে প্রয়োজনীয় সব তথ্য দুদককে দিয়েছি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্ধের বিষয়টি তারা চায়নি তাই দেয়া হয়নি। যদি তদন্তের স্বার্থে আরও কিছু চাই তাহলে তাও দেয়া হবে বলে জানান তিনি। প্রসঙ্গত, বেসিক ব্যাংকের দুই হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদুক ৫৬টি মামলা করে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেখানে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। অথচ বাচ্চুর বিরুদ্ধে জোরালো ব্যবস্থা নিতে সোচ্চার ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংসদীয় কমিটি। কিন্তু এ নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না দুদকের। তবে বিলম্বে হলেও দুই বছরের বেশি সময় পর অবশেষে সম্প্রতি বাচ্চুকে দু’দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদুক। সূত্র জানায়, অনেক মৌলিক প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি বেসিক ব্যাংকের সাবেক এ চেয়ারম্যান। যদিও তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ঋণ অনিয়মের বিষয়টি তিনি জানতেন। তবে পর্ষদের সবার সম্মতিতে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তিনি একা দায়ী নন। এদিকে যমুনা টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আবদুল হাই বাচ্চুর আসল চেহারা বেরিয়ে এসেছে। খোদ চেয়ারম্যান হয়ে তিনি কিভাবে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে টাকা নিয়েছেন তার প্রমাণ মিলেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইডেন ফিশারিজ লিমিটেড নামে কোম্পানি খোলেন বাচ্চু। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টকের তথ্য অনুযায়ী ইডেন ফিশারিজের চার পরিচালক হলেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান। কোম্পানির ঠিকানা দেয়া হয় ৪২/১-ক, জাহান প্লাজা, সেগুনবাগিচা। কিন্তু উল্লিখিত ঠিকানায় আদৌ বাচ্চুর কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না কখনও। সবই ভুয়া এবং কাগুজে প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছু নয়। এ প্রসঙ্গে জাহান প্লাজার মালিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ইডেন ফিশারিজ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান আমাদের ভবনে কখনও ছিল না।’ জানা গেছে, ইডেন ফিশারিজের নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মতিঝিল শাখার অ্যাকাউন্টে ২০১৩ সালের ২ মে ১০টি চেকের মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকা করে ৫ কোটি টাকা তোলেন আবদুল হাই বাচ্চু। একদিন পর উত্তোলন করেন আরও এক কোটি টাকা। একই দিন দু’জন ৫০ লাখ টাকা করে নগদ জমা দেন এক কোটি টাকা। এরপর ১৬ মে দুটি চেকের মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা তোলেন ইডেন ফিশারিজের মালিক বাচ্চু। আবার ওইদিনই দুটি চেকে ৫ কোটি টাকা জমা হয় একই অ্যাকাউন্টে। একদিনে ৯ কোটি টাকাসহ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ৩০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয় এই ব্যাংক হিসাবে। এমন খবরে বিস্মিত ব্যাংক ও অর্থনীতি খাতের বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত স্বল্প সময়ে এত বড় অংকের টাকা ক্যাশে লেনদেন অস্বাভাবিক। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এ প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব ছিল। তিনি মনে করেন, দুদকের জন্য এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ২০১৩ সালেই তখনকার চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সম্পৃক্ততায় হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ লোপাটের ঘটনা বহুদিন ধরে ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি।’ কিন্তু দিনের পর দিন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পরও বাচ্চুর অ্যাকাউন্টে রহস্যজনক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। জানতে চাইলে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক আমিনা জেসমিন রাজ্জাক বলেন, এ বিষয়ে আমরা কথা বলতে পারব না। পাবলিকলি কথা বলার এখতিয়ার নেই। ব্যাংকের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগকে জানালে তারা বলতে পারবেন। সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক যদি কোনো লেনদেনকে সন্দেহজনক মনে করে বা মনে করার কারণ থাকে এবং এরপরও এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রিপোর্ট না করে থাকে তাহলে সেটি অনৈতিক।
রিজার্ভ চুরির ঘটনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ফের দায়ী করেছে ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংক (আরসিবিসি)। মঙ্গলবার ব্যাংকটির আইনবিষয়ক প্রধান জর্জ দেলা কুয়েস্তা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সিনেটের কাছে আইনি সব বিষয় তুলে ধরেছে আরসিবিসি। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অনেক কিছুই চেপে গেছে।’ রয়টার্স এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ যুগান্তরকে বলেন, আরসিবিসির বক্তব্য সঠিক নয়। তারা এভাবে বলতে পারেন না। সারা দুনিয়া জানে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ আরসিবিসি ব্যাংকে গেছে। তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া রিজার্ভের বাকি অর্থ সে দেশে জব্ধ করা আছে। বিষয়টি এখন ফিলিপাইনে বিচারাধীন। আদালত যে রায় দেন তা সবাইকে মেনে নিতে হবে। এর আগে শনিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, আরসিবিসি ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, কারণ ফিলিপিন্স সরকার বিষয়টি দেখছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে, রিজল ব্যাংকের মধ্যেই ঝামেলা আছে। আমরা এ পৃথিবী থেকে রিজল ব্যাংককে মুছে দিতে চাই বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। এর জবাবে রিজল ব্যাংকের হেড অব লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিবৃতিতে উল্লিখিত মন্তব্য করে বলেন, ব্যাংক খাতে হ্যাকিংয়ের সবচেয়ে বড় এ ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার যে তদন্ত করেছিল, তার প্রতিবেদন দেখতে চেয়েছিল ফিলিপিন্স সরকার। কিন্তু অর্থমন্ত্রী মুহিত তখন বলেছিলেন, ফিলিপিন্স চাইলেও ওই প্রতিবেদন তাদের দেয়া হবে না। আরসিবিসি আগেও বলেছিল, এ ঘটনায় তাদের কোনো দায় নেই, বাংলাদেশ ব্যাংকই দায়ী। মঙ্গলবারের বিবৃতিতেও তারা একই সুরে কথা বলেছে। তারা বলছে, এ ঘটনায় অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের দায় আছে। স্বচ্ছতার ব্যাপারে তাদের যে আপত্তি, তথ্য চেপে রাখার যে চেষ্টা, তা সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে লড়াইকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আরসিবিসি বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতির শিকার।
তাদের অভিযোগ, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিজেদের গাফিলতির দায় এড়াতে তথ্য গোপন করে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আরসিবিসিকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাতে চাইছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে সুইফট মেসেজিং সিস্টেমের মাধ্যমে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশের এক বিলিয়ন ডলার সরিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি মেসেজে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার যায় ফিলিপিন্সের আরসিবিসিতে। আর আরেক আদেশে শ্রীলংকায় পাঠানো হয় ২০ লাখ ডলার। শ্রীলংকায় পাঠানো অর্থ ওই অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া শেষ পর্যন্ত আটকানো গেলেও ফিলিপিন্সের ব্যাংকে যাওয়া অর্থের বেশির ভাগটাই স্থানীয় মুদ্রায় বদলে জুয়ার টেবিল ঘুরে চলে যায় নাগালের বাইরে। ওই টাকার মধ্যে এক ক্যাসিনো মালিকের ফেরত দেয়া দেড় কোটি ডলার বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিয়েছে ফিলিপিন্স। এ ঘটনায় রিজল ব্যাংককে ২০ কোটি ডলার জরিমানাও করেছে ফিলিপিন্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জরিমানার অর্থ পরিশোধ করলেও বাংলাদেশকে বাকি অর্থ ফেরতে কোনো দায় নিতে রাজি নয় ব্যাংকটি। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গত মাসে এক কনফারেন্স কলে রিজলের বিরুদ্ধে মামলা করার পরিকল্পনা নিয়ে নিউইয়র্ক ফেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন, যেখানে ব্যাংকিং লেনদেনের আন্তর্জাতিক মেসেজিং নেটওয়ার্ক সুইফটের দু’জন প্রতিনিধিও ছিলেন বলে খবর দেয় রয়টার্স। এতে আরও বলা হয়, চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারের জন্য আগামী মার্চ-এপ্রিল নাগাদ নিউইয়র্কে একটি দেওয়ানি মামলা করার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছে। বাংলাদেশ আশা করছে, ফেডারেল রিজার্ভ ও সুইফট কর্তৃপক্ষও সেখানে বাদী হবে।
অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রকাশের পর আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে একক শাসনের প্রয়োজন। ১৯৭২ সালের সংবিধানেই শুধু সুপ্রিমকোর্টের হাতে ক্ষমতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। একক শাসন না থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তারা বলেন, সদ্য প্রকাশিত শৃঙ্খলাবিধিতে একক শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। বিধিমালায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মৃত্যু ঘটেছে। তবে এ বিধিমালা সংবিধান অনুযায়ী করা হয়েছে বলে অনেকেই মন্তব্য করেন। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা আরও বেড়েছে। কিন্তু ‘না বুঝে’ অনেকেই এ বিধিমালার সমালোচনা করছেন। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আমার মনে হয়, এতে সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা কোথাও ক্ষুণ্ণ করা হয়নি। সোমবার রাতে বহুল আলোচিত শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে দেশের রাজনীতিক এবং বিচারাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিধিতে রাষ্ট্রপতি এবং আইন মন্ত্রণালয়কে অধস্তন আদালতের বিচারকদের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবেও নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ বিধি প্রকাশের পর আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত মামলার বাদী মাসদার হোসেন। তিনি বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ফিরে যেতে হবে। একক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা ছিল, বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিমকোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ১১৬ অনুচ্ছেদে বাহাত্তরের বিধান আর ফেরেনি। জারি করা বিধিমালায় বলা হয়েছে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ‘নিয়োগকারী’ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি এবং আইন মন্ত্রণালয়কে অধস্তন আদালতের বিচারকদের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হিসাবেও নির্ধারণ করা হয়েছে। বিধিমালায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকল না বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ বলেছেন, বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় করা হলে এ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক থাকবে না। এ বিধির ফলে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মৃত্যু ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকল না- ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম : অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধির গেজেট যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে তাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকল না বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। মঙ্গলবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, এই বিধির ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হবে। এই গেজেট মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী উল্লেখ করে তিনি বলেন, রায়ে বলা ছিল তেল এবং পানি একসঙ্গে মিলবে না। কিন্তু এই বিধিতে তেল এবং পানিকে একসঙ্গে মেলানো হয়েছে। সরকারও দেখবে আবার সুপ্রিমকোর্টও দেখবে। এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। এর ফলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ‘সংবিধান যে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করেছে সেই জায়গায় রাষ্ট্রপতির স্থানে আইন মন্ত্রণালয় প্রতিস্থাপিত হতে পারে না। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আইন মন্ত্রণালয় পালন করতে পারে না। এই বিধিমালা করতে গিয়ে আইন মন্ত্রণালয় অধস্তন আদালতের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করে ফেলেছেন। বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম মঙ্গলবার সুপ্রিমকোর্টে তার নিজ চেম্বারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনকে সরকার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আমি অবাক হয়েছি। যদিও এটা করা উচিত ছিল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। কিন্তু তা না করে ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিধি করা হয়েছে। এই ১৩৩ (অনুচ্ছেদ) বিধি প্রযোজ্য হয় প্রজাতন্ত্রের সরকারি কর্মচারীদের জন্য। তিনি আরও বলেন, ‘বিচারিক আদালত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের সরকারি গণপ্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা সঠিক হয়নি।’ আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে এবং সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিচারিক আদালতকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু এ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সে জায়গা থেকে সরে গেছে সরকার। এর মাধ্যমে বিচারিক আদালতের নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে গেছে।’
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মৃত্যু ঘটেছে- ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ : সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধিমালা ‘অসাংবিধানিক অর্থহীন এবং আত্মঘাতী। সদ্য জারিকৃত বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধির সমালোচনা করে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, এর মধ্যে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণের মৃত্যু ঘটেছে। এই বিধি মাসদার হোসেন মামলায় বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণ নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিল তার পরিপন্থী। তিনি বলেন, সরকার নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির যে শৃঙ্খলাবিধি তৈরি করেছে তাতে নিম্ন আদালতের বিচারকরা সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল। এখন আর বলা যাবে না যে, বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক একটি প্রতিষ্ঠান। এই শৃঙ্খলাবিধি সংবিধানের ২২ অুনচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে। ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, বিচার বিভাগ হবে একটি স্বাধীন অঙ্গ এবং বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ সম্পূর্ণভাবে পৃথকীকরণ করা হবে। সেজন্য আইনও পাস করা হয়েছে। আজকে এই শৃঙ্খলাবিধির মাধ্যমে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণের মৃত্যু ঘটেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দূরে থাক, এটা সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মাসদার হোসেন মামলার প্রসঙ্গ টেনে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, ওই মামলায় বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সম্পর্কে সুপ্রিমকোর্টের যে নির্দেশ ছিল তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অর্থাৎ এই বিধি একটি অসাংবিধানিক বিধিমালা।
বিচারকদের জন্য পৃথক সচিবালয় দরকার- ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ : সাবেক আইনমন্ত্রী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, গ্যাজেটে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি ও আইন মন্ত্রণালয়কে বোঝানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। এর ফলে এই গেজেটে দ্বৈত শাসনের কোনো সুযোগ নেই। বহুল প্রতীক্ষিত গেজেটের বিষয়ে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমি মনে করি গেজেট ঠিকই আছে। অধস্তন আদালতের কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ উত্থাপিত হয় তবে কিভাবে তদন্ত হবে সেই সিদ্ধান্ত নেবেন সুপ্রিমকোর্ট। তারপর তারা তাদের তদন্তের ফলাফল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। তিনি বলেন, সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই গেজেট হয়েছে। তিনি বলেন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত যে বিধি সরকার করেছে, তাতে আপত্তি করার কিছু নেই। তবে আমার মনে হয়, বিতর্ক এড়াতে এবং বিচারকদের স্বার্থে তাদের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় করা দরকার। এটা মাসদার হোসেন মামলার চেতনার সঙ্গেও যায়। এটা করা হলে উচ্চ আদালতকে আইন মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী থাকতে হবে না। মঙ্গলবার যুগান্তরকে তিনি আরও বলেন, পৃথক সচিবালয় করা সম্ভব হলে এখন আইন মন্ত্রণালয় যে কাজটি করছে, সে কাজটি ওই সচিবালয় করবে। এর জন্য বিধিতে সামান্য কিছু সংশোধন আনতে হবে। এ গেজেট মাসদার হোসেন মামলার পরিপন্থী কিনা- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার তো মনে হয় এটি ওই রায়ের পরিপন্থী হয়নি। বরং বিধি করায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে। তিনি বলেন, বিচারকদের লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, তাদের বদলি- সবই এখনও সুপ্রিমকোর্টের হাতে আছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন এখনও সুপ্রিমকোর্টের নিয়ন্ত্রণে। অবশ্য এটা হয়েছে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে। ব্যারিস্টার শফিকবলেন, বিধি হয়েছে শুধু শৃঙ্খলা সংক্রান্ত। নিন্ম আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে সেটা সুপ্রিমকোর্টকে জানাতে হবে। পরে সুপ্রিমকোর্ট কাউকে নিয়োগ দিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করবে।
বিধি ’৭২-র সংবিধান অনুযায়ী হয়নি : মাসদার হোসেন
সাবেক জেলা জজ ও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার বাদী মাসদার হোসেন বলেছেন, আমি মনে করি, আইন মন্ত্রণালয় যে বিধিমালা করেছে, সেটি ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। ’৭২-র সংবিধানে ফিরে গেলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন হতে হলে একক শাসন লাগবে। তিনি বলেন, দ্বৈত শাসনের ফলে বিচারকরা দ্বিগুণ সুরক্ষা পাবেন। ‘বিধিতে যা বলা হয়েছে, তাতে আপত্তি করার কিছু নেই। দ্বৈত শাসন থাকার ফলে বিচারকরা কোনো ক্ষতির মুখে পড়বেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্বৈত শাসনের ফলে বিচারকরা দ্বিগুণ সুরক্ষা পাবেন। আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত নিন্ম আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির বিষয়ে মঙ্গলবার যুগান্তরের কাছে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মাসদার হোসেন। তিনি বলেন, ‘মাসদার হোসেন মামলার কোথায় লেখা আছে যে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টের হাতেই থাকতে হবে? আমার মামলার রায়ের ১২ দফার নির্দেশনায় বিষয়টি কোথাও নেই।’ তিনি বলেন, ‘সরকার নিন্ম আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির যে গেজেট প্রকাশ করেছে, তা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী নয়।’ বিধি অনুযায়ী অধস্তন আদালতের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতি ও আইন মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে মাসদার হোসেন বলেন, ‘এটা ঠিকই আছে। সুপ্রিমকোর্টকে ‘হায়ার অথরিটি’ করে দেয়া সম্ভব নয়।’
সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘এ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নিন্ম আদালতের সার্বিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিমকোর্টের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ফলে সুপ্রিমকোর্টের যে ক্ষমতা নেই, তা তো নয়।’ সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘সরকার বা রাষ্ট্রপতি যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান কিংবা নিন্ম আদালতের কোনো বিচারকের একদিনের ছুটিও যদি দিতে হয়, তাহলেও সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে দিতে হবে। বিধিতে এ বিষয়টি এসেছে। রাষ্ট্রপতি বা সরকার সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ বিধি প্রকাশে টানাপোড়েনের একপর্যায়ে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, এসকে সিনহা (পদত্যাগকারী সাবেক প্রধান বিচারপতি) রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে নিতে চান। মাসদার হোসেন বলেন, ‘আইনমন্ত্রী যেটা বলেছেন, সেটাই ঠিক। এসকে সিনহা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। আমিও তাই মনে করি। এসকে সিনহার নিয়ন্ত্রক কে হবেন, মূলত এটা নিয়েই তিনি আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন।’ গেজেট সঠিক হয়েছে বলে মন্তব্য করে মাসদার হোসেন আরও বলেন, ‘সংবিধানের ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ সুপ্রিমকোর্টের কাছে থাকায় চূড়ান্ত ঊর্ধ্বতন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (হেড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অথরিটি) সুপ্রিমকোর্ট হওয়ার আবশ্যকতা নেই। কারণ রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন বিচারকদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। ফলে তিনি বিচারকদের নিয়ন্ত্রকও।’
প্রথমেই আমরা শিরোনামের সুফিয়া ও সোফিয়া নামের দুই নারীকে চিনে রাখব, তারপর অন্য কথা। সুফিয়া হলেন মানবীয় অথবা অন্যভাবে বললে প্রাকৃতিক (natural) বুদ্ধিসম্পন্ন শাশ্বত এক বঙ্গললনা। তাকে blood and flesh (রক্তমাংসের শরীর) কিংবা তার নৃতাত্ত্বিক নাম Homo SapiensI বলতে পারি আমরা। আর সোফিয়াকে এই সেদিন দেখেছি, ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’ ইভেন্টে। তিনি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক যন্ত্রমানবী। এবার শুরু করা যাক। জড় ও জীবের সমন্বয়ে গঠিত এই পৃথিবীর ইতিহাসকে মোটামুটি চারটি যুগে ভাগ করে থাকেন সমাজতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকরা- আগুন, পাথর, ব্রোঞ্জ ও লৌহযুগ। লোহার সর্বশেষ যুগটি শেষ হয়েছিল যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগে। মনুষ্য প্রজাতি আসলে একটি রিলে রেসের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে এবং আধুনিক সভ্যতার যে যুগটিতে এখন তার বাস, সেটা শুরু হয়েছিল লৌহযুগের শেষ পোস্টটিকে স্পর্শ করে। এ তো গেল মানবেতিহাসকে ভাগ করার একটা বিশেষ রীতি। এই লেখক ভাগটা করতে চায় আরেকভাবে- আগুনপূর্ব, আগুন, চাকা, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ওয়েভ এবং সর্বশেষ গত শতাব্দীর মধ্যভাগে অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগ। আগুন আবিষ্কারের পর মানুষের জীবনধারণ পদ্ধতিই শুধু উন্নত হয়নি, বাড়তি চিন্তা করার সুযোগও তৈরি হয়েছে তার। আগুনে সেদ্ধ হওয়া অথবা পোড়ানো খাবার তখন কম পরিমাণে খেলেও পুষ্টি ও তৃপ্তি বেশি হতে থাকে এবং তাতে বাঁচে সময়ও। পশু শিকারে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয় না, ওদিকে আগুনের কল্যাণে পশুর আক্রমণ থেকে নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়। ফলে একদিকে সময়ের সাশ্রয় হয়, অন্যদিকে যাপন করা যায় অনেকটাই নিরুদ্বিগ্ন জীবন। সবটা মিলে সুযোগ সৃষ্টি হয় নতুন চিন্তা করার। এরপর মানুষকে বহুকাল অপেক্ষা করতে হয়েছে চাকা আবিষ্কারে। এই চাকা কমিয়ে আনে দূরত্ব, তৈরি হয় যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা। বর্তমান সময়ে উড়োজাহাজের গায়ে লাগানো থাকে যে চাকা, সেটা তো সেই আদি চাকারই স্মার্ট সংস্করণ। চাকার অধিকারী মানুষ আরেকটি দৈত্যাকৃতির লম্ফ দেয় বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পর। বিদ্যুতের ফলে রাতের অন্ধকারজনিত অলৌকিকতা দূর হয়, ঝকঝক করে ওঠে রাতের পৃথিবী। বাড়ে শ্রমঘণ্টা, মানুষ স্টিম ইঞ্জিনের পর্যায় অতিক্রম করে পা রাখে ব্যাপক যান্ত্রিকতায়, শিল্প বিপ্লবের পথও হয় মসৃণ। তবে মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে যদি ১০০ ধরা হয়, তাহলে এর ৫০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে লাখ লাখ বছর ধরে আর বাকি অর্ধেক হয়েছে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ওয়েভ উদ্ভাবনের পর থেকে। মাত্র দেড়শ’ বছরেরও কম সময় আগে উদ্ভাবিত এই ওয়েভ এক মহাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। দৃশ্যমান কোনো মাধ্যম ছাড়াই শব্দ ও ছবি চলাচল করতে থাকে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। রেডিও, টেলিফোন, টেলিভিশন- মানুষের এ এক অন্যরকম জগৎ। ম্যাগনেটিক ওয়েভ মানুষকে এসব প্রেজেন্ট করেই ক্ষান্ত থাকে না, সে তার হাতে তুলে দেয় কম্পিউটার, অতঃপর স্মার্টফোন।
এবার পাল্টে যায় মানুষের ব্যবহারিক জীবনটাই। এটা এমন পাল্টানো যে, এ বছরেরই মে মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসের এক লোক স্মার্টফোনের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আসক্তি ও এর ওপর নির্ভরতা পয়েন্ট আউট করতে তার নিজের ফোনটির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। যা হোক, প্রযুক্তি যেভাবে লাফাচ্ছে, তাতে হাতের স্মার্টফোনটিও হয়তো একদিন নিরাকার হয়ে যাবে এবং তাতে যোগাযোগের কোনো খামতি হবে না। সড়ক বা মহাসড়কে যাত্রা করতে হলে আমাদের প্রথমে গাড়িতে স্টার্ট দিতে হয়, ইনফরমেশন সুপার হাইওয়েতে বিচরণ করতে একদিন হয়তো কোনো স্টার্টারেরও প্রয়োজন হবে না, অথবা কারও কাছে দাবিও জানাতে হবে না তথ্যের, এক অদৃশ্য সুপার-পাওয়ার কানের কাছে এসে বলতে থাকবে- কী চাচ্ছো বলো, এনে দিচ্ছি। সেটা এক বিরক্তিকর পরিস্থিতি হবে হয়তো; কিন্তু প্রযুক্তির ক্ষতি ও বিরক্তির দিক তো কিছু থাকেই। টেলিপোর্টেশন নিয়েও কি ভাবা হচ্ছে না? ম্যাটারকে এনার্জিতে পরিণত করে যদি অন্য কোথাও ট্রান্সমিট করা যায়, মানবদেহকেও ভেঙে অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে কেন জোড়া লাগানো (assemble) যাবে না? মানুষ তো ম্যাটারই, নাকি? আমরা সর্বশেষ era বা যুগটিকে বলেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। হ্যাঁ, এই যুগটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের চূড়ান্ত রূপ, ফিউচারিস্টদের অনেকেই অবশ্য বলছেন, এই উৎকর্ষ আত্মঘাতীও বটে। সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে, আপাতত আমরা শিরোনামের দুই সতীন সোফিয়া ও সুফিয়াতে ফিরে যাব। যে সোফিয়াকে দেখলাম আমরা, তাকে বলা যেতে পারে পরীক্ষামূলক যন্ত্রমানবী, তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্তর খুবই প্রাথমিক। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থেকে সে ডেটা প্রসেস করে প্রশ্নের একটা বেসিক উত্তর দিচ্ছে। কখনও বা চেহারায় ফুটিয়ে তুলছে আনাড়ি এক্সপ্রেশনও। ক্রিয়ার বিপরীতে তার প্রতিক্রিয়া ও এক্সপ্রেশন ডেটাভিত্তিক। এক কথায় সে প্রোগ্রাম্ড রোবট। সোফিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে স্তরে রয়েছে, তার চেয়ে অনেক উঁচুমানের বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট ইতিমধ্যেই জাপানসহ কিছু দেশে নানা অ্যাক্টিভিটিতে সক্রিয় রয়েছে। কথা সেটা নয়, পয়েন্টটা হল তার মেন্টাল গ্রোথ অথবা যদি বলি বুদ্ধির উৎকর্ষ, দিন দিন বাড়তেই থাকবে এবং সেটা অতি দ্রুতগতিতে। আমরা এখন প্রায় প্রতিদিনই যেমন আইটি সেক্টরের অগ্রগতি দেখছি, সেই জ্যামিতিক প্রগমনেই (geometric progression) সোফিয়া ও তার সমগোত্রীয়রা একদিন হয়ে উঠবে একেকজন এমন হিউম্যানয়েড রোবট, যারা শুধু বুদ্ধিতে নয়, সেন্সিটিভিটি-ইমপাল্স-রিজনিং- সবক্ষেত্রেই এগিয়ে যাবে সুফিয়াদের চেয়ে। কম্পিউটারের সঙ্গে দাবা খেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও গ্রান্ডমাস্টাররা যেমন হেরে যাচ্ছেন, সুফিয়ারা তখন কুলোতে পারবে না সোফিয়াদের সঙ্গে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্তর কীভাবে ধাপ অতিক্রম করবে, একটা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যেতে পারে। ধরা যাক, একটি রোবটের সামনে দুটি ঘড়ি রাখা হল, যে দুটির একটির কাঁটা স্থির, অর্থাৎ ঘড়িটি বন্ধ। অন্যটি পাঁচ মিনিট স্লো চলছে। এবার তাকে জিজ্ঞেস করা হল, এ দুয়ের কোন্টি কেনা লাভজনক? রোবটটি যদি হতো দশ বছর আগের, তাহলে সে বলত বন্ধ ঘড়িটিই, কারণ সেটা দিনে-রাতে অন্তত দু’বার সঠিক সময় দেবে। সোফিয়া কিন্তু তা বলবে না। সে পরামর্শ দেবে স্লো ঘড়িটি কিনতে, বলবে- ঘড়ির সময়ের সঙ্গে পাঁচ মিনিট যোগ করে হিসাব করলেই সঠিক সময়টা জানা যাবে। আর আগামী দিনের হিউম্যানয়েড রোবট সোফিয়ার চেয়ে অনেক এগিয়ে বলবে- এবার আমার কনসালটেন্সি ফি-টা দিন তো! সোফিয়ারা কীভাবে মানুষের প্রোগ্রামিংয়ের অপেক্ষায় না থেকে ইন্টেলিজেন্ট, সেন্সিটিভ, ইমপাল্সিভ ও র‌্যাশনাল সত্তায় পরিণত হবে, তা একটু ব্যাখ্যা করা যাক। বর্তমানে যে পদ্ধতিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার হচ্ছে, অচিরেই সেই সুযোগ আরও অবারিত হতে যাচ্ছে। চেষ্টা চলছে বায়ুমণ্ডলের শেষ স্তর স্ট্রাট্রোম্ফিয়ার থেকে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সার্ভিস সরবরাহ করার। গুগল বেলুনের এবং ফেসবুক ড্রোনের মাধ্যমে এই সার্ভিস দেয়ার অবিরাম চেষ্টায় রত এখন। এই চেষ্টা সফল হলে সোফিয়ারা এক অন্তহীন ডেটাবেসের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়বে। সেই তথ্য ব্যবহার করতে করতে তার লার্নিং পদ্ধতিতেও আসবে পরিবর্তন। সেই শিখনপদ্ধতির শিক্ষার্থী হিসেবে ক্রমাগতভাবে উন্নত করবে তারা নিজেদের। জ্ঞান সঞ্চয় করতে শিখবে এবং সেখান থেকে তাদের নিজস্ব নিয়মে ব্যাখ্যা করতে পারবে যে কোনো কিছুই। তথ্যের প্রক্রিয়াকরণই জ্ঞান ও যুক্তির উৎস। এবং এভাবে এক সময় ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, গ্রহণ-বর্জন ইত্যাদি ব্যাপারেও তৈরি হবে সোফিয়াদের নিজস্ব ধারণা। এ পর্যায়ে অবশ্য একটা বিপদের দিক স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। হতে পারে মনুষ্য সমাজের চোখে যা অন্যায়, সোফিয়ারা সেটাকে দেখবে ন্যায় হিসেবে অথবা উল্টোটাও হতে পারে। শ্লীল-অশ্লীলের ধারণায়ও হয়তো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হবে ভিন্ন। কোনো কিছু চাপিয়ে দিয়ে তাদের দিয়ে নির্দেশ পালন করানোও কঠিন হয়ে পড়বে তখন। বাবা-মা যেমন অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে শত চেষ্টায়ও তাদের মনমতো গড়ে তুলতে পারে না, এক সময় মানুষের কথায়ও কান দেবে না তেমন যন্ত্রমানব। বিপদের সে কথাই বলেছেন স্টিফেন হকিং। বলেছেন, মানবজাতির সামনে এখন দুই বড় বিপদ ঝুলে আছে- গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স। হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট এক সময় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে বধ করবে তার স্রষ্টাকেই। টেসলারের প্রধান নির্বাহী ও ফিউচারিস্ট ইলোন মাস্কের কথা হল, হিউম্যান বিয়িংকে হিউম্যানয়েড রোবটের সঙ্গে ব্লেন্ড করেই বেঁচে ও টিকে থাকতে হবে। আসলে আমরা কেউই এই মুহূর্তে আন্দাজ করতে পারছি না, রক্তমাংস ও যন্ত্র- এ দুইয়ে আদৌ কোনো যুদ্ধ বাধবে কিনা অথবা বাধলেও সেই শত্রুতার স্বরূপটা কেমন হবে। যেমন, কালো টাকা যেভাবে বাজার থেকে সাদা টাকা হটিয়ে দেয়, ওয়ার্কিং রোবটরা তেমন হিউম্যান ওয়ার্কারদের হটিয়ে তৈরি করছে যখন বেকারত্ব, তখন তো একটা পর্যায়ে এ দুইয়ের সম্পর্কে চিড় ধরতে বাধ্য। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, রোবটগুলো বিকশিত হচ্ছে শত্রুতারই সংস্কৃতি চর্চা করতে করতে। তবে কি মানুষ এক আত্মঘাতী প্রাণী, এক সময় পান করবে বলে সে পাত্রে ঢালছে বিষ? এ যে গোকুলে নয়- তোমারে বধিবে যে, প্রকাশ্যেই বাড়িছে সে! আমরা বোধহয় খুব সিরিয়াস আলাপে ঢুকে পড়েছি, একটু হাল্কা হওয়ার চেষ্টা করা যাক। ভালোবাসায় কতটা রোমান্টিক হয়ে উঠবে এক সময় সোফিয়া? সে কি সুফিয়ার মতো অথবা তার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারবে পুরুষ? পারবে না, এই একটা জায়গাতেই পিছিয়ে থাকবে সে সুফিয়ার চেয়ে। সুফিয়া মৌলিক, ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রকৃত যেমন; সোফিয়া যৌগিক, মানুষের তৈরি শহরের মতো। যৌগধর্মের কারণে সোফিয়ার চুলে যেমন খুশকি জন্মাবে না, বাসা বাঁধতে পারবে না উকুনও; তার হৃদয়েও জন্ম নেবে না অনুভূতির আগাছা। অথচ অপ্রয়োজনীয় কথা ছাড়া ভালোবাসা হয় না, ভালোবাসার বাগানে থাকতে হয় আগাছা, অন্যথায় সেটা সুন্দর বাগান নয়। আবার ভালোবাসাই একমাত্র ক্রিয়া, যা প্রশিক্ষণ দিয়ে হয় না। স্বামী ছুটিশেষে যখন শহরের কর্মস্থলে ফিরে যেতে প্রস্তুতি নিতে থাকে, তখন আমাদের সুফিয়ারা কখনও কখনও বগলে রসুন রেখে জ্বর বাঁধিয়ে তাকে আটকায়। সোফিয়া জ্বর বাঁধানোর কৌশলটুকু রপ্ত করতে পারবে হয়তো; কিন্তু তার অতটা মমতা থাকবে না, যতটা দিয়ে আটকানো যায় স্বামী। মৌলিকত্বের গুণই আলাদা। এই গুণ বিরহের মাঝেও মিলন দেখতে পায়। আবার মৌলিক মানুষের কাছে ওই মিলনটিই মৌলিক। কবি আবুল হাসান যেমনটা বলেছেন- ‘যত দূরে থাকো ফের দেখা হবে। মানুষ যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।’ এতটা সমৃদ্ধ হবে কি সোফিয়া? পারবে না। নো, নেভার! হৃদয় যৌগ, কারণ এতে ভেজাল অনুভূতি মিশে যায় কখনও কখনও; কিন্তু আত্মা (soul) মৌলিক। রোবোটিক্সের সাধ্য নেই তাকে স্পর্শ করে। সবশেষে কী বলা যায়! খোদা না খাস্তা সোফিয়ারা যেন ছলনাময়ী না হয়। শেকসপিয়র চারশ’ বছর আগে লিখেছিলেন- Frailty thy name is woman. সোফিয়া পরিপূর্ণ নারী হওয়ার পর সেকালের কোনো কবি যেন আরও কঠিন কোনো কথা লিখতে বাধ্য না হন।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com
বয়স মোটে ছয় বছর। এ মুহূর্তে উপার্জনের তেমন কোনো দরকার নেই, তাগিদও নেই। কিন্তু প্রায় বিনা পরিশ্রমে ১১ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯০ কোটি টাকা) রোজগার করে এ শিশুটি। তাও নিজের পছন্দের কাজটি করেই। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য। আমেরিকান এ শিশু রায়ান এখন উপার্জনের নিরিখে নাম লিখিয়ে ফেলেছে ফোর্বস ম্যাগাজিনেও। এ অর্থ উপাজনে তেমন কিছুই করতে হয় না তাকে। শুধু তার পছন্দের খেলনাগুলো কী রকম লাগে, তাই ব্যাখ্যা করে। তা তার বয়সী সব বাচ্চাই খেলনা ভালোবাসে। নিজেদের পছন্দের খেলনা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে। কোথায় রায়ান টেক্কা দিয়ে গেল সবাইকে? এর নেপথ্যে অবশ্য আছে রায়ানের অভিভাবকরা। কিভাবে টাকা উপার্জন করছে রায়ান? সে বিভিন্ন খেলনার রিভিউ অনলাইনে দিয়েই এ অর্থ উপার্জন করছে। তার যখন বছরচারেক বয়স, তখন একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলা হয়। নাম দেয়া হয় রায়ানের নামেই। রায়ান তার পছন্দের খেলনাগুলো নিয়ে কথা বলত। তা ভিডিও করে তুলে দেয়া হতো ইউটিউবে। দেখতে দেখতে রায়ানের ভিডিও বেশ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অভিভাবকরা ইউটিউব সার্চ করে পৌঁছে যেতেন রায়ানের চ্যানেলে। আর দেখে নিতেন, তার বয়সী বাচ্চারা ঠিক কোন খেলনা পছন্দ করছে। সে খেলনার খুঁটিনাটি ইত্যাদি। যত জনপ্রিয়তা বাড়ে, তত বাড়ে দর্শকসংখ্যা। পাল্লা দিয়ে বাড়ে উপার্জনও। ক্রমে দেখা যাচ্ছে, ছয় বছর বয়সের রায়ান ইউটিউব থেকে উপার্জন করছে কোটি টাকারও বেশি। শুধু তাই নয়, সে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উপার্জন করা ইউটিউবারদের মধ্যে অষ্টম। বর্তমানে তার অনলাইন চ্যানেলের নাম রায়ান টয়সরিভিউ। তার ভিডিওগুলো কেমন? যে কেউ ইউটিউবে গেলে তার চ্যানেল দেখে অবাক হবেন। তেমন বড় কিছু নয়, নানা খেলান নিয়েই তার কারবার। সে নানা নতুন খেলনা সংগ্রহ করে। এরপর সেগুলোর প্যাকট খোলে, ব্যাটারি লাগায়, সুইচ অন করে এবং চালায়। এ সাধারণ ভিডিওগুলো শিশুদের খুবই প্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রায় ১০ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার রয়েছে রায়ানের চ্যানেলে। আর এ চ্যানেলের বিজ্ঞাপন থেকে যে আয় হয়েছে তাই এ বছর ১১ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় মদসহ ছাত্রলীগের পাঁচ নেতাকর্মীকে আটক করেছে সীমান্ত রক্ষ্মী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সোমবার রাতে কসবা উপজেলার গোপীনাথপর ইউনিয়নের দৌলতপুর ও পাতাবাজার সীমান্ত এলাকা থেকে তাদেরকে আটকের পর রাতে মামলা দিয়ে কসবা থানা পুলিশের কাছে হস্তাহন্তর করা হয়। ধৃতদের মধ্যে কসবা উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আজিমুর রেজা (২২) ও দ্বিন মোহাম্মদ স্বপন (২২) রয়েছেন। বাকি তিনজনের নামা জানা যায়নি। তারা উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা বলে জানা গেছে।
কসবা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মহিউদ্দিন জানান, সোমবার সীমান্ত এলাকা থেকে ছাত্রলীগ নেতা আজিমুর ও দ্বীন মোহাম্মদসহ পাঁচ নেতাকর্মীকে পাঁচ বোতল মদসহ গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিজিবির করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। রাতে আটকদের থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে বিজিবি। তবে কসবা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো: মনির হোসেন জানান, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে শুধুমাত্র স্বপন ও রেজা ছাত্রলীগ নেতা, বাকি তিনজন সাধারণ ছাত্র। সীমান্ত এলাকায় ঘুরতে গিয়ে বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে ভুল বুঝাবুঝির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
যশোরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির নির্বাচনে না আসার কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে না চাইলে বিএনপিকে নির্বাচনে আসতেই হবে। এটাকে তারা পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। তাহলে তারা আরো সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। মঙ্গলবার সকালে যশোর-খুলনা মহাসড়ক পরিদর্শন করে সাতক্ষীরা যাওয়ার পথে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, 'আমরা বারবার বলেছি, নির্বাচনে বিএনপি আসুক; নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হোক। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন কোনো নির্বাচন আমরা করতে চাইনি।
কিন্তু বিএনপি একটা পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। আসব আসব করে বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে একটা প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু আইনগতভাবে নির্বাচন কারো জন্যে থেমে থাকে না। নির্বাচনের ট্রেন চলবেই। গণতন্ত্রের যাত্রা ব্যাহত হওয়ার সুযোগ নেই। আর বিএনপি না এলে নির্বাচন তো বন্ধ থাকতে পারে না। বিএনপি নির্বাচনে না এলে গণতন্ত্রের কী দোষ!' মতবিনিময়কালে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম কামাল, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারসহ সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আবারো প্রশাসনের হাতে গিয়েই পড়লো। আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) সিনেট ২৫জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটস প্রতিনিধি নির্বাচন-২০১৭ উপলক্ষে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী পরিষদের প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমরা বহু কথা ও আন্দোলন করেছি। সংসদে আইন পাশ হয়েছে। আর কোনোভাবেই এটাকে মুক্ত করা গেল না। দুর্ভাগ্য প্রধান বিচারপতি (এসকে সিনহা) যখন মুক্তির চেষ্টা করেছেন তখন তাকে পদ হারাতে হলো, পরবর্তীতে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। আর আমরা কথা বলতে যাবো, প্রতিবাদ করলে নেমে আসে মামলার খড়গ। তিনি বলেন, এ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বেশিরভাগই ফলাফল শূন্য। তারপরও আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচন করে যেতে চাই। কারণ আমাদের একটিমাত্র পথ সেটি হচ্ছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে সকল সত্যকে ফিরিয়ে আনা। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক আকতার হোসেন খানের পরিচালনায় এবং বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুলের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন- নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, ঢাবি অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, ঢাবির সাবেক সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, ড্যাব সভাপতি একেএম আজিজুল ইসলাম প্রমুখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটস প্রতিনিধি নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী পরিষদের প্রার্থীরা হলেন- অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, ড. উম্মে কুলসুম রওজাতুর রোম্মান, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, এ বি এম ফজলুর করিম, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, কে এম আমিরুজ্জামান শিমুল, ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান, ড. জিন্নাতুন নেছা তাহমিদা বেগম, অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, ড. মোহাম্মদ আবদুর রব, ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, ডা. মোহাম্মদ রফিকুল কবির লাবু, মো: আশরাফুল হক, অ্যাডভোকেট মো: মাসুদ আহমেদ তালুকদার, ডা. মো: মোয়াজ্জেম হোসেন, ড. মো: শরীফুল ইসলাম দুলু, মো: সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া, মো: সেলিমুজ্জামান মোল্যা সেলিম, শওকত মাহমুদ, ড. সদরুল আমিন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, অত্যন্ত কঠিন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই সময়টা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচাইতে কলঙ্কজনক একটি অধ্যায়। আজকে গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের নামে আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেয়া হচ্ছে। গণতন্ত্রের নামে আমাদের শিক্ষক সমাজের অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। ছাত্রসমাজের অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে অথবা তাদেরকে একঘরে করে রাখা হচ্ছে। তাদেরকে কোনোরকম কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অংশ নিতে দেয়া হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি বিশেষ দলের প্রাধান্য বিস্তার করছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যে চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সেই চেতনাগুলো আজকে ধ্বংস হতে চলেছে। যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা মুক্তচিন্তার পাদপীঠ বলে মনে করি, এই দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার বলে মনে করি, গর্ববোধ করি, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন পুরোপুরিভাবে একটি একদলীয় চিন্তাভাবনার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকে দুর্ভাগ্য আমাদের যে স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৬/৪৭ বছর পরে আমরা এধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। এধরনের কলঙ্কময় একটি পরিবেশের মধ্যে আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটে নির্বাচন করতে হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা জানি না নির্বাচনের ফল কী হবে? তবে এটুকু জানি যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বাংলাদেশের মুক্তিকামী ও গণতন্ত্র চিন্তার মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। এখানে জয়পরাজয় প্রধান লক্ষ্য হবে না। লক্ষ্য হবে আমাদের লড়াই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দেশের চলমান সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুমিকায় দুঃখ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, যখন দেখি দেশের সার্থ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয় কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো প্রতিবাদ আসে না। তখন খুবই দুঃখ হয়, কষ্ট লাগে যখন দেখি ছাত্র-ছাত্রীরা নির্মমভাবে নিহত হয়, অন্যায়ের কাছে পরাজিত হয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো প্রতিবাদ আসে না। অধিকার আদায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো সোচ্চার কণ্ঠ ভেসে আসে না। তিনি বলেন, আমরা ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভূমিকা সেটা ফিরে চাই। বিশেষ করে গণআন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে নেতৃত্ব দিয়েছিল সেটা ফিরে চাই। আমরা ফিরে চাই আবারো বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে দাঁড়াবে এবং পথিকৃৎ হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে রেখে বাংলাদেশের মানুষ আবারো উজ্জীবিত হবে। আমরা ত্যাগ স্বীকার করে লক্ষ্যে অটুট থাকলে ইনশাআল্লাহ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবো। মির্জা ফখরুল আরো বলেন, এধরনের নির্বাচনে বিএনপি আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবেই অংশ নেয়। কারণ গণতন্ত্রের মধ্যেই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এই গণতন্ত্রের আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বেরিয়ে আসতে হবে। মুক্তচিন্তা ও অধিকার রক্ষার আন্দোলন বের করতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে- যতক্ষণ না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো আন্দোলন শুরু হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই আন্দোলন লক্ষ্যে পৌঁছায় না। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট নির্বাচনকে শুধু সিনেট নির্বাচন হিসেবে না নিয়ে আমাদের গণতন্ত্রকে মুক্তচিন্তার অধিকারকে মুক্ত করার নির্বাচন হিসেবে নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। আক্তার হোসেন খান লিখিত বক্তব্যে বলেন, আগামী ৬ ও ১৩ জানুয়ারি ২০১৮ ঢাকার বাইরের কেন্দ্রসমূহে এবং ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রসমূহে দেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত ঢাবি সিনেটের ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটস প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় মূল্যেবোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক জাতীয়তাবাদী পরিষদ মনোনীত প্রার্থীগণ অংশগ্রহণ করছে। প্যানেলের পক্ষে ৭টি এজেন্ডা তুলে ধরেন আকতার হোসেন খান। এজেন্ডাগুলো হলো- ঢাবির ভাবমূর্তি ও মান-মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা, একাডেমিক কার্যক্রমের দৃশ্যমান উন্নয়নসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে সিনেটকে সম্পৃক্ত, কেবলমাত্র বাজেট অনুমোদন ও ভিসি প্যানেল নির্বাচন করার মধ্যেই সিনেটকে সীমাবদ্ধ না করা, শিক্ষক নিয়োগ মেধার মূল্যায়নকেই একমাত্র মানদন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানজট সমস্যার সমাধান করা ও নিরাপত্তা জোরদার, দলমত নির্বিশেষে সব ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত এবং ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাণের দাবি, ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো বলেছেন, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেশটির প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নিতে পারবে না। কারণ তারা রোববারের মেয়র নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে এটি তাঁর আরেকটি পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। ভোটের পর মাদুরো বলেন, ভেনেজুয়েলার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কেবল ওই দলগুলো অংশ নিতে পারবে, যারা রোববারের মেয়র নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। অন্য দলগুলো আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিষিদ্ধ থাকবে। তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলো মেয়র নির্বাচন বয়কট করে রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে ‘গায়েব’ হয়ে গেছে। অন্যতম বিরোধী দল জাস্টিস ফার্স্ট, পপুলার উইল ও ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন মেয়র নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল গত অক্টোবরে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের পদ্ধতি পক্ষপাতদুষ্ট এবং তা কেবল মাদুরোর স্বৈরশাসনকেই আরও দৃঢ় করবে। ৩৩৫টি মেয়র নির্বাচনের মধ্যে ৩০০টিতে জয় পেয়েছে মাদুরোর দল। রোববারের নির্বাচনে ৪৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। বিশ্লেষকদের ধারণা, ফল নিজের পক্ষে নিতে নির্বাচন এগিয়ে আনতে পারেন মাদুরো। মাদুরোর দাবি, তিনি জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদের আলোকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত আগস্টে গঠিত এই পরিষদে মাদুরোর দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে তারা নিজেদের মতো করে নির্বাচনের নীতিমালা পরিবর্তন করতে পারে। এর মাধ্যমে মাদুরো নিজের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে চাইছেন বলে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ। বেশ কয়েক বছর ধরে ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক মন্দা যাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনীতিবিদকে বন্দী করা হয়েছে। এই বছরের প্রথম দিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ভেনেজুয়েলা। মাদুরো নতুন সংবিধান তৈরির প্রস্তাব দেওয়ার পর বিক্ষোভ শুরু হয়। সংঘর্ষে বহু লোকের প্রাণহানি হয়।
‘আমরা ডাকসু নির্বাচন করব। তবে এর সঙ্গে যেহেতু অনেকগুলো অংশীজন জড়িত, তাই একটু সময় লাগবে। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ার যে সংস্কৃতি চলে আসছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।’ এ রকম আশ্বাসবাণী শুনিয়ে ওয়ালিদ আশরাফের অনশন ভাঙালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান। স্নাতকোত্তর পর্বের এই ছাত্র ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার দাবিতে একাই দুই সপ্তাহ ধরে অনশন করছিলেন। কিন্তু উপাচার্য যে বললেন ‘একটু সময় লাগবে’, এই সময় কত লম্বা হবে, তা কেউ জানে না। কারণ, ওয়ালিদের অনশন চলাকালীন দুই সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো পর্যায়ে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কোনো ছাত্রসংগঠন বা অংশীজনের সঙ্গেও তারা এ বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব এড়িয়ে চলাই শ্রেয় মনে করে আসছে, তা বেশ স্পষ্ট। নইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির আহ্বানকেও কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না? এ ছাড়া গত ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট ছয় মাসের মধ্যে সিনেট পূর্ণাঙ্গ করার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তাতেও ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ আছে। কেননা, ডাকসুর প্রতিনিধিত্ব ছাড়া সিনেট পূর্ণাঙ্গ হয় না। অর্থাৎ আদালত কর্তৃক সিনেট পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশনা পরোক্ষভাবে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশনা হিসেবেও বিবেচ্য হতে পারে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১০ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট পূর্ণাঙ্গ করতে হলে এই সময়সীমার মধ্যেই ডাকসু নির্বাচন করা আবশ্যক। সুতরাং আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।
এ ছাড়া বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোসহ ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং তাঁদের দাবির প্রতি সমর্থন-সংহতি প্রকাশকারী প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাবেক ছাত্রনেতাদের মতামতও আর অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। তাই ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি দ্রুত শুরু করা উচিত। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, ১৯৯১ সাল থেকে ২৬ বছর ধরে দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। অথচ ১৯৯০ সালে বিপুল গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে গণতন্ত্রে প্রবেশ করেছি। জনপ্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রাখা হয়েছে—এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি অগণতান্ত্রিক এবং এতে একচেটিয়া কর্তৃত্বপরায়ণতার প্রকাশ ঘটছে। অবিলম্বে এটা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করা হোক।
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) মাতৃমৃত্যু বৃদ্ধির তথ্য সরকার যে কায়দায় বাতিল করে দিতে চেয়েছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। কোনো পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, সেটার ত্রুটি–বিচ্যুতি থাকলে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা থাকতে পারে, কিন্তু নিপোর্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে মাতৃমৃত্যু–সংক্রান্ত জরিপের প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়াটা কি আদৌ বিবেচনাসম্মত হলো? নিপোর্টের মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ প্রতিবেদন ২০১৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর হার লাখে ১৯৬। অর্থাৎ এক লাখ জীবিত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। ২০১০ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৯৪।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় লাখে ১৭৬ জনে। এর মানে হচ্ছে মাতৃমৃত্যুর হার আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু এই তথ্য মানতে নারাজ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্য এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে নিপোর্টের তথ্য মিলছে না। নিরপেক্ষ কাউকে দিয়ে এই জরিপ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করানো এবং কী পদ্ধতিতে এই জরিপ চালানো হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে বলে তাঁরা মনে করেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা না মানলে আর ওয়েবসাইট থেকে মাতৃমৃত্যুর প্রতিবেদন সরিয়ে ফেললেই কি আসল পরিস্থিতি বদলে যাবে? সরকার বেশ কয়েক বছর ধরে মাতৃমৃত্যু রোধে তাদের সাফল্যের কথা প্রচার করে আসছে। এখন প্রচারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হলো না বলে তথ্য মেনে না নেওয়ার মানসিকতা বিপজ্জনক। কোনো তথ্য না মানলে সেটা যে মিথ্যা হয়ে যায় না, এটা সরকার কবে বুঝবে? সরকারের বরং উচিত হবে জরিপের ফলাফল প্রত্যাখ্যান না করে একে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া। জরিপে উঠে আসা তথ্য থেকে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে কোথায় কী সীমাবদ্ধতা আছে, তা চিহ্নিত করে সেই সব সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনুযায়ী দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৪৩ জনে নামিয়ে আনার কথা ছিল সরকারের, কিন্তু তা হয়নি। এটা পরিষ্কার যে এই লক্ষ্য অর্জনে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের তরফে উচিত ছিল তা যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি। বেশির ভাগ মাকে জীবন রক্ষাকারী কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে মাতৃ স্বাস্থ্যসেবার মান যথাযথ নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ করুণ। সারা দেশে শুধু ৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করে। বাড়িতে সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েদের মাত্র ৩ শতাংশ প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সেবা পাচ্ছেন। রয়েছে আরও অনেক সমস্যা। সরকারকে এখন এসব সমস্যার দিকে নজর দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এই গত সপ্তাহে গতি পেয়েছে। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল ‘খুব সম্ভবত মানবাতাবিরোধী অপরাধের’ জন্য এক প্রস্তাব পাস করে মিয়ানমারের সমালোচনা করেছে। আর তার পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ উৎসাহ নিয়ে এক প্রস্তাব পাস করে সামরিক বাহিনীর হামলার অবসান চেয়েছে। একই সঙ্গে তারা রাখাইন প্রদেশে মানবিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগের দাবি জানিয়েছে। এই রাখাইন প্রদেশ থেকে গত আগস্টের শেষ ভাগ থেকে সোয়া ছয় লাখের বেশি মানুষকে তাড়ানো হয়েছে। কংগ্রেস ও ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে, এর আওতায় সামরিক নেতৃত্বও আছে। অন্যদিকে যারা দেশটির সামরিক বাহিনীকে সরঞ্জামাদি সরবরাহ করে, কংগ্রেস তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। এই মাসের শুরুর দিকে পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে দেখা করেছেন, এর আগে তিনি মিয়ানমারও সফর করেছেন। এর সঙ্গে তিনি ‘মানুষের ব্যাপক দুঃখ-কষ্টের’ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এমন কোনো লক্ষণ দেখছি না যে এতে মিয়ানমারের জেনারেল ও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারের ওপর প্রভাব পড়েছে। অধিকাংশ বিবরণেই দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ঘৃণার ব্যাপারে মিয়ানমার সমাজ দারুণভাবে একতাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনা নাকচ করার ক্ষেত্রেও তারা এককাট্টা।
আর রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের ঘৃণা দীর্ঘদিনের। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রণালিবদ্ধ বর্বরতার—শিশু হত্যা, গণধর্ষণ, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া—তদন্ত তো দূরের কথা, সামরিক বাহিনী উল্টো বলছে, সেনাবাহিনী নিরপরাধ। অন্যদিকে অং সান সু চি জেনারেলদের বিরুদ্ধে কথা বলা বা তাদের চাপ দেওয়া দূরে থাক, তিনি বলছেন, জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান এটার মধ্যে ‘গণহত্যার উপাদান’ আছে বলে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে মিয়ানমারের উদীয়মান গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ডিসেম্বরের ১ তারিখে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানকে নিয়ে তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেইজিং সফর করেছেন। বলা বাহুল্য, সি চিন পিংয়ের সরকার মিয়ানমারের ব্যাপারে জাতিসংঘের যেকোনো বক্তব্য ও কাজের সমালোচনা করেছে। আবার মিয়ানমারের প্রতি চীনের সমর্থনও কিন্তু একদম নিঃশর্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের মতো চীনও বাংলাদেশের জীর্ণ শিবিরে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমার তত্ত্বগতভাবে এই প্রত্যাবাসন মেনে নিয়েছে। তারা গত মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে এক চুক্তি সই করেছে। তারা বলেছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। কিন্তু জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের টেকসই ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। অনেক রোহিঙ্গাই এখন পর্যন্ত ভীতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেখানে আন্তর্জাতিক নজরদারি, মানবিক সহায়তা ও বাঁচার মতো নিরাপদ জায়গা নেই; এমনকি নাগরিকত্বের মতো মৌলিক অধিকার লাভেরও নিশ্চয়তা নেই। এই কঠিন বাস্তবতার অর্থ হলো জাতিসংঘ ও পশ্চিমা সরকারগুলোর উচিত বাংলাদেশে অবস্থানরত লাখ লাখ রোহিঙ্গার জীবনমান উন্নয়নে নজর দেওয়া। নিকট ভবিষ্যতে তাদের তো সেখানেই থাকার কথা। সেখানে তাদের গুরুতর মানবিক ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে, যেমন ডিপথেরিয়ার মতো প্রাথমিক পর্যায়ের মহামারি ঘটে যেতে পারে। তাদের এই ক্ষণস্থায়ী নিবাসগুলো দ্রুতই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে। এগুলো যদি ঠিকঠাক ব্যবস্থাপনা বা দেখভাল করা না হয়, তাহলে তা চরমপন্থীদের দলভুক্তকরণের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিমা সরকারগুলোর অবশ্যই মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর অনমনীয়তাকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। তারা যে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে দূরে রাখতে চাইছে, সেটা হতে দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ জাতিগত নিধনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ছাড় দেওয়ার যে চেষ্টা তারা করছে, তা বন্ধ করতে হবে। ব্যাপারটা হলো মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি না হওয়ার মানে কিন্তু আরও ভয়ংকর নৃশংসতা ডেকে আনা।
দোষ করে বুড়োধাড়িরা, মাশুল গোনে শিশু। নইলে ৯৫ শতাংশ শিশুর শরীরে নিকোটিন ঢুকবে কেন? হ্যাঁ, ধূমপানের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের কথাই বলা হচ্ছে। গতকাল সোমবার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরটি ভয়াবহ—রীতিমতো আতঙ্কজনক! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশনের আশপাশের ৯৫ শতাংশ শিশুর দেহে নিকোটিন রয়েছে, যা ফুসফুসের ক্যানসারে মারাত্মক ইন্ধন জোগায়। শুধু ফুসফুসই নয়, নিকোটিনের কুপ্রভাবে যকৃৎ-কিডনি-মস্তিষ্ক কোনোটাই সুস্থ থাকে না। বড়রাই নিকোটিনের মরণ ছোবল থেকে রেহাই পান না, আর কচিপ্রাণ শিশুদের বেলায় এটি যে কেমন মারাত্মক হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তামাক থেকে আসা নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাবে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ লোক মারা যায়, যা বিশ্বে প্রতিবছরের গড় মৃত্যুর ১০ শতাংশ। এর মধ্যে ছয় লাখ মানুষ মারা যায় ধূমপানের পরোক্ষ প্রভাবে। অর্থাৎ, ধূমপায়ী তামাক সেবন করে আর তার ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয় আশপাশের মানুষ। আমাদের দেশে ধূমপায়ীর অন্ত নেই। গ্রামই বলুন আর শহরই বলুন, ছেলেপুলেরা অনেকে গোঁফের রেখা ফোটার আগেই তলে তলে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আর তা বড়দের দেখে দেখেই শেখে। কেবল পুরুষই নয়, আমাদের দেশে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যাও কম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশে মোট নারীর দুই কোটিরও কিছু বেশি তামাক সেবন ও ধূমপানে আসক্ত (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। আর ঢাকা তো ধোঁয়ার ধূম্রজালে ঢাকা। একদিকে ইটভাটায় কাঠ আর কয়লা পুড়ে শ্বাসরোধী ধোঁয়া উড়ছে, আরেক দিকে রয়েছে নানা কলকারখানার ধোঁয়া। আবর্জনা পুড়িয়ে ধোঁয়া ওড়ানো হচ্ছে। উড়ছে বিটুমিন পোড়ানো ধোঁয়া। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে রাশি রাশি তামাক পোড়ানো ধোঁয়া। কার্বনজনিত গ্যাসে ঢাকার আকাশ ঢাকা। এর মধ্যে অক্সিজেন ফেরারি। অনেকটা কৌতূহল থেকেই ধূমপানের শুরু। বড়রা কত মজা করে সিগারেট ফোঁকে, আমিও একটু টেনে দেখি না কেমন লাগে—এ ধরনের কৌতূহল থেকে ছোটরা ধীরে ধীরে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বয়স বাড়ে, ক্ষতিকর অভ্যাসটাও ক্রমে গ্যাঁট হয়ে বসে।
গ্রামে খেতখামারে যাঁরা কাজ করেন, কায়িক শ্রমে হাঁফ ধরে গেলে পালা করে তাঁরা হুঁকা টানেন বা বিড়ি ফোঁকেন। ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, এটা তাঁদের ক্লান্তি দূর করে। কাজে জোশ এনে দেয়। অনেক পরিবারে ঘরের বাড়ন্ত ছেলে বা মেয়েকেই হুঁকা সাজানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। হুঁকা সাজানো হলে তারা গুড়ুক গুড়ুক করে দু-একবার টেনে পরখ করে ঠিকমতো হয়েছে কি না। কুয়াশাঢাকা শীতে হি-হি করে কাঁপছেন কোনো চাষি বা দিনমজুর, গা গরম করতে কী করেন দেখুন। নিকোটিনে ভরপুর ওই বিড়ি বা সিগারেট ফুঁকবেন। মানা করুন, গাল বাঁকা করে হাসবেন। উল্টো বুঝ দেবেন, ‘আরে, এতে গা গরম হয়!’ ক্লান্ত দুপুরে ছায়ায় দাঁড়িয়ে ধূমপানরত কোনো রিকশাচালক বা স্কুটারচালকের কাছে গিয়ে ধরনা দিন, আপনাকে কেয়ারই করবে না। সুখটান দিয়েই তবে নড়বে। আর এই সুখটানে কী যে সুখ, অল্পবয়সী ধূমপায়ীরা যখন পালা করে সিগারেট টানে, তখন বোঝা যায়। কেউ কেউ এমন মরিয়া থাকে, সুখটান না দিলে যেন মরেই যাবে। নিম্নশ্রেণির মানুষের মধ্যে অনেকের ধূমপানে এমন নেশা, ঘুম থেকে উঠেই বিড়ি ধরায়। নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত—এসব ঘরেও এমন ঘটনা দেখা যায়। আর সারা দিনে এক থেকে দেড় প্যাকেট সিগারেট ধ্বংস করা ধূমপায়ীরও অভাব নেই। ধূমপায়ীরা জেনেশুনে বিষ পান করে নিজেদের স্বাস্থ্যের বারোটা বাজালে কার কী করার আছে? কিন্তু তাঁদের এই রোজকার অভ্যাস যে অন্যদের যমের বাড়ি যাওয়ার পথ তৈরি করছে, কথা তো সেখানেই। নিজে মরবেন ভালো কথা, কিন্তু শিশুকে নিয়ে কেন? নারী বা পুরুষ যিনিই শিশুর সান্নিধ্যে ধূমপান করবেন, অলক্ষ্যেই শিশুর জীবনকে ধ্বংস করবেন তুষের আগুনের মতো। দেখা যায়, ধূমপায়ী অভিভাবক ঘরের ভেতর শিশুর সামনেই সিগারেট ধরিয়েছেন। শিশুটি নাক কুঁচকে অনুচ্চ আপত্তি জানাচ্ছে, পাত্তাই দিচ্ছেন না। এমন দৃশ্যও দেখা যায়, স্কুলগামী শিশুর পাশে থাকা (দায়িত্বশীল?) ব্যক্তিটিই অবলীলায় ধূমপান করছেন। একবার এক ব্যক্তি সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। পেছনে পাগল কিসিমের এক লোক তাঁকে অনুসরণ করছেন। হাতে আবার দা। ওই ব্যক্তি যেখানেই যান, পাগলা সেখানেই হাজির। একপর্যায়ে ব্যক্তিটি ভালোই ভড়কে গেলেন—এই পাগল আবার দা না চালায়! সিগারেট ফেলে দিয়ে তিনি ভোঁ-দৌড়! আর ওই পাগলা তখন আধখাওয়া সিগারেট তুলে আরামসে টানতে শুরু করল। কী মজা! জানি, ধূমপান ত্যাগের কথা বললে অনেকে গাল বাঁকা করে হাসবেন। কটু কথা বলবেন। নিজের চরকায় তেল দেওয়ার ভালো পরামর্শ দেবেন। এরপরও পুরোনো সেই বচনই আওড়ে যাব। ধূমপান ত্যাগ করুন। নিজের স্বাস্থ্যের দিকে না তাকান, আপনার ঘরের শিশুর দিকে তাকান, পাশের শিশুর দিকে তাকান, নগরের শিশুর দিকে তাকান, যারা এ দেশের ভবিষ্যৎ। ঠান্ডা মাথায় একবার অন্তত ভাবুন, আপনার তামাক পোড়ানো নিকোটিন কীভাবে একটি কচিপ্রাণে ঢুকে তার মধ্যে প্রাণঘাতী ক্যানসারের বীজ বুনে দিচ্ছে! অথচ ওর কোনো দোষ নেই। এ মুহূর্তে একটা গর্ব করতেই পারি যে আমি একজন অধূমপায়ী। কোনো দিনও তামাকজাত কোনো পণ্য বা সিগারেট আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। বন্ধুদের পীড়াপীড়িতে দু-একবার যে সিগারেটে টান দিইনি, তা নয়। কিন্তু এর ধোঁয়া বা স্বাদ কোনোটাই আমাকে কখনো আকৃষ্ট করতে পারেনি। আমার কাছে সব সময়ই মনে হয়েছে, আমি ধূমপান করব না—ধূমপান ত্যাগে এই ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট। অন্য কোনো কিছুর দরকার নেই। আর ধূমপানের নেশাটা যদি অদম্যই হয়ে থাকে, যা কিছুতেই বশে আনা সম্ভব নয়, তাহলে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা তো নেওয়া যায়। লোকজনের ভিড়পূর্ণ জায়গায় ধূমপান না করলেই হয়। যেমন: খেলার মাঠ, বাস টার্মিনার, রেলস্টেশন, বাস বা ট্রেনের ভেতর। ধারেকাছে শিশু আছে—এমন কোনো জায়গাও বাদ দিতে হবে। সচ্ছল ব্যক্তিরা চাইলেই বাড়ির ভেতর আলাদা ধূমপানঘর তৈরি করে নিতে পারেন, যেখান থেকে পরিবারের অন্যরা, বিশেষ করে শিশুরা থাকবে দূরে। বস্তিবাসীর পক্ষে এমন জায়গা খুঁজে নেওয়া কঠিন। সে ক্ষেত্রে ঘর থেকে দূরের কোনো জায়গায় গিয়ে বিড়ি বা সিগারেট ফোঁকার কাজটা চালানো যেতে পারে। আর ধূমপানের পর একটা কাজ কিন্তু সবারই করা উচিত। তা হচ্ছে ধূমপানের পর হাত ও মুখ এমনভাবে ওয়াশ করা, যার ফলে নিকোটিন শিশুর কাছে যাওয়ার আশঙ্কা কমে যা।
শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া: সাহিত্যিক, সাংবাদিক
sharifrari@gmail.com
অবৈধভাবে জাহাজে ভেসে তিন বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান নরসিংদীর নন্দলালপুরের রিকশাচালক রমজান মিয়া। সেখানে একটি কোম্পানিতে চাকরিও নেন। একদিন মালিকের সহায়তায় মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে পাসপোর্টের আবেদনপত্র জমা দেন। কয়েক মাস পর জমার রসিদ নিয়ে পাসপোর্ট তুলতে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে অন্য একজন সেই পাসপোর্ট নিয়ে গেছেন। মুঠোফোনে রমজান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সাবেক সহকর্মী মিয়ানমারের এক রোহিঙ্গা তাঁর নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে নিজের নামে পাসপোর্ট তৈরি করেছেন। দুটো রসিদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উভয় রসিদেই গ্রাহকের নাম, বাবা-মায়ের নাম সব একই। কেবল গ্রামের নাম আলাদা। গত বুধবার নরসিংদীর নন্দলালপুর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, মূলত দুটিই একই গ্রাম। কাগজ-কলমে গ্রামটির নাম একটি আর মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত অন্যটি। নন্দলালপুর গ্রামে গিয়ে কথা হয় রমজানের পরিবারের সঙ্গে। মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে রমজানের পরিবার একটি একচালা টিনের ঘরে ভাড়া থাকে। মালয়েশিয়া থেকে টেলিফোনে রমজান মিয়া বলেন, ‘কোম্পানির মালিকের সহযোগিতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে পাসপোর্ট আবেদন জমা দেওয়ার পর তারা জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র ইত্যাদি নিয়ে আমাকে একটি রসিদ দেয়। নির্দিষ্ট দিনে গেলে জানায়, আমার পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়ে গেছে। আবার পরের তারিখে পাসপোর্ট আনতে গেলে জানায়, আমার পাসপোর্ট অন্য কেউ নিয়ে গেছে। আমার জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে অন্য কারও নামে কীভাবে পাসপোর্ট হওয়া সম্ভব? জানতে চাইলে হাইকমিশন থেকে তারা জানায়, গ্রামের নাম বদল করা হয়েছে।’ পাসপোর্ট কী করে হলো, জানতে চাইলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার সাইদুল ইসলাম বলেন, পাসপোর্টের বিষয়টি দেখেন মশিউর রহমান। পরে মশিউর রহমানের ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। রমজান বলেন, মালয়েশিয়া আসার পর একই কোম্পানিতে কর্মরত এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। পাঁচ বছর আগে ওই রোহিঙ্গা অবৈধভাবেই মিয়ানমার থেকে জাহাজে করে মালয়েশিয়ায় এসেছিলেন। ঘনিষ্ঠতার সুবাদে রমজানের সবকিছুই জানতেন তিনি। এর সুযোগ নিয়ে তিনি হাইকমিশনে ঘুষ দিয়ে রমজানের পাসপোর্ট করিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। রমজান ওই ব্যক্তির ফেসবুক আইডি সরবরাহ করেন। তাতে দেখা যায়, ওই ব্যক্তির নাম সমীর খান। ফেসবুকে তাঁর কোনো জাতীয়তা পরিচয় নেই। রমজানের মা শেফালি বেগম বলেন, ‘রমজানের পাসপোর্টের ভেরিফিকেশনের জন্য বাড়িতে পুলিশ এসেছিল। তারা আমার ছেলের জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ ইত্যাদি যাচাই করে নিয়ে যায়।’ জানতে চাইলে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, নরসিংদীর সহকারী পরিচালক জেবুন্নাহার পারভীন দুটি রসিদ মিলিয়ে দেখে বলেন, এই পাসপোর্টগুলোর জন্য আবেদন করা হয়েছে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ দূতাবাসে। সেখানে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। অস্তিত্বহীন জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে বাংলাদেশি নন এমন কারও পক্ষে পাসপোর্ট করা সম্ভব কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, হয়তো পুলিশ ভেরিফিকেশনে কোনো সমস্যা হতে পারে। জানতে চাইলে নরসিংদীর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘কেউ যদি এই বিষয়ে অভিযোগ দেন তবে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’
রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের একটি প্রতিবেদনে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নির্যাতনের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এবং এটি গণহত্যারও শামিল। এ ইস্যুতে যুক্তরাজ্য এর নিজস্ব মানদণ্ড অনুযায়ী যথার্থ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি (ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি) এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘রাখাইন রাজ্যে সংঘাত এবং যুক্তরাজ্যের ভূমিকা’ (ভায়োলেন্স ইন রাখাইন স্টেট অ্যান্ড ইউকে’স রেসপন্স) শীর্ষক এ প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্য সরকারের কড়া সমালোচনা করে বলা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাজ্য এর নিজস্ব মানদণ্ড অনুযায়ী যথার্থ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এ সংঘাতকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য সরকারের বক্তব্যগুলো চরমভাবে বিভ্রান্তিকর ছিল বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ‘যেকোনো সংঘাতের যথাযথ সংজ্ঞা নির্ধারণ জরুরি। কেননা, এটি সুরক্ষার দায়দায়িত্বকে সামনে নিয়ে আসে এবং রাষ্ট্রগুলোকে ভূমিকা পালনে বাধ্য করে।’ যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর পরিস্থিতির নিজস্ব মূল্যায়ন না করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে। এতে দ্রুত বিশেষজ্ঞ দল প্রেরণ করে ধর্ষণ ও সংঘাতের অভিযোগগুলোর তদন্ত এবং পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র উদ্‌ঘাটন করে কমিটির কাছে প্রতিবেদন দাখিলে পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি উত্থাপন করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার সুপারিশ করা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র বিভাগ এ নিয়ে কী ভূমিকা পালন করেছে, তার মূল্যায়ন করতেই এই প্রতিবেদন তৈরি করে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। ৩৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে দেশটির একক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যৌথ ভূমিকার বিষয়গুলো আলাদা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। রোহিঙ্গা পরিস্থিতির মূল্যায়নে দ্রুত সরকারকে নিজস্ব তদন্তের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাকে অপর্যাপ্ত আখ্যায়িত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপক হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হওয়ার দায় যুক্তরাজ্যেরও আছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীনের হস্তক্ষেপে প্রস্তাব পাস না হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এতে বলা হয়, আঞ্চলিক মিত্র ও জোটের সঙ্গে মিলে যুক্তরাজ্যের উচিত সমাধান খোঁজা। প্রতিবেদনে বলা হয়, অবরোধ আরোপ যদিও কোনো উপযুক্ত পন্থা নয়; কিন্তু মিয়ানমারের কোনো সমালোচনা না করে একতরফা সম্পর্ক অব্যাহত রাখাটা যুক্তরাজ্যের জন্য সমীচীন নয়। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না ঘটলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবসার ওপর অবরোধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। রোহিঙ্গা নির্যাতনের পুরো দায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হেইংয়ের ওপর বর্তায় বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। বেসামরিক সরকারের প্রধান স্টেট কাউন্সেলর অং সাং সু চির নীরবতা সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও দেশটির গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সু চির বিকল্প নেই, কিন্তু তিনি ইতিমধ্যে নিজেকে নীতিভ্রষ্ট হিসেবে প্রমাণ করেছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে মানবিক উদাহরণ তৈরির জন্য বাংলাদেশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয় প্রতিবেদনে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে বলা হয়, বাস্তুহারা মানুষদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জের। নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেওয়া হয় প্রতিবেদনে। এতে জাতিসংঘের আস্থা অর্জন ব্যতীত কোনো ‍চুক্তিতে সমর্থন না দিতে যুক্তরাজ্য সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য স্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এটা লোকগুলোকে আশাহীন ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে এবং উগ্রবাদে দীক্ষিত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলবে।